সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

ইনফ্লুয়েঞ্জার অতিমারি থেকে ফ্যাসিবাদ

ইনফ্লুয়েঞ্জার অতিমারি থেকে ফ্যাসিবাদ

শ্যামলকুমার চক্রবর্তী

ফেব্রুয়ারী ২৩, ২০২২ ২৪৩

এদের মধ্যে সত্যিই কি কোন আবশ্যিক সম্পর্ক আছে ? থাকলেও তা কি সুদূরপরাহত ? না কি নিছকই সমাপতন? একটু খতিয়ে দেখা যাক। “ইনফ্লুয়েঞ্জা” কথাটা প্রথম ব্যবহার হয়েছিল ইটালিতে; শব্দটার উৎপত্তি মধ্যযুগের ল্যাটিন ভাষার ইনফ্লুয়েন্সিয়া (influentia) কথাটা থেকে। অর্থ, ইনফ্লুয়েন্স বা প্রভাব। নক্ষত্রের। ইটালিতে, ~১৫৮০ সালে, যখন নাকি নক্ষত্রলোকের বিশেষ সহাবস্থানে জন্য মানুষ এই রোগের কবলে পড়েছিল। পরবর্তীতে, ১৭৪৩ সালে, রোম থেকে গোটা ইউরোপে যখন জ্বর আর শ্বাসকষ্টের অতিমারি দেখা দেয় এবং বহু লোক মারা যেতে থাকে, ‘ইনফ্লুয়েঞ্জা” কথাটা তখন আবার ঘুরে-ফিরে আসে। সংক্ষেপে আমরা তাদের বলি “ফ্লু”।

‘স্প্যানিশ ফ্লু’

মৃতের সংখ্যার হিসাবে আধুনিক যুগের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি হচ্ছে ১৯১৮ সালে ধরা পড়া স্প্যানিশ ফ্লুর প্রাদুর্ভাব। প্রথম মহাযুদ্ধের অন্তিম লগ্নে এই মহামারির সূচনা। প্রথম মহাযুদ্ধে চার বছরে ১ কোটি ১৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে অংশগ্রহণকারী প্রায় পনের লাখ ব্রিটিশ ভারতীয় সেনা ছিল; তাদের মধ্যে ৭৪ হাজার সেনার প্রাণ যায়। পক্ষান্তরে, স্প্যানিশ ফ্লুতে মাত্র দুই বছরেই মারা যায় অন্তত পাঁচ কোটি মানুষ, কারও হিসেবে এটা দশ কোটি। অনেক আদিবাসী সম্প্রদায় প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার মুখে চলে যায়। শিশু থেকে বৃদ্ধ, সুস্থ কিংবা দুর্বল, সকলেই এই ফ্লুর শিকার হন। এই রোগের বিস্তার ছিল দক্ষিণ সাগর থেকে উত্তর মেরু পর্যন্ত। ঐতিহাসিকদের ধারণা যে, যুদ্ধকালে ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে সৈন্যরা যখন অত্যন্ত নোংরা এবং আর্দ্র পরিবেশে, সেনা ছাউনিতে প্রচন্ড অপুষ্টির মধ্যে গাদাগাদি করে থাকতে বাধ্য হতো, প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ায় তাঁরা দ্রুত এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। যদিও কেউ কেউ তিন দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন, কিন্তু অনেকেই আর সুস্থ হননি।

যুদ্ধ শেষে সৈনিকেরা একে একে নিজ দেশে ফিরতে থাকে। দ্রুত শহর-গ্রাম-জনপদে ছড়িয়ে পড়ে এই ফ্লু। ১৯১৯ সালে রয়্যাল সোসাইটি অব মেডিসিনের জন্য স্যার আর্থার নিউজহোমের এক প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, সে সময় গণপরিবহণ, সৈনিক বহণকারী পরিবহণ (মূলত জাহাজ), এবং যুদ্ধ উপকরণ তৈরির কারখানার মাধ্যমে দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে সংক্রমণ। ওই রিপোর্ট প্রকাশের এক বছর আগে, ১৯১৮ সালের জুলাইয়ে, উনি এক ‘গণবিজ্ঞপ্তি’ প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন, যেখানে মানুষকে ঘরে থাকতে এবং জনসমাগম এড়িয়ে চলতে নির্দেশ দেওয়ার কথা ছিল। সে সময় ব্রিটিশ সরকার সেই গণবিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশ করেনি। স্যার আর্থার মনে করতেন, নিয়ম মেনে চললে সে সময় বহু প্রাণ বাঁচানো যেতো। কিন্তু তা স্বত্ত্বেও তিনি বলেছিলেন: “অনেকসময় জাতীয় পরিস্থিতি এমন হয় যে স্বাস্থ্য এবং জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে, তখনকার প্রধান দায়িত্ব হয়ে ওঠে ‘চালিয়ে যাওয়া’।

ভুললে চলবে না, ১৯১৮ সালে ইনফ্লুয়েঞ্জার কোন চিকিৎসা ছিল না এবং নিউমোনিয়ার মত রোগের চিকিৎসায় কোন অ্যান্টিবায়োটিকও আবিষ্কার হয়নি। দ্রুত রোগির ভিড়ে উপচে পড়তে শুরু করল সব হাসপাতাল যদিও কাশি এবং হাঁচির মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ানোর বিষয়ে সতর্কতা জানানো হয়েছিল।

১৯৮-র ইনফ্লুয়েঞ্জা অতিমারির সময় ক্যানসাসের ক্যাম্প ফুন্সটন জরুরি অবস্থার মিলিটারী হাসপাতাল [Credit: Otis Historical Archives Nat’l Museum of Health Medicine – NCP 1603, Creative Commons]

