সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

হারিয়ে যাওয়া সময়ের সন্ধানে : ইতিহাস খোঁজার ইতিহাস

হারিয়ে যাওয়া সময়ের সন্ধানে : ইতিহাস খোঁজার ইতিহাস

কৃশানু নস্কর

এপ্রিল ৩, ২০২১ ৩৫০

বেদ, বেদান্ত, উপনিষদ, কোরআন, বাইবেল, আবেস্তা বা তালমুদ ইত্যাদির নাম শুনলেই ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে, ভক্তির আবেশে চোখ বন্ধ হয়ে আসে। তেমনি বিপ্লব বা রেভোল্যুশন শব্দগুলি কানে গেলে বোধ করি বহু মানুষের; যার মধ্যে ইতিহাসবিদ, সমাজবিদ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যেমন আছেন তেমনি সাধারণ মানুষও আছেন, রক্ত গরম হয়ে ওঠে, মুষ্টিবদ্ধ হয় হাত। আচ্ছা, এই বিপ্লবী বা ভক্ত কোন দলের মধ্যেই কি কোন বিজ্ঞানীকে কল্পনা করতে পারেন? বিজ্ঞানের বিষয়গুলির মধ্যে এমন কোন শব্দ কল্পনা করতে পারেন যা বিজ্ঞানী বা বিজ্ঞান শিক্ষিত ব্যক্তিদের ওপর এমন প্রভাব ফেলতে পারে?

হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন, ‘কোয়ান্টাম’! এই শব্দটির পরে বিপ্লব শব্দটা জুড়ে নিন; দিব্য খাপ খেয়ে যায়। কোয়ান্টাম মেকানিক্স বা বলবিদ্যা শব্দটা উচ্চারণ করুন আর দেখুন শুধু বিজ্ঞানী নয়, বিজ্ঞানের সঙ্গে সামান্যতম পরিচিতি আছে এমন মানুষেরও গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। এমন অসাধারণ, এমন মৌলিক, এমন অভ্রান্ত অথচ এমন রহস্যময় তত্ত্ব বিজ্ঞানের ইতিহাসে আর একটিও নেই। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ বা আরো ভালো করে বললে প্রথম ৩৫ বছর হল এ তত্ত্বের গড়ে ওঠার মূল সময়কাল।

না, এ তত্ত্ব সম্পর্কে আমরা আলোচনা করতে যাচ্ছি না। ওটা বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীদের জন্যই ছেড়ে রাখা ভালো। এ তত্ত্ব গড়ে ওঠার ইতিহাস নিয়েও আমাদের আলোচনা নয়। এই সামান্য পরিসর তার উপযুক্ত ক্ষেত্রও নয়। আমাদের আলোচনার বিষয় হল এ তত্ত্বের ইতিহাস সংরক্ষণের ইতিহাস।

কোয়ান্টাম তত্ত্ব বা কোয়ান্টাম বলবিদ্যা বা অন্য ভাষায় বললে কোয়ান্টাম বিপ্লবের ইতিহাস সম্পূর্ণরূপে জানা, নথিবদ্ধ করা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তথা বিজ্ঞানের ইতিহাস চর্চাকারীদের জন্য সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে যে বৃহৎ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল তা আর অন্য কোন বিষয় বা কোন ঘটনার ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে বলে আমার জানা নেই। সেই ইতিহাস নথিবদ্ধ ও সংরক্ষণের ইতিহাস বা বিবরণই আমাদের এই লেখার উপজীব্য।

গল্পটা শুরু করা যাক ১৯৬০ সাল থেকে; কেন? কারণ সেই বছরই আগস্ট মাসে ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে ইউনিভার্সিটিতে পাঁচজন প্রথিতযশা বিজ্ঞানী তথা অধ্যাপক মিলিত হলেন এক মহান উদ্দেশ্য নিয়ে। কোয়ান্টাম বিপ্লবের একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস সমস্ত তথ্য প্রমাণাদি এবং এতে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের ভূমিকা, এ সমস্ত কিছুই সংগ্রহ ও সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে এঁরা কাজ শুরু করতে চাইছিলেন।

তিনটি দশক বা খুব নির্দিষ্ট করে বললে বিংশ শতাব্দীর প্রথম ৩৩টি বছরই ছিল এই বিজ্ঞানীদের প্রধান লক্ষ্য। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমনটা আগে কখনো ঘটেনি। এত ছোট্ট একটা সময়কাল কখনো এত গভীর মনোযোগের বিষয় হয়ে ওঠেনি।

এই পাঁচ জন বিজ্ঞানী যাঁরা এই বৃহৎ কর্মযজ্ঞের প্রধান উদ্যোক্তা তাঁদের মধ্যেও কয়েকজন ছিলেন যাঁরা নিজেরাও এই ইতিহাসের অংশ। কিন্তু তাঁরা নিজেরা নিজেদের মরণোত্তর সম্মান প্রাপ্তির জন্য ব্যগ্র ছিলেন এমনটা ভেবে নেওয়া ঠিক নয়। তারা বরং নিজেদের সেই মহান কোয়ান্টাম বিপ্লবের উত্তরসূরি মনে করতেন। পদার্থবিদ, বিজ্ঞান ঐতিহাসিক ও দার্শনিকদের এই ছোট্ট দলটি মূলত যা প্রকাশ করতে চাইছিলেন তা হলো কৃতজ্ঞতা।

বার্কলের এই সমাবেশের মূল উদ্যোক্তা তাত্ত্বিক পদার্থবিদ জন হুইলার দলের সকলের মনোভাব একটি বাক্যে অতি সুন্দর ভাবে প্রকাশ করেছেন যে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের এই তিনটি দশক বিজ্ঞানের ইতিহাসে – “… গত তিন’শ বছরের মধ্যে অতুলনীয়।”

