সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

মহাভারত – ইতিহাসের আলোয়

মহাভারত – ইতিহাসের আলোয়

সন্দীপ মান্না

ডিসেম্বর ২৭, ২০২০ ১০৮২

প্রথম পর্ব

সাম্প্রতিক কালে মহাভারত মহাকাব্যের ঘটনাবলী ও চরিত্রগুলির ঐতিহাসিকতা, প্রাচীনতা, প্রামাণ্যতা ইত্যাদি নিয়ে সুবিপুল আলোচনা চলছে সারা ভারত জুড়ে। স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন উঠবে, কি ধরনের আলোচনা? একটি উদাহরণ দেওয়া যাক।

কেউ কেউ বলছেন, গুজরাট সমুদ্র উপকূলে সাগরের তলায় ‘শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকা নগরী’র সন্ধান পাওয়া গেছে। বহুতল বিশিষ্ট প্রাসাদ ও অট্টালিকা সহ এই নগরী নাকি বহু বহু প্রাচীন এক চমকপ্রদ নগরী এবং এই দ্বারকা নগরীর আবিস্কার প্রমাণ করেছে মহাভারতের ঐতিহাসিকতা ও প্রাচীনতা। কেউ সেই নগরীর সময় নির্ধারন করছেন ৫০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ তো কেউ বলছেন না না আরও আগে, প্রায় ১০০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। ইন্টারনেটের বিভিন্ন ওয়েবসাইটে এই নিয়ে বিপুল আলোচনা হচ্ছে, ইউটিউবে এই ধরনের ভিডিওর প্রদর্শন ও মন্তব্যও হচ্ছে তুমুল।

যেহেতু মহাভারতের প্রধান চরিত্রগণ বৈদিক সংস্কৃতির অন্তর্ভূক্ত, তাই সুকৌশলে প্রচারের চেষ্টা চলছে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ (বর্তমানের ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা) জুড়ে ৫০০০-১০০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ এক ‘অতি উন্নত নগর সভ্যতা’ ছিল এবং তা বর্তমান হিন্দুদের পূর্বপুরুষ বৈদিক গোষ্ঠী বানিয়েছিলেন। মহাভারতে গান্ধারের গান্ধারী যেমন ছিলেন, দ্বারকার সুভদ্রা যেমন ছিলেন, তেমন মণিপুরের (কেউ কেউ বলেন, বর্তমান ওড়িশার অন্তর্ভুক্ত স্থান) চিত্রাঙ্গদাও ছিলেন। সুতরাং আজ থেকে ৭০০০ – ১২০০০ বছর আগের বৈদিক গোষ্ঠীকৃত নাগরিক সভ্যতার ভৌগোলিক  ব্যাপ্তির সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রচারের চেষ্টাটি মন দিয়ে খেয়াল না করলে ভুল হয়ে যাবে।

সমুদ্রের তলার দ্বারকা নগরীর ঘটনাটি আসলে কি?

পুরাতত্ত্ববিদ S.R. Rao-এর তত্ত্বাবধানে গুজরাটের বর্তমান দ্বারকা শহরের কাছে সমুদ্রের তলদেশে একটি পুরাতাত্ত্বিক অন্বেষণ হয়েছিল। সেই অন্বেষণে সমুদ্রের তলায় একটি পুরাক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। পুরাক্ষেত্রগুলি সাধারণত নিকটে অবস্থিত বর্তমান অঞ্চলের নামেই পরিচিত হয়। সেই রীতি মেনে এই পুরাক্ষেত্রটির নাম দেওয়া হয়েছে দ্বারকা। সেই পুরাক্ষেত্রটি সম্বন্ধে পুরাতাত্ত্বিক S.R. Rao নিজে কি বলছেন শোনা যাক –

“The excavations by the Marine Archeology Unit (of the National Institute of Oceanography in Goa) from 1984 to 1988 in the sea bed ……… have confirmed the submergence of Dwaraka. The inner and outer fort walls, bastions and a jetty of massive dressed stones have been straced……… The ancient city was originally 4 km long and 0.5 km wide…… An Indus seal carved with a three headed animal…… and the votive jar inscribed in Late Harappan script suggest a fifteenth-century BC date for the ancient city in Bet Dwaraka”.

(সূত্রঃ- Rao S.R., Dawn and Devolution of Indus Civilization, Aditya Prakashan, Delhi, 1990, P.-151-152)

এখন কেউ যদি হরপ্পা (সিন্ধু) সভ্যতার শেষ পর্যায়ের (১৯০০-১৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) কোন পুরাক্ষেত্রকে মহাভারতের কাহিনীর এক প্রধান চরিত্র শ্রীকৃষ্ণের সময়কার দ্বারকা নগরী বলতে চান এবং তা নাকি ৫০০০-১০০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ নির্মিত, তা বলতেই পারেন, কেননা গল্পেই তো গরু গাছে ওঠে, আর আমরাও তো হাতুড়ে রচয়িতার ভূতুড়ে গল্প শুনতেই ভালবাসি। কিন্তু গল্প যে কখনই ইতিহাস নয়। মহাভারত মহাকাব্য সম্পর্কে আমরা প্রাথমিক দু’একটা ধারণার কথা ঝালিয়ে নিই।

মহাভারত রচনা 

কথিত, মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস যে কাহিনী রচনা করেন তার নাম জয় বা জয়সংহিতা এবং তা নাকি ছিল ৮৮০০ শ্লোক সম্বলিত। কৃষ্ণদ্বৈপায়নের অন্যতম শিষ্য বৈশম্পায়ন যখন পরিক্ষিতের পুত্র রাজা জন্মেজয়ের সর্পযজ্ঞে এই কাহিনীর বর্ণনা করেন, তখন উপাখ্যানযুক্ত হয়ে এই কাহিনীর শ্লোক সংখ্যা হয় ২৪০০০ এবং কাহিনীর নাম হয় ভারত। পরবর্তী প্রজন্মে কথক উগ্রশ্রবা যখন শৌনক ও অন্যান্য মুনিদের কাছে এই কাহিনীর বর্ণনা করেন, তখন কলেবর বৃদ্ধি হয়ে এই কাহিনী বিশালাকার ধারণ করে।

পরবর্তীকালে, বহু রচয়িতা এই মহান কাহিনীর সঙ্গে একাত্ম হবার ইচ্ছায় নিজেদের রচনা এতে সংযোজিত করেছেন এবং সুবিধামত সংশোধন করেছেন। ফলে, বর্তমানে ‘মহাভারত’ বলে আমরা যে অষ্টাদশ পর্বের সুবৃহৎ কাহিনী পড়ি তা মূল রচনার সঙ্গে এইসকল রচনা মিশে সৃষ্টি হয়েছে এবং কলেবর বৃদ্ধি পেয়ে গ্রন্থের শ্লোকসংখ্যা এক লাখের অধিক হয়ে গেছে। বর্তমান মহাভারত মহাকাব্যের কোনটি মূল কাহিনী এবং কোনগুলি প্রক্ষিপ্ত অংশ, তা আজও নির্ধারিত হয়নি। 

মহাভারতের কাহিনী অনুযায়ী, দুষ্যন্ত-শকুন্তলার পুত্র হলেন ভরত। কথিত, তাঁরই নামানুসারে এই দেশের নাম ভারতবর্ষ। এখানে বর্ষ অর্থে মহাদেশ। ভরত যেহেতু বহু দেশ (বর্তমান ভৌগোলিক প্রেক্ষিতে বহু অঞ্চল) জয় করে এবং বহু অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করে সার্বভৌম রাজচক্রবর্তী হয়েছিলেন তাই তাঁর দেশকে মহাদেশ বা বর্ষ নামে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। ভরতের বংশধর হলেন রাজা শান্তনু। রাজা শান্তনুর সময় থেকেই মহাভারতের মূল কাহিনী শুরু হয়েছে।

পুনের ‘সংস্করণ’

মহারাষ্ট্রের পুনের ‘দি ভাণ্ডারকর ওরিয়েন্টাল রিসার্চ ইন্সটিটিউট’-এর গবেষকগণ ১৯১৯-১৯৬৬-র মধ্যে দেশে ও বিদেশে রক্ষিত বিভিন্ন পুথি বিশ্লেষণ করে ১৯ খন্ডে ১৩,০০০ পৃষ্ঠা সমন্বিত মহাভারতের একটি ‘সংস্করণ’ প্রস্তুত করেন। ২২শে সেপ্টেম্বর, ১৯৬৬ সালে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মাননীয় সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণাণ এই ‘সংস্করণ’টি প্রকাশ করেন।

মহাভারতের গুরুত্ব

এই গ্রন্থের কলেবর, কাহিনীতে বর্ণিত দেবদেবী, চমকপ্রদ অবতারগণ, নায়ক-নায়িকাচিত লার্জার দ্যান লাইফ চরিত্রাবলী, ঘটনার ঘনঘটা ও ব্যাপকতা, রোমাঞ্চকর টানাপোড়েন, ধর্মোপদেশ, রাজনীতি, কূটনীতি, সমাজনীতি সব মিলিয়ে মহাভারতকে প্রকৃতই মহাকাব্য হতে সাহায্য করেছে। এই গ্রন্থ আকারে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মহাকাব্য বলে স্বীকৃত হয়েছে আর মানুষের মধ্যেও বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে। মহাভারতকে সংহিতা বা সংগ্রহগ্রন্থ এবং পঞ্চম বেদ স্বরূপ ‘ধর্মগ্রন্থ’ও বলা হয়ে থাকে।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘ইহা কোন ব্যক্তি-বিশেষের রচিত ইতিহাস নহে, ইহা একটি জাতির স্বরচিত স্বাভাবিক ইতিহাস’। সুতরাং, মহাভারতের ঐতিহাসিক গুরুত্ব যে আছে তা রবীন্দ্রনাথের উক্তি থেকেই প্রতীয়মান। আমরা এবার মহাভারতের ঐতিহাসিকতার মধ্যে প্রবেশ করবো এবং দেখতে চেষ্টা করবো এই কাহিনীর ঐতিহাসিকতা।

তুমুল বিতর্কের সূত্রপাত

১৯৭৫ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর ভারত সরকারের প্রাক্তন Chief Epigraphist, Dr. D.C. Sircar সংবাদসংস্থা UNI-এর কাছে মহাভারত সম্পর্কে একটি মন্তব্য করলেন এবং যথারীতি মন্তব্যটি তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করল। তিনি বললেন, মহাভারত মহাকাব্যের আদৌ কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই এবং মহাভারত আসলে একটি Myth মাত্র।

তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে তিনি বলেন –

১) বৈদিক সাহিত্যে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের কোন উল্লেখ নেই।

২) মহাভারতের সময়ের কোন সঠিক ভিত্তি নেই। মহাভারত চর্চাকারীগণ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বিভিন্ন সময়কাল নির্ধারণ করেছেন।

৩) খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের আগের কোন সাহিত্যকর্মে মহাভারতের ঘটনাবলীর বিবরণ পাওয়া যায়না।

৪) বৈদিক সাহিত্যে কুরুক্ষেত্রকে যুদ্ধক্ষেত্র বলে বর্ণনা করা নেই।

৫) কথাসরিৎসাগরে উল্লেখ আছে পরিক্ষিতের পঞ্চম বা ষষ্ঠ প্রজন্ম হলেন কৌশাম্বির রাজা উদয়ন, আবার পুরাণ অনুযায়ী উদয়ন হলেন পরিক্ষিতের পঁচিশ বা চব্বিশতম প্রজন্ম। তাহলে কোন মতটাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে!

৬) পরবর্তীযুগের বৈদিক সাহিত্যে ধৃতরাষ্ট্র ও পরিক্ষিতের নাম পাওয়া যায়, অথচ মহাভারতের অন্যতম প্রধান চরিত্র পঞ্চপাণ্ডবের কোন উল্লেখ সেখানে নেই।

৭) প্রাগজ্যোতিষপুরের (বর্তমান অসম বা অহম) ভগদত্ত মহাভারতে উল্লেখিত চরিত্র অপরদিকে পরবর্তী বৈদিক সাহিত্যে ভগদত্তের কোন উল্লেখ পাওয়া যায়না।

৮) প্রাচীনকালের মানুষের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ সম্মন্ধে কোন ধারণাই ছিলনা। কাহিনীটি জনপ্রিয় হওয়ার পর কাহিনীর সাল, তারিখ ইত্যাদির অন্বেষণ শুরু হয়েছে, একটি ঘটনার সঙ্গে অন্য ঘটনার সূত্র মিলিয়ে মিলিয়ে কাহিনীটিকে ঐতিহাসিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।

৯) এক অক্ষৌহিণী সেনার অর্থ – ২১,৮৭০ রথ, ২১,৮৭০ হাতি, ৬৫,৬১০ অশ্বারোহী এবং ১,০৯,৩৫০ পদাতিক, অর্থ্যাৎ মোট ২,১৮,৭০০। রথগুলি আবার চার ও ছয় ঘোড়ারও হত। ১৮ অক্ষৌহিনী সেনার অর্থ হলো প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষ, ঘোড়া, রথ, হাতির সম্মিলিত দল। একটি মাঠে এই বিশাল সৈন্যদলের অবস্থান ও তা নিয়ে যুদ্ধ করা একটি অসম্ভব বিষয়।

১০) দেবকীপুত্র কৃষ্ণ একজন ঐতিহাসিক চরিত্র হতেও পারেন, যেহেতু ছান্দোগ্য উপনিষদে তাঁর উল্লেখ পাওয়া যায়। 

D.C. Sircar-এর এই মত সমর্থন করলেন বিশিষ্ট পুরাতাত্ত্বিক, অধ্যাপক H.D. Sankalia. Sankalia বললেন, মহাভারতের সময়কাল ও ঘটনার বিভিন্নতা নিয়ে এই কাহিনীর চর্চাকারীদের মধ্যেই প্রচুর মতভেদ আছে। তাছাড়া, এই মহাভারত-চর্চাকারীরা মূলত সংস্কৃতভাষার পণ্ডিত ও Arm-chair Historians মাত্র। অনেক ঐতিহাসিকই অধ্যাপক Sankalia-র মতকে সমর্থন করলেন।