ওই সময় সংক্রমণ ঠেকানোর উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয়ভাবে কোন লকডাউন জারি করা হয়নি। তবে অনেক থিয়েটার, নাচের হল, সিনেমা হল এবং গির্জা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ইংল্যান্ডের ফুটবল লিগ এবং এফএ কাপ যুদ্ধের জন্য আগেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তবে মহামারির কোন প্রভাব খেলার ওপর পড়েনি। স্টেডিয়ামে দর্শক কম রাখার বা খেলা বাতিল করার কোন ধরণের প্রচেষ্টাই করা হয়নি সে সময়। কিছু কিছু শহরে জীবাণুনাশক ছড়িয়ে দেয়া হয় এবং কিছু লোক জীবাণু বিরোধী মাস্ক পড়তো। তবে এই সময়ে সবাই স্বাভাবিক জীবনযাপন করে গেছে। জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বার্তাগুলো ছিল ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। আর এখনকার মতো সামাজিক মাধ্যম না থাকা সত্ত্বেও নানান ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও ভুয়ো খবরের ছড়াছড়ি ছিল। কিছু কিছু ফ্যাক্টরিতে ধূমপান না করার নিয়ম শিথিল করা হয়েছিল, কারণ এরকম একটা বিশ্বাস ছিল যে ধূমপান সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে সক্ষম। ১৯১৮ সালের নভেম্বরে নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড পত্রিকা পাঠকদের পরামর্শ দেয়: “প্রতিদিন রাতে ও সকালে নাকের ভেতরে সাবান ও জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন; সকালে ও রাতে জোর করে হাঁচি দিন, এরপর লম্বা নিঃশ্বাস নিন। মাফলার পরবেন না, প্রতিদিন দ্রুতবেগে হাঁটুন এবং কাজ থেকে হেঁটে ঘরে ফিরুন।”

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধ দপ্তরে কাজ করা নারীরা রাতে এবং দিনে ১৫ মিনিট করে বাইরে হাঁটতে যেতো। এটি ফ্লু’কে দূরে রাখতে পারে বলে মনে করা হতো। [Getty images]

সে সময় সরকারি নির্দেশনা নিয়ে যে সংশয় তৈরি হয়, সে বিষয়ে ডেইলি মিরর পত্রিকার একজন কার্টুনিস্টের আঁকা ব্যঙ্গচিত্র। [mirrorpix]

রেড ক্রসের তরফে যে বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছিল তখন, তা এ রকম : ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধ করুন! কারও নিঃশ্বাসের সামনে দাঁড়াবেন না। মুখ ও দাঁত পরিষ্কার রাখুন। যারা কাশছেন বা হাঁচছেন, তাঁদের এড়িয়ে চলুন। যে সব জায়গার ভেন্টিলেশন কম, সে সব জায়গায় যাবেন না। গরম, নির্মল বাতাস এবং সূর্যালোকের মধ্যে থাকুন। নানা জন একই পানীয়ের কাপ বা তোয়ালে ব্যবহার করবেন না। হাঁচি বা কাশি হলে মুখে ঢাকা দিন। দুশ্চিন্তা, ভয় এবং ক্লান্তি থেকে দূরে থাকুন। ঠান্ডা লাগলে বাড়িতে থাকুন। কাজে বা অফিসে হেঁটে যান। অসুস্থ রোগীর ঘরে ঢোকার আগে মাস্ক পরে নিন [১]।

এতদিনে প্রায় সবাই জেনে গেছেন, স্প্যানিশ ফ্লু নামটার সঙ্গে স্পেনের কোন প্রত্যক্ষ যোগ নেই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে স্প্যানিশ ফ্লু যখন মহামারিতে রূপ নেয়, তখন সরকারি হস্তক্ষেপে আমেরিকায় গণমাধ্যম সেই সংবাদ খোলাখুলি প্রচার না করতে পারলেও স্পেনের সংবাদপত্র ফলাও করে এই ফ্লুর কথা প্রচার করে। প্রথম মহাযুদ্ধে স্পেন ছিল নিরপেক্ষ অবস্থায়। যুদ্ধকালীন সংবাদ তারা নিরপেক্ষভাবেই প্রকাশ করতো।

স্যান ফ্রান্সিসকোতে উন্মুক্ত স্থানে আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা, স্যান ফ্র্যান্সিসকো, ১৯১৮। [Getty images]

এখনকার ২০১৯-এর করোনাভাইরাসের উপদ্রবের কথা বাদ দিলে, একশ বছরের মধ্যে সেটি ছিল বৃহত্তম প্যানডেমিক। যদিও অনেক পরে জানা যায় যে সেটির কারণ ছিল এক প্রকার আরএনএ ভাইরাস, orthomyxovirus-এর টাইপ-এ, জীববিজ্ঞানীদের ভাষায় H1N1 ভাইরাস। এইচ এবং এন যথাক্রমে ভাইরাস আবরণীর দুটো এনজাইম বা উৎসেচক, হিমাগ্লুটিনেজ় ও নিউরামিনিডেজ়-এর মিউটেন্ট বা পরিব্যক্তরূপ।