অবশ্য এটা এমন কিছু নতুন বা অভাবনীয় চিন্তা নয়। সে সময় সমস্ত পৃথিবীতে সব তাত্ত্বিক পদার্থবিদ ও বৈজ্ঞানিকদের মনোভাব একই রকম ছিল। এই পাঁচ জন কেবল আলাদা ছিলেন একটি বিষয়ে। তাঁরা শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা মনের মধ্যে নিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারেননি। তাঁরা একে প্রকাশ করতে চেয়ে ছিলেন কিছু একটা করার মধ্যে দিয়ে। সেই আগস্ট মাসের সমাবেশের থেকেই তাঁরা প্রস্তুতি শুরু করলেন সেই কাজের যা চলবে পরবর্তী চারটি বছর ধরে এবং হবে বিজ্ঞান ও ইতিহাস দুই দিক থেকেই এক অভূতপূর্ব এবং অসাধারণ কাজ।

কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটলো। কাজ আরম্ভ হওয়ার আগেই এ প্রকল্প একটা বিরাট ধাক্কা খেলো। ১৯৬১ সালের ৫ই জানুয়ারি তরঙ্গ বলবিদ্যার অন্যতম স্রষ্টা এরউইন শ্রয়েডিংগার ৭৩ বছর বয়সে মারা গেলেন।

‘The Bell is tolling’ হুইলার এর কণ্ঠে শোনা গেল সতর্কবাণী, ‘সময় কমে আসছে’। সকলেই উপলব্ধি করলেন এ সতর্কবাণীর নিহিতার্থ। হ্যাঁ, সত্যিই তো সময় কমে আসছে। ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৮ এই স্বল্প সময়টুকুর মধ্যেই বিশ্ব বিজ্ঞান হারিয়েছে এনরিকো ফার্মি (১৯৫৪), অ্যালবার্ট আইনস্টাইন (১৯৫৫), জন ভন নিউম্যান (১৯৫৭), উলফগাং পাউলি (১৯৫৮) ও আব্রাহাম ইওফোর মতো ব্যক্তিত্বদের। আর এখন এই ১৯৬১ সালের প্রথমেই কোয়ান্টাম ধারণার ইতিহাসের এক বিশাল অজানা অধ্যায় নিয়ে চলে গেলেন শ্রয়েডিংগার।

অবশ্যই তাঁর লেখা চিঠিপত্র ডাইরি নোটবুক পাণ্ডুলিপির খসড়া এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত কাগজপত্র যা তাঁর বিধবা পত্নী এবং অন্যান্যরা যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন তা থেকে অনেক কিছুই জানা যাবে, কিন্তু তা কতটুকু? তা কি যথেষ্ট? তিনি কি আদৌ কাগজপত্র সংরক্ষণের ব্যাপারে যত্নবান ছিলেন? সব চিঠিপত্র যা তিনি পেয়েছেন তা কি সংরক্ষণ করেছেন? নিজের লেখা সব চিঠির কি কপি রেখেছেন? তিনি নিজে খানিকটা অগোছালো এবং খামখেয়ালী গোছের ছিলেন।

নাৎসি শাসিত জার্মানিতে তো তাঁর জীবন ছিল ভবঘুরে এক যাযাবর এর মতন। সুইজারল্যান্ড থেকে ইতালি, তারপর সেখান থেকে আয়ারল্যান্ড – এই ভবঘুরে জীবনে কটা ব্যক্তিগত চিঠি বা নোটবুক তিনি যত্ন করে রাখতে পেরেছেন? সুতরাং তাঁর চলে যাওয়ার অর্থ হলো কোয়ান্টাম মেকানিক্স নামক তাত্ত্বিক বিপ্লবের একটা বড় অংশের ইতিহাস তিনি সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন। আর কোনদিন তাঁর নিজের মুখ থেকে শোনা যাবে না ব্যক্তিগত ধ্যান ধারণার কথা, সেই সময়ের কথা যখন এসেছিল পদার্থবিদ্যার বসন্তকাল, যখন সব ফুল একসঙ্গে ফুটে ছিল।* সে ফুলগুলি এখন একে একে ঝরে পড়ছে। আর সময় নেই, সুতরাং বিজ্ঞানের ইতিহাস এর অন্যতম গবেষক থমাস কুন, যিনি এ প্রকল্পের প্রধান তিনি এবং তার সহযোগীরা ব্যস্ত হয়ে উঠলেন।

খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল তখনো প্রায় একশো জনের মত প্রবীণ বিজ্ঞানী জীবিত এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। এদের মধ্যে রয়েছেন বিভিন্ন তাত্ত্বিক ও পরীক্ষক (experimenter) বিজ্ঞানী, যাঁরা সেসময় কোয়ান্টাম মেকানিক্সের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ভিত্তি নির্মাণের কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এখন কয়েক দশক পরে তাঁরা ছড়িয়ে আছেন বিভিন্ন দেশের শহর ও গ্রামে। কোপেনহেগেন থেকে পাওলো অল্টো, রোম থেকে নিউইয়র্ক, মস্কো, লন্ডন, প্যারিস, সান দিয়েগো, কিয়োটো ওয়ারশ এবং আরো অনেক জায়গায়।

পরিকল্পনা অনুসারে এবার কাজ শুরু হলো। পরিকল্পনাটা অবশ্য খুবই সহজ ও সাধারণ। প্রত্যেক প্রবীণ বিজ্ঞানীর সঙ্গে দেখা করো এবং কথোপকথন বা সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে সেই সময়ের বৈজ্ঞানিক, মানসিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, এমনকি দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে যত বেশি সম্ভব জানার চেষ্টা করো।

সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে সেই সময়ের ইতিহাস জানার চেষ্টা হবে তা তো বোঝা গেল কিন্তু সাক্ষাৎকার কেন? এর চেয়ে তো বরং প্রত্যেককে নিজের নিজের স্মৃতিকথা লিখতে বললেই অনেক বেশি সহজে, অনেক বেশি দ্রুত কাজটা হতো, তাই না?

