সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এক স্বাধীন ভারত সরকার আর মুছে যাওয়া অভ্যুত্থানের গল্প

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এক স্বাধীন ভারত সরকার আর মুছে যাওয়া অভ্যুত্থানের গল্প

বহ্নিহোত্রী হাজরা

ফেব্রুয়ারী ২৭, ২০২১ ৪০১

প্রথম মহাযুদ্ধের সময়ে তৈরি হয়েছিল ভারতের স্বাধীন সরকার। তথ্যটা চমকে ওঠার মতোই আর সেটা কখনও কখনও ইতিহাস বইয়ের পাতায় ভুল করে জায়গা পেয়ে গেলেও এক লাইনের বেশি নেয়নি। তবে হ্যাঁ, আজাদ হিন্দ সরকারের মতন এই সরকারও তৈরি হয়েছিল ভারতের মাটিতে নয়, বিদেশে। কাবুলে তৈরি হয় এই সরকার। সেই সরকার প্রসঙ্গে জানবার আগে ‘বার্লিন কমিটি’ সম্পর্কে দু’চার কথা জেনে নিলে আমাদের একটু সুবিধা হবে। কেন? কারণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সুযোগে ব্রিটিশদের কবল থেকে ভারতকে স্বাধীন করার স্বপ্ন অনেক বিপ্লবী দেখেছিলেন। মেতে উঠেছিলেন সেই চেষ্টাতে। বাঘা যতীন এবং রাসবিহারীর কথা আমরা খানিকটা জানি। তার মধ্যে বিদেশে প্রবাসী বিপ্লবীদের ভূমিকাও ছিল উল্লেখযোগ্য। আর বার্লিন কমিটি ছিল খোদ জার্মানিতে। যে জার্মানি ছিল ব্রিটেনের প্রধান শত্রু প্রথম বিশ্বযুদ্ধে। ফলে কৌশলগত কারণেই প্রবাসী বিপ্লবীদের একটা অংশ ঘাঁটি গাড়েন বার্লিনে; গড়ে তোলেন বার্লিন কমিটি। আসুন দেখা যাক কী পরিকল্পনা বা কর্মকাণ্ড ছিল এই বার্লিন কমিটির, স্বাধীন সরকারের সঙ্গে এই কমিটির সম্পর্ক ঠিক কেমন ছিল?

প্রবাসে, দেশের গন্ধ

১৯১৪ সালে বার্লিন কমিটি গড়ে ওঠে প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবী এবং ছাত্রদের হাত ধরে। তবে বিদেশে বিপ্লবী  কেন্দ্র স্থাপনের চেষ্টা কিন্তু সেই প্রথম নয়। এর আগেই শ্যামজি কৃষ্ণবর্মা ১৯০৫ সালে খোদ ইংল্যান্ডে বসে গড়ে তুলেছিলেন ‘ইন্ডিয়া হাউজ’-এর মতো সংগঠন। এছাড়া প্যারিসে ভারতীয়দের আরেকটি বিপ্লবী কেন্দ্র গড়ে ওঠে। সেখানে শ্রীমতী কামার সঙ্গে সর্দার সিংজি রাওজি রানা ছিলেন প্রধান উদ্যোক্তা। লন্ডনে বিপ্লবী মদন লাল ধিংরা, কার্জন উইলিকে হত্যা করায় সেখানকার বিপ্লবী নেতৃত্ব খানিক ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। গ্রেপ্তার এড়াতে বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় চলে আসেন প্যারিসে। এরপর বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন অনুমান করে ১৯১৪ সালের এপ্রিলে বীরেন্দ্রনাথ জার্মানি চলে যান। মূলত  বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্যের উদ্যোগে গড়ে ওঠে বার্লিন কমিটি। কমিটির সেক্রেটারিও ছিলেন বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। জার্মান বিদেশ দপ্তরও আগ্রহ দেখায় প্রবাসী ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং ‘প্যান-ইস্লামিস্ট’-দের সাহায্য করার ব্যাপারে। এই প্যান ইস্লামিস্টদের সম্পর্কে দু’চার কথা বলে না নিলে বিষয়টি অস্পষ্ট থেকে যাবে। ‘প্যান ইস্লামিজম’ এমন এক আদর্শ, যেখানে বিশ্বজুড়ে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের ঐক্যের কথা বলা হয়। এই আদর্শের প্রচারকরা মনে করতেন আল্লার পবিত্র জমি দখল করে রেখেছে ইংরেজদের মতো সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। ফলে ভারতের প্যান ইস্লামিস্ট-রা ব্রিটিশদেরকে উৎখাত করে, সেই জমিকে মুক্ত করার স্বপ্ন দেখতেন।  জার্মান বিদেশ দপ্তরের তরফে ম্যাক্স ভন ওপেনহাইম ছিলেন বার্লিন কমিটির পক্ষ থেকে ভারতীয় ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামকে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগে। ক্রমে জিতেন্দ্রনাথ লাহিড়ী, ভুপেন্দ্রনাথ দত্ত, তারকনাথ দাস, লালা হরদয়াল, বরকতুল্লাহ, হেরম্বলাল গুপ্ত সহ অনেকেই যোগ দেন এই কমিটিতে।