স্প্যানিশ ফ্লু যে এক ভাইরাসের কুকীর্তি, তা জানতে গড়িয়ে যায় এক দশকেরও বেশি সময়। তারপর শুরু হয় সেই ভাইরাসের খোঁজ। খোঁজ মানে, তা দেখতে কেমন, তার জীন উপাদান কী কী, ইত্যাদি। এবং সে সব জানতে কেটেছে আটটি দশক। দীর্ঘ প্রতীক্ষা! অবশেষে ১৯৯৫ সালে, এগিয়ে এলেন তিন তরুণ বিজ্ঞানী- জেফ্রি টাউবেনবার্গার, অ্যান রিড ও টমাস ফ্যানিং। চাকরিসূত্রে যাঁরা মেরিল্যান্ডের রকভিল-এ সামরিক বাহিনীর ইন্সটিটিউট অব প্যাথলজি-র সঙ্গে যুক্ত। ফরমালডিহাইডে সংরক্ষিত ফুসফুস কলার নমুনার জীনক্রম বিশ্লেষণ করা হয়। একটি নমুনা ছিল সাউথ ক্যারোলিনার ফোর্ট জ্যাকসন-এ, ১৯১৮ সালে মৃত এক সেনার ফুসফুস থেকে পাওয়া ভাইরাসের পাঁচখানি জীনের গঠন। আরেকটি রোগীর ফুসফুস ছিল ১৯১৮-র সেপ্টেম্বরে, নিউ ইয়র্ক প্রদেশের ক্যাম্প আপটনের সেনা ছাউনিতে মৃত, এক সেনার। উভয়ের জীনক্রম অনুরূপ। অর্থাৎ, একই ভাইরাস দুজন সেনার মৃত্যুর মূলে। আরও দুই গবেষকের সঙ্গে ওঁদের চার পাতার পেপার বেরল বিখ্যাত জার্নাল ‘সায়েন্স’-এ। শিরোনাম: ‘ইনিশিয়াল জেনেটিক ক্যারেক্টারাইজ়েশন অব দি নাইন্টিন এইট্টিন স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস’। ‘সায়েন্স’-এ ছাপা ওই পেপার নজরে পড়ল জোহান হালটিন নামে ৭৩ বছরের অবসরপ্রাপ্ত এক প্যাথলজিস্টের। তিনি যৌবনে মনের দুঃখে পিএইচ ডি গবেষণা ছেড়ে গিয়েছিলেন বনবাসে। টাউবেনবার্গারদের জানালেন সুযোগ পেলে আরও একবার ফেলে আসা ৪৬ বছর আগেকার গবেষণায় ফিরতে চান। খবর ছিল যে, আলাস্কার এক গ্রামে, পার্মাফ্রস্টের তলায়, স্প্যানিশ ফ্লুতে মৃত অনেককে গণকবর দেওয়া হয়েছিল। শুরু হলো খনন। তাঁরা খুঁড়ে পেলেন পৃথুলা এক যুবতীর মৃতদেহ। চর্বির পুরু আস্তরণে ঢাকা তাঁর ফুসফুসের কলা ছিল সম্পূর্ণ অটুট। বিশ্লেষণ করে এবার পাওয়া গেল ভাইরাসের পূর্ণ জীন মানচিত্র। প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস’ জার্নালে, ১৯৯৯ সালে, ছাপা হল টাউবেনবার্গার, রিড, ফ্যানিং এবং হালটিন-এর লেখা পেপার— ওরিজিন অ্যান্ড ইভলিউশন অব দ্য নাইন্টিন এইট্টিন স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস হিমাগ্লুটিনিন জিন’। অবশেষে চরিত্রায়ন করা সম্ভব হলো ৮১ বছর আগে দাপিয়ে বেড়ানো এক ভাইরাসের, H1N1 [১, ৫]। এখান থেকে এবার ফিরে যাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান থেকে সন্ধি চুক্তিতে।

১১ নভেম্বর ১৯১৮ : যুদ্ধবিরতি

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের এক পক্ষে ছিল জার্মানি,অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়াউসমানীয় সাম্রাজ্য, যাদের বলা হতো কেন্দ্রীয় শক্তি। উসমানীয় সাম্রাজ্য, ঐতিহাসিকভাবে তুর্কি সাম্রাজ্য বা অটোমান সাম্রাজ্য বলে পরিচিত ছিল। আর অপরপক্ষে ছিল সার্বিয়া, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জাপান, ইতালি, রুমানিয়ামার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এদের বলা হতো মিত্রশক্তি। সবার শেষে, ৬-ই এপ্রিল ১৯১৭-তে, আমেরিকা যুদ্ধে যোগ দেয়। এদিকে, ইউক্রেনের ব্রেস্ট লিটভক্সকে, ৩রা মার্চ ১৯১৮-তে, সোভিয়েতের সদ্যোজাত বলশেভিক সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় শক্তির শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যুদ্ধ থেকে রুশেরা বেরিয়ে এল। তখন এ-ছাড়া তাদের আর কোনো উপায়ও ছিল না। এই চুক্তির অপমানজনক শর্তাবলির ফলে রুশদের জনবলের এক-তৃতীয়াংশ, তাদের শিল্পের অর্ধেক আর কয়লা-খনির শতকরা নব্বই ভাগ হাত-ছাড়া হল। একই সঙ্গে ইউক্রেন, পোল্যান্ড ও ফিনল্যান্ডের ওপর থেকে তাদের দখল চলে যায়। এমনকি রুশ বন্দিদের মুক্তির জন্য নগদ টাকায় মুক্তিপণ দিতে হল। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! ভার্সাই চুক্তিতে এবার জার্মানির চরম হেনস্থা হওয়ার পালা, তাদের জাতীয় গরিমা ভেঙে চুরমার। চার বছরেরও অধিক সময় ধরে চলতে থাকা যুদ্ধের অবসান ঘটল ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর। সেই বছর ৮ই জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন কংগ্রেস প্রতিনিধিদের কাছে, যুদ্ধাবসান ও স্থায়ী শান্তির উদ্দেশ্যে চোদ্দ-দফা শর্তাবলী নিয়ে আসেন। উনি চেয়েছিলেন যুদ্ধে-শান্তিতে সব সময় সমুদ্র-পথে অবাধ মুক্ত বাণিজ্যের গ্যারেন্টি, বাণিজ্যিক-অর্থনৈতিক অবরোধ বা বাধা সৃষ্টির অপসারণ, দেশগুলির নিজেদের মধ্যে সমস্ত গোপন চুক্তির অবসান ও তাদের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনায় স্বচ্ছতা আনা, ইউরোপিও সাম্রাজ্যগুলির অবসান, নতুন রাষ্ট্রের জন্ম, তাদের আত্ম-নিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং যেটা তিনি পাখির চোখ করেছিলেন, অনেক দেশ নিয়ে এমন এক মহাসঙ্ঘ (লিগ অফ নেশনস) গঠন করা, যাদের নজরদারিরতে বিশ্বে স্থায়ী শান্তি বলবৎ থাকবে। পরাজয় স্বীকার করে ১৯১৮-র অক্টোবর মাসে জার্মানি যখন উইলসনের কাছে সাধারণ যুদ্ধ বিরতি ও শান্তির প্রস্তাব রাখে, তখন তারা যে প্রস্তাবিত চোদ্দ দফা শর্ত মানতে রাজি আছে, সে কথা জানাতে ভোলে নি। কিন্তু মার্কিন সেনেট বেঁকে বসে। এবং শেষ পর্যন্ত এই বিরোধিতায় অনড় থাকায় আমেরিকা বরাবর লিগ অফ নেশনস-এর বাইরেই থাকে। যাই হোক, অবশেষে ১১ ই নভেম্বর প্রথম শান্তি চুক্তি (armistice) স্বাক্ষরিত হওয়ার পর প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের অবসান হয়। তবে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি ঘটে ১৯১৯ সালের ২৮ জুন ‘ভার্সাই চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হওয়ার পর।