মহাভারতের ঐতিহাসিকতার পক্ষে যাঁরা, তাঁরা তুমুল বিরোধিতা করে উঠলেন। তাঁরা বললেন, মহাভারতের অবশ্যই ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে, এবং তার যুক্তি এবং প্রমাণও আছে। ফলে যেটা ঘটল, তা হলো, দুটি পক্ষের মধ্যে তুমুল বাদানুবাদ শুরু হয়ে গেল। এমনকি সেই সময়ের সংবাদমাধ্যমে প্রায়শই মুখ্য সংবাদ হিসাবে এই বিতর্ক প্রকাশিত হতে লাগল।

দ্বিতীয় পর্ব 

ছোটবেলা থেকে পুরাণের গল্পগুলি এমনভাবে আমরা শুনে এসেছি যে, ভারতের সুপ্রাচীন অতীত সম্পর্কে আমাদের ধারণা শুধুমাত্র মুনি-ঋষি, রাজা-মন্ত্রী, রাক্ষস-অসুর, বনবালক-বালিকা, আশ্রম-রাজপ্রাসাদ জাতীয় গল্পের মধ্যেই আশ্রয় নেয়। এর বাইরে আমরা, সাধারণ ভারতীয়রা, অন্যকিছু যেন ভাবতেই পারি না। আমরা শুধু জেনে থাকি আমাদের দেশের ভূগোল ও সংস্কৃতি বহু বহু প্রাচীন, আমাদের সভ্যতা অনাদি কালের। পুরাণ আর ইতিহাসের মিশ্রনের ঘুর্ণিতে এভাবেই ঘুরপাক খেতে অভ্যস্ত হয়ে উঠি আমরা। এই কারণেই ভারত-ইতিহাসের আদি পর্যায়কে ‘ইতিহাসম্-পুরাণম্’ আখ্যা দেওয়াও হয়। 

একদিকে উপমহাদেশের প্রাক ও প্রায় ইতিহাস (Pre and Proto History) রচনার তথ্যের অভাব অপরদিকে পুরাণ-ইতিহাসের ঘুর্ণিপাকের কারণে গল্প-কাহিনী বেশিরভাগ সময়েই ইতিহাসের স্থান গ্রহণ করেছে। এরই সঙ্গে সত্যকে জানার ও গ্রহণের অনিচ্ছা আমাদের ইতিহাস-বিমুখ করে তুলেছে। আমরা তাই কোনক্রমে তিনটি প্রস্তর যুগের ব্যপ্তির বিশালতাকে পাশ কাটিয়ে; পশুপালক জীবন, কৃষিকাজের উন্মেষকে বুড়ি ছুঁয়ে; গ্রাম গড়ে ওঠার উদ্যোগকে ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়ে ইতিহাসের উল্টোদিকে পাশ ফিরে শুই। যে পাশে থাকে মহাকাব্য, পুরাণ আর ইতিহাসের নামে আগামাথাহীন গল্প কাহিনী। তাই সুবৃহৎ মহাকাব্যটি ইতিহাস নাকি শুধুই কাহিনী নাকি ইতিহাসমিশ্রিত কাহিনী, এই ধাঁধা আর জট আজও ছাড়াতে পারিনা।

মহাভারতের কাল নির্ণয়

ঐতিহাসিকতার নিরিখে মহাভারতের ঘটনাবলীর কাল নির্ণয় করা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কবে ঘটেছিল এইসকল ঘটনাগুলি? কিসের ভিত্তিতে এর কাল নির্ণয় করা হবে? এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলিতে মনে রাখতে হবে, আলাদা আলাদা সময়ে ইতিহাসের রাজনৈতিক, সামাজিক, আর্থিক,সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ভিন্নতর হয়ে থাকে।

মহাভারতের কাল নির্ণয় করতে গিয়ে গত কয়েক দশকে বিশেষজ্ঞরা মূলত কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময়কে হিসেব করে বের করার চেষ্টা করেছেন আর এই যুদ্ধের কাল নির্ণয় করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, নানা ‘মুনি’র নানা মত। আমরা দেখে নিই কিভাবে বিশেষজ্ঞরা এই যুদ্ধের কালনির্ণয় করেছেন।

বিভিন্ন মতানুযায়ী কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময়ের যে বিভিন্নতা দেখা যাচ্ছে, তা মূলত চার ধরনের –

১) আনুমানিক ৫১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ,

২) আনুমানিক ৩১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ,

৩) আনুমানিক ১৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ,

৪) আনুমানিক ৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ।

মতগুলি এবার বিশদে দেখে নেওয়া যাক –

১) আনুমানিক ৫১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ 

এই মতটির সপক্ষে পি ভি বর্তকদের মত যাঁরা আছেন, তাঁরা মনে করেন হিন্দু সভ্যতা বহু হাজার বছরের প্রাচীন এক নাগরিক সভ্যতা। তাঁরা এটি প্রচারের জন্য কিছু গ্রহ, নক্ষত্রের অবস্থানকে যুক্তি হিসেবে প্রদান করেন। বর্তমানে এই মতটি হিন্দু সভ্যতার গৌরবগাথার বিশেষ প্রচারকারী ছাড়া সকল পক্ষের বিশেষজ্ঞ দ্বারা বাতিল হয়ে গেছে।

২) আনুমানিক ৩১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ 

এই মতটি গণনার ক্ষেত্রে প্রাধান্য পেয়েছে দ্বাপরযুগের সমাপ্তি ও কলিযুগের আরম্ভ এবং শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যু। গ্রহ-নক্ষত্র গণনা করে বলা হয়, দ্বাপরযুগের শেষ ও কলিযুগের শুরু হয় শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যুতে, ৩১০২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ -এ। মহাভারতের মৌষলপর্বে উল্লেখিত, শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যুর ৩৬ বছর আগে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ সম্পন্ন হয়েছিল। সেই হিসাব অনুযায়ী কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় হলো ৩১৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ বা আনুমানিক ৩১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ ।

আর্যভটের রচনা ‘আর্যভট্টীয়’ থেকে জানা যায়, তাঁর যখন ২৪ বছর বয়স (জন্ম ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দ), তখন কলি সূচনার ঠিক ৩৬০০ বছর শেষ হয়েছে। তাহলে কলির শুরু হয়েছে (৩৬০০-২৪-৪৭৬)= ৩১০২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। এই হিসেবে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ (৩১০২+৩৬)=৩১৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হওয়ার কথা। এখানে যে কথাটি বলে নেওয়া প্রয়োজন তা হলো, আর্যভট কি করে এই সময় হিসেব করলেন তার কোন যুক্তিগ্রাহ্য বক্তব্য পাওয়া যায় না। কেননা, রৈখিক সময় (যেমন, খ্রিস্টাব্দ) ও চক্রাকার সময় (সত্য-ত্রেতা-দ্বাপর-কলি-সত্য-ত্রেতা…) – এই আলাদা পদ্ধতি দুটিকে একই ভূমিতলে রেখে কি করে হিসাব বার করা হয় তার কোন যুক্তি দেওয়া হয়নি। এমনকি, আর্যভটের মূল গ্রন্থটির নাকি হদিশই পাওয়া যায়নি।

বরাহমিহিরের মতে এই যুদ্ধের সময় ২৪৪৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। চালুক্য রাজবংশের সম্রাট দ্বিতীয় পুলকেশীর আইহোল প্রশস্তিতে (৬৩৪ খ্রিস্টাব্দ) লেখা আছে, এই যুদ্ধের পর ৩৬৩৫ বর্ষ অতিক্রান্ত, সেই সূত্রে যুদ্ধের সময় ধরে নেওয়া হচ্ছে (৩৬৩৫-৬৩৪) = ৩০০১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ । অন্যান্য মতানুযায়ী আরও দুটি সময় পাওয়া যায়, একটি হলো ৩০৯৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ ও অপরটি ৩০৬৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ ।

আনুমানিক ৩১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ মতটির স্বপক্ষে যাঁরা, তাঁরা হলেন মূলত সংস্কৃতভাষা চর্চাকারী এবং জ্যোতিষশাস্ত্রবিদগণ। আকাশের বিভিন্ন গ্রহ নক্ষত্রের স্থান হিসাব করে এই গণনাগুলি করা হয়েছে।

৩) আনুমানিক ১৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ  

যে সকল ঐতিহাসিক মহাভারতের ঘটনাবলীকে ‘ঐতিহাসিক ঘটনা’ বলে প্রমাণ করতে চান তাঁদের মতে, ৩১৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় হতে পারে না।

তাঁদের যুক্তি, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পরে হস্তিনাপুরের রাজা হয়েছিলেন পরিক্ষিৎ। বিষ্ণু ও ব্রহ্মপুরাণ অনুযায়ী, কৌশাম্বির (এলাহাবাদের কাছে) রাজা উদয়ন হলেন পরিক্ষিতের বংশধর এবং পরবর্তী ২৪তম প্রজন্ম। আবার গৌতম বুদ্ধের সমকালীন হলেন রাজা উদয়ন। ইতিহাসে গৌতম বুদ্ধের সময়কাল আনুমানিক ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। ৩১৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ বিয়োগ করলে পাওয়া যায় ২৬৩৮ বছর। তাহলে বলতে হয়, ২৬৩৮ বছর ধরে কুরু বংশের ২৪ জন রাজা রাজত্ব করেছেন এবং এক একজন রাজার গড় রাজত্বকাল হয় ২৬৩৮ ÷ ২৪ = ১১০ বছর। পৃথিবীর কোন সভ্যতায়, বিশ্ব ইতিহাসের কোন রাজত্বকালে এই গড়ের নজির নেই। সুতরাং এ এক বাতুলতা মাত্র। বিশেষ করে যখন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় জানা যায়, ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ ভারতে মানুষের গড় আয়ু ছিল মাত্র ৩০ বছর।

এমনকি হেরোডোটাসের মতানুযায়ী যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, এক এক জন রাজার রাজত্বের গড় সময় ৩৩ বছর (এক শতাব্দীতে তিন প্রজন্মের রাজত্ব ধরে নিয়ে) তাহলে উদয়নকে ২৪তম বংশধর ধরে নিয়ে ২৪ জন রাজার রাজত্বের মোট সময় ৩৩ x ২৪ = ৭৯২ বছর। সেই হিসাবে উদয়নের রাজত্বকাল ৩১৩৮ – ৭৯২ = ২৩৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। উদয়ন যেহেতু বুদ্ধের সমকালীন, তাই সেই হিসাব ধরলে বুদ্ধের সময়কাল ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ১৮৪৬ বছর পিছিয়ে চলে যাবে (৩১৩৮-৭৯২) ২৩৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, সম্রাট অশোকের রাজত্বের সময়, ২৬৮-২৩২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পাল্টে হয়ে যাবে ২১১৪-২০৭৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। এই হিসাবের পদ্ধতি মেনে নিলে ভারতের স্বাধীনতার বছর ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে পাল্টে হয়ে যাবে ১০১ খ্রিস্টাব্দ। 

৩১৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের কাল মেনে নিলে শুধুমাত্র ভারতবর্ষই নয়, পৃথিবীর অন্যান্য সভ্যতার ইতিহাসের তারিখ ও ঘটনাক্রমও পাল্টে যাবে। যেমন, মিশরীয় সভ্যতার ঐতিহাসিক কালক্রম শুরু হয় সমকালীন লেখমালার (inscriptions) মাধ্যমে, যা খুব স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়েছে পঞ্চম রাজবংশের সময় থেকে। পঞ্চম রাজবংশের সমকালীন যে লিপি পাওয়া গেছে, তা ২৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগে হতে পারেনা। তাদের দিনপঞ্জি (ক্যালেন্ডার) তৈরি হয়েছে মহাকাশের তারার গতিকে অনুসরণ করে। Sothis/Serius (লুব্ধক)-এর অবস্থানের সাথে রাজনৈতিক ঘটনাক্রম হুবহু মিলিয়ে এই দিনপঞ্জি তৈরি করা হয়েছে, তাই ভুল হওয়ার সম্ভবনা কম। কিন্তু কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময়কে যদি ৩১৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ ধরা হয়, তবে পরবর্তী সমসাময়িক ভারতীয় শাসক ও মিশরীয় রাজবংশের সময়ের মিল নিয়ে মিশরীয় ইতিহাসে আরও পিছিয়ে গেলে কোনও সময়ই মেলানো যাবে না।

গ্রিসের ইতিহাসের সময়ের সঙ্গেও এই তারিখটি (৩১৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) মিলছেনা। অশোকের সময়ের গান্ধার লিপিতে গ্রিক বর্ণ ‘eta’, ‘xi’, ‘phi’ ও ‘Omega’ পাওয়া গেছে। গ্রিসের ইতিহাস অনুযায়ী, এই বর্ণগুলি গ্রিক লিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ। অথচ, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ যদি ৩১৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হয়, তাহলে অশোকের গান্ধারলিপির সময় (আনুমানিক ২৫৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) পাল্টে হয়ে যাবে ২১০৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ, যা সম্পূর্ণভাবে অসম্ভব।

শ্রীলঙ্কার ইতিহাস অনুযায়ী জানা যায়, ৮৪১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে তাদের সঙ্গে চিনের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। সেই থেকে শ্রীলঙ্কার ইতিহাসের সময়কাল চিনের রাজবংশের সময়কাল মিলিয়ে করা হয়েছে। রাজা উপতিশ্যার (৩৬০-৪১০ খ্রিস্টাব্দ) একটি লিপির (৩৯৮ খ্রিস্টাব্দ) উল্লেখ করে সেনারথ পরানাভিথানা বলেছেন যে, শ্রীলঙ্কায় ৫৪৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বৌদ্ধযুগের সূচনা হয়।

এই সকল কারণে, ঐতিহাসিকদের বক্তব্য হলো ৩১৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ ঘটতে পারেনা। এই মতের প্রচারকদের বক্তব্য হলো, কোশলের রাজা প্রসেনজিত, কৌশাম্বির রাজা উদয়ন এনারা গৌতম বুদ্ধের সমকালীন আর উদয়ন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পরবর্তী ২৪তম প্রজন্ম। তাই হেরোডোটাসের মতানুযায়ী যদি এক শতাব্দীতে তিন প্রজন্মের রাজত্বও ধরে নেওয়া হয়, তাহলে হিসাব বার হয় ২৪ x ৩৩ = ৭৯২। ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের সাথে (বুদ্ধের কাল) এই ৭৯২ যোগ করলে হচ্ছে ১২৯২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ বা ১৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। তাই তাঁদের হিসেবে, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময়কাল হচ্ছে আনুমানিক ১৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ।