কিন্তু না তা হতো না। প্রথমত, যাঁরা সাহিত্য জগতের মানুষ নন তাঁরা সহজে নিজেদের বক্তব্য প্রকাশ করার মত উপযুক্ত শব্দ ও ভাষা খুঁজে পান না। ৭০ বছর বয়সী নিলস বোর, রাদারফোর্ড সম্পর্কে স্মৃতিচারণা কখনোই লিখে উঠতে পারতেন না, যদি না ইয়ুর্গেন কালকার এর সাহায্যনা নিতেন। তাছাড়া লেখার মধ্যে অনেক কথা অস্পষ্ট ও রয়ে যায়। প্রশ্ন না করলে সে সব কথার মানে বোঝা যায় না। যেমন ধরা যাক, নিলস বোর যখন জানাচ্ছেন, “… that he had caught on to the quantum principle in the structure off the planetary atom back in the being off 1912 in Manchester”. তখন আসলে তিনি ঠিক কি বলতে চেয়েছেন? ঠিক কি ভেবেছিলেন তিনি? কেমন ছিল তাঁর তখনকার বৌদ্ধিক চেতনা? ১৯১২ সালে এসব প্রশ্ন কেউ তোলেনি। কিন্তু এই ১৯৬২ সালে এসে মনে হচ্ছে প্রশ্ন করার সময় এখনো পেরিয়ে যায়নি।

দ্বিতীয়তঃ লিখিত স্মৃতিচারণা অনেক কারণেই ভীষণ রকম নির্বাচিত ঘটনার সমষ্টি। এতে সবকিছু বিস্তৃতভাবে লেখা থাকে না। বেশিরভাগ সময়েই এখানে লেখকের সাফল্যের বিবরণ থাকে কিন্তু তার আগে তাকে কতবার ব্যর্থতার কানাগলিতে অসহায় ভাবে হাতড়ে বেড়াতে হয়েছে তা লেখা থাকেনা।

যেমন ষাটের দশকে লেখা একটি স্মৃতিচারণা মূলক গ্রন্থে হাইজেনবার্গ জানিয়েছেন কেমন করে মাত্র ২৬ বছর বয়সে তিনি পারমাণবিক বলবিদ্যার এক নতুন তত্ত্ব সৃষ্টি করেছিলেন (যা বর্তমানে ম্যাট্রিক্স মেকানিক্স নামে পরিচিত)। কিন্তু সেই তিনিই ১৯২৭ সালে কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার মূল চালিকা নীতি সম্পর্কিত এক আলোচনা সভায় ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন, সেকথা ওই বইতে লেখা নেই। অথচ ইতিহাস এ তথ্যও নথিবদ্ধ করতে চায়। প্রকৃত ইতিহাসকারকে নৈর্ব্যক্তিক উদাসীনতায় নথিভুক্ত করতে হবে প্রতিটি ঘটনা যা এক বৃহৎ ঘটনাপ্রবাহের অংশ। জানতে হবে সেই সব কিছু যা পরম সত্যের সন্ধানে রত এইসব প্রবীণ বিজ্ঞানীদের তৎকালীন জীবনের অংশ ছিল। সুতরাং তাঁদের জিজ্ঞেস করতে হবে আরো বিস্তারিত রূপে, আরো আরো বেশি  কিছু জানতে হবে তাঁদের কাছ থেকে যা তাঁরা ইতিমধ্যেই বলেছেন তাছাড়াও।

অতএব এই আর্কাইভ প্রকল্পের সদস্যরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এই প্রবীণ গবেষকদের উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন রেকর্ডার এবং একগুঁয়ে অনুসন্ধানকারীদের যথাবিহিত কৌতূহলের মুখোমুখি হতেই হবে।

তবে হ্যাঁ, প্রত্যেক বিজ্ঞানী কে আগে একসেট করে বিস্তারিত প্রশ্নাবলী পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল যাতে তাঁরা সাক্ষাৎকারে বসার আগে মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারেন,  নিজেকে গুছিয়ে রাখতে পারেন। এবং মজার কথা হল এই প্রশ্নাবলীটিকেও একটি সুসংবদ্ধ নিবন্ধ রূপে পড়া যেতে পারত। এবং এই উক্তিকে অতিরঞ্জন মনে করার কোন কারণ নেই। এ ব্যাপারে আমার সাক্ষী আরেক বিজ্ঞানের ঐতিহাসিক সোভিয়েত পদার্থবিদ ডি দানিন; তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানাচ্ছেন, “… these questionnaires are veritable treatise ( take my word for it, I have read many of them) “

এত কিছুর পর, সব প্রস্তুতি সমাধা হলে সাক্ষাৎকার পর্ব শুরু হলো, তাও ১৯৬২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির আগে নয়। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে মাত্র আড়াই বছরেরও কম সময়ে ১৮ মে ১৯৬৪ সালে ১৭৫ তম অর্থাৎ অন্তিম সাক্ষাৎকারটি নেওয়া সম্ভব হল।

সাক্ষাৎকারের সংখ্যা বিজ্ঞানীর সংখ্যার চেয়ে এত বেশি কেন? কারণ কোয়ান্টাম বিপ্লবের প্রধান স্থপতিদের ভূমিকা ভালোভাবে বুঝে নেওয়ার জন্য প্রত্যেকের বক্তব্য অন্যের সাপেক্ষে যাচাই করার প্রয়োজন ছিল এবং তার জন্য অনেকেরই একাধিক সাক্ষাৎকার নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। অন্য কথায় এঁদের প্রায় জেরা করা হয়েছিল। অবশ্যই কেউ এতে আপত্তি করেননি।

হাইজেনবার্গ তো বরং এ বিষয়ে সবচেয়ে দরাজ ছিলেন। তিনি একাই দিয়েছেন বারোটি সাক্ষাৎকার যার মোট সময় কুড়ি ঘণ্টারও বেশি এবং ৩০০ পাতার ওপর টাইপ করা ডকুমেন্ট। একইভাবে নিলস বোর দিয়েছেন পাঁচটি সাক্ষাৎকার, সাত ঘণ্টার কথোপকথন; পল ডিরাক দিয়েছেন পাঁচটি, ম্যাক্স বর্ন দিয়েছেন তিনটি, রবার্ট ওপেনহাইমার দিয়েছেন তিনটি এবং এভাবেই মোট সাক্ষাৎকারের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৭৫টিতে।