ভার্সাইয়ের রাজপ্রাসাদ, যেখানে ভার্সাইয়ের চুক্তি হয়

 প্যারিস শান্তি বৈঠকে “বৃহৎ চার”(the ‘big four’);(বাঁ-দিক থেকে) ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড, ইতালির প্রধানমন্ত্রী ভিত্তরিয় অরলান্ডো, ফরাসি প্রধানমন্ত্রী জর্জেস ক্লেমেঙ্কো এবং মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন।ভার্সাইয়ের রাজপ্রাসাদ, যেখানে ভার্সাইয়ের চুক্তি হয়

প্যারিসের শান্তি বৈঠকে উড্রো উইলসনের ফ্লু সংক্রমণ   

সমালোচকরা অবশ্য বলেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে যে ভার্সাই চুক্তি সম্পাদিত হয়, সেখানেই জার্মানিতে ফ্যাসিবাদের উত্থান ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ প্রোথিত হয়েছিল [১,৩] । প্যারিসের সেই শান্তি সম্মেলন ছিল ড্রামা বা মতান্তরে ও মেলোড্রামায় ভরপুর।  ফ্রান্সের অদূরবর্তী ভার্সাই নগরে এ চুক্তি সম্পাদিত হয়। যে ‘বিগ ফোর’ এখানে মুখ্য ভূমিকা নেয় তারা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন, বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জর্জ, ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী জর্জেস ক্লেমেঙ্কো এবং ইটালির প্রধানমন্ত্রী ভিত্তোরিও অরলান্ডো।

স্থান: ভার্সাই রাজপ্রাসদের হল অফ মিররস। জার্মান প্রতিনিধি জোহান্স বেল-কে দেখা যাচ্ছে ভার্সাই চুক্তি সই করছেন, আর তাঁর ওপর ঝুঁকে রয়েছেন হের হার্মান মুলার। মাঝের সারিতে বসে রয়েছেন (বাঁ দিক থেকে ): আমেরিকার জেনারেল টাস্কার ব্লিস, কনেল ইএম হাউস, হেনরি হোয়াইট, রবার্ট লান্সিং, প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন; ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী জর্জেস ক্লেমেঙ্কো; ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ, এ বোনার ল, আর্থার ব্যালফোর, ভাইকাউন্ট মিলনার, জিএন বার্ণস; জাপানের শায়নজি কিনমচি। পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে (বাঁ দিক থেকে): গ্রিসের এলেফথেরিয়স ভেনিজ়িলোস; পর্তুগালের আফন্সো কস্টা; ব্রিটিশ প্রেসের পক্ষ থেকে লর্ড রিডেল; কানাডার জর্জ ফস্টার; সার্বিয়ার নিকোলা পাসিক; ফ্রান্সের স্টিফেন পিশঁ; বৃটেনের মরিস হ্যাঙ্কে, এডুইন মন্টেগু; ইম্পেরিয়াল ওয়ার ক্যাবিনেটের পক্ষ থেকে একমাত্র ভারতীয় প্রতিনিধি বিকানিরের মহারাজা গঙ্গা সিং; ইটালির প্রধানমন্ত্রী ভিত্তরিও ইমানুয়েল ওর্লান্ডো; বেলজিয়ামের পল হাইমানস; দক্ষিণ আফ্রিকার জেনারেল লুই বোথা; এবং অস্ট্রেলিয়ার ডব্লিউএম হিউজেস। [Source: Imperial War Museum Exhibit]  

