সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

কালের যাত্রা

কালের যাত্রা

জ্যোতির্ময় পাল

ফেব্রুয়ারী ২৬, ২০২৩ ১৩৩

১৭৮৮ সাল। স্কটিশ এনলাইটমেন্টের জোয়ার এসেছে উত্তর সাগরের কোলে থাকা এই ছোট্ট দেশে। সবাই প্রশ্ন করছে; ধর্ম, রাজনীতি, সমাজ সব কিছুকেই প্রশ্ন করার সাহস পেয়ে গেছে স্কটল্যান্ডবাসীরা। ক্ষমতার দুই কেন্দ্র, চার্চ এবং রাষ্ট্র, স্বাগত জানিয়েছে এই সাহসকে [১]।

নেপচুনিসম বনাম প্লুটোনিজম

এদিকে ন্যাচারাল ফিলোসফির শ্রেণীকক্ষে কি চলছে? ১৬০৩ সালে ইতালিয়ান দার্শনিক উলিস আলড্রোভান্ডি একটা নতুন শব্দ ব্যবহার করতে শুরু করেন- জিওলজি বা ভূতত্ববিদ্যা। প্রাচীন বিষয় জিওগ্রাফি বা ভূগোলের থেকে এর অর্থ এবং উদ্দেশ্য আলাদা। জিওগ্রাফি হল পৃথিবীর বর্ণনা, কোথায় পাহাড় আছে, কত উঁচু, কতদূর বিস্তৃত ইত্যাদির আলোচনা, এবং সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল, এই সমস্ত ভূমি মানুষের জীবনে কীরকম প্রভাব ফেলে তার অনুশীলন। উলিস আলড্রোভান্ডি, অন্যদিকে জিওলজি শব্দটি ব্যবহার করেন এই প্রাকৃতিক ভূমির বিভিন্ন রূপের কারণ খুঁজে দেখার জন্য। ইতালি থেকে জার্মানিতে জিওলজি চর্চার প্রসার ঘটে।

আব্রাহাম গটলব ভার্নার, সে যুগে জার্মানির উঠতি জিওলজিস্ট ছিলেন। ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে  পৃথিবীতে  পাথর তৈরি কীভাবে হয়েছে তাই নিয়ে তিনি নতুন তত্ত্ব  দিলেন। তাঁর মতে সমস্ত পাথর তৈরি  হয়েছে সমুদ্রের জল থেকে। রোমান সমুদ্রের দেবতা নেপচুনের নামে এই থিওরির নাম হল নেপচুনিসম; অবশ্য অনেকে একে তত্ত্ব বললেও, বৈজ্ঞানিক অর্থে যাকে তত্ত্ব বলা হয় সেভাবে একে তত্ত্ব না বলাই ভালো। ভার্নারের অকাট্য প্রমান – ওল্ড টেস্টামেন্ট বা আদিপুস্তকে বর্ণিত নোয়ার বন্যা। নেপচুনিস্টদের স্থির বিশ্বাস যে এই ভয়ঙ্কর বন্যার পর থেকেই সমস্ত পাথর জমতে শুরু করে।

সমসাময়িক ইতালিতে আন্তন লাজারো মোরো, আরও একটা তত্ত্ব উত্থাপন করলেন। কেবল মাত্র জল থেকে নয়, আগ্নেয়গিরি থেকেও পাথর তৈরি হতে পারে। আগ্নেয়গিরি যেন নরক থেকে উঠে আসে, আর সেই জন্যই গ্রিক নরকের দেবতার নামে এই তত্ত্বর নাম প্লুটোনিজম। দুই মতবাদের মধ্যে বিবাদ চলতে থাকে, কিন্তু চার্চের সমর্থনের জন্য নেপচুনিসম অধিক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