তবে থমাস কুন এবং তার সাথীরা কলকাতায় আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সঙ্গে দেখা করতে কেন আসেননি তা এক অজানা রহস্য। এলে নিঃসন্দেহে তাঁরা উপকৃত হতেন। আইনস্টাইন, মাদাম কুরি প্রমুখ অনেকের কথা আমাদের এই জাতীয় অধ্যাপকের কাজ থেকে তারা জানতে পারতেন।

যাইহোক, এরপর এসব গোছানোর পালা। সব সাক্ষাৎকার গুলি টাইপ করানো হলো অর্থাৎ আজকের দিনে যাকে বলে ট্রান্সক্রাইব করা। সব চিঠি এবং পাণ্ডুলিপি যা সংগ্রহ করা হয়েছিল তা থেকে মাইক্রোফিল্ম বানানো হলো। এরপর সমস্ত অরিজিনাল বা মূল কাগজপত্র তাদের প্রকৃত অধিকারীদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হল। তাঁরা বা তাঁদের উত্তরাধিকারীরা যতদিন ইচ্ছা এগুলো নিজেদের কাছে রেখে দিতে পারেন।

এবার এই অমূল্য ঐতিহাসিক দলিল সংরক্ষণের প্রশ্ন। কোথায় এবং রাখা হবে এগুলি? ঠিক হল এগুলি তিনটি জায়গায় আলাদা আলাদা করে সংরক্ষিত হবে। সেইমতো সব দলিলের তিনটি করে কপি বা প্রতিলিপি বানানো হল এবং সংরক্ষণের জন্য বেছে নেওয়া হলো-১)বার্কলে (ক্যালিফোর্নিয়া) বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার, ২)ফিলোসফিক্যাল সোসাইটি অফ আমেরিকা (ফিলাডেলফিয়া)এবং অবশ্যই ৩)ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে নিলস বোর ইনস্টিটিউট।

আজ এই দুই হাজার কুড়ি সালে এই আর্কাইভটি ডিজিটাল রূপেও সংরক্ষিত বিভিন্ন সার্ভারে ‘Archive for history of quantum physics’ নাম দিয়ে গুগল সার্চ করলেই এ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য ও লিংক পাওয়া যাবে। কিন্তু যদি মূল দলিলগুলো দেখতে চান যদি উপভোগ করতে চান সেই বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিদের সান্নিধ্য তাহলে আপনাকে যেতে হবে মূল অভিলেখাগারগুলির কোন একটিতে। সারি দিয়ে সাজানো স্টিল আলমারিগুলির হাতল ধরে টান দিলেই দেখতে পাবেন আলফাবেটিক্যাল অর্ডারে সাজানো ফাইলগুলো। কথা বলে উঠবেন এনরিকো ফের্মির বন্ধু ও সহকর্মী এডোরাডো আমালদি থেকে মেসন কণার আবিষ্কর্তা জাপানি বিজ্ঞানী হিদেকি ইউকাওয়া। চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠবেন বোর, ডিরাক, হাইজেনবার্গ, আইনস্টাইন প্রমুখ।

এই অভিলেখাগার এর নাম হতেই পারত ফরাসি ঔপন্যাসিক মার্সেল প্রাউস্ট এর অন্যতম সেরা সৃষ্টির নাম অনুসারে “A La Recherche Du Temps Perdu” যার সবচেয়ে কাছাকাছি বাংলা হতে পারে “হারিয়ে যাওয়া সময় এর সন্ধান”।

কিন্তু এই অবিস্মরণীয় অভিলেখাগার এর মূল স্থপতি যাঁরা, আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে প্রায় শত জন প্রবীণ বিজ্ঞানীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন যাঁরা, সেই সংগ্রাহক এবং ঐতিহাসিকদের অভিজ্ঞতাও কম রোমাঞ্চকর নয়। তাঁরা বরং নিজেদের এই কর্মকাণ্ডকে এক অন্য নামে ডাকতেন, “The race for the time not yet lost”।

তাঁদের নাটকীয় অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে দুটি কাহিনী বরং বর্ণনা করে যবনিকাপাত করা যাক।

কোয়ান্টাম বিপ্লবের যে সময়টুকু ইতিহাসের ঝড়ে তখনো হারিয়ে যায়নি সেসময়ের ইতিহাসকে নথিবদ্ধ করার, সেই অবিস্মরণীয় সময়কে খুঁজে বেড়ানোর প্রয়াস প্রায় আড়াই বছর ধরে চলেছিল তা আমরা আগেই দেখেছি। এও দেখেছি যে শুরু হওয়ার আগেই এ প্রকল্প কেমন বিপর্যস্ত হয়েছিল শ্রোয়েডিঙ্গারের অকাল মৃত্যুর কারণে। প্রকল্প চলাকালীনও এমন বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়েছিল থমাস কুন ও তাঁর সঙ্গীদের। সে ঘটনাই এবার জানবো আমরা।

প্রকল্পের ১৭৫টি সাক্ষাৎকারের মধ্যে ১৩৩টি সম্পন্ন হয় থমাস কুনের প্রত্যক্ষ পরিচালনায়। তিনি এই প্রকল্পের মধ্যে লুকিয়ে থাকা বিয়োগান্তক সুরটি সবচেয়ে বেশি করে অনুভব করেছিলেন ১৯৬২ সালের নভেম্বর মাসে।