বৈঠকে, প্রথম থেকেই ফ্রান্স সুর চড়াতে শুরু করে এবং পরাজিত জার্মানিকে কত রকম ভাবে পর্যদুস্ত আর অপমান করা যায়, ক্রমাগত তার চেষ্টা করে চলে। জার্মানিকে এত চাপ দিতে নিষেধ করে উইলসন, ফ্রান্স তাতে কর্ণপাত করে না। বৈঠকের প্রথম দিকে উইলসনের সাথে তো ক্লেমেঙ্কোর তুমুল বিতণ্ডা বেধে যায় এবং বৈঠক প্রায় ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়। ততদিনে, বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এই ফ্লু-তে আক্রান্ত। অতঃপর, ৩ রা এপ্রিল, ২০১৯-এ, রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন স্বয়ং ফ্লু-এর লক্ষণ নিয়ে আক্রান্ত হন দ্বিতীয়বার। অবিলম্বে তাঁকে অন্তরীণ করা হয় প্যারিসের ডাউনটাউনে, অভিজাত হোটেল দ্যু প্রিন্স মুরাত-এ। তিনি ২০১৮-তে প্রথমবার আক্রান্ত হয়েছিলেন, কিন্তু সেবার দ্রুত সেরে ওঠেন। তখন বেশি জানাজানি হয়নি, কারণ আমেরিকা যে এক মহামারিতে আক্রান্ত, পনেরো মাসে যে আমেরিকাতে ৬ লক্ষ ৭৫ হাজার মানুষ মারা যান, পরে-ও এই কথাটা তিনি কখনই জনসমক্ষে স্বীকার করতে চাননি। এমনকি, তাঁর বড় মেয়ে সহ ব্যক্তিগত সচিব, বহু সিক্রেট সার্ভিসের কর্মী, মায় হোয়াইট হাউজ়ের ভেড়া-ও যে আক্রান্ত হয়েছিল, তা কাউকে জানতে দেননি। তাতে নাকি যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে মার্কিন সেনার মনোবল ভেঙে পড়তো। সমগ্র দুনিয়ার ভবিষ্যত যে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষনে দাঁড়িয়ে, সে কথা বুঝে উইলসনের ব্যক্তিগত চিকিত্সক অসুস্থ রাষ্ট্রপতিকে অবিলম্বে শয্যায় সম্পূর্ণ বিশ্রাম নিতে নির্দেশ দেন। হোয়াইট হাউজ়ের ডাক্তার ক্যারি গ্রেসন চিঠিতে তাঁর বন্ধু স্যামুয়েল রস-কে লেখেন– “The President was suddenly taken violently sick with the influenza at a time when the whole civilization seemed to be in a balance.” [২] উইলসনের ফ্লু-তে আক্রান্ত হওয়ার কথা লঘু করে দেখানো হয় সাংবাদিকদের কাছে – ঠান্ডা ও ভেজা স্যাঁত-সেঁতে আবহাওয়ার কারণে তার এমন হয়েছে বলা হয়। এমনকি, ২০১৯-এর ৫-ই মে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-কে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান হয় যে, উইলসনের ফ্লু হয়নি। এদিকে চোখের অন্তরালে রাষ্ট্রপতির শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। তিনি এমনকি বিছানায় উঠে বসবার-ও ক্ষমতা হারান। তার সঙ্গে চলতে থাকে প্রবল কাশি, ১০৩ ডিগ্রি জ্বর এবং আন্ত্রিক গোলযোগ। উইলসনের জীবনিকার স্কট বার্গ লেখেন যে তিনি হঠাৎ অদ্ভুত আচরণ করতে শুরু করেন, এমন সব নির্দেশ দিতে থাকেন যা অপ্রত্যাশিত, এমকি তাঁর ঘরের কিছু আসবাব কেন তিনি দেখতে পাচ্ছেন না, তা নিয়ে হৈ চৈ ফেলে দেন, যদিও বাস্তবে তেমন কিছুই হয়নি। নালিশ করতে থাকেন যে ফরাসি গুপ্তচরেরা সব সময় তাঁকে ঘিরে রেখেছে। তাঁর মানসিক ভারসাম্যহীনতা নিয়ে আর কোনো সন্দেহ থাকে না। রাষ্ট্রপতির প্রধান উপস্থাপক (chief usher) আরউইন হুভার-কে বলতে শোনা যায়, একটা ব্যাপার অন্তত নিশ্চিত, এই সংক্রমণের পর তিনি একেবারেই যেন অন্য মানুষ হয়ে যান [১,২]। এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েন যে ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে তিনি কী করে আমেরিকাকে নেতৃত্ব দেবেন, সে বিষয়ে রাষ্ট্রপতির হাতে-বাছা প্রতিনিধি দল প্রবল দুশ্চিন্তায় পরে, বিশেষ করে মার্কিন সেনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যেখানে উইলসনের চোখের মণি ‘লিগ অফ নেশনস’-এর বিরোধিতায় অটল। লরা স্পিনি তাঁর বইতে উল্লেখ করতে ভোলেননি যে এই ইনফ্লুয়েঞ্জা এ-ভাইরাস (IAV)-এর H1N1 সাবটাইপ, সব রোগলক্ষণ মিলিয়ে যাওয়ার পরেও স্নায়ুতন্ত্রের বেশ কিছু সমস্যা সৃষ্টি করে, বিশেষ করে প্যারানয়া এবং অস্বাভাবিক আলস্যভাব বা নিদ্রালুতা [৫]। বহু আগে, প্রখ্যাত চিকিত্সক এবং জন হপকিন্স হাসপাতালের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা স্যার উইলিয়াম ওসলার ১৮৯৩-তে প্রকাশিত তাঁর প্রসিদ্ধ এবং এখনো জনপ্রিয় বই The Principles and Practice of Medicineএ লিখেছিলেন ফ্লু-র লক্ষণ নিয়ে “…(flu) causes marked delirium, meningitis, accompanied by pneumonia; abscess of the brain, peripheral neuritis; mental disorders are not uncommon, inaptitude for mental exertion, depression of spirits, even insanity may follow an attack.” ওসলার স্বয়ং ১৯১৯ সালে এই ফ্লু-র বলি হন।