সদ্য শুরু হওয়া জিওলোজি পাঠ্যসূচিতে তখন নেপচুনিসম প্রধান পাঠ্য বিষয় হয়ে উঠল।

পৃথিবীর বয়স ৬,০০০ বছর নাকি ৭৫,০০০ বছর

পাথর তৈরি হতে কত সময় লাগে, পৃথিবীই বা কত পুরোনো, সে সব নিয়েও ইউরোপের দার্শনিক মহলের একাংশ চিন্তা ভাবনা করতে শুরু করেছে। এই ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়েই ফ্রান্সের নাচেরলিস্ট জর্জেস-লুই লেক্লারক, কোম্তে দ্য বুফোঁ আদিপুস্তক থেকে পৃথিবীর বয়স হিসাব করে ফেললেন, তা দাঁড়ালো গিয়ে ৬০০০ বছর। কিন্তু আদিপুস্তক বর্ণিত সেই কুলপঞ্জী কি একদম সঠিক? বুফোঁর মন সংশয়ী হয়ে ওঠে।

১৭ শতাব্দীর জার্মান গণিতজ্ঞ লিবনিজ মনে করেছিলেন পৃথিবী কোনো জ্বলন্ত অগ্নিপিন্ড থেকে ক্রমশ ঠান্ডা হয়েছে। ১৮ শতকের ইতালিয়ান প্লুটোনিজমের থিওরিও অনেকটা এই ধারণার সঙ্গে মিলে যায়। ১৭৬০ সালে বুফোঁ একটা পরিকল্পনা করলেন। লোহার গোলককে গরম করে গলনাঙ্কের কাছে নিয়ে গিয়ে দেখতে চাইলেন  ঠাণ্ডা হতে কত সময় লাগছে। তৎকালীন থার্মোমিটারের ওপর ভরসা না করে বুফোঁ হাত দিয়ে মেপে দেখতেন যে লোহার গোলক ঠাণ্ডা হয়েছে কিনা। এই রকম অনেক পরীক্ষা করার পর তিনি কিছু ফলাফল পেলেন। ১৭৭৮ সালে তাঁর সেই সমস্ত ফলাফল প্রকাশ করলেন বইয়ের আকারে, “Les époques de la nature” [২]। এটি সম্ভবত পৃথিবীর প্রথম জিওলোজি-র বই। অবশ্য অনেকে চার্লস লিয়েলের ‘প্রিন্সিপলস অফ জিওলজি‘-কে প্রথম জিওলজি-র বই বলেন।  

বুফোঁর গবেষণা নিয়ে এলো নতুন তথ্য। তাঁর হিসাব বলছে পৃথিবীর বয়স প্রায় ৭৫,০০০ বছর। অর্থাৎ তাঁর তথ্য আদিপুস্তক তথা চার্চবিরোধী।

ধর্ম আর বিজ্ঞানের বিবাদ

ইউরোপে ধর্ম আর বিজ্ঞানের বিবাদ দীর্ঘদিনের। প্রথমদিকে বিবাদ শুরু হয়েছিল সূর্য আর পৃথিবীর আপেক্ষিক অবস্থান নিয়ে। কোপার্নিকাস, ব্রুনো, গ্যালিলিও প্রমুখ বিজ্ঞানীরা যখন ভূকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের বদলে সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বের কথা প্রচার করতে থাকেন, তখন হয় তাঁরা ধর্মনিন্দার দোষে অভিযুক্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন, বা কারাগারে জীবন কাটিয়েছেন। এসমস্ত ঘটনা ১৬-শতকের। আইজ্যাক নিউটনের জন্ম ১৬৪২ সালে, এবং তার বৈপ্লবিক আবিষ্কারের পর থেকে পৃথিবী এবং সূর্যের অবস্থানের আপাতবিবাদের নিস্পত্তি হয়। বিজ্ঞানের অকাট্য প্রমাণের সামনে প্রাচীন পুঁথির কথা নেহাৎ অলীক বলে প্রমাণিত হয়। মানুষ বিজ্ঞানের পরীক্ষা ও যুক্তির অমোঘ শক্তিকে ক্রমশ মেনে নিতে থাকে। এরপর সরাসরি ধর্মীয় পুস্তকের বিরোধিতা করে নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ১০০ বছরের মধ্যে আর আসেনি। আব্রাহামিক ধর্মগ্রন্থগুলোর মধ্যে ভূকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের উল্লেখ ছাড়াও আরো একটি বিষয় ছিল, যেটা তৎকালীন বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন সময় ভাবিয়ে তুলেছে, কিন্তু সরাসরি ধর্ম গ্রন্থের বিরোধিতা করার মতো কোনো যুক্তি সামনে আসেনি, তা হলো পৃথিবীর বয়স।

