সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন – অমল গুহের সঙ্গে আলাপচারিতা

স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন – অমল গুহের সঙ্গে আলাপচারিতা

নভেম্বর ১৩, ২০২১ ২০১

ইতিহাস আড্ডা পোর্টালের পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে স্বাধীনতার যাত্রাপথের যে বিভিন্ন আঙ্গিক তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে, ১৯৪৭ ও তার পরবর্তী কালের বিভিন্ন গণ আন্দোলনের সাথে যুক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে আলাপচারিতা তার একটি অংশ। এই পর্বে আমাদের আলাপচারিতা ভারতীয় গণনাট্য আন্দোলনের এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব অমল গুহের সঙ্গে। ৮৬ বছর বয়সি অমল গুহ আজও বয়সের তোয়াক্কা না করে সাংস্কৃতিক আন্দোলন, বিশেষত নাট্য আন্দোলনের সাথে যুক্ত রয়েছেন। তাঁর বয়স এবং করোনা অতিমারির কথা চিন্তা করে সামনাসামনি না হয়ে দূরভাষেই এই আলাপচারিতা সারা হল। ইতিহাস আড্ডার পক্ষে এই আলাপচারিতায় অংশগ্রহণ করেছেন নবাঙ্কুর মজুমদার

ইতিহাস আড্ডা: প্রথমেই ইতিহাস আড্ডা পোর্টাল এবং ইতিহাস তথ্য ও তর্ক গ্রুপের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ জানাই আমাদের সময় দেবার জন্য। আচ্ছা, আপনার নাম, জন্মস্থান ও পরিবার নিয়ে যদি কিছু বলেন।

অমল গুহ: আমার নাম অমল গুহ, মাঝখানে একটা কান্তি আছে, সেটা আমার সার্টিফিকেট অনুযায়ী কেবলমাত্র শোভাবর্ধনের জন্য। সামাজিক ভাবে সকলে আমাকে অমল গুহ নামেই চেনে। আমার জন্মস্থান কলকাতার মানিকতলা এলাকায়। বাবা ছিলেন পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ সরকারের পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর, আর মা ছিলেন একজন পরিপূর্ণ গৃহকর্ত্রী। অনেক ভাইবোন থাকলেও তারা একে একে চলে যাওয়ায় আমরা তিনজন মাত্র অবশিষ্ট ছিলাম।

ইতিহাস আড্ডা: আপনার জন্মের সময়কার পরিস্থিতি নিয়ে যদি কিছু একটু বলেন। 

অমল গুহ: আমার জন্ম তারিখ অফিশিয়ালি ১৯৩৬ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি। কিন্তু বাস্তবে ১৯৩৬-এর ৫ই ফেব্রুয়ারি, ২২শে মাঘ আমার জন্ম। উনিশ শ’ ছত্রিশ সাল আমাদের রাজনৈতিক এবং সামাজিক ইতিহাসের এক স্মরণীয় কাল। ১৯৩৬ সালে এআইএসএফ (অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্ট ফেডারেশন) জন্ম নিয়েছে, এআইকেএস (অল ইন্ডিয়া কিষান সভা) জন্মেছে, মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি তৈরি হয়েছে। অবশ্য এআইটিইউসি (অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস) ১৯২০ সালে তৈরি হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তার আন্দোলনের ঢেউ ১৯৩৬ সালে আছড়ে পড়ছিল। গান্ধিজির অহিংস নীতির বিরুদ্ধে গিয়েও শ্রমজীবী মানুষদের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন করতে হচ্ছিল। গান্ধিজি হিংসার রাজনীতি পছন্দ করতেন না, কিন্তু এ ধরণের আন্দোলন করতে গেলে গণতান্ত্রিক পথের বাইরেও একটা পথ নিতে হত, সেটা ঠিক হিংসা নয়, সেটা দমন পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ। এমন একটা সময় ছিল আমার জন্মের কাল। ১৯৩৭ সালে ভারতে যে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন চালু হয়েছিল, তাতে বাংলায় জোট মন্ত্রীসভা হলেও অন্যান্য প্রদেশে অবশ্য কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। এ সময়টা সেই কারণে খুব গুরুত্বপূর্ণও বটে। ১৯৩৮ সালে হরিপুরা কংগ্রেস ও ১৯৩৯ সালে ত্রিপুরী কংগ্রেসে নেতাজীর কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট হওয়া আমাদের জাতীয় জীবনে খুবই প্রভাব ফেলেছিল। এ সময় আমরা পূর্ববঙ্গে চলে গেছি। পূর্ববঙ্গে যাওয়ার কারণ আমার বাবার টিবি হয়ে গিয়েছিল। তখনও টিবির ওষুধ আবিষ্কার হয়নি, ডঃ বিধান রায় প্রায় জবাব দিয়ে দিয়েছিলেন, তবে তিনি শেষ চেষ্টা হিসেবে হাওয়া বদলের পরামর্শ দেন। সেইমত মা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, পূর্ববঙ্গে নিয়ে গিয়ে বাবাকে নদীর ওপর বোটে রাখা হবে। এ ব্যাপারে মাকে মামারাও যথেষ্ট সাহায্য করেছিলেন, কারণ বরিশাল টাউনেই ছিল মামাবাড়ি। আমি দিদিমার কাছে থাকতাম, মা বাবাকে নিয়ে বোটে থাকতেন। এত করেও বাবাকে বাঁচানো গেল না, ১৯৪১ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি চলে গেলেন। আমার বয়স তখন সাড়ে পাঁচ। ১৯৪২ সালে বরিশাল একাডেমিতে আমাকে ক্লাস টু তে ভর্তি করে দেওয়া হল। মামাবাড়ির এক বৃহৎ পরিবারে দাদু দিদিমা, মামা মামীর স্নেহচ্ছায়ায় বেড়ে উঠতে লাগলাম। দু’বেলা ছাব্বিশটা করে পাত পড়া এক পরিবার, স্বাচ্ছন্দ্য ও অসাচ্ছন্দ্যের দোলাচলে মোটামুটি চলছিল। কোনও আন্দোলনের সাথে সম্পর্ক এ সময় সম্ভব ছিল না, শুধু দাদুর স্নেহের সাবধান বাণী “পড়াশোনা কর, তোমাকে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, মায়ের দুঃখ ঘোচাতে হবে” এসব কথায় উৎসাহিত হয়ে পড়াশোনার মধ্যে ডুবে গেলাম। ১৯৪২ এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় প্রায় দিনই স্কুলে স্ট্রাইক হত, বিরক্ত হতাম, বুঝতাম না ইংরেজরা কেন ভারত ছাড়বে? পড়াশোনায় বেশ ভাল ছিলাম, বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিছু পুরস্কারও জুটেছিল। এ সময় প্রথম স্কুল নাটকে অংশগ্রহণ করি। তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষে লঙ্গরখানায় আমরা ফ্যান দিতাম, একটু নুন মিশিয়ে, লেবু চিপে মানুষ তাই খেত। তবু পঞ্চাশ হাজার লোকের মৃত্যুকে কিছুতেই আটকানো যায়নি। নিজের চোখে দেখেছি সেই মৃত্যু মিছিল। ৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনের পর ১৯৪৪-৪৫ সাল নাগাদ ইংরেজরা কিছু স্বায়ত্তশাসন দিতে আরম্ভ করলেন, ক্রিপস মিশনের মাধ্যমে তারা আরো স্বায়ত্তশাসনের আশ্বাস দিলেন কিন্তু পাশাপাশি এও বললেন, কেন্দ্রীয় শাসন তোমাদের হাতে দেওয়া যাবে না। ১৯৪৭ সালের আগে আমরা যুক্ত বাংলায় লীগের শাসনে ছিলাম। ছেচল্লিশের দাঙ্গায় বরিশালে তেমন প্রভাব না পড়লেও কলকাতায় বহু হাজার মানুষ নিহত হন, পূর্ববঙ্গের ফেনিতে, নোয়াখালিতে ভয়াবহ দাঙ্গা, গান্ধিজির ছুটে যাওয়া—এমন এক অশান্ত সময়ে আমার বেড়ে ওঠার কাল।