জার্মানির শাস্তি এবং ২৮ জুন ১৯১৯, ভার্সাই চুক্তিস্বাক্ষর

সুযোগ বুঝে ফরাসি প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেঙ্কো কোনো রকম কূটনৈতিক শিষ্টাচারের তোয়াক্কা না করে, মানসিক ভারসাম্যহীন উড্রো উইলসনের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করে চলেন। এমন কি ক্লেমেঙ্কো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ-কে জিজ্ঞেস করে বসেন যে, সে উইলসনের ডাক্তার-কে চেনেন কি না, তাকে ঘুষ নিতে রাজি করানো যায় কিনা [৭]। আমরা জানি, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে উইলসনের চোদ্দ-দফা সনদ, জার্মান রাষ্ট্র-কে অপমান করা বা তাদের সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত করা থেকে বিরত ছিল, যার দরুন পরাজিত জার্মানরা উইলসনের এই সন্ধি-প্রস্তাব (armistice)-এ সম্মত হয়ে প্যারিসের বৈঠকে যোগ দিতে, এক কথায় রাজি হয়ে যায়। আর জার্মানদের বিষয়ে চরমপন্থা এড়িয়ে চলবার এই কারণেই ক্লেমেঙ্কো খরগহস্ত হয়েছিলেন উইলসনের ওপর । ক্লেমেঙ্কোর চাপের কাছে অসুস্থ, দিশাহীন উইলসন আত্মসমর্পণ করেন, তাঁর সাধের লিগ অফ নেশনস-এর ধারণা বাঁচিয়ে রাখবার তাগিদে। কিন্তু ইতিহাসের এমনই পরিহাস, উইলসনের হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও মার্কিন সেনেট, পরে ১৯১৯-এর জুলাই এবং অক্টোবর, দুই-দুবারই লিগ অফ নেশনস-এ আমেরিকার অংশগ্রহণের প্রস্তাব খারিজ করে দেয়। লিগ অফ নেশনস তৈরি হলো বটে কিন্তু সেখানে আমেরিকা অনুপস্থিত রয়ে গেল। এটা অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ। এদিকে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে একমাত্র জার্মানিকে যুদ্ধ অপরাধী এবং আগ্রাসী শক্তি সাব্যস্ত করা হয়। তাদের ওপর বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ চাপানো হয়, এবং বিশেষ করে ফ্রান্স আর বেলজিয়ামের বেলায় এই জরিমানার পরিমাণ নির্ধারন করতে এক স্বতন্ত্র কমিশন গঠন করা হয়। তাঁরা ১৯২১ সালে ক্ষতিপূরণের অংক ৩৩ বিলিয়ন ডলার (১৩২ বিলিয়ন গোল্ড মার্ক) ধার্য করেন। অর্থনীতিবিদেরা জানায় যে এই পরিমাণ অর্থ যোগাড় করবার ক্ষমতা জার্মানির আর নেই। এইভাবে জোর করলে গোটা দুনিয়ার আর্থিক ভারসাম্য বিপর্যস্ত হবে। ক্ষমতা ও প্রতিহিংসার মদিরায় মত্ত মিত্র শক্তি সে দিন এ কথায় কর্ণপাত করে নি। উপরন্তু, জার্মানি-কে এই বলে সাবধান করা হয় যে ক্ষতিপূরণ মেটাতে না পারলে তাদের বিরুদ্ধে একতরফা পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার ন্যস্ত থাকবে মিত্র শক্তির ওপর।

ক্লেমেঙ্কো চাপ দেন এমন ব্যবস্থা নিতে যাতে জার্মানি আর কোনদিন ইউরোপের কাছে এক সামরিক বিপদ হয়ে উঠতে না পারে। জার্মান সৈন্য সংখ্যার উর্ধসীমা এক লক্ষে বেধে দেওয়া হয়। জার্মানিতে সাঁজোয়া গাড়ি, ট্যাঙ্ক, ডুবোজাহাজ, উড়োজাহাজ এবং বিষাক্ত গ্যাস উত্পাদন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। কেবল অল্প-সংখ্যক নির্দিষ্ট কয়েকটি কারখানা অস্ত্র বানাতে পারবে। রাইন নদীর পশ্চিমে জার্মানির পুরো অঞ্চল এবং তার পূর্বে ৫০ কিলোমিটার এলাকা অসামরিক বলে ঘোষণা করা হয়। তাদের পশ্চিমে অবস্থিত Alsace ও Lorraine ফ্রান্স-কে প্রত্যার্পণ করতে হয়, Saarland-কে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত লিগ অফ নেশনস-এর অধীনস্ত করা হয়। উত্তরের তিনটি ছোট অঞ্চল ডেনমার্ক-কে ফিরিয়ে দিতে বলা হয়। এক প্লেবিসাইটের মাধ্যমে Schleswig-এর উত্তর অঞ্চলটি-ও ডেনমার্কের অন্তর্ভুক্ত হয়। তাছাড়া, পূর্বে, পোল্যান্ড-কে ফের এক স্বতন্ত্র দেশ হিসেবে পুনরুত্থান করা হয় আর জার্মানির পশ্চিম প্রুশিয়া ও পোজ়নান অঞ্চল তাদেরকে ফিরিয়ে দিতে হয়। এ ছাড়া, আপার সাইলেশিয়া-ও চলে আসে পোল্যান্ডে। ডানস্ক (Gdansk/Danjig)-কে মুক্ত শহর ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে, দেশের বাইরে জার্মানির সকল উপনিবেশ– চিন, প্যাসিফিক অঞ্চল এবং আফ্রিকা– চলে যায় ফ্রান্স, ব্রিটেন, জাপান-সহ অন্য মিত্র শক্তির দখলে। চিনের শানডং অঞ্চল কনফুশিয়সের জন্মস্থান। জাপান জায়গাটির দখল নেয়, পরে তা জার্মানিকে লীজ় দেওয়া হয়। এই শান্তি চুক্তিতে জায়গাটি চিনের পরিবর্তে ফের জাপানের হতে তুলে দেওয়ায় গোটা চিন জুড়ে প্রবল অশান্তি দেখা দেয়। চিনা প্রতিনিধি ওয়েলিংটন কু এই প্রত্যর্পণ মেনে নিতে অস্বীকার করেন। খবর পৌঁছায় চিনে এবং গোটা দেশ প্রতিবাদে মুখর হয়। তেরটা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় চার হাজার ছাত্র-ছাত্রী ৪-ঠা মে, ১৯১৯-এ বিক্ষোভ শুরু করে তিয়ানানমেন স্কোয়ারে, পরে শ্রমিকেরা ওই প্রতিবাদে সামিল হয়। সূত্রপাত হয় ঐতিহাসিক মে-ফোর্থ মুভমেন্ট, চিনের ইতিহাস নেয় এক নতুন মোর। ১২-ই জুন চিনা প্রধানমন্ত্রী ডুয়ান কিরুই-এর গোটা ক্যাবিনেট পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়, প্যারিসে ওয়েলিংটন কু-র কাছে নির্দেশ আসে সই না করবার জন্য। চুক্তি স্বাক্ষরের দিন মিত্র দেশগুলির হাজারো অনুরোধ, প্রচ্ছন্ন হুমকি উপেক্ষা করে কু সই করতে অস্বীকার করে। সে দিন চিন ছিল অংশগ্রহণকারী একমাত্র দেশ যে, অসম ভার্সাই চুক্তি  প্রত্যাখ্যান করবার হিম্মত দেখিয়েছিল। ওয়েলিংটন কু চিনে রাতারাতি জাতীয় হিরো বনে যায়।