বুফোঁ এই প্রথম খুঁজে পেলেন পৃথিবীর বয়েস ৭৫,০০০ বছর! এই বই প্রকাশ করা সহজ না। বইয়ের ভূমিকায় দাবি ত্যাগ করতে হলো, “সম্পূর্ণ অনুমানমূলক ধারণা” যা “অপরিবর্তিত স্বতঃসিদ্ধ” ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষতি করতে পারে না [অনুবাদ সম্পাদকের] [২]। বুফোঁর বইয়ের ইংরেজি অনুবাদক জা জালাসিউইচ আরো কিছু অপ্রকাশিত পুঁথির খোঁজ দিয়েছিলেন, তাতে বুফোঁর গণনা মতে পৃথিবীর বয়েস প্রায় ৩০ লক্ষ বছর[২]। এই হিসাব ১৭৭৮ সালে ছিল মহাপাপ এবং ধর্মনিন্দা।

শিলাচক্র

১৭৮৮ সাল। তিন বন্ধু উত্তর সাগরের মাঝে ভেলা নিয়ে বেড়িয়েছেন। স্কটল্যান্ডের ডানগ্লাস থেকে সিক্কার পয়েন্টের উদ্দেশ্যে। বাম দিকে অথৈ সাগর, ডানদিকে স্কটিশ দ্বীপের বারউইকশায়ার উপকূল। তিন বন্ধু  জেমস হুটোন, জন প্লেফেয়ার, আর জেমস হল [৩]। স্কটিশ এনলাইটমেন্টের সঙ্গে এরা তিনজনেই বিভিন্ন ভাবে যুক্ত। প্লেফেয়ার এর মধ্যে বিশেষ প্রসিদ্ধ ছিলেন। ইউক্লিডের পঞ্চম এক্সিওম প্লেফেয়ারের নামে। জেমস হুটোন ডাক্তারি পড়ে পরবর্তী কালে কৃষিকাজ নিয়ে গবেষণা করেন। হুটোনের বাবা ছিলেন সেসময়কার এডিনবার্গের কোষাধক্ষ্য। অল্পবয়সে বাবাকে হারালেও পারিবারিক অর্থিক অবস্থা কখনোই খারাপ ছিল না।  স্বাবলম্বী হয়ে নিজের ব্যবসাতেও তিনি উন্নতি করেন। ১৭৬৪ সাল থেকে কৃষিকাজ থেকে সাময়িক বিরতি নিয়ে জর্জ ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে হুটোন এডিনবার্গের বাইরে ঘুরতে যান। সেই সময় প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ হয় এবং ভূমির বিভিন্ন রূপের উৎপত্তি নিয়ে ভাবনা শুরু করেন [৩]।

পর্যবেক্ষণ এবং তার দার্শনিক বিশ্লেষণ থেকে বিজ্ঞানের সূচনা। বিশ্লেষণ শুরু হয় প্রথমে যুক্তি দিয়ে, তারপর ভাষা দিয়ে, তারপর অংক কষে এবং  শেষে হয়তো আরো কিছু, পরীক্ষা নিরীক্ষা করে, বিজ্ঞান জ্ঞানী হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রথম ভাবনাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  তার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে ভবিষ্যতের ভাবনার ভিত্তি। প্রায় ২০ বছর ধরে ব্রিটিশ দ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে হুটোন কিছু পর্যায়ক্রমিক যুক্তি সাজিয়ে তোলেন। আগ্নেয়শিলা বা গ্রানাইট যে সমুদ্রের জল থেকে তৈরি  হয়নি, সে বিষয়ে হুটোন মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে উঠে ছিলেন। তাঁর চিন্তা ভাবনা অনেকটাই ইতালিয়ান প্লুটোনিজম দিয়ে প্রভাবিত ছিল। কিন্তু পরবর্তী ধাপে ইতালিয়ান প্লুটোনিজমের থেকে তাঁর ভাবনা ক্রমশ আলাদা হতে থাকলো। প্রথমে আগ্নেয়গিরি থেকে পাথর তৈরী হলেও সেই পাথর বায়ু, নদী, সাগরের প্রভাবে ক্ষয়ে যেতে থাকে। ক্ষয়ে যাওয়া পাথর আবার স্তরীভূত হয়ে নতুন পাথর তৈরী করে। এই চক্র অবিরাম। হুটোনের নিজের ভাষায়, “পৃথিবী, একটি প্রাণীর দেহের মতো, এটি মেরামত করার সঙ্গে সঙ্গে আবার নষ্টও হয়ে যায়। এর বৃদ্ধি এবং পরিবর্ধন এর একটি দিক আছে; এর আরেকটি অবস্থা রয়েছে যা হল হ্রাস এবং ক্ষয়। এইভাবে এই পৃথিবীর  এক অংশে ধ্বংস হয়, কিন্তু অন্য অংশে নবায়ন হয়”.[অনুবাদ সম্পাদকের] হুটোন এই চক্রের নাম দেন “Rock cycle” – শিলাচক্র [৪]।