বার্লিন কমিটি আমেরিকার গদর পার্টির সঙ্গে যেমন যোগাযোগ রাখে, তেমনি আবার বাগদাদ, সুয়েজ খাল, পারস্য এবং আফগানিস্তানে চারটি মিশন পাঠায়। বিপ্লবী কেন্দ্র স্থাপনের চেষ্টা করে বিভিন্ন প্রান্তে। এঁদের পাঠানো আফগান মিশনের অঙ্গ হিসাবেই গড়ে ওঠে কাবুলের স্বাধীন সরকার। কাবুলের সেই সরকার সম্পর্কে একটা ধারণা পেতে আমাদের অবশ্যই একটু জানতে হবে সেই সরকারের প্রধান কাণ্ডারিদের জীবন সম্পর্কে দু-চার কথা। আসুন, জেনে নিই।

রাজা মহেন্দ্রপ্রতাপের কথা

জার্মান সম্রাট কাইজারের আশীর্বাদধন্য মহেন্দ্রপ্রতাপ কিন্তু হাথ্রাসের রাজ পরিবারের ছেলে। কি আপনাদের হাথ্রাস নামটা চেনা লাগছে কি? মনে পড়ে যাচ্ছে  হাথ্রাসের  ক্ষতবিক্ষত দলিত মেয়েটির দেহ? এই তো সেদিনের কথা। এমনই এক নারকীয় ক্ষমতা প্রদর্শন যে ধর্ষণ আর খুনেই শেষ হল না অত্যাচার,  নির্যাতিতার পুরো পরিবারকে পুলিশ বন্দী বানিয়ে রাখল ,মোবাইল কেড়ে নেওয়া হল, পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হল না এমনকি মিডিয়াকেও। সে আমাদের সকলের জন্য লজ্জার এক নারকীয় অধ্যায়। সে এক ভিন্ন প্রসঙ্গ। তো ১ ডিসেম্বর ১৮৮৬ তে হাথ্রাসের রাজ পরিবারে জন্ম মহেন্দ্রপ্রতাপের। আলীগড় অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজে পড়াশোনা করেন তিনি। গ্র্যাজুয়েশান শেষ না করেই কলেজ ছেড়ে দেন। কংগ্রেস অধিবেশনে যোগ দিতে প্রতাপ ১৯০৬ সালে কলকাতায় গিয়ে স্বদেশী আন্দোলনে জড়িত বেশ কয়েকজন  নেতার সাথে দেখা করেছিলেন, স্বদেশী পণ্য ও স্থানীয় কারিগর দিয়ে ক্ষুদ্র শিল্পের প্রচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সামাজিক অসাম্য, বিশেষত অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার।  দাদাভাই নওরোজি, বাল গঙ্গাধর তিলক, মহারাজা বরোদা এবং বিপিন চন্দ্র পালের বক্তৃতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে স্বদেশী আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন। তিনি তাঁর রাজ্যে বিদেশি তৈরি পোশাক পোড়াতে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। ১৯১৪ সালের ২০ ডিসেম্বর প্রতাপ বাইরের সমর্থন পেয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের খপ্পর থেকে ভারতকে মুক্ত করার ইচ্ছায় তৃতীয়বারের মতো ভারত ত্যাগ করেন। ১৯১৫ সালের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডে তাঁর উপস্থিতি সম্পর্কে জানতে পেরে সদ্য প্রতিষ্ঠিত বার্লিন কমিটির ‘চট্টো’ ওরফে বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় প্রতাপকে বার্লিনে আমন্ত্রিত করার জন্য জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রকের ভন জিম্মারমনকে অনুরোধ করেছিলেন। ইতিমধ্যে পার্টির বিপ্লবী দাদা চানজি কার্স্পের নেতৃত্বে আফগানিস্তানে প্রথম মিশন পাঠিয়েছিলেন চট্টো। মহেন্দ্রপ্রতাপকে সামনে রেখে পরবর্তী মিশন পাঠানোর পরিকল্পনা করেন বীরেন্দ্রনাথ। ১০ এপ্রিল ১৯১৫ তে বার্লিন ছেড়ে ভিয়েনা, বুডাপেস্ট, সোফিয়া হয়ে ১ সপ্তাহের মধ্যে মহেন্দ্রপ্রতাপ পৌঁছলেন কনস্টান্টিনোপল। সেখানেই তুরস্কের সুলতানের সঙ্গে দেখা হয় তাঁর। এনভার পাশা এবং তালাত পাশার সঙ্গেও সাক্ষাৎ সেখানে। এরপর জার্মান সম্রাটের স্বাক্ষর করা চিঠি নিয়ে তিনি পৌঁছন আফগানিস্তানের আমীরের কাছে।   