এই সকল ঐতিহাসিকরা আরও বলেছেন, মহাভারত কখনই কোন Myth নয়। অষ্টাধ্যায়ীর লেখক পাণিনি (৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) এই মহাকাব্যের বেশ কিছু চরিত্রের কথা উল্লেখ করেছেন। তাছাড়াও, সপ্তম শতাব্দীর চিনা পরিব্রাজক জুয়ান জাং (হিউয়েন সাং) তাঁর লেখায় এই মহাযুদ্ধের কথা উল্লেখ করেছেন। ঐতিহাসিকদের মতে, যজুর্বেদ ও অথর্ববেদেও মহাকাব্যের নায়কদের নাম পাওয়া যায়, সেটাও মহাকাব্যের ঐতিহাসিকতার অকাট্য প্রমাণ।

প্রসঙ্গত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর কৃষ্ণচরিত্রে পৌরাণিক বংশলতিকা অনুযায়ী কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময়কাল নিরূপণ করেছেন ১৪৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ।

তৃতীয় পর্ব

আগের পর্বে আলোচনা হচ্ছিল কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় নিয়ে এবং সেই সময় নির্ধারণ নিয়ে বিভিন্ন মতের কথা। এখনও চতুর্থ মতটি নিয়ে আলোচনা বাকি আছে, যে মত অনুযায়ী যুদ্ধের সময়কাল আনুমানিক ৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ । 

যেহেতু গঙ্গা-যমুনা দোয়াব ও উচ্চ গাঙ্গেয় সমভূমিতে (হরিয়ানার পূর্ব অংশ, উত্তরপ্রদেশের উত্তর ও মধ্য অংশ এবং উত্তরাখণ্ডের দক্ষিণ অংশ) মহাভারতের কাহিনীর মূল কেন্দ্রগুলি অবস্থিত, তাই চতুর্থ মতটি (যুদ্ধের সময়কাল আনুমানিক ৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) নিয়ে আলোচনার আগে এই অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের (Archeological Survey of India) পরিচালনাধীন পুরাতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে আমরা যে বিভিন্ন পুরাতাত্ত্বিক পর্যায়গুলি দেখতে পাই তা নিয়ে সামান্য আলোচনা করা প্রয়োজন।

এই অঞ্চলের বিশিষ্ট পুরাক্ষেত্রগুলি হলো অহিচ্ছত্র, অত্রঞ্জিখেরা, আলমগিরপুর, ইমলিডি, কুরুক্ষেত্র, কৌশাম্বি, পানিপথ, বাগপত, বৈরাট, মথুরা,শৃঙ্গবেরপুর, হস্তিনাপুর, হুলাস ইত্যাদি। এই অঞ্চলের পুরাতাত্ত্বিক পর্যায়গুলিকে মূলত মৃৎপাত্রের বৈশিষ্ট দিয়ে ভাগ করা হয়।

গঙ্গা-যমুনা দোয়াব ও উচ্চ গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলের পুরাতাত্ত্বিক পর্যায়গুলি হলো –

ক) ‘হলদে রঙের মৃৎপাত্র সংস্কৃতি’ (Ochre Coloured Pottery Culture বা OCP),

খ) ‘কালো-লাল মৃৎপাত্র সংস্কৃতি’ (Black and Red Ware Culture বা BRW),

গ) ‘চিত্রিত ধুসর মৃৎপাত্র সংস্কৃতি’ (Painted Grey Ware Culture বা PGW) ও

ঘ) ‘উত্তরের কালো উজ্জ্বল মৃৎপাত্র সংস্কৃতি’ (Northern Black Polished Ware Culture বা NBPW)

এইবার প্রতিটি পর্যায় বিশদে দেখে নেওয়া যাক –

ক) ‘হলদে রঙের মৃৎপাত্র সংস্কৃতি’ (Ochre Coloured Pottery Culture বা OCP)

পুরাতাত্ত্বিক খননকার্যের দ্বারা গঙ্গা-যমুনা দোয়াব ও উচ্চ গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলের সবথেকে নিচে বা সব থেকে প্রাচীন সংস্কৃতি বা বসতি স্থাপনের নিদর্শন পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শেষপাদে (১৫০০/১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) । এই অঞ্চলে সেই সময় ‘হলদে রঙের মৃৎপাত্র সংস্কৃতি’ (Ochre Coloured Pottery Culture বা OCP) গড়ে উঠেছিল। এই মৃৎপাত্রের বৈশিষ্ট্য হলো অনেকদিন জলে ডুবিয়ে রাখলে মাটির পাত্রের যেরকম কাসে হলদে ভাব হয়, পাত্রগুলি তেমন রঙের।

ঘরের দেওয়ালের পলেস্তারার যে টুকরো পাওয়া গেছে তাতে দেখা যায় শণ, খড়, লতাপাতা, কুটো ইত্যাদি দিয়ে ঘরের দেওয়াল বানিয়ে তার ওপর মাটি লেপে দেওয়া হত। ঘরের খুঁটির কাঠ ছিল, শাল, বাবুল, শিশু ইত্যাদি গাছের।

এই পর্যায়ে শস্য হিসাবে গম, যব, খেসারি ও চানা জাতীয় ডালের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। হাড়, তামা দিয়ে তৈরি হাতিয়ার; টেরাকোটার টুকরো; তামার দানা পাওয়া গেছে। OCP পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিশেষত্ব হলো, এই পর্যায়ে Copper Hoard এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। Copper Hoard মানে তামার হাতিয়ার যথা, হারপুন, চ্যাপটা কুঠার, দাঁড়াসদৃশ তরবারি ইত্যাদি। এই সংস্কৃতির বা পর্যায়ের শেষ অবস্থা পাওয়া যাচ্ছে, আনুমানিক ১১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। ঐতিহাসিকরা বলছেন, হরপ্পার নাগরিক সভ্যতার অবক্ষয়ের পরে (১৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের পরে) সেখানকার মানুষদের মূলত দু’দিকে পরিযান (migration) হয়েছিল। তার একটি এই দিকে অর্থাৎ পূর্ব হরিয়ানা এবং উত্তরপ্রদেশের দিকে এবং এই OCP পর্যায় হলো সেই হরপ্পীয় নাগরিক সভ্যতার মানুষদের গ্রামীণ সংস্কৃতি। [প্রসঙ্গত, পুরাতত্ত্বের ভাষায় গ্রামের ক্ষেত্রে সংস্কৃতি (Culture) এবং নগরের ক্ষেত্রে সভ্যতা (Civilization) বলা হয়।] 

খ) ‘কালো-লাল মৃৎপাত্র সংস্কৃতি’ (Black and Red Ware Culture বা BRW)

গঙ্গা-যমুনা অঞ্চলে এই সংস্কৃতির বিস্তার ১২০০ থেকে ৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ, যদিও খুব বেশি অঞ্চলে এই সংস্কৃতি পাওয়া যায় নি। এই পর্যায়ের মৃৎপাত্রগুলি কুমোরের চাকে গড়া। পাত্রের ভেতরটি কালো ও বাইরেটা লাল ও কালো রঙের। সম্ভবত, পাত্রগুলির উপরিভাগ উল্টিয়ে দিয়ে পোড়ানো হত, ফলে বাইরের অংশ অক্সিডাইসড অবস্থায় এসে লাল-কালো রঙের হত এবং ভেতরের অংশ কম তাপমাত্রার ফলে কালো থাকত। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, মানুষের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে ও সংস্কৃতির উত্তরণ ঘটছে।

শস্যের মধ্যে ধান, যব, গম, জোয়ার এবং ডালের ক্ষেত্রে মুসুর, মটর, তিল, তিসি পাওয়া গেছে। গৃহপালিত পশুর মধ্যে গবাদি পশু, ভেড়া ও ছাগলের অস্তিত্ব জানা গেছে। অস্ত্রের ক্ষেত্রে পাথরের কুড়ালের সঙ্গে হাড়ের ও তামার তৈরি তিরের ফলা পাওয়া গেছে। কাঠকয়লার টুকরো থেকে আম, বাবুল, বাঁশ, শাল, করঞ্জি, তেঁতুল ইত্যাদি গাছের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। কালো-লাল মৃৎপাত্র সংস্কৃতি পর্যবেক্ষন করে দেখা যাচ্ছে এটি একটি গ্রামীণ কৃষি-সংস্কৃতি।

গ) ‘চিত্রিত ধুসর মৃৎপাত্র সংস্কৃতি’ (Painted Grey Ware Culture বা PGW)

এই সংস্কৃতির বিস্তৃতি ১১০০ থেকে ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। ঐতিহাসিকরা মনে করেন, এই সংস্কৃতি বৈদিক মানবগোষ্ঠীর সংস্কৃতি। মাটি ভালভাবে ছেনে ও নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় পুড়িয়ে মৃৎপাত্রগুলিকে রূপোলী-ধূসর বর্ণ করা হত। এই বর্ণের বিভিন্ন মাত্রায় (shades) পাত্রগুলি পাওয়া গেছে। পাত্রের গায়ে ধূসর বর্ণের ওপরে কালো (black) বা গাঢ় খয়েরি (deep brown) রঙ দিয়ে সহজ জ্যামিতিক নকশায় চিত্রিত করা হত। রেখা, বিন্দু, বৃত্ত, চৌকো নকশার সঙ্গে স্বস্তিকা, সিগমা (sigma) চিহ্নের চিত্রায়নও পাওয়া গেছে। পাত্রগুলির সিংহভাগই হলো থালা ও বাটি।

এই পর্যায়ে পোড়ামাটি, হাতির দাঁত, কাচ, ঝিনুক, হাড়ের গহনা পাওয়া গেছে। মধ্যিখানে গর্তবিশিষ্ট নকশা করা পোড়ামাটির চাকতি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া গেছে। তবে, পোড়ামাটির মানুষ বা পশুর মূর্তি খুবই কম পাওয়া গেছে। এই পর্যায়ের মূল বিশেষত্ব হলো ধাতু হিসাবে লোহার ব্যবহার। এই পর্যায়ের শেষের দিকে লোহা ব্যবহারের ব্যাপকতা লক্ষ্য করা গেছে। লোহার তৈরি তিরের ফলা, বল্লমের ডগা, কুড়াল, ছুরি, বালা ইত্যাদির প্রমাণ পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে হাড়ের ও তামার তৈরি অস্ত্রের প্রমাণও পাওয়া গেছে। প্রসঙ্গত, আগের দুটি পর্যায়ে লোহার ব্যবহার পাওয়া যায় নি। 

শস্যের মধ্যে ধান, গম ও বার্লির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। নদীর পলিযুক্ত উর্বর জমিকে কাজে লাগিয়ে কৃষিকাজ হত। বছরে দু’বার কৃষিকাজ হত, এমন প্রমাণও পাওয়া গেছে। কিন্তু এই পর্যায়ে নদী-সেচের কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ধরে নেওয়া হয়, চারিদিকে নদী থাকা সত্ত্বেও নদী-সেচের দক্ষতা বা উৎকর্ষতা এই পর্যায়ের মানব-গোষ্ঠীর জানা ছিল না।

গৃহপালিত পশুর মধ্যে গবাদি পশু, ভেড়া, ঘোড়া, শুয়োর পাওয়া গেছে। মাছ ধরার সরঞ্জামের চিহ্নও এই সময়ে পাওয়া গেছে। এই পর্যায়ের ঘরবাড়ি মাটির। কাঁচা মাটির ইট ও একবার পোড়ানো মাটির ইটের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। বসতি এলাকার মধ্যে কুমোরের ভাটা, কামারের কাজের জায়গা দেখা গেছে। এছাড়া এই পর্যায়ে বেশ কিছু ঘরবাড়ি পাওয়া গেছে যা কাঠ ও মাটি দিয়ে তৈরি হত। এই ধরনের বাড়িগুলিকে পুরাতত্ত্বের ভাষায় wattle and daub বলা হয়। 

এই পর্যায়ের পুরাক্ষেত্রগুলি বেশিরভাগই নদীর তীরে অবস্থিত। নদীর থেকে দূরে যে পুরাক্ষেত্রগুলি পাওয়া গেছে, সেখানে বসতির সংখ্যা অনেক কম। পুরাতত্ত্বের নির্ণয়ে এই PGW পর্যায়টি হলো গ্রামীণ কৃষি-পশুপালন সংস্কৃতি (Rural agro-pastoral culture)।

ঘ) ‘উত্তরের কালো উজ্জ্বল মৃৎপাত্র সংস্কৃতি’ (Northern Black Polished Ware Culture বা NBPW)

পরবর্তী পর্যায় হলো ‘উত্তরের কালো উজ্জ্বল মৃৎপাত্র সংস্কৃতি’ (Northern Black Polished Ware Culture বা NBPW)। এই পর্যায়ের বিস্তৃতি নির্ধারন করা হয়েছে ৬০০ থেকে ২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ । হরপ্পা (সিন্ধু) সভ্যতার নগরায়ণের পর ভারতীয় উপমহাদেশের দ্বিতীয় নগরায়ণ (Second Urbanization) ঘটে এই সময়েই গঙ্গা-যমুনা অঞ্চলে ।

এই পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, মাটির পাত্রগুলিকে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় পুড়িয়ে কালো করা হত এবং পোড়ানোর পর উজ্জ্বল মসৃণ পালিশ করা হত। মৃৎপাত্রের এই রূপ অসামান্য কারিগরী দক্ষতার পরিচায়ক। হাতির দাঁতের, পোড়ামাটির, হাড়ের তৈরি চিরুনি, দাবার বা পাশার ছক্কার মত ঘুঁটি পাওয়া গেছে। ধাতু গলানোর পাত্র ও লোহার সুপ্রচুর ব্যবহার এই সময়ে দেখা গেছে। এছাড়াও পোড়ামাটির গোল চাকা, হাড়ের তৈরি তিরের ফলা পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া গেছে।