ইতিহাস আড্ডা: স্বাধীনতার আগের দিনগুলিকে আপনি খুব সুচারু ভাবে ব্যাখ্যা করলেন, ইতিহাসের এক দুঃখজনক অধ্যায় দুর্ভিক্ষ ও বাংলার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকেও চিত্রিত করলেন, সে সময় তো বাংলা তথা ভারতে অনেকগুলো আঙ্গিকে অনেক রকম আন্দোলন চলছে, আপনি কি তার মধ্যে কোন আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন?

অমল গুহ: আমি তখন ঠিক বুঝতাম না, যতদিন না শ্রেণি আদর্শ বুঝেছি ততদিন সবকিছু আমার কাছে গোল গোল ছিল। আমি ভাবতাম নেতাজি বোধহয় একমাত্র পুরুষ সিংহ, তিনিই ভারতকে স্বাধীন করবেন। নেতাজি ১৯৪১ সালে যখন বেরিয়ে গেলেন, ইংরেজের জাতশত্রু জার্মান সাম্রাজ্যবাদ, ইতালীয় সাম্রাজ্যবাদ ইত্যাদির সঙ্গে যখন যোগসাজশ করছেন, বিদেশে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মিও তৈরি করেছেন, তখন ভাবতাম তিনি যে ‘শত্রুর শত্রু আমার মিত্র’ এই চাণক্য নীতি গ্রহণ করেছেন এটা বোধহয় ঠিক। তখন নেতাজি আমার কাছে আদর্শ পুরুষ, তখন ২৩শে জানুয়ারি নিয়মিত পালন করতাম। ১৯৪৫ সালে নেতাজির তথাকথিত প্রয়াণ আমরা বিশ্বাস করতাম না, আমাদের স্লোগান ছিল ‘নেতাজি ফিরে এস’। বরিশালের বিশিষ্ট কংগ্রেসি ছিলেন সতীন সেন, তিনি টাউন হলে থাকতেন। ওদিকে আমার ঘনিষ্ট বন্ধু সত্যেন্দ্রনাথ ভৌমিকের বাবা ছিলেন এক মস্ত বড় কংগ্রেসি, তাদের বাড়িতে সতীন সেনের জন্য রান্না হত। খাবারটা আমরা রোজ দিয়ে আসতাম, তিনি দোতলায় বসে খেতেন। এমনও কয়েকবার হয়েছে, হঠাৎ কয়েকজন মানুষ নীচে এসে দাঁড়িয়ে বলে উঠল, “বাবু কিছু খেতে দেবেন, তিন দিন কিছু খাই নাই।” সঙ্গে সঙ্গে সতীন সেন নীচে নেমে এসে ঐ তিন চার জন ক্ষুধার্ত মানুষকে নিজের খাবারটা ভাগ করে দিয়ে নিজে অভুক্ত থেকে গেলেন। সত্যেন এসে তার মাকে বললে তিনি আবার খাবার তৈরি করে দিতেন, সেই খাবার সাইকেলে করে আবার আমরা পৌঁছে দিতাম। এটা এখনো আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল। আমাদের বাড়ির পাশেই ছিল অশ্বিনী দত্তের বাড়ি, তিনি তখন জীবিত নেই, তাঁর পালিত পুত্র সরল দত্ত, সতীন সেন, শরৎ চন্দ্র গুহ, মনোরঞ্জন দাশগুপ্ত এঁরা সবাই কংগ্রেসের বিশিষ্ট নেতা ছিলেন। আমাদের স্কুলের মাঠে অনেক রাজনৈতিক সভা হত, আমি খানিকটা কৌতূহল বশেই সেখানে যেতাম, শুনতাম তাঁদের বক্তব্য। কেউ কেউ আবার কংগ্রেস বিরোধী কথাও বলতেন, তাঁরা যে প্রচ্ছন্ন কমিউনিস্ট তা তখন আমি ধরতে পারতাম না। কমিউনিস্টরা তখন জাতীয় আন্দোলনে কংগ্রেসি নেতাদের পাশে থেকেই বক্তৃতা করতেন। বরিশাল টাউন হলে অরুণা আসফ আলি– যিনি পরিপূর্ণ বামপন্থী মনোভাবাপন্ন ছিলেন, বিজয় লক্ষ্মী পণ্ডিত, এঁরা সব বক্তৃতা করতে আসতেন। নেতাজিও একবার এসেছিলেন, আমি তখন স্কুলে পড়ি। আমরা মালা নিয়ে ছুটেছিলাম তাঁকে দেখবো বলে, কিন্তু দেখতে পাইনি। এমন অগ্নিগর্ভ সময়ে আমার বেড়ে ওঠা, তবুও এ সময় আমি কোনও আন্দোলনে যুক্ত থাকতে পারিনি। কিন্তু স্কুলের মাঠে নিয়মিত বক্তৃতা শুনতাম, অভিভূত হতাম। কংগ্রেস ঘেঁষা, নেতাজি ঘেঁষা, খানিকটা দেশপ্রেমিক ভাব এগুলো আমার মধ্যে গড়ে উঠছিল। 