ও-দিকে, জার্মান প্রতিনিধিদল প্রবল ক্রোধ ও ক্ষোভে ফেটে পরে চাপানো শর্তাবলীর তীব্র আপত্তি করতে থাকে, ওই বিপুল পরিমাণ আর্থিক জরিমানা দেওয়া যে তাদের পক্ষে কার্যত অসম্ভব সে কথা বার বার বলে। জানায় এ সব পদক্ষেপ নিলে জার্মানি দেশটি শেষ হয়ে যাবে। তাঁরা মনে করিয়ে দেন যে, উইলসনের সন্ধি প্রস্তাবে তাঁরা যখন সম্মত হন, তখন এই শর্তগুলি ছিল না; নতুন শর্ত চাপিয়ে মিত্রশক্তি বিশ্বাস ভঙ্গের কাজ করতে উদ্যত হয়েছে। ঐতিহাসিকেরা মনে করেন, এই বিশ্বযুদ্ধে জার্মানিকে একমাত্র আগ্রাসী শক্তি এবং যুদ্ধ-অপরাধী আখ্যা দেওয়া আর তার সঙ্গে রাইনল্যান্ডে অন্তত পনেরো বছর ধরে ফরাসি সৈন্য মোতায়েন করা তাঁদের জাতিগত অস্মিতার ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত ছিল [৪]।

অবশেষে, অসুস্থ উইলসন ক্লেমেঙ্কোর প্রবল চাপের কাছে নতিস্বীকার করেন। জার্মানদের বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া হয় এবং তাদের প্রবল ঊষ্মা এবং আপত্তি অগ্রাহ্য করে জোর করে সই করানো হয়। চুক্তি সইয়ের স্থান ছিল ভার্সাই প্রাসাদের হল অফ মিররর্স, তারিখ ২৮-শে জুন ১৯১৯, যদিও সেটি কার্যকর হয় ১০-ই জানুয়ারি ২০২০ সালে। সমসময়ের প্রায় সকল বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা আজ নির্দ্বিধায় স্বীকার করে যে, বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে যে ভার্সাই চুক্তি সম্পাদিত হয়, তার উদ্দেশ্য ছিল জার্মানিকে সম্পূর্ণরূপে পঙ্গু করে দেওয়া। তাদের একমাত্র যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত করা, বিভিন্ন ধরণের নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিপুল অঙ্কের আর্থিক বোঝা চাপানো এবং জার্মান মাটিতে ফরাসি সৈন্য স্থায়ী ভাবে মোতায়েন করা, এই সব কাজ ছিল এক কথায় সম্পূর্ণ প্রতিহিংসামূলক।

প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ জন মেইনার্ড কেনস, যিনি ভার্সাই চুক্তির সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তাঁর বই The Economic Consequences of Peace-এ লেখেন যে ভার্সাইয়ের চুক্তি জার্মানির পক্ষে এতটাই নিষ্ঠুর ছিল যে তাকে ‘Carthaginian Peace’ বলতে হয়, যা ফরাসি প্রতিশোধপরায়ণতার (revanchism) মাধ্যমে জার্মানিকে সম্পূর্ণ ভাবে ধ্বংস করবার উন্মার্গ, অপরিণামদর্শী প্রয়াস, যা উইলসনের ন্যায্যতর চোদ্দ-দফা শর্তের সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল। তাঁর কথায় — “I believe that the campaign for securing out of Germany the general costs of the war was one of the most serious acts of political unwisdom for which our statesman have ever been responsible.” এমনকি, লয়েড জর্জ যিনি চুক্তির সময়ে ফরাসি দখলদারির বিরোধিতা করেন, তার স্মৃতিকথায় লেখেন– “the odious accompaniments of such an occupation of German towns… … had much to do with the fierce outbreak of patriotic sentiment in Germany, which finds its expression in Nazism.”