খাদ্যবস্তু হিসাবে ধান, জোয়ার, বাজরার চিহ্ন পাওয়া গেছে। বাড়িঘর তৈরিতে পাথরের খন্ড, কাঁচামাটির ইট ছাড়াও ভালোভাবে মাটি পুড়িয়ে তৈরি ইটের ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে। সব পুরাক্ষেত্রেই, কারিগরী বিদ্যার প্রচলনের প্রচুর নিদর্শন পাওয়া গেছে। এই পর্যায়কে গ্রাম থেকে শহর গড়ে ওঠার পর্যায় হিসাবেই দেখা হয়।

এইক্ষেত্রে একটি কথা কিন্তু মনে রাখতে হবে, প্রতিটি পুরাক্ষেত্রে ওপরের নির্দিষ্ট সময় মেনে কিন্তু এই পর্যায়গুলি আসেনি। আবার বেশিরভাগ পুরাক্ষেত্রেই OCP পর্যায়ের পর সরাসরি PGW পর্যায় পাওয়া গেছে, শুধু মাঝে একটি সময়ের ফাঁক (Time Gap) থেকে গেছে।

পুরাতাত্ত্বিক পর্যায়গুলি বুঝে যাওয়ার পরে আমরা মহাভারতের সময় নির্ধারণের চতুর্থ মতটি নিয়ে আলোচনা করব।

৪) আনুমানিক ৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ 

পুরাতাত্ত্বিক, অধ্যাপক B.B. Lal এর মতে মহাভারতের প্রামাণিকতা থাকতে পারে একই নামে অবস্থিত বর্তমানকালীন স্থানগুলির পুরাতাত্বিক খননের মাধ্যমে। তাঁর তত্ত্বাবধানে মহাভারতের নামোল্লেখ থাকা কিছু স্থানে যথা, হস্তিনাপুর, মথুরা, কোশাম্বী, কুরুক্ষেত্র, পানিপথ, বাগপত, বৈরাট ইত্যাদি স্থানে ভারতীয় পুরাতাত্বিক সর্বক্ষণের উদ্যোগে খননকার্য করা হয়।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একেবারে নিচের স্তরে OCP পর্যায় পাওয়া যাচ্ছে এবং তার ওপরের স্তরে পাওয়া যাচ্ছে ‘চিত্রিত ধূসর মৃৎপাত্র সংস্কৃতি’ (Painted Grey Ware Culture বা PGW)। PGW-র পরেই সেখানে পরবর্তী সংস্কৃতি ‘উত্তরের কালো উজ্জ্বল মৃৎপাত্র সংস্কৃতি’ (Northern Black Polished Ware Culture বা NBPW)-র সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে।

অধ্যাপক B.B. Lal পুরাতাত্ত্বিক খননকার্যে পাওয়া তথ্যপ্রমাণের সঙ্গে কাহিনীর মিলগুলি খুঁজে দেখেছেন –

প্রথমত, গঙ্গা-যমুনা উপত্যকায় PGW-র সময়কাল ধরা হয় ১১০০ থেকে ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ এবং NBPW-র সময় ৬০০-২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ।

দ্বিতীয়ত, মৎস্য ও বায়ুপুরাণে বলা আছে, হস্তিনাপুর নগরী ধ্বংস হওয়ার কারণ হলো প্রবল বন্যা, ফলে রাজা পরিক্ষিতের বংশধর নিচক্ষু হস্তিনাপুর থেকে কৌশাম্বীতে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। হস্তিনাপুরের খননকার্যে PGW-র শেষ অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে সেইরকমই এক প্রবল বন্যার অস্তিত্ব।

তৃতীয়ত, হস্তিনাপুরের PGW সংস্কৃতির শেষভাগের অনুরূপ হলো এলাহাবাদের নিকট অবস্থিত কৌশাম্বীর PGW সংস্কৃতি।

অধ্যাপক B.B. Lal ধরে নিয়েছেন, এই PGW সংস্কৃতিই হলো মহাভারতের সংস্কৃতি। তিনি নিম্নলিখিতভাবে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের কাল নির্ণয় করেছেন –

নিচক্ষু হলেন পরিক্ষিতের পঞ্চম প্রজন্ম। হস্তিনাপুরের বন্যার পরে তিনি কৌশাম্বিতে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। নিচক্ষু’র পর উদয়ন হলেন কৌশাম্বি রাজ্যের ১৯তম প্রজন্ম। তাহলে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর উদয়ন হলেন ২৪তম প্রজন্ম। এই উদয়ন ছিলেন বুদ্ধের (৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) সমকালীন। সুতরাং, তিনি ধরে নিলেন ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ কৌশাম্বির রাজা ছিলেন উদয়ন।

গড়ের যোগফল হলো – ৮১.৩। এই সংখ্যাকে ৬ দিয়ে ভাগ করে পাওয়া যাচ্ছে ১৩.৫৫ বছর বা ১৪ বছর বা ১৫ বছর। তাহলে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পরবর্তী ২৪ প্রজন্মকে ১৫ দিয়ে গুণ করলে পাওয়া যাচ্ছে ৩৬০ বছর। যদি উদয়নের রাজত্বকাল ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ হয় তাহলে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আনুমানিক সময়কাল হলো ৫০০+৩৬০ = ৮৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ বা আনুমানিক ৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ । 

এইক্ষেত্রে আমাদের একটি কথা মনে রাখতে হবে, হস্তিনাপুরে পুরাতাত্ত্বিক PGW পর্যায়ের বন্যার সময়কালের সঠিকতা পুরাতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে পাওয়া গেলেও পুরাণের লেখায় কিন্তু বন্যার সময়কাল বলা হয়নি।

চতুর্থ পর্ব 

আগের পর্ব পর্যন্ত কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় নিয়ে তথা মহাভারতের ঐতিহাসিকতার সময় নিয়ে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের মতামত এবং তাদের গণনা পদ্ধতি দেখলাম। পুরাতাত্ত্বিক অধ্যাপক B.B. Lal এর গণনা অনুযায়ী জানলাম, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় হলো, আনুমানিক ৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ ।

কিন্তু সত্যিই কি তাই? সেই সময়ই কি বিখ্যাত কুরু-পাণ্ডব যুদ্ধ হয়েছিল? পঞ্চপাণ্ডব কি গান্ধারীনন্দন দুর্যোধনের শত ভাই-এর সমসাময়িক? চলুন, একবার দিল্লির পুরানো কেল্লা ঘুরে আসি। 

দিল্লির পুরানো কেল্লা

যাঁরা মহাভারতের ঐতিহাসিকতার পক্ষে, তাঁরা মনে করেন, দিল্লির পুরানো কেল্লা অঞ্চলই হলো মহাভারতের পঞ্চপান্ডব রাজধানী ইন্দ্রপ্রস্থ। এছাড়া, ইন্দ্রপ্রস্থের স্থান নিয়ে সাধারণ জনমতও বলে আজ যেখানে দিল্লির পুরানো কেল্লা অবস্থিত, সেখানেই মহাভারতের পঞ্চপাণ্ডবদের রাজধানী ইন্দ্রপ্রস্থ ছিল। এমনকি ইতিহাসের দলিল-দস্তাবেজ ঘাঁটলেও এই জনমতের সমর্থন পাওয়া যায় – 

১) চতুর্দশ শতকে লিখিত শামস সিরাজ আফিফের ‘তারিখ-ই-ফিরুজ-শাহী’-তে উল্লেখিত, সেই সময় সেই জায়গায় (দিল্লির পুরানো কেল্লা অঞ্চল) ইন্দ্রপ্রস্থ নামে একটি পরগণার সদর (district headquarter) ছিল।

২) পুরানো দিল্লির নারাইনা গ্রামে পাওয়া চতুর্দশ শতকের একটি পাথুরে লেখমালায় ইন্দ্রপ্রস্থের নাম পাওয়া গেছে।

৩) ষোড়শ শতকে রচিত আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরী’ তে লেখা আছে, পুরাকালে যেখানে পাণ্ডবদের রাজধানী ইন্দ্রপ্রস্থ ছিল সেখানেই হুমায়ুনের কেল্লা নির্মিত হয়েছিল। 

৪) উনবিংশ শতকের শেষপাদেও পুরানো কেল্লার ভেতরে একটি গ্রাম ছিল, যার নাম ইন্দ্রপত। 

তাহলে এরপরেও মহাভারতের ঐতিহাসিকতা নিয়ে আর কোন সন্দেহ কি থাকতে পারে? চলুন, একবার পুরানো কেল্লার মাটির নিচে উঁকি মারি। 

Archeological Survey of India পরিচালিত দিল্লির পুরানো কেল্লা অঞ্চলের বিস্তৃত পুরাতাত্ত্বিক খননকার্যে বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন স্তর বা পর্যায় পাওয়া গেছে। এক একটি স্তরে বা পর্যায়ে এক একটি সময়ের বসতি ছিল। সর্বপ্রাচীন বা সবথেকে নিচের স্তরটির বয়স নির্ধারিত হয়েছে খ্রিস্টপূর্বাব্দ চতুর্থ শতক। অর্থাৎ, খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের আগে এই অঞ্চলে কোনপ্রকার বসতি ছিল না এবং সর্বপ্রাচীন স্তরটি নেহাতই এক গ্রামীণ সংস্কৃতি। কাহিনীতে লেখা কোন এক ময়দানবকৃত প্রাসাদের এবং অট্টালিকাসমৃদ্ধ নগরের অস্তিত্ব পাওয়া তো দূরের কথা, এমনকি ওপরের কোন স্তরেও প্রাসাদের কোন নিদর্শন পাওয়া যায় নি। 

আগের পর্বে আমরা দেখলাম, Archeological Survey of India পরিচালিত হস্তিনাপুরের খননকার্যের মাধ্যমে পুরাতাত্ত্বিক, অধ্যাপক B.B. Lal প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আনুমানিক সময়কাল ৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ আর সেই Archeological Survey of India পরিচালিত দিল্লির পুরানো কেল্লার পুরাতাত্ত্বিক খননে দেখা গেল, পঞ্চপাণ্ডবদের রাজধানী ইন্দ্রপ্রস্থ বলে যদি কিছু গ্রামের ঘরবাড়ি, গ্রামীণ সংস্কৃতি থেকেও থাকে, ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগে কোন বসতির অস্তিত্বই এখানে ছিল না।

অঙ্গুত্তরনিকায় অনুসারে ষোড়শ মহাজনপদের যে তালিকা পাওয়া যায় সেখানে কুরু (বর্তমান দিল্লি ও সন্নিহিত এলাকা, রাজধানী – হস্তিনাপুর) জনপদটির নাম পাওয়া যায়, তার সময়কাল আনুমানিক ষষ্ঠ ও পঞ্চম খ্রিস্টপূর্বাব্দ। 

তাহলে, এখন এই চার-পাঁচশ বছরের ব্যবধান কোন গল্পকার মেলাবেন? আর মেলাতে গেলে হাতে পড়ে থাকবে শুধুই পেনসিল। 

কেন এমন হয়

আসলে লোককথায়, মানুষের মুখে মুখে এমন কিছু গল্প উড়ে বেড়ায় যা আসলে myth। সেই myth এমনভাবেই ইতিহাসের ঘটনাক্রমের সঙ্গে মিলেমিশে থাকে, তাকে আলাদা করাই হয় বেজায় মুশকিলের। এই myth-কে কেন্দ্র করেই মধ্যযুগে রচিত কিছু পুস্তকে ইন্দ্রপ্রস্থের উল্লেখ আছে, যেমন, এই myth-কে কেন্দ্র করেই রাবণের আকাশচারি রথের গল্প শোনা যায়। চতুর্দশ শতকের পাথুরে লেখমালায় ইন্দ্রপ্রস্থের উল্লেখও সেই myth-কেন্দ্রিক।

আমাদের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো, কেউ myth ও ইতিহাস মিলিয়ে মিশিয়ে কিছু লিখলেই তাঁর লেখার তথ্যাবলি কোন প্রশ্ন ছাড়াই আমরা বিশ্বাস করে নিই। তাছাড়া ছোটবেলা থেকে শুনে আসা, মনের মধ্যে গেঁথে থাকা ইতিহাস নামের পৌরাণিক গল্পগুলি এই বিশ্বাস পোক্ত করে। এই ধারণাগুলি মনের ভেতরে দীর্ঘদিন রেখে দিলে, তা একসময় ধারণা থেকে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। 

সুতরাং, এখন থেকে মুখে মুখে ঘুরে বেড়ানো গল্প, কাহিনী, স্তোত্রকথা, পৌরাণিক গল্প কিংবা ইতিহাস নামক myth শুনলে বা এই বিষয়ের কোন লেখা পড়লে আমরা কখনই বলব না, বাঃ কি দারুণ সব তথ্য জানলাম, কত ইতিহাস জানলাম। কেননা, গল্প বা myth কখনই ইতিহাস হতে পারেনা। বরং, ‘ইতিহাস’ বলে যাই বলা হোক না কেন, আমরা প্রতিটি তথ্যে সন্দেহপ্রবণ হবো এবং অবশ্যই জিজ্ঞাসার তুমুলকরণ জারি করে তথ্য ও তথ্যসূত্র বিচার করবো। We always need to ask: In whose interest is it that, the past should be presented to us in this way?