ইতিহাস আড্ডা: পরবর্তী কালে আপনি যখন সচেতন হলেন, এঁদের মধ্যে কার ব্যক্তিত্ব আপনাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করল? আপনি যখন গণ আন্দোলনে যুক্ত হবার কথা ভাবছেন, তখন কার দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছিলেন?

অমল গুহ: সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যুক্ত নেতারা আমাকে যেন বেশি আকৃষ্ট করছিলেন। ১৯৪৬ এর দাঙ্গার সময় নিয়মিত ভাবে নেতাদের অগ্নিবর্ষী ভাষণ শুনতে যেতাম, দ্বিজাতি তত্ত্বের বিরুদ্ধে বক্তৃতা, গান্ধিজির অহিংস নীতির পক্ষে এবং বিপক্ষে বক্তৃতা—এসব শুনতাম। গান্ধিজির নির্ভীকতা, রাতের অন্ধকারে হারিকেন নিয়ে তিনি নোয়াখালীর রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন—এসব চিত্র আমার চোখের সামনে যেন ফুটে উঠত। ধীরে ধীরে আবদুল মালেক, পরাণ মিয়া, প্রফুল্ল চন্দ্র দে, এঁদের নাটকে প্রভাবিত হতে শুরু করলাম। ব্রিটিশ বিরোধী নাটকগুলো—সিরাজউদ্দৌলা, মীরকাশেম, মহারাজ নন্দকুমার, বিদ্রোহী, কারাগার – এই নাটকগুলো বড়দের সঙ্গে করা শুরু করলাম। এসব দ্বারা অনুপ্রাণিত হতে লাগলাম, খানিকটা সংস্কৃতি মনস্কতা, খানিকটা সাহিত্য ভাবনা এসব তখন মনন জুড়ে বসেছিল। সে যুগে সাধারণত মেয়েরা নাটকে অভিনয় করত না, পুরুষরাই মেয়েদের ভূমিকায় কাজ চালিয়ে নিত। পরাণ মিয়া নারীদের ভূমিকায় নিয়মিত অভিনয় করতেন, আমাকেও সখীর রোল দেওয়া হত, মেয়েদের রোল আমিও করেছি। এই ছিল পূর্ববঙ্গে থাকার সময় আমার নাট্য চিন্তার সীমাবদ্ধতা, আমি এখানেই আটকে ছিলাম।

ইতিহাস আড্ডা: এবার একটু অন্য আঙ্গিকে জিজ্ঞেস করি, এই যে গণ আন্দোলন এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম – দুটো ভিন্ন দিক, এই আন্দোলনগুলো সম্পর্কে আপনার চারিদিকের মানুষদের ধারণাটা কেমন ছিল? এসব আন্দোলনে যুক্ত মানুষদের ঠিক কিভাবে দেখা হত?

অমল গুহ: দেশপ্রেমটাই ছিল তখন মূল কেন্দ্রবিন্দু। স্বাধীনতা অর্জন ছিল আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য। গণ আন্দোলনের মধ্যে মজুতদারির বিরুদ্ধে আন্দোলন, দুর্ভিক্ষে চাল সংগ্রহের জন্য আন্দোলন, মজুতদার বিরোধী আন্দোলন, লঙ্গরখানা চালানো, দুর্নীতি ও কালোবাজারির বিরুদ্ধে আন্দোলন— এগুলিই ছিল তখনকার গণ আন্দোলনের মূল রূপ এবং রেখা। বরিশাল টাউন প্রগতিশীল আন্দোলনের এক তীর্থক্ষেত্র ছিল। সেখানে সাংস্কৃতিক আন্দোলন যেমন দানা বেঁধে উঠেছিল, তেমনি ছিল রাজনৈতিক আন্দোলন। আমার অজ্ঞাতসারে সেখানে এমনকি আইপিটিএ-র শাখাও পুরোদস্তুর ছিল। আমি কলকাতায় এসে দেখি আমার মুকুল মাসি অমিয় বসুকে বিয়ে করেছেন এবং তাঁরা গণনাট্যের প্রথম সারির নেতা। প্রথম প্রথম ভাবতাম মুকুল মাসি ঘরে বসে গান না গেয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইছেন কেন? রাস্তায় দাঁড়িয়ে ‘ইয়ে ওয়াক্ত কি আওয়াজ হ্যায়, মিলকে চলো, মিলকে চলো’ এসব হিন্দু মুসলিম ঐক্যের গান গাইছেন কেন? বরিশালে থাকতেই মুকুল মাসিদের কাছে বিভিন্ন দেশাত্মবোধক গান শুনেছি, তখন দেখলাম এই আন্দোলনে দেশপ্রেমটাই কেন্দ্রবিন্দু আর এর সাথে সংশ্লিষ্ট আন্দোলন—মজুতদার, কালোবাজারির বিরুদ্ধে আন্দোলন, যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন এগুলোও বেশ প্রবল। বরিশালে তখন কত কত প্রগতিশীল মানুষদের দ্বারা এসব সংগঠিত হচ্ছে, কি তীব্র সেই আন্দোলন! প্রতিটা দিন টাউন হলে বক্তৃতা, সভা – উদ্দীপনার চূড়ান্ত, সকলের পাখির চোখ হচ্ছে দেশকে স্বাধীন করার প্রয়াস। এই আন্দোলনগুলিতে কিন্তু প্রচুর জনসমর্থন ছিল। সুবিশাল টাউন হল ভরে গিয়ে বাইরে বহু মানুষ দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুনত। তখনকার দিনে যে নাট্য আন্দোলন আমরা করতাম, সেটাকে আন্দোলনই বলব, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন ছিল সেটা। অবুঝ অবস্থায় থাকলেও নাট্য আন্দোলনে আমি সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছিলাম। শ্রেণি আদর্শ আমার কাছে তখনও  পরিস্কার হয়নি, তবুও যে ডাকছে সেখানেই এসব নাটক করতে ছুটে যাচ্ছি। দেশপ্রেম ছিল কেন্দ্রবিন্দু, কিন্তু স্বার্থান্ধ ব্যক্তিও কিছু ছিল, আমরা তাঁদের একেবারে নস্যাৎ করে দিতাম। বরিশাল টাউন ছিল হিন্দু প্রধান অঞ্চল, সেখানে লীগ মোটেই প্রাধান্য পেত না, পাত্তাই পেত না বলা যায়, তবে তাদেরও কিছু লোকজন ছিল। মুসলিমদের আমরা ঘৃণা করতাম না, কিন্তু হিন্দু মুসলিম ছোঁয়াছুঁয়ির একটা ব্যাপার ছিলই।