হুটোনের দ্বিতীয় যুক্তি ছিল যে, বর্তমানে ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক ঘটনা প্রবাহকে যদি সঠিক ভাবে  বুঝতে পারা যায়, তাহলে পৃথিবীর বুকে ঘটে যাওয়া পুরোনো ঘটনা গুলোকেও বোঝা যাবে। বর্তমানই অতীতের দর্পন [৪]।

আজকের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায় পাথর ক্ষয়ে গিয়ে আবার জমে ওঠা অতি  ধীর এক প্রক্রিয়া। শিলা চক্র যদি চলতে থাকে, এবং এই ভাবে যদি পাথর তৈরি  হয়, তাহলে এর সময়কাল ছিল কল্পনাতীত। এই সময়কাল কখনোই ধর্মপুস্তকের ৬০০০ বছর হতে পারে না। ততদিনে বুফোঁর গণনা সামনে এসেছে । কিন্তু ৭৫,০০০ বছরও হুটোনের দার্শনিক ভাবনার জন্য যথেষ্ট নয়। হুটোনের ভাষায়, “অতএব, আমাদের বর্তমান অনুসন্ধানের ফলাফল হল, আমরা কোনো শুরুর চিহ্ন খুঁজে পাই না, শেষের কোনো সম্ভাবনা খুঁজে পাই না।” [অনুবাদ সম্পাদকের ][৪]

যখন ‘সময় গভীর হচ্ছিলো’

১৭৮৫ সালে হুটোন প্রকাশ করলেন তার প্রথম গবেষণাপত্র, “থিওরি অফ আর্থ” [৪]। ১০০ পাতার এই বইতে তাঁর চিন্তাভাবনার একটা খসড়া লিখে পেশ করলেন রয়াল সোসাইটি অফ এডিনবার্গ-এর সভায়। ১৭৮৫ এর আগে ‘সময় অগভীর ছিল, সময় অল্প ছিল’। কেবল হাতে গোনা কয়েকজন বিজ্ঞানীর কাছে ‘সময় গভীর হচ্ছিলো, সময় অনন্ত হচ্ছিলো’। “Deep time” ভূতত্ববিদ্যার মৌলিক ধারণা হয়ে উঠলো [৫]। ভূগোলের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন একটা নতুন বিষয় হয়ে দাঁড়ালো। ভূগোল ক্রমশ মানুষের সময়কাল  ঘেঁষা একটি বিষয় হয়ে উঠতে থাকলো, জিওলজি আগামীদিনে ক্রমশ বিজ্ঞান ঘেঁষা বিষয় উঠতে থাকলো।