একইভাবে আমার এই মহাভারত নিয়ে লেখাটির কোনও অংশে সন্দেহ জাগলেই ঠিক ওপরের প্রশ্নটিই আমাকে করবেন এবং সঠিক উত্তর না পেলে আমার এই লেখাটির সেই অংশ গ্রহণ করবেন না।

তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে, ইন্দ্রপ্রস্থের পাণ্ডবপক্ষ কি হস্তিনাপুরের কৌরবপক্ষের সমসাময়িক নন? কুরুক্ষেত্র যুদ্ধটি মূলত কার সঙ্গে কার হলো, কিংবা যুদ্ধটি আদৌ হয়েছিল তো? তাহলে কি ধরে নিতে হবে ভীম বিখ্যাত গদাযুদ্ধে দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ করেননি কিংবা ভীষ্মের শরশয্যা অর্জুন বানাননি? আর সবথেকে বড় প্রশ্ন, বৈদিক সাহিত্যে পঞ্চপাণ্ডবের নামের উল্লেখ নেই কেন, নেই কেন প্রবল প্রতাপান্বিত মগধ নৃপতি জরাসন্ধের উল্লেখ? বিষয়টি খুবই গোলমেলে এবং প্যাঁচালো হয়ে যাচ্ছে, তাই না? ইতিহাসের পুরাতাত্ত্বিক উপাদানগুলি দেখলাম, জানলাম। এবার সাহিত্যিক উপাদানে ঐ সকল অঞ্চলের ঐ সময়ের কি কি তথ্য পাওয়া যায়, দেখা যাক।

সাহিত্যিক উপাদান

বৈদিক গোষ্ঠীর সর্বপ্রাচীন সাহিত্যকীর্তি ঋগ্বেদ। সমগ্র বৈদিক সাহিত্যকে পণ্ডিতরা দু’ভাগে বিভক্ত করেছেন –

১) ঋগ্বেদ বা ঋগ্বৈদিক সাহিত্য (১৫০০-১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে রচিত) এবং

২) পরবর্তী বৈদিক সাহিত্য অর্থ্যাৎ সাম, যজুঃ, অথর্ববেদ (সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, উপনিষদ ইত্যাদি)। এইগুলি ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের পরে রচিত।

বৈদিক সাহিত্য ছাড়া মহাভারত ব্যাখ্যা করার অন্য কোন সাহিত্যিক উপাদান তুলনামূলকভাবে কম। জৈন ও বৌদ্ধ সাহিত্যে অবশ্য কিছু উপাদান পাওয়া যায়।

সাহিত্যিক উপাদান থেকে আমরা কি কি তথ্য পাই, দেখে নিই –

ভৌগোলিক  অঞ্চল 

ঋগ্বৈদিক যুগে (১৫০০-১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) বৈদিক কৌম (Clan) গুলির বসবাসের ভৌগোলিক স্থান ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে, মূলত সিন্ধু নদ ও তার উপনদ/নদী বিস্তৃত অঞ্চলে (পাকিস্তানের সিন্ধুপ্রদেশ, পাকিস্তানের পাঞ্জাব রাজ্যে এবং ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যে)। নিকটবর্তী সম্পর্কযুক্ত কৌমগুলিকে (Clan) একসঙ্গে জুড়ে নিয়ে এক একটি বড় গোষ্ঠী (Tribe) তৈরি হত। 

ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল থেকে দক্ষিণ-পূর্বদিকে ব্রহ্মাবর্ত (বর্তমান হরিয়ানা) হয়ে ক্রমশ পূর্বদিকে পরিভ্রমণ করে আনুমানিক ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গঙ্গা-যমুনা দোয়াব ও উচ্চ গাঙ্গেয় সমভূমিতে কয়েকটি বৈদিক গোষ্ঠী বসতি স্থাপন করে।

পরবর্তী বৈদিক যুগে (১০০০-৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) তাদের বসবাসের ভৌগোলিক স্থান গঙ্গা-যমুনা দোয়াব ও উচ্চ গাঙ্গেয় সমভূমিতে যে ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ঐতরেয় ব্রাহ্মণেও। এখানে সর্বপ্রথম বসবাসের কেন্দ্রীয় ভৌগোলিক অঞ্চল হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ‘ধ্রুবমধ্যমাপ্রতিষ্ঠাদিশ’ যা কিনা ‘শিষ্টদেশ’ অর্থ্যাৎ বৈদিক ঐতিহ্যবাহী, সজ্জন সমাজের বাসস্থান। এই ‘ধ্রুবমধ্যমাপ্রতিষ্ঠাদিশ’-এর পশ্চিমসীমায় আছে বিনশন (কুরুক্ষেত্রের নিকটবর্তী) ও পূর্বসীমায় আছে কালকবন (এলাহাবাদের নিকটবর্তী)। মধ্যের এই কেন্দ্রীয় এলাকাটি পরবর্তীকালে মনুসংহিতায় ‘মধ্যদেশ’ বলে বর্ণিত।

মনে রাখতে হবে, ঋগ্বেদে অঙ্গ, মগধ ও বঙ্গের কোন উল্লেখই নেই। কিন্তু পরবর্তী বৈদিক সাহিত্যে অঙ্গ, মগধ ও বঙ্গকে অপবিত্র অঞ্চল বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, পরবর্তী বৈদিক সাহিত্যের যুগে গঙ্গা-যমুনা অঞ্চলে (বর্তমান উত্তরপ্রদেশ) বসবাস করার জন্য তাদের পূর্বভারতের ভৌগোলিক বিন্যাস ও সেখানে বসবাসকারী মানবগোষ্ঠীগুলির ভিন্ন সাংস্কৃতিক চেতনাগুলি সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়েছিল, যা স্বাভাবিক কারণেই উত্তর-পশ্চিম ভারতে বসবাসের সময়, ঋকবৈদিক যুগে ছিল না।

মহাভারতেও দেখতে পাই, ঋষি দীর্ঘতমার পাঁচ পুত্র (বলি রাজার ক্ষেত্রজ পুত্র) অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পৌণ্ড্র ও সুহ্মর উল্লেখ। বৈদিক গোষ্ঠীগুলির এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন হওয়ার মূল কারণ গঙ্গা, যমুনা ও তাদের উপনদী, শাখানদীর পলিনির্ভর উর্বর জমিতে কৃষিকাজের সুব্যবস্থা ও উৎপন্ন ফসলের প্রাচুর্য। মহাভারতের কাহিনী অনুযায়ী আমরা দেখতে পাই, এই গঙ্গা-যমুনা অঞ্চলই মহাভারতের কাহিনীর মূল ভূখণ্ড। 

রাজনৈতিক পরিস্থিতি

পরবর্তী বৈদিক সাহিত্য অনুযায়ী, বৈদিক যে যে কৌম/গোষ্ঠীগুলি উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল থেকে গঙ্গা-যমুনা অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করে, সেগুলি হলো কুরু, পাঞ্চাল, অন্ধক-বৃষ্ণি, কোশল প্রভৃতি। এই কৌম/গোষ্ঠীগুলির মধ্যে সদ্য অধিকৃত উর্বর কৃষিজমি, জলের অধিকার, পশুচারণভূমি, গবাদি পশু প্রভৃতি বিষয়ে প্রায়শই প্রবল আকারে গোষ্ঠীসংঘর্ষ হত।

এই প্রসঙ্গে মহাভারতে দুর্যোধন ও তার সঙ্গীদের বিরাট রাজার গোধন হরণ ও অর্জুনের তা পুনরুদ্ধারের কাহিনী স্মরণে আসে।

গোষ্ঠীপ্রধান (রাজন্য)-কে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা ছিল, তাকে আমরা ‘পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রাকযুগ’ (Proto-state system) বলতে পারি। কৃষিজীবী সমাজের ‘স্থায়ী পত্তন’ হওয়ার পর থেকে এবং উদ্বৃত্ত ফসলের কারণে রাজনৈতিকভাবে বৈদিক কৌম/গোষ্ঠীগুলির ‘গোষ্ঠীতন্ত্র’ থেকে ‘বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র’-এর রূপান্তর ঘটছিল ধীরে ধীরে। এই গোষ্ঠীগুলির মধ্যে সমগ্র অঞ্চল জুড়ে প্রবল প্রতাপের কারণে ক্ষমতার দাবিদার হয়ে উঠেছিল দুটি গোষ্ঠী – কুরু এবং পাঞ্চাল।

মহাভারতের কাহিনীর ভিত্তি কিন্তু কৌরব, পাণ্ডবের দ্বন্দ্বের কাহিনী নয় বরং কুরু ও পাঞ্চাল, এই দুই গোষ্ঠীর বিভেদের কাহিনী নিয়েই তৈরি। সমাজে চতুর্বর্ণ বিভাজনও হয়েছিল পরবর্তী বৈদিক যুগে। ব্রাহ্মণদের দাবি ছিল বর্ণশ্রেষ্ঠ হিসাবে তারাই সমাজশ্রেষ্ঠ, যেহেতু বৈদিকজ্ঞানের একমাত্র ধারক তারাই এবং যাগযজ্ঞে পৌরোহিত্যর সম্পূর্ণ অধিকার তাদেরই। কিন্তু গোষ্ঠীপতি রাজন্যরা (বর্ণভেদ অনুযায়ী যারা দ্বিতীয় শ্রেণীতে অবস্থিত, ক্ষত্রিয়) কোনভাবেই এই দাবি মেনে নেয়নি। ফলত, দুটি উচ্চবর্ণের মধ্যে লাগাতার তুমুল বিরোধ বেঁধেই থাকত।

মহাভারতের কাহিনীতে ব্রাহ্মণ পরশুরামের বারংবার ক্ষত্রিয় নিধন এবং ব্রাহ্মণ ঋষি বশিষ্ঠের সঙ্গে রাজা বিশ্বামিত্রের বিরোধের গল্প হয়তো এই বিভেদেরই ছায়া অবলম্বনে তৈরি।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি

এই যুগে কৃষিকাজ ছিল প্রধান জীবিকা। আধা পশুপালক-আধা কৃষিজীবীরা ক্রমশ উর্বর জমিতে পাকাপাকিভাবে কৃষিজীবী সমাজের পত্তন ঘটাল। উৎপন্ন শষ্যের মধ্যে ধান (ব্রীহি), গম, যব প্রভৃতির ব্যবহার ছিল। শতপথ ব্রাহ্মণে কৃষিকর্মের চারটি পর্যায় পাওয়া যায় – হলকর্ষণ, বীজবপন, ফসল কাটা ও পাকা ফসলের ঝাড়াই-বাছাই। পরবর্তী বৈদিক সাহিত্যে কাঠের তৈরী ধারালো লাঙলের ফলা (পবীরবৎ) কৃষিকাজের আদর্শ ছিল।

কিন্তু এই যুগেই লোহার ব্যবহারেরও উল্লেখ পাওয়া যায়। যজুর্বেদ ও অথর্ববেদে শ্যামায়স বা কৃষ্ণায়স (Dark/Black Metal) নামে লোহার উল্লেখ আছে। কৃষ্ণ যজুর্বেদের তৈত্তিরীয় সংহিতায় (৫.২.৫) উল্লেখ আছে ছটি বা কখনও বারটি বলদ বা ষাঁড়ের সাহায্যে কৃষিকাজে লাঙলের ব্যবহার। সুতরাং অবশ্যই সেই ধাতুটি (লোহা) শক্তপোক্ত ছিল, তামার মতন তুলনামূলকভাবে নরম ছিল না। ৬০০-২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ সময়ের বৌদ্ধগ্রন্থেও লোহার উল্লেখ আছে। বৌদ্ধগ্রন্থ সুত্তনিপতে লোহার বিভিন্ন সামগ্রী যথা, অঙ্কুশ, খুঁটি, গোলাকার বল, হাতুড়ি প্রভৃতির উল্লেখ আছে।

পরবর্তী বৈদিক যুগেরই দ্বিতীয় পর্যায়ে কারিগরি বিদ্যার ব্যপক প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। বাজসনেয়ী সংহিতার ৩০ অধ্যায়ে ও তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে (৩.৪) বিভিন্ন কারিগরি পেশার উল্লেখ পাওয়া যায়, যথা কুম্ভকার, কর্মার, মণিকার, ধনুকার, সুরাকার, গোপালক, সূত, ধীবর ইত্যাদি। মহাভারতেও আমরা এইসকল কারিগর শ্রেণীর পরিচয় পাই। ব্যবসা বা বাণিজ্যের প্রচলন খুব বেশি ছিল না। যেহেতু মুদ্রার প্রচলন তখনও হয়নি তাই পণ্যবিনিময় প্রথাই ছিল। 

কৃষির উদ্বৃত্ত একশ্রেনীর মানুষকে যথা, গোষ্ঠীপতি (রাজন্য) ও তার অনুচরগণ, পুরোহিতবর্গ বা ব্রাহ্মণ, শিল্পভাবনাকারী কিছু পেশাদারকে কায়িক পরিশ্রমহীন কাজে সহায়তা করল।

মহাভারতেও হস্তিনাপুরের নগর জীবনযাত্রায় একশ্রেণীর মানুষের কায়িক পরিশ্রমহীন জীবনযাপনের উদাহরণ পাই।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি

সমাজের প্রাথমিক ভিত্তি ছিল পরিবার (কুল)। এই পরিবার পিতৃতান্ত্রিক। পরিবার যৌথ বা একান্নবর্তী। পরিবারের শীর্ষে থাকেন পিতা। শিশুর কলকাকলি মুখর পরিবারের উল্লেখ বৈদিক সাহিত্যে আছে।

পোশাক মূলত ছিল সুতির। পশমের (ঊর্ণ-সূত্র) পোশাকও ছিল, সম্ভবত মেষ বা ছাগলের লোমের তৈরি। সাধারণ মানুষেরা হয়ত গাছের ছাল-বাকলের পোষাক পরতেন। গহনা বলতে তামা বা লোহার তৈরি। হাতির দাঁত বা পোড়ামাটির গহনাও ছিল। পশুর হাড়ের তৈরি চিরুনি দিয়েই নিশ্চয় রাজা-রাজড়ারা চুলের যত্ন নিতেন। ধাতুর তৈরি মুকুট বা বর্মের কোন নিদর্শন পাওয়া যায়নি। 

অস্ত্র ছিল লোহার ও তামার ফলার তির, বল্লম, কুঠার। কাঠের তৈরি গদাজাতীয় অস্ত্র থাকা সম্ভবপর। ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে স্থানান্তরে যাওয়া বিশেষজনের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকই ছিল। অর (Spoke) যুক্ত চাকার রথের প্রচলন ছিল। তবে অসমান মাটিতে বা জমিতে তার গতিবেগ সম্পর্কে সন্দেহ থাকে।