ইতিহাস আড্ডা: সেই সময়ের এমন কিছু বিশেষ মানুষ যারা আপনার জীবনে রীতিমত দাগ কেটে গেছেন, তাঁদের সম্পর্কে যদি কিছু বলেন।

অমল গুহ: বিশেষ মানুষ বলতে সতীন সেনের কথা আগেই বলেছি, নিজের মুখের খাবার অন্যদের হাতে তুলে দিতেন। এছাড়া দেশ স্বাধীন হবার পর বরিশালে পঞ্চাশ সালের রায়ট হয়েছিল, তখন আমার বয়স ১৩, ১৪। সেসময় বহু মানুষকে কাছ থেকে নিঃস্বার্থ ভাবে কাজ করতে দেখেছি। শরৎ চন্দ্র গুহর বাড়িতে নিয়মিত যেতাম। এছাড়া মনে রাখার মত ব্যক্তি মনোরঞ্জন দাশগুপ্ত, সুশীল সরখেল, আব্দুল মালেক, সরল দত্ত, উপেন্দ্র চন্দ্র দে প্রমুখ। সুশীল সরখেল আমাদের সাথে মীরকাশেম করতেন, এই নাটকে যেসব জাতীয়তাবাদী সংলাপ বলতেন পরে তাঁর ব্যাখ্যা শুনে আমরা উদ্বেলিত হতাম, নিজের দেশ সম্পর্কে গর্বিত হতাম। বরিশালে থাকাকালীন এই নামগুলিই আমার কাছে শিহরণ জাগানো নাম। আরেকটা কথা বলা দরকার, আমার এক বন্ধু শোভন সেন, তার বাবা রবি সেন, তাদের বিখ্যাত বাড়িটার নাম ছিল ‘রজনী নিবাস’, অশ্বিনী দত্তের বাড়ির ঠিক পেছনে, এই বাড়িটায় আমরা খেলতাম। এখানে এক ভদ্রমহিলা এসে চিলেকোঠার ছাদে একগাদা বই নিয়ে থাকতেন, নীচ থেকে খাবার পৌঁছে যে্ত। বন্ধুকে জিজ্ঞেস করে জানলাম উনি শোভনের পিসি মণিকুন্তলা সেন। এঁরা সব আমার সে সময়ের ভাল লাগার মানুষজন, শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবার মত ব্যক্তি। 

ইতিহাস আড্ডা: স্বাধীনতার ৭৫ বছর হতে চলল, আপনার জীবনে সেই বিশেষ দিনটি অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট দিনটি কিভাবে এসেছিল?

অমল গুহ:  তখন আমার ১১-১২ বছর বয়স। যেদিন কাগজে বেরোল, ‘ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম’, পাড়ার কংগ্রেসিরা বললেন ঠিক রাত বারোটাতে শঙ্খ ধ্বনি করতে, তাই করা হল। কিন্তু তার পরদিনের অমৃত বাজার ছাপলো, ‘বরিশাল অ্যান্ড খুলনা গোস টু ইস্টার্ন পাকিস্তান’—দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগ। আমরা বিমর্ষ হয়ে পড়লাম। দাদু বললেন, ‘এত বড় বাড়ি, এত আমার আত্মীয় স্বজন, এগো ছাইরা যামু কৈ?’ চারিদিকে নৈস্তব্ধ, হতাশার পরিবেশ। স্বাধীনতা পেয়েছি, অথচ স্বাধীন হইনি। দিনটা আমার এভাবেই কাটল। তখন আমরা এটা বুঝতাম না, এটা রাজনৈতিক স্বাধীনতা না অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না আক্ষরিক স্বাধীনতা। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না এলে যে প্রকৃত স্বাধীনতা আসে না, সেটা পরবর্তী কালে কলেজ জীবনে শিখেছি। এই হল আমার স্বাধীনতার দিনের স্মৃতিকথা।

ইতিহাস আড্ডা:  দেশভাগের করুণ অভিজ্ঞতা তো বললেন, দেশভাগের প্রত্যক্ষ প্রভাব আপনার জীবনে কেমন ভাবে পড়েছিল?