এদিকে ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষর করায় জার্মানিতে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত জার্মানি আর্থিক জরিমানার খানিকটা অংশ নগদ টাকায় পরিশোধ করতেই দেশে আর্থিক সংকট দেখা দেয়। সেখানকার দক্ষিণপন্থী দলগুলি, বিশেষ করে হিটলার, তখনকার ওয়াইমার কোয়ালিশন সরকারের বিরুদ্ধে জার্মানির গরিমা, অস্মিতা বিসর্জন দিয়ে চুক্তি সই করবার অভিযোগ তোলে। দলগুলি বোঝাতে থাকে যে জার্মানি আদৌ যুদ্ধে হারেনি, ওয়াইমার সরকার আসলে দেশবাসীকে পেছন থেকে ছুরি মেরেছে। জনমতের প্রবল চাপে কোয়ালিশনের তিনটি দল-ও ভার্সাই চুক্তির বিরোধিতা শুরু করে দেয়। ক্রমশ জার্মান অর্থনীতির অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে এবং পশ্চিমী দুনিয়ায় প্রবল আর্থিক মন্দা (গ্রেট ডিপ্রেশন) অবস্থা তাকে আরও সঙ্গীন করে তোলে।

ভার্সাই চুক্তিতে তাদের আত্মসমর্পণ-কে দায়ী করে দেশ জুড়ে হিটলার প্রচার চালাতে থাকে। তাঁর আক্রমণের তীর ছিল মূলত কম্যুনিস্ট আর ইহুদীদের দিকে। জানায়, ক্ষমতায় এলে দেশের হৃত গরিমা এবং জমি পুনরুদ্ধার করেই ছাড়বে। জার্মান জনগণ আগ্রহ ভরে তাঁর কথা শুনতে থাকে, বাগ্মিতায় প্রভাবিত-ও হতে থাকে। ১৯৩৩ সালের অক্টোবর মাসে হিটলার ক্ষমতায় আসে, শুরু হয় নাৎসি শাসন।

জার্মানির রাইখস্ট্যাগের সামনে ভার্সাই চুক্তির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ।

    ভিয়েনার হে্ল্ডেনপ্লাৎজ়-এ অস্ট্রিয়ার অধিগ্রহণ (Anschluss) ঘোষণা করছেন হিটলার, ১৫-ই মার্চ, ১৯৩৮

জার্মানি লিগ অফ নেশনস থেকে বেরিয়ে আসে এবং বিশ্ব নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলন থেকে নিজেদের অংশগ্রহণ প্রত্যাহার করে। এর পর ১৯৩৫-এর মার্চ থেকে দেশবাসীদের বাধ্যতামূলক সৈন্যদলে নাম লেখানো শুরু হয় এবং পুরোদস্তুর সমরসজ্জায় দেশ খোলাখুলি মেতে ওঠে। জার্মান লুফৎওয়াফ (বায়ু সেনা) নতুন করে সৃষ্টি করা হয় এবং নৌবাহিনী (surface fleet)-র পুনরুত্থান ঘটে, যদিও প্রথম দিকে তা অ্যাংলো-জার্মান নেভাল এগ্রিমেণ্ট দ্বারা পরিচালিত চুক্তি অনুসারে এই নৌবাহিনীর কলেবর ব্রিটিশ রয়াল নেভি’র অনুর্ধ ৩৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবধ্য রাখতে হয়। এই সমরসজ্জার জন্য আট-বছর সময়কাল ধরে ৩৫ বিলিয়ন রাইখসমার্কস অনুমোদন করা হয়।

লিগ অফ নেশনস থেকে বেরিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও জার্মান পুনর্যুদ্ধ-সজ্জা, বা তাদের ওপর চাপানো আর্থিক জরিমানা মেটানোর বিষয়টি নিয়ে পূর্বেকার মিত্রশক্তির দেশগুলি খুব একটা উচ্চবাচ্য আর করতে দেখা যায়নি। তার কারণ বিবিধ — আর্থিক মন্দা, শিল্পপতিদের চাপ আর সোভিয়েত রাশিয়া-কে অদূর ভবিষ্যতে জার্মানরা জব্দ করবে, এই গোপন বাসনা। সব হিসেব নস্যাত করে, ৭-ই মার্চ ১৯৩৬-এ জার্মান সেনা রাইনল্যান্ডে প্রবেশ করে এলাকার দখল নেয়। দুই বছরের মধ্যে অস্ট্রিয়া-র সরকারের পতন ঘটিয়ে সে দেশে প্রবেশ করে আনশ্লুশ ঘোষণা করে, সে দেশ অধিগ্রহণ করে। এক বছর পর, ২৩-এ মার্চ ১৯৩৯-এ জার্মানি লিথুয়ানিয়ার মেমেল অঞ্চল  অধিগ্রহণ করে। এবং বাকি ইতিহাস।

উইলসন অসুস্থ না হলে কী হতো, প্যারিসে তাঁর সাধের চোদ্দ-দফা প্রোগ্রাম বলবৎ করতে পারতন কি না বলা মুশকিল। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার: ফ্যাসিবাদ জন্মানোর অন্যতম পূর্বশর্ত উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং ঘরে বাইরে চিহ্নিত করা যায় এমন শত্রু নির্মাণ। দেশের সকল দারিদ্র দুর্দশার দায় তখন চাপানো যায় তাদের ঘারে।      

তথ্যসুত্র:  

[১] Barry JM (2005) The Great  Influenza: The story of the deadliest pandemic in history. London: Penguin Books.  

[২] Solly M. What happened when Woodrow Wilson came down with the 1918 flu. Smithsonian Magazine, October 2, 2020.

[৩] Crosby AW (2003) America’s forgotten epidemic, 2nd ed. Cambridge: Cambridge University Press.

[৪] Breitnauer J (2019) The Spanish Flu epidemic and its influence on history. Philadelphia: Pass and Sword History.

[৫] Spinney L (2017) Pale Rider: The Spanish Flu of 1918 and how it changed the world. London: Jonathan Cape.

[৬] Opal JM, Opal SM. The importance of watching the health of a U.S. President: the Spanish flu and a flawed peace treaty, The Conversation, January 2, 2019.

[৭] Coll S. Woodrow Wilson’s Case of the Flu, and How Pandemics Change History.  The New Yorker,April 17, 2020.

[৮] George DL (1939) Memoirs of the Peace Conference, vol 1. New Haven: Yale University Press.

প্রাক্তন অধ্যাপক, গবেষক, প্রাবন্ধিক ও সমাজ কর্মী