তাঁরা তখন সবে প্রকল্পের ইউরোপীয় বছরটি শুরু করেছেন। নিলস বোর নিজে থমাস কুন এবং তাঁর সঙ্গীদের ডেকে পাঠালেন কোপেনহেগেনে তাঁদের প্রধান কেন্দ্র স্থাপনের জন্য। গবেষকরা সানন্দে সে প্রস্তাব মেনে নিলেন এবং কাজ শুরু করলেন। বোরের সবচেয়ে পুরনো সহকারী অস্কার ক্লেইন এর দেওয়া ছ’টি সাক্ষাৎকারের প্রথমটি নেওয়া হয়ে গেল। জার্মানিতে অবসর জীবনযাপনরত ম্যাক্স বর্ণের সাক্ষাৎকার (আরেকটি আগ্রহোদ্দীপক কাহিনী) নেওয়া হল, প্যারিসে ফরাসি পদার্থবিদ লুই ডি ব্রগলির সঙ্গে সাক্ষাৎকার নির্ধারিত হল, এমনকি ভিয়েনাতে শ্রোয়েডিঙ্গারের বিধবা পত্নীর সঙ্গে যোগাযোগ হলো।

দেখতে দেখতে অক্টোবর মাস এসে পড়ল। ৭ অক্টোবর, ১৯৬২প্রকল্পের সদস্যরা নিলস বোরকে তাঁর সাতাত্তরতম জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালেন এবং তার তিন সপ্তাহের মধ্যে কোয়ান্টাম ফিজিক্সের  অন্যতম পিতৃপুরুষ প্রতিম এই মহান বিজ্ঞানীর সাক্ষাৎকার নেওয়া শুরু হল।

রেকর্ডারের চাকা ঘুরতে শুরু করলো এবং বোর বলতে শুরু করলেন পদার্থের অজানা রহস্য সন্ধানে তাঁর দীর্ঘ যাত্রার কথা। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগে ঐতিহাসিকরা জানতে চাইছিলেন তাঁর জীবনের গোড়ার দিকের কথা; তাঁর ছোটবেলার কথা; তাঁর কলেজ জীবনের কথা। বিজ্ঞানী যুগান্তর আনয়নকারী প্রত্যেক বিজ্ঞানীর বেড়ে ওঠার, পরিণত হয়ে ওঠার পথ ও ধারা দুই-ই অতি বিচিত্র এবং আগ্রহ উদ্রেককারী হয়। সুতরাং ঐতিহাসিকরা অত্যন্ত আনন্দিত ছিলেন স্বয়ং নিলস বোরের ভাষ্যে তাঁর জীবন কাহিনী শুনতে পেরে। এ কাহিনী আর কেউ এর চেয়ে ভালো করে বলতে পারতো না। (এখানে একটি ব্যক্তিগত কথা উল্লেখ না করে পারছি না। এ লেখা যারা পড়ছেন সেই পাঠকদের কথা জানিনা কিন্তু এ ঘটনা লেখার সময় আমি নিজে অন্তত থমাস কুন এবং তাঁর সহকর্মীদের বিরল সৌভাগ্য জেনে ঈর্ষায় জ্বলে পুড়ে যাচ্ছি।)

নিলস বোর বলছেন তাঁর ছাত্রজীবনের কথা। স্মৃতিচারণ করছেন যে ছাত্রজীবনে তিনি কিরকম উদগ্রীব ছিলেন দর্শন শাস্ত্রের উপর কিছু লেখার জন্য! বস্তুত তিনি ইচ্ছাশক্তির স্বাধীনতা বিষয়টির কোন গাণিতিক সমাধান খুঁজে পেতে উৎসুক ছিলেন।

সরল ভাষায় লিখলে সমস্যাটি খানিকটা এইরকম; যদি প্রকৃতিতে সবই পূর্বনির্ধারিত হয় এবং মানুষ কি করবে তা যদি স্বাধীনভাবে নির্বাচন করতে না পারে তাহলে নীতি আদর্শ বিষয়ে প্রশ্ন তোলা অর্থহীন। অন্যদিকে ইচ্ছার স্বাধীনতা যদি থাকে তাহলে ক্লাসিক্যাল ডিটারমিনিজম, যে তত্ত্ব অনুসারে প্রকৃতিতে সবই নিশ্চিত পূর্ব নির্ধারণের কারণেই সংঘটিত হয়, তার সঙ্গে এই স্বাধীন ইচ্ছাকে মেলানো যাবে কেমন করে?

সাতাত্তর বছর বয়সী বিজ্ঞানী স্মিত হাস্য সহকারে ঐতিহাসিকদের জানালেন যে তিনি গণিতের সাহায্যে এই প্রাচীন দার্শনিক সমস্যাটির সমাধান করার বিষয়ে বদ্ধপরিকর ছিলেন। এক কলেজছাত্রের পক্ষে এমন উত্তুঙ্গ লক্ষ্য হয়তো উন্নাসিকতা মনে হতে পারে। কিন্তু এখন আমরা জানি যে ওই কলেজছাত্রটি নিলস বোর, যিনি পরবর্তীকালে ক্লাসিক্যাল ডিটারমিনিজম-কে সিংহাসনচ্যুত করতে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করবেন। অন্য কথায় মহাবিশ্বকে রক্ষা করবেন পূর্বনির্ধারিত ভবিষ্যতে উপনীত হওয়ার থেকে। মানুষকে ফিরিয়ে দেবেন তার মূল্যবোধ ও ন্যায়বোধের গৌরব।

প্রবীণ বিজ্ঞানীর স্মৃতিচারণা ও ভাষ্যে মন্ত্রমুগ্ধ বিজ্ঞানভিক্ষু ঐতিহাসিকের দল আরো, আরো জানতে চাইছেন প্রশ্নের পর প্রশ্ন করছেন আর প্রবীণ বিজ্ঞান তপস্বী হাতে তুলে নিয়েছেন চক্খড়ি, ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বক্তব্য মূর্ত করে তুলছেন ছবির মাধ্যমে, গাণিতিক সমীকরণ ও তার ব্যাখ্যায়। ঘুরে চলেছে রেকর্ডার, বন্দী করছে এক অমূল্য ঐতিহাসিক দলিল।