অমল গুহ: ১৯৫০-এর ফেব্রুয়ারিতে রায়টের সময় আমার পড়াশুনো নিয়ে খুব চিন্তায় পড়লাম। তখনও ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিই নি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা দিতে পারলে কোন একটা স্থান পাবো তাতে আমার মাস্টার মশাইরাও নিশ্চিত ছিলেন। হেড মাস্টার মশাই সুরেন কর, সহকারী প্রধান শিক্ষক হীরালাল গুপ্ত, পণ্ডিত মশাই ব্রজেন্দ্র নাথ ভট্টাচার্য আমাদের উৎসাহ দিতে লাগলেন। রায়টের রাতে আমরা বাড়ি বাঁচাবার চেষ্টা করছি, ভয়ে বেরোতে পারছি না। প্রতি দিন বেঁচে থেকেও মৃত্যু ভয় তাড়া করছে। মামা আমার ও মায়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। মামা পরামর্শ দিলেন, একবার পেট্রাপোলে ঢুকতে পারলেই উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়া যাবে। সেখান থেকে শেয়ালদা স্টেশনে চলে গেলে কোন না কোন আত্মীয় স্বজনের নিশ্চয় চোখে পড়বো। আর তাদের কারো দেখা পেলেই তো কেল্লা ফতে। সোজা ‘দুইখ্যা মামা’র বাড়ি। সেখানেই অপেক্ষা করছে আমার মুক্তির পরোয়ানা! একদিন বেরিয়ে পড়লাম। ১৩ আনা দিয়ে স্টিমারের টিকিট কেটে খুলনা, সেখান থেকে ফ্রিতে ট্রেনে চড়ে বেনাপোল। বর্ডার পার হয়ে পেট্রাপোল। সেখান থেকে বহু ঘাটের জল খেয়ে আজকের বাগুইহাটি থেকে এক মাইল দূরে এক পল্লী প্রকৃতির মাঝে ছোট্ট কুঁড়েতে দুইখ্যা মামার কাছে থেকে আমি পড়াশুনো করেছি, মানুষ হয়েছি। একসময় মাকে, বোনকে নিয়ে এসেছি। ধীরে ধীরে মামারা চলে এলেন, দিদিমাকে নিয়ে শুধু রয়ে গেলেন ছোট মামা। তাদেরকে দেশের সম্পদ এমনকি বাড়ির ফার্নিচার বিক্রি করে পেট চালাতে হয়েছে। আর আমি? আমার শেয়ালদায় সম্বল বলতে ছিল ৩ টাকা। উদ্বাস্তু হিসেবে নাম রেকর্ড করা, লঙ্গর খানায় খিচুড়ি খাওয়া, ষ্টেশনে শোয়া, অবশেষে একদিন ব্রজ মামার সাথে দেখা। তাঁর হাত ধরে উদ্বাস্তু কার্ড সঙ্গে নিয়ে বেলগাছিয়া ষ্টেশন থেকে মার্টিন ট্রেনে চেপে হাতিয়াড়া ষ্টেশনে নামলাম। সেখান থেকে ম্যাট্রিক, আই কম, বি কম অনার্স পড়ে বেরিয়ে এসে বাগুইহাটিতে বাসা করে মাকে নিয়ে আসা। মার্টিন রেল করে আমি তখন আমহার্স্ট স্ট্রিট সিটি কলেজে পড়তে যেতাম। এখানে ভূপেশ গুপ্তের ভাইপো সন্দীপ গুপ্তের সাথে আমার যোগাযোগ হয়। তিনি বিপিএসএফ (বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল স্টুডেন্ট ফেডারেশন)-এর সিটি কলেজের সেক্রেটারি ছিলেন। তিনি আমায় বললেন তুমি যদি ছাত্র আন্দোলনই কর তবে তোমাকে এসএফ-ই করতে হবে। তিনি আমার মনে খানিকটা দাগ কেটেছিলেন। ইন্টারমিডিয়েট পড়বার সময় আমি চুটিয়ে নাটক করছি, এমনকি মহেন্দ্র গুপ্তকে নকল করে নন্দকুমার ইত্যাদি বিখ্যাত সব নাটক করেছি। স্টার থিয়েটারে তখন আট আনায় নাটক দেখা যেত। এরকম একদিন দুজন ভদ্রলোক আমার নাটক দেখতে এলেন। গভীর রাত পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করছেন কখন আমি গ্রিন রুম থেকে বেরবো। আমার সাথে দেখা হওয়ার পর আমার অভিনয়ের প্রশংসা করে বললেন, তোমার নাটকে আমরা মুগ্ধ হয়েছি। এঁরা ছিলেন বিখ্যাত নাট্যকার মনোরঞ্জন বিশ্বাস এবং নিশিকান্ত মণ্ডল। নিশিকান্ত বাবু তখনকার পার্টির একজন প্রথম সারির নেতা, যার বাড়িতে কংসারি হালদার লুকিয়ে থাকতেন। ব্রিটিশ আমলে কংসারি হালদারের মাথার মূল্য ছিল এক লক্ষ টাকা। দেশ স্বাধীন হবার পরেও ভারত সরকার কংসারি হালদারকে মুক্তি দেননি। নিশিকান্ত মণ্ডলের বাড়িতে মহেশ নাটকের রিহার্সাল দিতে যেতাম, ওখানে কংসারি হালদার কৃষক সেজে লুকিয়ে থাকতেন। মহেশে আমি গফুর মিয়ার অভিনয় করতাম। অভিনয় দেখে নিশিকান্ত মণ্ডল, মনোরঞ্জন বিশ্বাস, তখনকার পার্টি সেক্রেটারি নিরাকার চক্রবর্তী প্রমুখ খুব প্রশংসা করলেন। নিরাকার বাবু আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কিসের জন্য নাটক কর?” আমি বললাম, “নাম যশ খ্যাতির জন্য, নিজের ভাল লাগার জন্য।” উনি বললেন, “ভুল করছো, জীবনের জন্য নাটক কর কি?” যাই হোক সন্ধ্যে বেলায় মনোরঞ্জন বাবু তাঁর বাড়িতে নিয়ে গেলেন, একসময় তাঁর লেখা নাটক ‘সাড়া’ আমাকে পরিচালনার ভার দেওয়া হল। এই নাটকে প্রথম আমি এক ফ্যাক্টরি মালিকের চরিত্রে নেগেটিভ রোল করলাম। ১৯৫৩ সালে আমি ‘চলতি বাসর’-এর পক্ষ থেকে ভূপেশ গুপ্তের ভাইপোর মাধ্যমে পার্টির মেম্বার হয়ে গেছি। ১৯৫৪ সালে ‘চলতি বাসর’ ভারতীয় গণনাট্য সংঘের দেশবন্ধু নগর শাখায় পরিনত হল। ধীরে ধীরে আমি প্রাদেশিক স্তরে নেতার ভূমিকায় প্রতিষ্ঠিত হলাম। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত গণনাট্য আন্দোলনের অংশীদার হয়ে বিভিন্ন জায়গায় ‘মহেশ’, ‘কর্মখালি’, ‘ধান দেব না’, ইত্যাদি নাটক করে খ্যাতি অর্জন করতে আরম্ভ করি। ১৯৫৬ সালে সংযুক্ত কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দ আমার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে পূর্ণ সদস্য পদ দেন। ইতিপূর্বে আমি গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছি, ১৯৫৬ সালেই আমি এম. কমে. ভর্তি হয়েছি, কিন্তু দুকুল সামলাতে পারছি না। তবু চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলাম। হিন্দু বিদ্যাপীঠে পড়াবার সময় অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সহকর্মী হিসেবে পেয়েছি, এছাড়াও নির্মল সেন, সুভাষ ভট্টাচার্য এঁদের সঙ্গে কাজ করেছি। আস্তে আস্তে গণনাট্যের প্রাদেশিক নেতৃত্বে চলে এলাম। অবশেষে ১৯৬৭ সালে রাজ্য সম্পাদক হলাম। কিন্তু বেশিদিন কন্টিনিউ করিনি, ঐ সময় আমি ইউনিয়ন কার্বাইডে যোগ দিয়েছি, নিয়মিত নাইট ডিউটি করতে হত, ফলে ঐ বছরই আমি সম্পাদক পদ ছেড়ে দেওয়াতে আশু সেন সম্পাদক হলেন। ইতিপূর্বে ১৯৬২ সালে চীন-ভারত বিরোধকে কেন্দ্র করে গণনাট্যেও বিরোধ বাঁধে, ১৯৬৪তে পার্টির বিভাজন হয়। ঐ সময় আমরা নয় জন নেতা — আশু সেন, শিশির সেন, কিশলয় সেন, অমল গুহ, চিররঞ্জন দাস, শক্তি বন্দ্যোপাধ্যায়, দিলীপ ঘোষাল, হীরেন ভট্টাচার্য, ও বাসুদেব দাশগুপ্ত মিলে ৮ নং সীতারাম ব্যানার্জী লেনে আশু সেনের প্রেসে গণনাট্যের দ্বিতীয় পর্যায় নিয়ে আলোচনা করতাম। জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব, প্রগতিশীলতা ইত্যাদি নিয়েও আলোচনা চলত। আমি এখনো গণনাট্যেরই সদস্য, উপদেষ্টা মণ্ডলীর চেয়ারম্যান পদে আছি।