পরবর্তী বৈদিক সাহিত্য বিচার করলে দেখা যায়, এই যুগেই উত্তরভারতের সংস্কৃতকরণ (Sanskritization) শুরু হয় এবং উত্তরভারত ক্রমশ আর্যাবর্ত নামে পরিচিতি লাভ করে। 

সবমিলিয়ে পরবর্তী বৈদিক যুগে অর্থ্যাৎ ১০০০-৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের সময়ে আমরা মূলত একটি গ্রামীণ সমাজ দেখতে পাচ্ছি যা ধীরে ধীরে একটি জটিল নাগরিক সভ্যতার দিকে এগিয়ে চলেছে।

পঞ্চম পর্ব

এতক্ষণ আলোচিত পুরাতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক উপাদানের তথ্য ও বিবরণ থেকে যে বিষয়গুলি পরিস্কার হলো –

১) মহাভারত একটি কাহিনী বা মহাকাব্য। যে কোন কাহিনীতে যেমন নির্দিষ্ট সময়ের ছাপ থাকে, এখানেও তাই ছিলো। হয়তো কোনও কোনও চরিত্র বাস্তবের আধারে নির্মিত, আবার নাও হতে পারে। 

২) কাহিনীর সময়টি ১০০০ – ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে। সাল, তারিখ নির্দিষ্টভাবে কেউ বলতে পারবেন না। কেননা, বলা সম্ভবই নয়।

৩) কাহিনীর স্থানগত কেন্দ্র মূলত গঙ্গা-যমুনা অঞ্চল, ভালোভাবে বললে আর্যাবর্ত। সেটাই হওয়া স্বাভাবিক, কেননা প্রধান দুটি পরস্পরবিরোধী শক্তি, কুরু ও পাঞ্চালের ভৌগোলিক অবস্থান এইখানেই। কাহিনীতে বাকি যেটুকু ছড়ানো ছিটানো জায়গা, তাতেও এটি সম্পূর্ণ ভারতবর্ষের সকল অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করে না। 

৪) সময়ের হিসাবে যে বিষয়টি খেয়াল করতে হবে তা হলো, ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ উত্তরভারত বা আর্যাবর্তের ইতিহাসে ষোড়শ মহাজনপদ ও গৌতম বুদ্ধের প্রবেশ ঘটে গেছে। এই বিষয়টি পরের পর্বে আলোচনা করা হয়েছে।

৫) পরবর্তীকালে বিভিন্ন যুগে সেই সেই যুগের রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক, আর্থিক পরিস্থিতি মূল কাহিনীর সঙ্গে সংযোজিত এবং সংশোধিত হয়ে মূল কাহিনী বহু জায়গায় রূপান্তরিত হয়েছে। এমনকি, মূল কাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন উপকাহিনী মিলেমিশে তা এক বিশাল মহাকাব্যে পরিণত হয়েছে।

৬) মহাভারতের সংযোজন, সংশোধনগুলি কোনও কোনও জায়গায় এতোই মোটাদাগের যে, যে কেউ সেই সময়ের ইতিহাস খুঁটিয়ে পড়লেই বুঝতে পারবেন। ধরুন, রবীন্দ্রনাথের গোরা উপন্যাসের কোন জায়গায়, ২০১৯-এর লোকসভা ভোটের প্রেক্ষাপট পেলেন। কিরকম লাগবে? কিংবা চারুলতায় নিখিলেশ মোবাইল ফোনে বিমলাকে বলছেন, আজ রাতে শুধু মোমো খাবো, জেলুসিল ঘরে আছে তো? কিরকম বিষয়টা দাঁড়াবে?

মহাভারত বলতে আমরা আজ যা পড়ি, সেটা ঠিক এটাই। বিভিন্ন সময়কালীন চিত্রের মিশ্রন। আদতে জগাখিচুড়ি।

মহাভারতের কাহিনীর ঐতিহাসিকতা বিচারে আমাদের আরও কিছু বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য করা দরকার –

বাড়িঘর ও আসবাবপত্র

পুরাতাত্ত্বিক PGW পর্যায়কে (১১০০-৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) মহাভারতের কাহিনীর কাল নির্ধারণ করলে মেনে নিতে হবে, তখন, এই অঞ্চলে মূলত মাটির বাড়ির প্রাধান্য ছিল। অবস্থাপন্নদের জন্য কাঠ ও মাটি দিয়ে বাড়িঘর তৈরি হত। দ্বিতীয় ধরনের বাড়িগুলিকে পুরাতত্ত্বের ভাষায় ‘wattle and daub’ বলা হয়। এই পর্যায়ের শেষ দিকে রোদে শুকানো কাঁচা ইটের (আগুনে পোড়ান নয়) কিছু বাড়িঘরের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। কোন অট্টালিকা বা প্রাসাদের নিদর্শন পুরাতাত্ত্বিক PGW সংস্কৃতিতে পাওয়া যায়নি।

তাহলে বোঝা যাচ্ছে, মহাভারতের ময়দানবকৃত ইন্দ্রপ্রস্থের অপরূপ প্রাসাদ তৎকালীন যুগের মানুষের কল্পনারও বাইরে ছিল। বারণাবতের জতুগৃহ বেত, শণ, খড়কুটো দিয়ে তৈরি কাঁচা ঘর ছাড়া অন্যকিছু হতেই পারেনা, কেননা, এর বেশি নির্মাণ জ্ঞান সেই মানবগোষ্ঠীর ছিলো না। 

রাজসিংহাসন বলতে কাঠের উঁচু জায়গা, গাছের গুঁড়ি বা মাটির ঢিপি হতে পারে, ধাতুর তৈরি কোন উচ্চাসনের চিহ্ন পুরাতাত্ত্বিক খননে কোথাওই পাওয়া যায়নি; বিছানা বলতে মাটিতে খড়ের বা শণের বা গাছের পাতার বিছানা থাকাই একান্তভাবে সম্ভব, মহাভারতের রাজপরিবারের সদস্যরা নিশ্চয়ই সেখানেই ঘুমোতেন। অট্টালিকা এবং পালঙ্কের বর্ণনা আরও পরবর্তীকালে নাগরিক সভ্যতার কালে মূল কাহিনীতে সংযোজিত হয়েছে, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। 

সাজসজ্জা

পোড়ামাটি, হাতির দাঁত, কাচ, ঝিনুক, হাড়ের গহনা ছাড়া অন্য কোন গহনার সেসময় প্রচলন ছিল না। বর্তমানকালের মুকুর বা আয়না জাতীয় কিছু তখন ছিলই না। পশুর হাড়ের চিরুনী থাকতে পারে কেশসজ্জার জন্য। টিভি সিরিয়ালে রাজপরিবারের সদস্যদের যে সকল সোনার গহণা, মুকুট পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়, তা নেহাতই পরবর্তীতে সংযোজন, সংশোধনকালে কাহিনীতে যুক্ত হয়েছে। 

অস্ত্র

হাড়ের ও তামার তৈরি অস্ত্র ছাড়াও লোহার তৈরি তিরের ফলা, বল্লমের ডগা, কুঠার, ছুরি পাওয়া গেছে। এইসব নিয়েই নিশ্চয়ই সেসময় দু’পক্ষে যুদ্ধ হত। কোনপ্রকার বর্মের নিদর্শন পুরাতাত্ত্বিক অন্বেষণে পাওয়া যায়নি।

সুতরাং টিভিতে দেখানো অস্ত্রের নিদর্শন ও সাংঘাতিক মারণাস্ত্রের বিপুলতা নেহাতই সুড়সুড়ি দেওয়া গল্পকথা। 

কাহিনীর চরিত্র

ধৃতরাষ্ট্র, পরিক্ষিৎ ও কৃষ্ণ এই তিনজনের নাম ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়। বাকি চরিত্রগুলির, বিশেষ করে পঞ্চপাণ্ডবের পাঁচটি চরিত্রের কোন ঐতিহাসিক তথ্য নেই। 

শূন্যর ধারণা

কথিত, মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস যে কাহিনী রচনা করেন তার নাম জয় বা জয়সংহিতা। ‘জয়ো নামেতিহাসোহয়ং শ্রোতব্যো বিজিগীষুণা’, [১/৫৬/১৯] ‘যিনি জয়কামনা করেন এই জয় নামক ইতিহাস তাঁর শোনা উচিত’। এই জয় নামক রচনাটি নাকি ছিল ৮৮০০ শ্লোক সম্বলিত। আর্যভট (জন্ম ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দ) পৃথিবীতে শূন্যের গাণিতিক ধারণা ও প্রচলন ঘটিয়েছিলেন। শ্লোক সংখ্যা ৮৮০০ ছিল, এই শূন্য গণনা করার ধারণা আর্যভটের জন্মের হাজার বছর আগে কিভাবে এল? 

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ

বর্তমান কুরুক্ষেত্র শহরের কাছে কয়েকটি স্থানে পুরাতাত্ত্বিক খননকার্যে কোন কোন ক্ষেত্রে PGW সংস্কৃতির নিদর্শন পাওয়া গেছে। কিন্তু, মহাভারতের বিখ্যাত কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ১৮ অক্ষৌহিনী সেনার বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের এবং অসংখ্য মানুষ ও পশুর অস্থির নিদর্শন পাওয়া যায়নি।

এক অক্ষৌহিণী সেনাবাহিনীর অর্থ – ২১,৮৭০ রথ, ২১,৮৭০ হাতি, ৬৫,৬১০ অশ্বারোহী এবং ১,০৯,৩৫০ পদাতিক, অর্থ্যাৎ মোট ২,১৮,৭০০। রথগুলি আবার দুই ও চার ঘোড়ারও হত। কাহিনী অনুযায়ী, ১৮ দিনের যুদ্ধে ১৮ অক্ষৌহিণী সেনা মারা গেছিল, দু’দশজন ছাড়া। তার মানে প্রতিদিন ১ অক্ষৌহিণী সেনা মারা গেছিল।

প্রতিদিনের মৃতদেহের হিসাব – 

১) ২১৮৭০ রথ = ২১,৮৭০ ঘোড়া + ২১,৮৭০ সারথি + ২১,৮৭০ যোদ্ধা = ৬৫,৬১০ মৃতদেহ।

(চার, ছয় ঘোড়ার রথগুলিকে হিসাবে ধরছিনা)

২) ২১,৮৭০ হাতি = ২১,৮৭০ হাতি + ২১,৮৭০ মাহুত + ২১,৮৭০ যোদ্ধা = ৬৫৬১০ মৃতদেহ।

৩) ৬৫,৬১০ অশ্বারোহী = ৬৫,৬১০ ঘোড়া + ৬৫,৬১০ যোদ্ধা = ১,৩১,২২০ মৃতদেহ।

৪) ১,০৯,৩৫০ পদাতিক = ১,০৯,৩৫০ মৃতদেহ।

প্রতিদিন মোট (৬৫,৬১০ + ৬৫,৬১০ + ১,৩১,২২০ + ১,০৯,৩৫০) = ৩,৭১,৭৯০ মৃতদেহ। এরমধ্যে ১,০৯,৩৫০ টি পশুর ও ২,৬২, ৪৪০ জন মানুষের মৃতদেহ। 

১৮ দিনের সর্বমোট মৃতদেহের হিসাব হলো, প্রতিদিন ৩,৭১,৭৯০ মৃতদেহ x ১৮ দিন = ৬৬,৯২,২২০ (ছেষট্টি লাখ বিরানব্বই হাজার দুশো কুড়ি) মৃতদেহ। এর মধ্যে (১,০৯,৩৫০ x ১৮) = ১৯,৬৮,৩০০ পশুর ও (২,৬২,৪৪০ x ১৮) = ৪৭,২৩,৯২০ মানুষের মৃতদেহ। 

যোদ্ধাদের সঙ্গে অসংখ্য পরিমাণে দাসদাসী, রাঁধুনি, রান্নার জোগাড়ে, তাঁবু ফেলার লোক, গীত ও বাদ্য করার লোক এবং অন্যান্য বিভিন্ন কাজের লোক ছিলই। সব মিলিয়ে মনুষ্য সংখ্যাটি ৬০ না ৭০ লক্ষ, আপনারাই বলুন।

ফলত, স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে আসবে –

১) সারা ভারতে সেই সময়ে মোট জনসংখ্যা কত ছিল? তার মধ্যে কতজন যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল? 

২) যুদ্ধের সময়ে এত মানুষ কোথায় থাকতো? নিশ্চয়ই তাঁবুতে। এত তাঁবুর কাপড় বানাতে যে পরিমান তুলোর চাষ প্রয়োজন, তা কি সে সময়ে সম্ভবপর ছিল? একর বা হেক্টর প্রতি তুলোর চাষের কোন তথ্য পাওয়া গেছে? যে সময়ে সাধারনের পরনের কাপড়ই ঠিকমত জুটত না, সেখানে এত তাঁবুর কাপড় যোগাড় করা তো বিষ্ময়যোগ্য! 

৩) প্রতিদিনের মৃতদেহ ৩,৭১,৭৯০ হলে একটি বৃহৎ মাঠে একসঙ্গে তার অন্তত দ্বিগুন সৈন্য+(সারথি/মাহুত) + পশু লড়াই করত, কেননা বাকিরা জীবিত, আহত হয়ে সন্ধ্যায় তাঁবুতে ফিরত। সেই বৃহৎ মাঠটির মাপ কত ছিল, কেউ কি বলতে পারবেন? 

৪) যুদ্ধ যদি একটি মাঠে হয় বাদবাকি (রিজার্ভ) সৈন্যদের তাঁবু ও পশুদের অবস্থানের জন্য যুদ্ধস্থলের আশেপাশে বিপুল পরিমাণ খালি জায়গা দরকার। এছাড়া রান্নাবান্নার জন্যও অনেক জায়গার প্রয়োজন। কোথায় ছিল এত ফাঁকা জায়গা?