আর্কাইভ প্রকল্পের গবেষকদের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুসারে সাক্ষাতকারের মাধ্যমে যে সমস্ত ঘটনাবলি জানতে চাওয়া হবে তার সময়সীমা ছিল ত্রিশের দশকের গোড়া অবধি কারণ কোয়ান্টাম বিপ্লবের ঘাত প্রতিঘাত ভরা অধ্যায়টি মূলত ওই সময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ১৯৩০ সালে সলভে কনফারেন্সে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সঙ্গে উদ্দেশ্যের বাস্তবতা বিষয়ে আইনস্টাইনের প্রশ্ন ও বোর কর্তৃক তার উত্তর প্রদানই মোটামুটি বোর-আইনস্টাইন দীর্ঘ বিতর্কের অন্তিম চরণ।

পদার্থবিদ্যার উপর ষষ্ঠ সলভয় সম্মেলন, ব্রাসেলস, ১৯৩০

বাম থেকে ডানে দাঁড়িয়ে – ই হার্জেন, জে হেনরিওট, জে ভার্চাফেল্ট, সি ম্যানিব্যাক, এ কটন, জে ইরেরে, ও স্টার্ন, এ পিকার্ড, ডব্লু জেরলাচ, সি ডারউইন, পি.এ.এম. ডিরাক, ই বাউর, পি কাপিতসা, এল ব্রিলুইন, এইচ এ ক্রেমারস, পি দেবি, ডব্লিউ পাউলি, জে ডরফম্যান, জে এইচ ভ্যান ভ্লেক, ই ফার্মি, ডব্লিউ হেইসেনবার্গ

বাম থেকে ডানে বসা – থ ডি ডন্ডার, পি জিমেন, পি ওয়েইস, এ সোমারফিল্ড, এম কুরি, পি ল্যাঙ্গভিন, এ আইনস্টাইন, ও রিচার্ডসন, বি ক্যাবেরা, এন বোহর, ডব্লিউ জে ডি হাস

১৯৩০-এর সলভে কনফারেন্স যেখানে কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়ে বোর আইনস্টাইন বিতর্ক চরমে ওঠে এবং আইনস্টাইন থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে কোয়ান্টাম মেকানিক্স-এর অসারতা প্রমাণের চেষ্টা করলেও বোর শেষ পর্যন্ত আইনস্টাইনকেই ভুল প্রমাণ করে দেন। ছবিতে সেরকমই একটি মুহূর্ত ধরা পড়েছে যখন বিংশ শতাব্দীর দুই অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষা বিজ্ঞানের সবচেয়ে জটিল ধাঁধা নিয়ে আলোচনায় মগ্ন। ছবিটি তুলেছেন আরেক বিশ্ববিশ্রুত বিজ্ঞানী পল এরেনফেস্ট।

কিন্তু প্রকল্পের গবেষকদের কৌতূহল হল বাঁধ মানছিল না। ক্রমাগত প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে তাঁরা এই প্রবীণ বিজ্ঞানীকে ক্লান্ত করে ফেলছিলেন, যার ফলশ্রুতি হলো, চতুর্থ সাক্ষাৎকারের পরেও বোর কেবলমাত্র বিশের দশকে অবধিই পৌঁছতে পেরেছিলেন। শেষ অবধি ক্লান্ত বিজ্ঞানঋষি সবিনয়ে বিশ্রাম চেয়েছেন তবে যেহেতু কোয়ান্টাম বিপ্লবের মূল ঘটনাবলীতে পৌঁছানো এখনো বাকি তাই তিনি সঙ্গে সঙ্গেই জানিয়েছেন যে এ বিশ্রাম হবে স্বল্পসময়ের।

১৭ই নভেম্বর, ১৯৬২ পূর্ব প্রতিশ্রুতি মত বোর তাঁর পঞ্চম সাক্ষাৎকারটি দিতে শুরু করলেন। (বিজ্ঞান ও ইতিহাসের প্রেমিকরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যুগসন্ধিক্ষণে আমরা দাঁড়িয়ে!) বোর পুনরায় সেই ভুলে যাওয়ার সময় এর সন্ধানে নিজের অতীত স্মৃতি হাতড়াতে শুরু করলেন। উঠে এলো আইনস্টাইনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ বিতর্কের শুরুর প্রসঙ্গ। এক সময় এই পঞ্চম সাক্ষাৎকারটিও শেষ হলো। কেমন যেন প্রতীকিভাবেই বোর সাক্ষাৎকার শেষ করলেন তার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হ্যারল্ড হেফডিং-এর প্রসঙ্গ তুলে; যিনি প্রায়শই নিজের অফিসঘরে বসানো যৌবনের গ্রিক দেবী ‘হিবি’-র মূর্তির দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করতেন, “দেবী কি আমার ওপর আদৌ সন্তুষ্ট হয়েছেন?”

কেন সাক্ষাৎকারের শেষে বোর সহসা এ প্রসঙ্গ তুললেন? প্রকৃতির অজানা রহস্য উন্মোচন করে আমাদের জ্ঞান বৃদ্ধিতে এক অন্যতম প্রধান ভূমিকা নিয়েছেন যিনি সেই প্রবীণ ঋষিপ্রতিম বিজ্ঞানী কি জানতে চাইছিলেন যে নবীন প্রজন্মের শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা তিনি পেয়েছেন কিনা? (নিলস বোরও এ বিষয়ে সন্দিহান? আশ্চর্য!)