ইতিহাস আড্ডা: দেশভাগের ফলে কি গণ-আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় কোন ছেদ পড়েছিল?

অমল গুহ: সাময়িক ভাবে আমরা হতভম্ব, বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলাম, সে কারণে কিছুদিন তো ছেদ পড়েছিলই। স্থায়ী ভাবেও স্থান-কালে একটা ব্যাপক পরিবর্তন এসেছিল। যেমন, আমরা চলে আসার পর বরিশালে সাংস্কৃতিক আন্দোলন আর কখনো দানা বাঁধতে পারেনি। আবার পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় তা দুর্দান্ত ভাবে বিকশিত হওয়া শুরু হল। দেশভাগ জনিত উদ্বাস্তু সমস্যা, তার ব্যাথা বেদনা নিয়ে বহু নাটক আমরা করা শুরু করলাম। ‘ছিন্নমূল’, ‘নতুন ইহুদি’, ‘বাস্তুভিটা’ তুলসী লাহিড়ীর ‘দুখিনী মা’, ইত্যাদি নাটক আমাদের অমর করে রেখেছে।  আর বলতে হয় বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’ নাটকের কথা। কলকাতায় সমাদ্দার ফ্যামিলি চলে এল, ডাস্টবিন থেকে খাবার কুড়িয়ে খাচ্ছে, মেজবৌ দেহ বিক্রি করছে—এসব নবান্নের সিগনেচার মার্ক।

ইতিহাস আড্ডা: নবান্ন বোধহয় ১৯৪৪ সালে মঞ্চস্থ হয়েছিল?

অমল গুহ: ১৯৪৪ সালের ২৪শে অক্টোবর মঞ্চস্থ হয়, তখন তো আমি পূর্ববঙ্গে। ১৮৭৬ সালের কুখ্যাত নাট্যাভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন আমাদের ভারতীয়দের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য হয়েছিল, ঢাকায় যখন নবান্ন নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছিল মাঝপথে তা বন্ধ করে দেওয়া হল, মার খেয়েছিলেন তখনকার নেতারা—মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, সজল রায়চৌধুরী, নির্মল ঘোষ, শেখর চট্টোপাধ্যায়, জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায় এঁরা। পরবর্তীতে ‘তরঙ্গ’ নাটকে জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায় আর আমি পাশাপাশি অভিনয় করেছি, শেখর চট্টোপাধ্যায়, সাধনা রায়চৌধুরী, বীরেশ মুখোপাধ্যায়, নিবেদিতা সেন, তুলসী লাহিড়ী, চারুপ্রকাশ ঘোষ— এঁদের সাথেও অভিনয় করেছি।

ইতিহাস আড্ডা: গণনাট্য আন্দোলনের মূল লক্ষ্য তো ছিল বিভিন্ন সচেতনতা মূলক নাটকের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে তাদের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে সচেতন ও সম্পৃক্ত করা?