কনস্টান্টিনোপল থেকে আফগান সীমান্ত প্রদেশ হেরাট পৌঁছনো সহজ ছিল না মোটেই। পথে বাধা বিস্তর। এমনও দিন গেছে একফোঁটা জল বা খাবার মেলেনি। তাতে দুঃখ নেই। অ্যাডভেঞ্চারের মধ্যে আছে রোমাঞ্চ। যত কষ্ট সহ্য করতে হোক না কেন। তবে আরেকটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটল পার্সিয়াতে। মহেন্দ্রপ্রতাপের ব্যক্তিগত লাগেজ সেখানে খোয়া গেল। তাতেও খেদ নেই। আসল বিপত্তিটা হল যখন জার্মান প্রতিনিধি হের ভন হেন্টিগ ইচ্ছাকৃতভাবেই ২৬ টির মধ্যে ২৩ টি জার্মান সরকারী চিঠি পার্সিয়াতে আটকে দিলেন। সে চিঠি আর কোনদিনই আফগানিস্তানে পৌঁছল না। ভারতের বিভিন্ন রাজার উদ্দেশ্যে লেখা এই চিঠিগুলো মিশনের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করত।       

কাবুলে গিয়ে তীব্র অর্থসঙ্কটে পড়েছিলেন মহেন্দ্রপ্রতাপ। ভারতে যে দূত পাঠানোর বন্দোবস্ত করবেন তারই বা খরচ যোগাবে কে? এই অবস্থায় মিশনে যোগ দিলেন মৌলবি ওবায়দুল্লাহ সিন্ধ্রি। নিজের খরচে তিনি লোক পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। ডিসেম্বরে যে সরকার প্রতিষ্ঠা হল তার প্রেসিডেন্ট ছিলেন মহেন্দ্রপ্রতাপ, প্রধানমন্ত্রী বরকতুল্লাহ, স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী (Administrative minister)  ওবায়দুল্লাহ, পররাষ্ট্র সচিব চম্পক রমণ পিল্লাই এবং সমরসচিব মহম্মদ বশির। অর্থসঙ্কটের কারণ হিসাবে মহেন্দ্রপ্রতাপ আঙুল তুলেছেন জার্মান প্রতিনিধি ভন হেন্টিগের দিকেই। সমস্ত তহবিল তিনি কুক্ষিগত করেছিলেন। অর্থ,অস্ত্র এবং পরিকাঠামোগত সাহায্য তখন খুবই প্রয়োজন। স্বাধীন সরকারের তরফ থেকে তুরস্ক, রাশিয়া এবং জাপানে প্রতিনিধি পাঠানো হয় সাহায্য চেয়ে।    