এ প্রশ্নের উত্তর আর কোনদিন জানা যাবে না। কারণ পরদিন অর্থাৎ ১৮ই নভেম্বর ১৯৬২, বোর এর মাথায় হঠাৎ যন্ত্রণা শুরু হয়, যন্ত্রণা বাড়তে থাকায় তিনি বিশ্রাম নেবার জন্য ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লেন এবং সমাহিত চিত্তে নিঃশব্দে ইহলোক ত্যাগ করলেন। বিজ্ঞানের জগতের আর এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের কর্মময় জীবনের অবসান হলো। প্রকল্পের গবেষকরা আবার এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হলেন। এরপর একমাত্র বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ গুলো ছাড়া শোকে মুহ্যমান ইতিহাসবিদদের কাছে আর কোন সম্বল রইল না যার সাহায্যে যে কথা বোর জানাতে সময় পাননি তা জানার।

সৌভাগ্যবশত তিনি অনেক কিছুই লিখে রেখে গিয়েছিলেন। এছাড়াও প্রায় ছয় হাজারের বেশি চিঠিপত্র ছিল যা বৈজ্ঞানিক আলাপ-আলোচনা এবং তার প্রথম দিকের গবেষণাপত্র, লেকচার নোটস ও ১৯২২ সালের নোবেল লেকচার। সব মিলিয়ে এক বৃহৎ সংগ্রহ।

তবুও এ যথেষ্ট নয়। প্রকল্পের গবেষকরা জানতেন ত্রিশের দশকে লেখা নিলস বোরের নাৎসী বিরোধী দলিল ও কাগজপত্র তাঁরা কোনদিনই পাবেন না। কেন? কারণ ১৯৪০ নাগাদ জার্মানি ডেনমার্ক অধিকার করলে বোর স্বহস্তে সে সব পুড়িয়ে ফেলেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েছিলেন আরো অন্য অনেক বিজ্ঞানীর মতই আমেরিকায় পালিয়ে যেতে।

যদিও ওই দলিলপত্রগুলো কোয়ান্টাম বিপ্লবের সময়সীমার মধ্যে পড়ে না, তবু ওগুলো প্রয়োজনীয় কারণ ওগুলো ১৯৩৩ থেকে ১৯৪০ এরমধ্যে বৈজ্ঞানিক ধারণার পারস্পরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ব্যক্তি জীবনে কি মর্ম বিদারক দুর্ভাগ্য নিয়ে এসেছিল তার অকৃত্রিম প্রতিফলন। সুতরাং একে এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবেই ধরতে হবে। ওগুলোর অভাব পূরণ করতে পারতেন যিনি, তিনি আর নেই।

রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে ওঠা ইতিহাসের ঝড় আর বৈজ্ঞানিক ধারণার বিমূর্ত সংঘর্ষের মধ্যে জটিল মিশ্রণ মানুষের হৃদয়ে কি গভীর ক্ষত চিহ্ন রেখে গেছে তা প্রকল্পের গবেষকরা উপলব্ধি করেছেন যখন তাঁরা ইউরোপীয় প্রবীণ বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকার নিতে গেছেন। সেই অস্থির সময়ের হৃদয়বিদারক আর্তি তাঁদের বুক চিরে বারংবার বেরিয়ে এসেছে যাঁরা সেই যন্ত্রণা ভোগ করেছেন; এমনকি সে মানুষটি অন্য জগতের চিন্তায় মগ্ন মহাবিশ্বের সুগভীর সত্যের সন্ধানে রত আপন ভোলা বিজ্ঞানী হলেও।

আশি বছর বয়স্ক বৃদ্ধ ম্যাক্স বর্ণের সাক্ষাৎকার নেওয়ার আগে থমাস কুন ও তাঁর সঙ্গীরা সঙ্গত কারণেই ঠিক করেছিলেন গটিংয়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের এই প্রাক্তন প্রধানের সাক্ষাৎকারে তাঁর পুরনো ছাত্র পাস্কিউল জর্ডানকে আমন্ত্রণ জানাবেন। তিনি ম্যাক্স বর্ণের চেয়ে প্রায় বিশ বছরের ছোট এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের গাণিতিক ভিত্তি নির্মাণ কালের পরিস্থিতি ও ঘটনাবলির স্মৃতিচারণে তাঁর সাক্ষ্য অশীতিপর ম্যাক্স বর্ণের তুলনায় অধিক নির্ভরযোগ্য হবে বলেই প্রকল্পের কর্ণধাররা মনে করেছিলেন। এছাড়া তিনি এ সময় অর্থাৎ সাক্ষাৎকারের সময় হামবুর্গে প্রফেসর ছিলেন এবং সেখান তাঁর পক্ষে উপস্থিত হওয়াও সুবিধাজনক ছিল।

কিন্তু বাস্তবে এ পরিকল্পনা সফল হলো না। জর্ডানের নাম শোনামাত্র বর্ন এককথায় তাঁর এই প্রাক্তন ছাত্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ নাকচ করে দিলেন। বর্নের এই রাগী প্রত্যাখ্যানের কারণ আর কিছুই না, তিরিশের দশকে জর্ডানের নাৎসি ভাবধারাকে সমর্থন এবং যুদ্ধের পরে পঞ্চাশের দশকে জার্মান জাতীয়তাবাদের (অন্য কথায় নব্য নাৎসিবাদ) পুনরুত্থানে জর্ডানের সজ্ঞান প্রয়াস বর্ন মেনে নিতে পারেননি।

বংশানুক্রমে জার্মানির আদিবাসিন্দা বর্ন যে শুধুমাত্র ইহুদি হওয়ার কারণে নিজ ভূমে পরবাসী বলে চিহ্নিত হয়েছিলেন। আশ্রয়হীন, দেশহীন এক বিতাড়িত ভবঘুরের জীবনযাপন করতে হয়েছে তাঁকে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও। তিনি কেমন করে নাৎসি বা ফ্যাসিবাদের সমর্থকের সঙ্গে একত্রে বসেন? থমাস কুনকে বর্ন সচেতন করে বলেছিলেন যে তাঁর স্ত্রী জর্ডান সম্পর্কে আরো স্পর্শকাতর, সুতরাং “…that blockhead pascual would never be allowed to cross their doorstep …” ঠিক এই ভাষায় বর্ন নিজের সিদ্ধান্ত থমাস কুনকে জানিয়ে দিয়েছিলেন।