অমল গুহ: যথার্থ বলেছেন। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাধীনতা্র পরে গঠিত সরকার জনদরদী না জনবিরোধী, তাদের খামতিগুলো কোথায় তা তুলে ধরা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, নারী স্বাধীনতা, নারীর ক্ষমতায়ণ প্রসঙ্গ এগুলো আমাদের নাটকে বারে বারে এসেছে। আমাদের নাটকের মূল উপজীব্য ছিল সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতার বাণী তুলে ধরা, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা, একচেটিয়া পুঁজিবাদ বিরোধিতা, সাম্যবাদী দর্শনের আলোকে প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন ইত্যাদি। এই যে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব, তা সম্পন্ন করার একটা দিক হল ভূমি সংস্কার। সেখানে চাষির নেতৃত্ব থাকবে, একথা আমাদের নাটকেও প্রতিফলিত হত। পাশাপাশি ‘বিদ্যাসাগর’, ‘নীলদর্পণ’ এই ধরণের নাটকগুলোও করেছি।

ইতিহাস আড্ডা: গণনাট্য আন্দোলন যে এতটা পথ পার হয়ে এল, এই আন্দোলন তার নিজের জায়গায় কতটা সফল হয়েছে বলে আপনার মনে হয়?

অমল গুহ:  আমরা আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি। কেন পারিনি সেই কথাগুলোই আমাদের নাটকে তুলে ধরতাম। ইদানীং যে ফ্যাসিবাদী মনোভাব, একনায়কতন্ত্র, গণতন্ত্রের নামে প্রহসন এগুলির বিরোধিতা গণনাট্যের বিষয়বস্তু। টেকনিকটা বদলে গেছে, আগে সাউন্ড, আলো, মঞ্চ এসবে জোর দিতাম, এখন ভাবনা কি করে নাটককে আরও বেশি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া যায়। অফিসের টি ব্রেকে, লাঞ্চ পিরিয়ডের মধ্যে মাত্র ১৫ মিনিটে একটা চাতাল বা ঐ ধরনের কোথাও একটা নাটক করে ফেলা, ১০-২০-৫০ জন দেখছে আমাদের নাটক। সফদার হাসমি আমাদের থেকে ব্যাপারটা অনুকরণ করেছিলেন, আমরাও তাঁর মত বিষয়মুখী নাটক তৈরি করছি। এভাবেই পথনাটক জনপ্রিয় হচ্ছে। পথনাটক, এভিনিউ থিয়েটার, ব্রডওয়ে থিয়েটারের পাশাপাশি আমরা রাস্তায় গানের অনুষ্ঠান করি।  আজকাল স্যোশাল মিডিয়াতে আমরা নাচ, গান, আবৃত্তি, নাটকের অনুষ্ঠান করে সম্প্রচার করছি।

ইতিহাস আড্ডা: পঞ্চাশের মন্বন্তর, যেটাকে আমরা সাধারণ ভাবে দুর্ভিক্ষ বলি, তেভাগা আন্দোলন বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে আপনার কোন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অভিজ্ঞতা আমাদের সাথে শেয়ার করবেন?

অমল গুহ: মন্বন্তরে আমরা লঙ্গরখানা চালিয়েছি, সেটা নিছক এক জনহিতকর কাজ ভেবে নয়, মানবতার কাজ ভেবেই করেছি। পঞ্চাশের মন্বন্তরে মজুত বিরোধী আন্দোলন করেছি, মজুতদারদের বিরুদ্ধে দোকানে দোকানে অবরোধ করেছি, ঢিল ছুঁড়েছি। এসব আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।

ইতিহাস আড্ডা:  তেভাগা আন্দোলন বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কোন স্মৃতি?

অমল গুহ: তেভাগা আন্দোলনের সময় আমার বয়স ১১-১২ বছর মত। পরবর্তীতে ১৯৫৩-৫৪ সালে আমি যখন নাটক করছি, তখন তেভাগার পটভূমিকায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বন করে ‘হারানের নাতজামাই’ নাটকটা প্রায় ২০০ রজনী করেছি। ঐ নাটকটা এখনো লোকের ভাল লাগবে। নিস্তারিণীর মা, ভুবন মণ্ডল নামে এক আন্দোলনকারী রাজনৈতিক নেতাকে পুলিশের হাত থেকে বাঁচাতে নিজের বিবাহযোগ্যা মেয়ের ঘরে জামাই সাজিয়ে ঢুকিয়ে দেয়। ভুবন মণ্ডলের রোলটা আমি করেছিলাম। 

ইতিহাস আড্ডা:  স্বাধীনতার আগে ও পরে আপনার চোখে কী বদলাল আর কী বদলাল না?

অমল গুহ: যেটা বদলাল, আমরা স্বাধীন হলাম, রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেলাম। যেটা বদলাল না তা হচ্ছে, ক্ষুধা, দারিদ্র, দুর্নীতি, ব্যাভিচার, অসাম্য। নেহেরু বলেছিলেন, স্বাধীন ভারতে দুর্নীতিগ্রস্তকে ল্যাম্পপোস্টে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে। কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল যারা চুরি করছে, দুর্নীতি করছে, ভেজাল দিচ্ছে, রাজনৈতিক ভাবে এরাই আদৃত হচ্ছে, বদলায়নি কিছুই। রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না পেলে মানুষের কিছুই বদলাবে না। এটাই আমরা মানুষকে বলতে শুরু করলাম।

ইতিহাস আড্ডা: স্বাধীনতা পরবর্তীকালে পণ্ডিত নেহেরুর হাত ধরে যখন জাতীয় কংগ্রেসের জমানা শুরু হল, সে সময় আপনি কি কোন আন্দোলনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে যুক্ত হয়েছিলেন?