৫) মাঠের মধ্যে স্তূপীকৃত মৃতদেহের ভিড়ে পরের দিনে কোন ফাঁকা জায়গায় যুদ্ধ হত? রোজ যেখানে ৩,৭১,৭৯০ সংখ্যক পরিমাণ নিহত হত, সেখানে নিশ্চয়ই দুদিন পরে সেই মৃতদেহগুলির দুর্গন্ধে টেঁকা দায় হত। তাহলে একই জায়গায় আঠারো দিন ধরে কি করে যুদ্ধ হলো! যদি এও ধরে নেওয়া হয়, সারারাত ধরে প্রায় ৪ লাখ মৃতদেহ মাঠ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হত, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই কোথায় নিয়ে যাওয়া হত? গণকবর দিলে তার কোন পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণ কেন পাওয়া গেল না? গণচিতা জ্বালালে বিপুল পরিমাণ কাঠই বা কোথা থেকে জোগাড় হত? কোথায় ছিল এত গাছ? এত গাছ কারা কাটত? কাঁচা কাঠে চিতা জ্বলত কি? গণচিতার সুবিপুল দুর্গন্ধের কারণে সেখানে তাঁবু ফেলে আদৌ বসবাস সম্ভবপর হত কি?

৬) তিরন্দাজির জন্য অনেক জায়গা প্রয়োজন। দূর থেকে আকাশে অপর পক্ষের সেনা লক্ষ্য করে তির ছুঁড়তে হয়। তাহলে একই মাঠে যুগপৎভাবে আকাশের তিরযুদ্ধ, সামনা-সামনি গদাযুদ্ধ, বল্লম বা কুঠার দিয়ে দ্বৈরথ, ঊরু চাপড়ে মল্লযুদ্ধ কি সম্ভবপর?

৭) পাঠক খেয়াল করুন, এক অক্ষৌহিণী সৈন্যদলে – পশুর সংখ্যা ১,০৯,৩৫০ টি এবং পদাতিক সৈন্য ঠিক ১,০৯,৩৫০ টি; অশ্বারোহীর সংখ্যা ৬৫,৬১০টি তো রথের ঘোড়া, সারথি এবং যোদ্ধা মিলিয়ে সংখ্যা ৬৫,৬১০। এই সংখ্যাগুলির মিলকরণও আশ্চর্যজনক নয় কী? 

প্রশ্নগুলি স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে, এবং এর কোন সদুত্তর পাওয়া যায়না। পাওয়া যায়না, কেননা এর কোন উত্তর হয়না। 

অনেক ঐতিহাসিকের মতে, শ্রীমদ্ভগবত গীতার বাণীসহ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের এপিসোডটা মহাভারতের মূল কাহিনীর প্রক্ষিপ্ত অংশ এবং পরবর্তীকালে, সম্ভবত গুপ্ত যুগে মূল কাহিনীর সঙ্গে সংযোজিত। এই যুদ্ধের ধারণা ঋগ্বৈদিক যুগের ‘সুদাসের নেতৃত্বে ভরত গোষ্ঠীর সঙ্গে দশরাজনের বিখ্যাত যুদ্ধ’ – এর ঘটনার ছায়া অবলম্বনে তৈরি। এছাড়াও তাঁরা বলেন, গীতার বাণীসমূহের ধর্মীয়-সংস্কৃতির সঙ্গে তৎকালীন (১০০০ – ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) সময়ের বৈদিক সংস্কৃতির মিল নেই।

ষষ্ঠ পর্ব 

বিভিন্ন পুরাণে যেমন রাজবংশগুলির বংশলতিকার বিভিন্নতা দেখা যায়, তেমনই মহাভারতের ক্ষেত্রেও বংশলতিকার প্রামাণ্যতা নির্ভুল নয়। মহাভারতের বিখ্যাত বংশের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার ইচ্ছেতে পরবর্তীকালে কোন রাজার সেই বংশলতিকায় নিজের বংশকে যুক্ত করার ঘটনাও কোন অস্বাভাবিক বিষয় নয়। পরিক্ষিতের মাতৃগর্ভে মৃত্যু ও কৃষ্ণের কল্যাণে পরিক্ষিতের পুনর্জন্মলাভ কাহিনীতে বংশের ধারাবাহিকতা রাখার প্রচেষ্টাও হতে পারে। এইভাবে হয়তো বিখ্যাত বংশটির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হলো। 

বংশলতিকার ক্ষেত্রে আরেকটি গোলমাল লক্ষ্য করা যায়, যা নিচের উদাহরণে স্পষ্ট। যযাতির দুই স্ত্রী, যথাক্রমে, দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা। যযাতি ও প্রথমা স্ত্রী দেবযানীর প্রথম পুত্র যদু, যেখান থেকে শুরু হয় বিখ্যাত যদু বংশ। আবার যযাতি ও দ্বিতীয়া স্ত্রী শর্মিষ্ঠার পুত্র পুরু, যেখান থেকে শুরু হয় বিখ্যাত পুরু বংশ। সেইসূত্রে, যদু ও পুরু হলো বৈমাত্রেয় ভাই এবং সমপ্রজন্ম। চরম বিষ্ময়ের ঘটনা হলো, মহাভারত অনুযায়ী যদুর পঞ্চম প্রজন্ম শ্রীকৃষ্ণ পুরুর পঁয়ত্রিশতম প্রজন্ম অর্জুনের সমসাময়িক। আবার কাহিনী অনুযায়ী কৃষ্ণ নাকি অর্জুনের থেকে মাত্র একবছরের বড়। 

এমনই আরেকটি উদাহরণ হলো, দেবগুরু বৃহস্পতি ও অসুরগুরু শুক্রাচার্য সমকালীন। অথচ কাহিনী অনুযায়ী, বৃহস্পতির চতুর্থ প্রজন্ম অশ্বত্থামার সমকালীন যুধিষ্ঠির হলেন শুক্রাচার্যের দুহিতা শর্মিষ্ঠার পুত্র পুরুর পঁয়ত্রিশতম প্রজন্ম। মহাভারতের কাহিনীকার ও সংকলকরা যে গোঁজামিলটাও হিসাব করে দিতে পারেন নি, এটাই আশ্চর্য! 

নরকাসুর ও প্রাগজ্যোতিষপুর 

প্রাগজ্যোতিষপুরের (বর্তমান অসম বা অহম) রাজা নরকাসুর হলেন অসুর প্রধান রাজ্যের মহাশক্তিশালী রাজা। তিনি নাকি বিভিন্ন রাজ্যের ষোল হাজার নারীকে তাঁর প্রাসাদে বন্দী করে রেখেছিলেন। কৃষ্ণ সেই রাজ্যে গিয়ে ষোল হাজার নারীকে উদ্ধার করে দ্বারকায় নিয়ে আসেন। 

কাহিনীর এই গল্পটি সত্যি ধরে নিলে দুটি বিষয় সামনে আসে – 

ক) ষোল হাজার নারীকে বন্দী করে রাখতে গেলে প্রাসাদে কত ঘর প্রয়োজন? অসমে এমন কোন প্রাসাদ কি পুরাতাত্ত্বিক খনন কার্যে পাওয়া গেছে? অসমে তৎকালীন যুগে, অর্থাৎ, ১০০০ – ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ সময়ে আদৌ কোনরকম নাগরিক সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া গেছে কী? ষোল হাজার নারীকে এক জায়গায় নিয়ে আসা তৎকালীন জনসংখ্যার তুলনায় অসম্ভব কাজ নয় কী? 

খ) কৃষ্ণকে দ্বারকা থেকে অসম যেতে গেলে জরাসন্ধের মগধ পেরিয়ে যেতে হবে। কাহিনী অনুযায়ী, যে জরাসন্ধের ভয়ে কৃষ্ণ সম্পূর্ণ যদু গোষ্ঠী (clan/tribe) নিয়ে মথুরা থেকে পালিয়ে দ্বারকা গিয়ে বসতি স্থাপন করেন, তাঁরই রাজ্য অথবা সেই রাজ্যের আশপাশ দিয়ে রথ চালিয়ে বা ঘোড়ার পিঠে চেপে প্রাগজ্যোতিষপুর যাবেন এবং ঐ বিপুল পরিমাণ নারীকে হাজার হাজার গরু কি ঘোড়ার গাড়িতে করে সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসবেন আর জরাসন্ধের মতো পরাক্রমী নৃপতি চুপ করে বসে মজা দেখবেন? তাছাড়া ঐ বিপুল পরিমাণ গরু বা ঘোড়ার গাড়ি কিভাবে যোগাড় হলো? দ্বারকা থেকে প্রাগজ্যোতিষপুরের দূরত্ব কতো? কিভাবে গেলেন বা এলেন? কতোদিন সময় লাগলো?

ভগদত্ত ও প্রাগজ্যোতিষপুর 

নরকাসুরের পুত্র ভগদত্ত। তিনি দুর্যোধনের স্ত্রী ভানুমতির পিতা। ফলে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে জামাতার পক্ষ অবলম্বন করবেন, এটাই স্বাভাবিক। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে তিনি এসোছিলেন হাতি আর পদাতিক কিরাত সৈন্য নিয়ে। অসম থেকে কুরুক্ষেত্রের এরিয়াল ডিস্ট্যান্স কতো? দুহাজার কিমি-র বেশি। মিলিটারির হিসাবে, ভূমি পথ সাধারণত তার দ্বিগুণ হয়। অর্থাৎ কমপক্ষে চার হাজার কিমি। 

পাকা সড়কপথে প্রতিদিনে সৈন্যদের হাঁটার গড় গতি ঘন্টায় ৫ কিমি। রাস্তায় খানাখন্দ বা কাঁচা রাস্তায় বা জল-জঙ্গলের প্রতিবন্ধকতায় তা ঘন্টাপ্রতি গড়ে ৩ কিমি বা আরও কম। প্রতিদিন গড়ে ১০ ঘন্টা কার্যকরী হাঁটার হিসাব এবং বছরে সাত মাস কার্যকরী হাঁটার হিসাব, অর্থাৎ একজন সৈন্য ৩৬৫ দিনের বছরে ২১০ দিন হাঁটতে পারবে। এটি বর্তমানকালের হিসাবের প্রেক্ষিত। এই হিসাবে তৎকালীন যুগে ৪ হাজার কিমি হাঁটতে সময় লাগবে ১৩৩.৩৩ বা ১৩৪ কার্যকরী দিন প্রায় এবং কোন বিশ্রামের দিন না ধরে অর্থাৎ নাগাড়ে হেঁটে গেছে। তাহলে, তৎকালীন সময়ে এটা দ্বিগুণ হতে বাধ্য। কাহিনীতে জানা যায়, ভগদত্ত ১ অক্ষৌহিণী সৈন্য নিয়ে যুদ্ধে এসেছিলেন। 

ক) কতদিন আগে দুর্যোধন ভগদত্তকে যুদ্ধে যোগ দেবার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন? 

খ) মাঝে মাঝে বিশাল জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ তৈরি করে আসতে হয়েছিল। প্রচুর নদী পথে পড়েছিল। তৎকালীন যুগে নৌকোর কোন পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই। ধরে নিলাম ভেলা বানিয়ে নদী পেরোতে হয়েছিল। এক অক্ষৌহিণী সেনাবাহিনীর অর্থ – ২১,৮৭০ রথ, ২১,৮৭০ হাতি, ৬৫,৬১০ অশ্বারোহী এবং ১,০৯,৩৫০ পদাতিক। সঙ্গে অন্যান্যরা। এত পরিমাণ ভেলা কি দিয়ে বানানো হয়েছিল? বিপুল পরিমাণ ভেলার সামগ্রী প্রত্যেকটি নদীর ধারেই কিভাবে পাওয়া গেল? ভেলা বানাতে সময় লাগবে সুতরাং সেটি হিসাবে ধরলে পৌঁছানোর দিন আরও বেশি হবে। 

গ) তৎকালীন সময়ে এই বিপুল পরিমাণ লোকজনের এই দীর্ঘ পথ আসতে তার মধ্যে প্রচুর পরিমাণে অসুস্থ হবে, মারা যাবে, এটাই স্বাভাবিক। তাহলে, বাহিনীর কতজন এসে কুরুক্ষেত্রে পৌঁছল? যদি ধরে নিই, ১ অক্ষৌহিণী এসে পৌঁছলো তাহলে দ্বিগুণ পরিমাণে যাত্রার শুরুতে ছিল। যদি তাই হয়, অসমে ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ বা তারও আগে কী এই পরিমাণ যোদ্ধা, রথ, যুদ্ধ-প্রশিক্ষিত হাতি, ঘোড়া ছিল? 

মগধ – জরাসন্ধ – কংস

মহাভারতের কাহিনীর একটি অংশ মগধের নৃপতি জরাসন্ধ, জরাসন্ধের জামাতা মথুরারাজ কংস এবং জরাসন্ধের অন্যান্য সঙ্গীসাথী ও অন্যান্য চরিত্র সম্পর্কিত। ASI বা ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ-এর পুরাতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে মগধের রাজধানী রাজগীর (রাজগৃহ বা গিরিব্রজ) অঞ্চলে ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগে কোন বসতির চিহ্নমাত্র নেই। একেবারে নিচের স্তরে যে বসতির সন্ধান পাওয়া গেছে, তা সম্পূর্ণ গ্রামীণ সংস্কৃতি (নাগরিক সভ্যতা নয়) ।

আনুমানিক ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দই যদি জরাসন্ধের সময় হয়, তাহলে কাহিনী অনুযায়ী ব্যাখ্যায়িত প্রবল পরাক্রমী মগধের ‘নাগরিক নৃপতি’ জরাসন্ধ, যিনি প্রায় ১০০ রাজাকে নিজের কারাগারে বন্দী করে রেখেছিলেন, পুরাতাত্বিক হিসাব অনুযায়ী আসলে হেঁটো ধুতি পরা রাজগীরের এক ‘গ্রাম্য মোড়ল’ ছাড়া আর কিছুই ছিলেন না।

হয় ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগে মহাভারতের কাহিনীর নির্মাণ হয়নি অথবা হলেও পরবর্তীকালে সংযোজন ও সংশোধনের সময় জরাসন্ধ চরিত্রটির কাহিনীতে অন্তর্ভূক্তি ঘটেছে। যুগপৎভাবে কংস চরিত্রটিরও অন্তর্ভূক্তি একইসঙ্গে ঘটেছে, নাহলে কংস কি করে জরাসন্ধের জামাতা হন?৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ ভারতের ইতিহাস অনুযায়ী মধ্যগাঙ্গেয় সমভূমিতে গৌতম বুদ্ধ, ষোড়শ মহাজনপদের প্রবেশ ঘটে গেছে, সেখানে মহাভারতের মূল কাহিনীর চরিত্রগুলি কোথায়? মগধের রাজা তখন বিম্বিসার, মথুরা

শহরটির উল্লেখ শূরসেন গণরাজ্যের রাজধানী বলে। এবার আপনি এই সবকিছু কিভাবে, কোন অঙ্কের সাহায্যে মেলাবেন? 