ঐতিহাসিকরা বাধ্য হয়েছিলেন বর্ণের আরেক বিখ্যাত ছাত্র ফ্রেডরিক হুন্ডকে (হুন্ডস রুলখ্যাত; বারো ক্লাসে বিজ্ঞান পড়েছেন যাঁরা, তাঁরা নিশ্চয়ই মনে করতে পারছেন) সাক্ষাৎকারে আমন্ত্রণ জানাতে। যদিও তিনি নিজে বর্ণের কাছাকাছি বয়সী হওয়ার কারণে সাহায্যকারী রূপে যথাযথ ছিলেন না কিন্তু অন্য উপায়ে আর ছিলনা।

সুতরাং হারানো সময়ের সন্ধানে বেরিয়ে বিজ্ঞানভিক্ষু ঐতিহাসিকরা এমন এক ঘটনার সাক্ষী হলেন যা তাঁদের নিখাদ সারস্বত সংগ্রহে মানবিকতার অপ্রত্যাশিত অশুদ্ধি মিশিয়ে দিল। কোয়ান্টাম বিপ্লবের সামাজিক ও নৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে তাঁরা এমন কিছু জানলেন যা তাঁদের আগের ধারণা সম্পূর্ণ পাল্টে দিলো।

বিমূর্ত বিজ্ঞান ও তার সাধকরা মাটির পৃথিবী থেকে দূরে এক গজদন্তমিনারে বাস করেন, এই পূর্বসংস্কার যে ভুল তা প্রমাণিত হল। সেই মিনারের ফটক ইতিহাসের দাবির সামনে যে শুধু গুঁড়িয়ে গেল তাই নয়, দেখা গেল সেই মিনারের বাসিন্দা তথাকথিত অন্য জগতের মানুষরাও আদতে আমাদের মতই সাধারণ মানুষ। আমাদের মতই তারাও শান্তি চান, সকল মানুষের, মানব সভ্যতার উন্নতি কামনা করেন। গভীর প্রত্যয়ের সঙ্গে চান এ পৃথিবী আরো মানবিক হয়ে উঠুক এবং সেই লক্ষ্যে নিজেদের প্রজ্ঞা ব্যবহার করেন। হ্যাঁ, জর্ডানের মত ব্যতিক্রমরাও এখানে উপস্থিত; কিন্তু আসার কথা যে তারা নিতান্তই এক অতি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র।

বলা হয় ইতিহাস পড়ার বা চর্চা করার অন্যতম উদ্দেশ্য হল অতীতে ঘটে যাওয়া ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং ভবিষ্যতে তেমন ভুল না করা। আমরা তেমনটা করতে পারব, নাকি ভবিষ্যৎ কাল আমাদের সম্পর্কে আলোচনার সময় বলবে, “ইতিহাস থেকে আমরা এই শিক্ষাই পেলাম যে, এরা ইতিহাস থেকে কোন শিক্ষাই নেয়নি”; তা নির্ধারণ করার সুযোগ কিন্তু আমাদেরই হাতে।

* পাদটীকা: ‘পদার্থবিদ্যার বসন্তকাল’-এ প্রসঙ্গক্রমে এল আই পোনোমারেভ তাঁর দ্য কোয়ান্টাম ডাইস বইতে নন-ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির যুগ্ম আবিষ্কর্তা জানোস বলাই-এর পিতার বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন, “… when spring comes, all the violets burst into bloom all the same time.”

তথ্যসূত্র:

১) D. Danin, Probalilities of the quantum world by: Mir Publishers, Moscow

২) L.I. Ponomarev, The quantum dice by: Mir Publishers, Moscow

৩) Manjit Kumar, Quantum: Hachette India

৪) Max Born, Atomic Physics: Dover publications

মন্তব্য তালিকা - “হারিয়ে যাওয়া সময়ের সন্ধানে : ইতিহাস খোঁজার ইতিহাস”

  1. অপূর্ব। রোমহর্ষক অনেক কিছু জানলাম। ম্যাক্স বর্ণের ফ্যাসীবাদ বিরোধী ভূমিকা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আর একটি অজানা তথ্য।

  2. অনেক আশা নিয়ে পড়া শুরু ক’রেছিলাম, কিন্তু বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিজ্ঞানের ‘ব’ ও পেলামনা, কোয়ান্টাম থিওরির ন্যুনতম ব্যাখ্যা কোন বিজ্ঞানীর মুখনিঃসৃত আশা করেছিলাম, ছিটেফোঁটাও পেলাম না।

    1. শুভ্র কান্তি বাবু, ধৈর্য্য সহকারে প্রবন্ধটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। আপনার আশা পূরণ না হওয়াতে দুঃখিত। তবে এটি কোয়ান্টাম মেকানিকসের ইতিহাস বা ব্যাখামূলক লেখা নয় সেকথা প্রথমেই স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। এটি ইতিহাস সংরক্ষণের ইতিহাস। প্রবন্ধটির নামও সেই ইঙ্গিতবাহী। কোয়ান্টাম মেকানিকস্ এক বৃহৎ ও জটিল এবং কিছু  ক্ষেত্রে বোধের অগম্য এক বিষয়। এতোটাই যে এর অন্যতম নির্মাতা গবেষক মারে গেলম্যান বলেছেন ” এই অদ্ভুত রহস্যময় তত্ত্ব আমরা বুঝি না, কেবল এর ব্যবহার জানি।” যেখানে এ তত্ত্বের অন্যতম গবেষকরাই হতবুদ্ধি সেখানে আমি কি নতুন লিখতে পারি? তবু  যদি আপনারা পাশে থাকেন তাহলে ভবিষ্যতে কখনও এর ইতিহাস এবং সেসূত্রে বিজ্ঞানীদের ব্যাখা সম্পর্কে আলোচনার চেষ্টা করবো। ধন্যবাদ নেবেন।

  3. ভালো লাগলো। সহজ ভাষায় কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান, আপেক্ষিকতা র উপর লেখা দিন। যা পড়ে আমার মত এক সাধারণ লোক একটা ধারণা করতে পারে।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।