অমল গুহ: সাংস্কৃতিক আন্দোলনটাই আমার কাছে মূল ছিল। প্রগতিশীল এবং প্রতিষ্ঠান বিরোধী নাটকের ভেতর দিয়ে সামাজিক বার্তা দেবার চেষ্টা করে গেছি – দুর্নীতির বিরুদ্ধে, দুষ্কৃতকারীর বিরুদ্ধে, মজুতদারির বিরুদ্ধে, নারীর অসম্মানকারী মনোবৃত্তির বিরুদ্ধে। সাংস্কৃতিক আন্দোলনটা আমি প্রাণপণে করে গেছি। স্কুল জীবনে অবুঝ সময়ে আরম্ভ করেছি, আর বুঝে করতে আরম্ভ করেছি ১৯৫৩ সাল থেকে। ১৯৫৩ সালে আমার জীবনে একটা পরিবর্তন এসেছে। ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় ‘চলতি বাসরে’ আমি আবৃত্তি শেখাতাম, রবীন্দ্র ভারতীতেও কিছুদিন পড়িয়েছি। ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়ান থিয়েটার আর্টসে আমি তিন বছর পড়িয়েছি, কেশব একাডেমিতে সান্ধ্যকালীন ক্লাস হত। কুমার রায়ের নেতৃত্বে যেমন অনেক নাটক করেছি তেমনি রবীন্দ্র ভারতীতে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি অয়দিপাউস এবং রক্তকরবীর শম্ভু মিত্রকে। উৎপল দত্তের কাছে আমি না শিখলেও তিনি আমার গুরু। তিনি নিজেই ছিলেন একটা প্রতিষ্ঠান।  প্রফেসর মামলক, নীল রক্ত, ইতিহাসের কাঠগড়ায়, লৌহ মানব, টিনের তলোয়ার, ফেরারি ফৌজ—তাঁর অনেক নাটক করেছি। কোন দ্বিচারিতা তাঁর মধ্যে ছিল না। তিনি বলতেন, একজন কমিউনিস্ট ছাড়া একজন ভাল অভিনেতা হতে পারে না। একজন যদি মার্ক্সিস্ট হয়, তার মধ্যে ডায়নামিজম, তার মধ্যে ডায়ালেকটিক্যাল মেটিরিয়ালিজম থাকলে সে ভাল অভিনেতা হতে পারে। আমরা তাঁরই শিষ্য বলতে পারেন।

ইতিহাস আড্ডা:  জরুরি অবস্থা আপনার জীবনে কোন প্রভাব ফেলেছিল?

অমল গুহ: জরুরি অবস্থা তো ১৯৭৫ সালে, আমি ১৯৭০ সাল থেকে ঘরছাড়া। স্ত্রী আমার অফিস থেকে টাকা নিয়ে একা সংসার চালাচ্ছে। ১৯৭১ সালে আমার পুত্রের জন্ম হয়, কিন্তু তার মুখও আমি দেখতে পাই নি। লুকিয়ে অফিস যেতাম, কখনো কাশিপুর অঞ্চলে, কখনো গ্রামীণ হাতিয়াড়া অঞ্চলে লুকিয়ে থাকতে বাধ্য হতাম। গুলি করে, গুপ্ত ঘাতকের দ্বারা এসব হত্যাকাণ্ড হত, আমাকে এজন্য প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে লুকিয়ে থাকতে হত। ১৯৭২-এর কারচুপির নির্বাচন এবং ১৯৭৫ এর ২৫শে জুন জরুরী অবস্থা জারি, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ এরকম সময় আমাদের যে কি নিদারুণ অবস্থা গেছে বলবার নয়। ১৯৭৬ সালের শেষের দিকে যখন স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসছে, আমরা মিটিং মিছিল করতে পারছি, তখন একদিন আবদুল্লা রসুল বললেন, পালিয়ে থাক কিন্তু আন্দোলন থেকে সরে গেলে মরচে ধরে যাবে। তখন কবিতা নাটক করছি, ইলা মিত্রের কবিতা বলে মানুষকে উত্তেজিত করে তুলছি—এসব করে দেখা গেল ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে কেউ যা ভাবতে পারে নি তাই হয়েছে, কমিউনিস্টরা জয়ী হয়েছে।

ইতিহাস আড্ডা: ধর্ম নিয়ে একটা প্রশ্ন করি। এই যে ধর্মীয় বিদ্বেষ, হিংসা, তখন আর এখন কতটা বদলেছে? তখন বলতে আমি স্বাধীনতার আশপাশের সময়ের কথা বলছি।

অমল গুহ: স্বাধীনতার আগে তো ধর্ম নিয়ে ভাবিই নি। অনেক মুসলিম বন্ধু ছিল আমাদের, তাদের সঙ্গে ফুটবল খেলেছি, নাটক করেছি। আমার নাটকের যারা প্রধান পুরুষ ছিলেন – আবদুল মালেক, পরাণ মিয়া এরা আমার সাথে অভিনয় করে আনন্দ পেয়েছেন, আমিও পেয়েছি। জিন্না সাহেবের দ্বিজাতি তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে যখন দেশভাগ হল গান্ধিজি কিন্তু মানেন নি। সর্দার প্যাটেল, আজাদও সেটা মেনে নিলেন, হিন্দু মুসলিমের মাঝে পড়ে মানবিক ধর্ম উড়ে গেল, দেশে এক বিভীষিকা নেমে এল। আমরা বললাম, ধর্মাধর্ম এসব মূল্যহীন জিনিস নিয়ে আলোচনা করার অবকাশ আমাদের নেই, আমরা মনে করি দ্বিজাতি তত্ত্ব নয়, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই। 

ইতিহাস আড্ডা: আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলতে ইতিহাসের যে মনিমুক্তোগুলো কুড়িয়ে পেলাম তাতে আমরা অত্যন্ত সমৃদ্ধ হলাম। অনেক শ্রদ্ধা, অভিনন্দন। আপনার নীরোগ ও সুস্থ দীর্ঘ জীবন কামনা করি।

অমল গুহ: ধন্যবাদ।

মন্তব্য তালিকা - “স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন – অমল গুহের সঙ্গে আলাপচারিতা”

  1. খুব প্রয়োজনীয় ও ভালো একটা কাজ হলো অমল গুহের সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করে ।ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই।

    1. আপনার মত মানুষকে পাশে পেয়েছি বলে একাজ সম্ভব হল। অনেক ধন্যবাদ নেবেন।