তিন বন্ধুর কথা

কিন্তু ১৭৮৮ সালে কি করছে সেই তিন জন? আবার ফিরে যাওয়া যাক সেই সময়ে, সেই স্কটিশ উপকূল বরাবর উত্তর সাগরের পারে। ১৭৮৫ সালে হুটোনের তত্ত্ব কেবল দার্শনিক ভাবনা হিসাবে দাঁড়িয়েছিল। তাকে হাতে কলমে প্রমাণ  করতে হত সময়ের গভীরতা, শিলাচক্রের সত্যতা। জেমস হল স্কটল্যান্ডের ডানগ্লাস-এর বাসিন্দা, স্কটিশ উপকূল ভালো করেই চিনতেন। প্লেফেয়ারকে সঙ্গে নিয়ে সেই ঐতিহাসিক নৌযাত্রায় এসে পৌঁছালেন সিক্কার পয়েন্টে [৩]। ২০০ বছর পরেও সিক্কার পয়েন্ট একই ভাবে রয়েছে। এখানে দীর্ঘক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলে চোখ যখন পরিষ্কার হয়ে উঠবে, তখন দেখা যাবে দুটো সম্পূর্ণ আলাদা পাথরের স্তর। ওপরে রয়েছে প্রায় অনুভূমিকভাবে একটা পাথরের স্তর। এদের রং কিছুটা হালকা লালচে। তার নিচে আছে একটু কালচে রঙের পাথর, এরা আবার প্রায় উল্লম্ব ভাবে প্রসারিত। জেমস হল এই দৃশ্যের একটা ছবি এঁকে ফেললেন। জেমস হুটোনের চোখের সামনে ভেসে উঠলো ইতিহাস, পৃথিবীর গভীর সময়ের ইতিহাস।

প্রথমে এই কালচে পাথর সমুদ্র পৃষ্ঠে জমা হচ্ছিলো। এদের নাম গ্রেওয়াকে। তারপর এরাই ভূআলোড়নের কারণে প্রায় ৯৫ ডিগ্ৰী কোণ  বেঁকে গেল, অর্থাৎ প্রায় উলম্ব ভাবে দাঁড়িয়ে গেলো। এই জন্য সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে উঁচুতে উঠে গেলো, আর পাথর জমতে পারলো না। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ওপরে উঠে যাবার কারণে এই উল্লম্ব পাথরই বাতাসের প্রভাবে ক্ষয়ে যেতে লাগলো। আবার সমুদ্রের ওঠানামার মধ্যে এরা সমুদ্রের নিচে চলে গেলো।

এরপরে উল্লম্ব গ্রেওয়াকের ওপর অনুভূমিক ভাবে বিস্তৃত লালচে পাথর জমতে লাগলো, যাদের নাম ওল্ড রেড স্যান্ডস্টোনে। তারপর একদিন সমুদ্রের জলতল নিচে নেমে গেলে সমস্ত অঞ্চল আবার দৃশ্যমান হয়ে উঠলো। পুরো বিষয়টা হতে যে সময় লাগবে তার হিসাব নিশ্চিত ভাবে মানুষের জীবদ্দশায় দেখা সম্ভব না, তখনকার হিসাবের  বাইরে সেই  সময় লাগবে। প্লেফেয়ার হুটোনের এই বর্ণনায় অভিভূত হয়ে লিখলেন, “সময়ের অতল গহ্বরে এতটা স্থূলতা  দেখে মনটা কেমন যেন কুঁকড়ে উঠল” [অনুবাদ সম্পাদকের]। [৬]

হুটোন ১৭৮৮ সালে থিওরি অফ আর্থ-এর আরও একটি সংকলন লেখেন। এই সংকলনের ভাষা বেশ কঠিন, প্রায় দুর্বোধ্য। নেপচুনিসমের কবলে বিজ্ঞান, তখন চার্চবিরোধী কথা বলা অপরাধ। স্কটিশ এনলাইটমেন্টের মধ্যেও চার্চবিরোধিতা করা সহজ নয়। তাই হুটোনের এই চিন্তা ভাবনা সেই সময়ে খুব একটা গ্রহণযোগ্য ছিল না। এই বই প্রকাশের পর হুটোন অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ১৭৯৭ সালে মারা যান। হয়তো হুটোনের বই, তার লেখা পত্র কিছুই সংরক্ষিত থাকতো না, যদি না তাঁর  বোন ইসাবেলা সে সমস্ত নথিপত্রকে লিপিবদ্ধ করতেন  [৩]। হুটোনের চিন্তাধারা ইউরোপের বেশি মানুষকে প্রভাবিত না করলেও, একজন অন্তত গুণমুগদ্ধ ছিলেন। জন প্লেফেয়ার। প্লেফেয়ার ১৮০২ সালে প্রকাশ করেন তার একমাত্র বই “Illustrations of the Huttonian Theory of the Earth” [৬]. এই বই হয়ে ওঠে হুটোনের বৈজ্ঞানিক দলিল।