কৃষ্ণ 

সামবেদের ষড়বিংশ ব্রাহ্মণের অন্তর্গত প্রথম উপনিষদটি হলো ছান্দোগ্য উপনিষদ। বৈদিক সাহিত্যের বিভাজন ধরলে সামবেদ দ্বিতীয় বেদ এবং বহুলাংশে ঋগ্বেদের ঋকগুলির সুরারোপিত গানমাত্র। কালের হিসাবে সম্ভবত ১০০০-৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ রচিত। ছান্দোগ্য উপনিষদে কৃষ্ণ নামটির উল্লেখ আছে, যার উদাহরণস্বরূপ বলা হয় কৃষ্ণ চরিত্রটি ঐতিহাসিক। যদিও তার অর্থ এই নয় যে, ছান্দোগ্য উপনিষদ ও মহাভারতের দুই কৃষ্ণ একই ব্যক্তি। 

মহাভারত অনুযায়ী, কংস হলেন কৃষ্ণের মামা এবং বয়োজ্যেষ্ঠ, তাহলে জরাসন্ধ ও কংসের চরিত্র যদি মহাভারতের কাহিনীতে ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগে যুক্ত না হয়, তাহলে, কংসের ভাগ্নে এবং বয়সে ছোট কৃষ্ণের ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগে কাহিনীতে প্রবেশ সম্ভবপর নয়। আর কৃষ্ণ যদি ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগের চরিত্র না হন, তাহলে মূল কাহিনীতে তিনি প্রক্ষিপ্ত অংশ। তাহলে, ভীষ্ম বা বিদুরের সঙ্গে তাঁর পরামর্শমূলক বৈঠকের কাহিনীর যৌক্তিকতা নেই। যেমন নেই ছান্দোগ্য উপনিষদের কৃষ্ণ ও মহাভারতের কৃষ্ণ একই ব্যক্তি ধরে নেওয়া। 

মহাভারতের কৃষ্ণ চরিত্রের নানান ব্যাখ্যা, নানান ভাষ্য আছে, আছে পণ্ডিতসমূহের বিতর্ক। কেউ বলেন, কৃষ্ণের বৃন্দাবন পর্বটি অনৈতিহাসিক, তাঁকে যেভাবে ষোল হাজার গোপিনী পরিবেষ্টিত করে দেখানো হয়েছে তাতে তাঁর হীন চরিত্র ফুটে উঠেছে, যা আদৌ ঠিক নয়, আসলে তিনি ষড়রিপু বহির্ভূত মহান যোদ্ধা, দার্শনিক, বিষ্ণুর অবতারস্বরূপ। কেউ বলেন, কৃষ্ণের গায়ের রঙ কালো, তাই নাম কৃষ্ণ এবং তিনি অনার্য সম্প্রদায়ের প্রধান নেতা। কেউ বলেন, তিনি আর্য প্রতিভূ এবং জরাসন্ধের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কাহিনী হলো, পূর্ব ভারতের অনার্যদের বিরুদ্ধে আর্যদের লড়াই এবং কৃষ্ণের নেতৃত্বে পূর্ব ভারত দখলের আর্য প্রচেষ্টা। এছাড়াও কৃষ্ণ চরিত্রের নানাদিক, নানা দর্শন, বিভিন্ন মতবাদ লেখকরা কলমের আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলেন। মুশকিল হলো এইসব লেখকরা প্রত্যেকই বর্তমান পঠিত মহাভারতের প্রতিটি চরিত্রকে এককালীন প্রেক্ষাপটে রেখে তার ওপর ভিত্তি করে কৃষ্ণ চরিত্রটিকে ঐতিহাসিক ধরে নিয়ে লেখালেখি করেন। 

সুতরাং সোজাসুজি বক্তব্য রাখাই যায়, কৃষ্ণের জন্মকাল আগে নির্ণয় করা হোক। তারপর দেখা যাক, মহাভারতের কোন ঘটনাগুলির সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত। এবার দেখা যাক, সেই ঘটনাগুলির ঐতিহাসিক কালের আন্দাজ। যাঁরা মহাভারতকে ঐতিহাসিক বলতে চান, কোন উত্তর কী আছে তাঁদের কাছ থেকে? না থাকলে মহাভারতের কৃষ্ণ চরিত্রটিকে ঐতিহাসিক চরিত্র বলে মানা সম্ভবপর নয়। 

মহাভারতের ঐতিহাসিকতা নিয়ে আরো বহু প্রশ্ন তোলা যায়, পাতার পর পাতা ধাঁধা তৈরি করে দেওয়া যায়, যার কোন সদর্থক উত্তর নেই। তাই আপাতত এখানেই বিরত হলাম। 

উপসংহার

আজও মহাভারত মহাকাব্যের ঐতিহাসিকতা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। এখনও এটি শুধুমাত্র এক সাহিত্যকর্ম, এক অনন্য মহাকাব্যমাত্র। শুধু বোঝা গেছে, অতীতের গল্প-কাঠামোয় পরবর্তীকালের খড়, মাটি, রঙের প্রলেপ পড়ে অষ্টাদশ পর্বের একলক্ষ শ্লোকসংবলিত বর্তমান মহাকাব্য পরিণতি লাভ করেছে, যেখানে বিভিন্ন কালের বিভিন্ন সংস্কৃতির একীকরণের চেষ্টা হয়েছে। তবুও আমাদের বেশিরভাগ মানুষের মনের গভীরে মহাভারত এক ঐতিহাসিক কাহিনী, কেননা, হঠাৎ করে মহাভারত কেন্দ্রিক দর্শন, সংস্কৃতি, যা ছোটবেলা থেকে মানসিকভাবে লালন, পালন করে এসেছি, সেটা জগাখিচুড়ি পাকিয়ে গেলে মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। এছাড়াও সত্যকে গ্রহণের অনিচ্ছা বিপুল সংখ্যক মানুষের মধ্যে দেখা যায়। 

মহাকাব্যটির প্রক্ষিপ্ত অংশগুলির সামগ্রিক নির্ণয় আজ পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি। সম্ভবত, হবেও না। কেননা, নতুন করে ভারতের ইতিহাস রচনার যে প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে, তাহলে তার গোঁজামিলগুলো পরিস্কার হয়ে ফুটে উঠবে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, মহাকাব্যের সংযোজন ও সংশোধনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে সংকলিত হয়েছে ১৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৪০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে। হয়তো বা! 

মহাভারতের চরিত্রদের নিয়ে গল্প লেখা যেতেই পারে, মহাকাব্যের সাহিত্যগত বিশ্লেষণে বইয়ের পর বই ছাপা হতেই পারে, কিন্তু মহাকাব্যটির ঐতিহাসিকতার পক্ষে থাকা বড়ই অনৈতিহাসিক হয়ে যাবে।

তথ্যসূত্র:

১) চক্রবর্তী, দিলীপ কুমার, ভারতবর্ষের প্রাগিতিহাস, আনন্দ পাবলিশার্স।

২) চক্রবর্তী, বিষ্ণুপদ, মহাভারত, আনন্দ পাবলিশার্স।

৩) চক্রবর্তী, রণবীর, ভারত-ইতিহাসের আদি পর্ব (প্রথম খণ্ড), ওরিয়েন্ট ব্ল্যাকসোয়ান।

৪) চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র, বঙ্কিম রচনাবলী (কৃষ্ণচরিত্র), কামিনী প্রকাশনালয়।

৫) বসু, রাজশেখর, মহাভারত, এম.সি.সরকার।

৬) ভট্টাচার্য, সুকুমারী, প্রাচীন ভারত: সমাজ ও সাহিত্য, আনন্দ পাবলিশার্স।

৭) লীলেন, মাহবুব, অভাজনের মহাভারত, PDF.

৮) Chakrabarti, Dilip K., ‘India An Archeological History, Palaeolithic Beginnings to Early Historic Foundations’, Oxford University Press.

৯) Lal, B.B., Silk Road – The Painted Grey Ware Culture of The Iron Age, PDF.

১০) Lal, B.B., Mahabharata: Historicity, PPT.

১১) Sharma, R.S., India’s Ancient Past, Oxford India Paperbacks.

১২) Singh, Upinder, A History of Ancient and Early Medieval India – From the Stone Age to the 12th Century, Pearson.

১৩) Singh, Upinder (Ed.), Delhi Ancient History, Social Science Press.

১৪) Tewari, Rakesh, The origins of Iron-working in India: New evidence from the Central Ganga Plain and the Eastern Vindhyas. (http://www.archaeologyonline.net/artifacts/iron-ore).

১৫) Thapar, Romila, The Past As Present – Forgoing Contemporary Identities Through History, Aleph Book Company.

১৬) Thapar, Romila, Ancient Indian Social History – Some Interpretations, Orient BlackSwan.

১৭) Witzel, Michael, Early Sanskritization: Origins and Development of the Kuru State, PDF.

১৮) Website of Archeological Survey of India (http://www.asi.nic.in).

মন্তব্য তালিকা - “মহাভারত – ইতিহাসের আলোয়”

  1. পড়লাম। এই গ্রুপের লেখা বেশ আকর্ষণীয়।
    এটিও তার ব্যতিক্রম নয়।
    মহাভারত। যে বিতর্কের শেষ নেই।
    লেখককে ধন্যবাদ।

  2. এটাৰ পৰ আৰ কোন প্ৰশ্ন বা সন্দেহ থাকিৰ কথা নয় ।গোষ্ঠী গত সংঘৰ্ষ ই মহাভাৰতেৰ মূল কাহিনী । ৰিসাৰ্চ পেপাৰেৰ মৰ্যাদা পাওয়া উচিত ।

  3. আপনাকে ধন্যবাদ লেখাটার জন্য । মহাভারাত অতুলনীয় এত বিশাল আর জটিল এবং অসংখ্য গল্প সমন্বিত আর কনও রচনা আমার জানা নেই । ভারত বাসিদের পরম গরবের আধার। নাই বা থাকুক ঐতিহাসিক সত্যতা। সামাগ্রিক চেতনা তো বতেই

  4. সুন্দর তথ্যভিত্তিক লেখা। তবে মহাভারত একটি বৃহৎ কাব্য এবং এতে বহু সংযোজন ঘটেছে ফলে অনেককিছুই অতিরঞ্জিত। সেই অতিরঞ্জন গুলো নিয়ে এতো দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন ছিল না। পৌরাণিক রাজবংশের প্রজন্ম বিষয়ে হিসাবে একটু গোলমাল হয়েছে মনে হচ্ছে। মৎসপুরাণ ও বিষ্ণুপুরাণে মোটামুটি বংশতালিকা ক্রমানুযায়ী দেওয়া। সে হিসাবে (বংশছেদগুলো না ধরলে ) কৃষ্ণ ও অর্জুনের বংশপর্যায়ে বিশেষ ভেদ নেই। গিরীন্দ্রশেখর বসু পুরাণপ্রবেশ বইতে পুরাণোক্ত বংশতালিকাগুলির তুলনামূলক বিচার করেছেন। সেটি আমার ঠিকঠাক মনে হয়েছে।
    বৃহস্পতি দেবগুরুর উপাধি বলে মনে হয় সুতরাং কচ পিতা বৃহস্পতি আর অশ্বথামার প্রপিতামহ বৃহস্পতি এক ব্যক্তি নাই হতে পারেন।
    যে প্রাগজ্যোতিষপুরের কথা মহাভারতে আছে তা বতর্মান আসাম নয়। হিমাচল বা উত্তরাখন্ডের কোনো হিমালয় পাদদেশের রাজ্য।
    মহাভারত ৮৮০০ শ্লোকে লেখা তা একটি শ্লোক থেকে জানা যায় যেটি নিয়ে বিতর্ক আছে। শ্লোকটি হল,
    অষ্টৌ শ্লোক-সহস্রাণি অষ্টৌ শ্লোক-শতাণি চ।
    অহং বেদ্মি শুকো বেত্তি সঞ্জয়ো বেত্তি বা ন বা।।
    এরমধ্যে শূন্যের ধারণা আবিষ্কার হওয়া না হওয়ার সম্পর্ক নেই। ওটা সংখ্যায় লেখার জন্য লাগে, কথায় লিখতে না। যদিও অনেকেই মনে করেন উপরোক্ত শ্লোকটি কেবল কূট শ্লোকগুলিকে নির্দেশ করে, পুরো কাব্যটিকে নয়।

    Anyway, মহাভারত এবং তৎসংক্রান্ত আলোচনা আমার অন্যতম প্রিয় বিষয়। আশা করি কখনও এ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার সুযোগ পাবো।
    আরেকবার ধন্যবাদ এ বিষয়টি নিয়ে লেখার জন্য

  5. “মহাভারত” কে ঐতিহাসিক বলে আমিও মনে
    করি না।।
    কারণ যে কোনো বিষয়ের ঐতিহাসিকতা প্রমান করতে গেলে যে বৈজ্ঞানিক উপায়ে সংগৃহীত তথ্য
    প্রয়োজন তা সত্যিই নেই মহাভারতের ক্ষেত্রে।
    তবুও আমার মনে একটি প্রশ্ন খোঁচায়,
    মহাভারতে বর্ণিত ময়দানব-কৃত ইন্দ্রপুরী,
    অথবা বিভিন্ন অস্ত্রের এত পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা
    কি ভাবে এলো! কারা লিখলো!
    “ব্রহ্মাস্ত্র” “পাশাস্ত্র” …ইত্যাদি অস্ত্রের গালভরা
    বর্ণনা মহাভারতে আছে।
    অবশ্যই প্রক্ষিপ্ত।
    কিন্তু একেবারে আধুনিক ও তো নয়।
    তবে কোন যুগে ওই বর্ণনা গুলি যুক্ত হলো?

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।