কালের যাত্রা পথে

কালের যাত্রা ভারি জটিল। ইউরোপের বৈজ্ঞানিক মহলে যে ‘সময়’ ছিল খুবই অল্প, তার চিন্তা ভাবনায় পরিবর্তন হতে লাগলো। বুফোঁ প্রথম আঘাত হেনেছিলেন কালের যাত্রায়। হুটোন তাকে রূপ দিলেন। ১৭৯৭ সালে হুটোনের মৃত্যু আর এসেই বছরেই জন্মালেন চার্লস লিয়েল, হুটোনের উত্তরসূরি। হুটোনের তত্ত্ব নতুন নাম পেল লিয়েলের হাত ধরে, ইউনিফর্মিটরিয়ানিজম,অভিন্নতাবাদ [৭]। পদার্থবিদের উপহাস, আক্রমণ সহ্য করেও একদল বিজ্ঞানী খোঁজ করে চললেন হুটোনের গভীর সময়ের। চার্লস ডারউইন তাদের মধ্যে অন্যতম। যদিও ডারউইনও পৃথিবীর বয়েসের সঠিক হিসাবে দিতে পারেননি, তবে হুটোনের গভীর সময়ের ওপর তাঁর বিশ্বাস ছিল। ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব দাঁড়িয়ে আছে “deep time” সময়ের গভীরে যাবার ওপর ভিত্তি করে। প্রায় ৩০ বছর ধরে ডারউইনের সঙ্গে কেলভিনের চলেছে প্রবল বিবাদ। সে বিজ্ঞানের ইতিহাসের আর এক অধ্যায় [ ৮]।  পরে সেই প্রসঙ্গ আলোচনা করা যাবে।

হুটোনের মৃত্যুর ১০০ বছর পরে আবিষ্কৃত হয় তেজস্ক্রিয়তা। তারপর পৃথিবীর বয়স সঠিকভাবে নির্ণয় করা সহজ হয়। আমরা আজ জানি পৃথিবীর বয়স ৪৫৪ কোটি বছর। হুটোনের আয়াসলব্ধ  বয়সের থেকে অনেক বেশি হলেও আজ  প্রমাণিত হয় হুটোনের তত্ত্বের সত্যতা।

তথ্যসূত্র

  1. Hermen A., 2001, The Scottish Enlightenment: The Scots’ Invention of the Modern World.‎ Fourth Estate Ltd.
  2. Buffon, G.L.C, 1778. Les époques de la nature, Translated by Zalasiewicz, J., Milon, A-S., and Zalasiewicz M., 2018 in English as “The Epochs of Nature”, The University of Chicago Press.
  3. McKirdy, A., 2022. James Hutton.The Founder of Modern Geology. National Museum Scotland.
  4. Hutton, J., 1788. Theory of the Earth, Transactions of the Royal Society of Edinburgh, 1(2), 209-305.
  5. Baxter, S., 2003, Revolutions in the Earth: James Hutton and the True Age of the World. Weidenfeld & Nicolson.
  6. Playfair, J., 1802. Illustration of the Huttonian Theory of the Earth. Republished 2011, Cambridge University Press.
  7. Lylle, C., 1830, Principles of Geology Vol I. Republished 1997, Penguin classics.
  8. Paul, J., 2022, ডারউইন বনাম কেলভিন: পৃথিবীর বয়সের খোঁজে, Geoscience Education.
ভূপদার্থবিদ্যার গবেষক। বিজ্ঞান বাদে সমাজ, সংগীত, সিনেমা চর্চায় আগ্রহী। ভ্রমণ বিলাসী এবং বইপোকা।

মন্তব্য তালিকা - “কালের যাত্রা”

  1. অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হলেও একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে পরিবেশনের কঠিন কাজটি লেখক ভীষণ সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন। লেখক জ্যোতির্ময় পালকে ধন্যবাদ।