১৯১৫-১৯১৬ সাল নাগাদ শীতকালে মহেন্দ্রপ্রতাপের প্রাইভেট সেক্রেটারি হরিশ্চন্দ্র হঠাৎ সুইৎজারল্যান্ডের  জেনেভা শহরে পৌঁছে জার্মান রাষ্ট্র প্রতিনিধির বাসস্থানে হাজির হন। রাজা খুশপাল সিংহ, রাজা পৃথ্বিপাল সিংহ সহ বেশ কিছু দেশীয় রাজা বিপ্লবারম্ভ করতে প্রস্তুত বলে জানান। জার্মান সরকারের কাছে তাঁরা অর্থ সাহায্য চান। ৩০০০ পাউন্ড দেওয়াও হয় জার্মান সরকারের তরফে। বার্লিন কমিটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে এ সমস্ত মিশন পরিচালনার ক্ষেত্রে। কিভাবে বিপ্লব পরিচালনা করতে হবে, কিভাবে অস্থায়ী সরকার স্থাপন করতে হবে- তা স্থির করতে সুচিন্তিত খসড়া পেশ করে কমিটি। অস্থায়ী সরকারে যেন হিন্দু মুসলিম প্রতিনিধিত্ব সমান-সমান হয় -এই বিষয়ে বিশেষ নজর রাখে বার্লিন কমিটি। অভিজাতশ্রেণী এবং জননায়কদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে সরকার গঠনের কথা ভাবে তাঁরা।   

হরিশ্চন্দ্রের রিপোর্ট যতই জমকালো হোক না কেন তাঁর আচরণ সন্দেহ উদ্রেক করে বার্লিন কমিটির। ওদিকে তিনি আবার স্বামী শ্রদ্ধানন্দের বড় ছেলে। চট করে কেউ তাঁর দিকে আঙুল তুলতেও পারছে না। তবু তিনি যে বড় রকমের ধাপ্পাবাজি করছেন সে ব্যাপারে যেন ক্রমেই ইঙ্গিত পেতে লাগল বার্লিন কমিটি।   

বরকতুল্লাহের কথা

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে মোটামুটি পরিচয় যাঁদের আছে তাঁরা নিশ্চয়ই বরকতুল্লাহ-র নাম শুনেছেন। আর এই স্বাধীন সরকারের বিষয়ে জানতে তাঁর জীবন সম্পর্কে খানিক অবগত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রসঙ্গত বলে রাখি সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি।

বরকতুল্লাহ-র জন্ম ভূপালে। ১৯০৯ সালে উচ্চ শিক্ষালাভের জন্য লন্ডন পাড়ি দেন উনি। সেখানেই শ্যামজী কৃষ্ণভর্মা এবং রাওজী রানার সংস্পর্শে আসেন। সে সময়ই বরকতুল্লাহ স্থির করেন নিজের লক্ষ্য- স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হন তিনি।    

আমেরিকায় গিয়ে তারকনাথ দাসের মতো বিপ্লবীদের সঙ্গে কিছুদিন কাজ করার পর যখন অধ্যাপনার সূত্রে জাপানে যান, সেখানে ‘ইসলামিক ফ্রাটারনিটি’ নামে একটি পত্রিকা বার করেন। ভারতের স্বাধীনতার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী ইসলামিক ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলার দিকেও মন ছিল তাঁর। আবার ১৯১৪ তে আমেরিকায় ফিরে কাজ শুরু করেন গদর পার্টির সঙ্গে। ইতিমধ্যে জার্মান সরকারের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতির সুযোগ কাজে লাগাতে গড়ে উঠল বার্লিন কমিটি। বরকতুল্লাহ যোগ দিলেন কমিটিতে। আফগানিস্তানের সরকারের সঙ্গে আলাপ আলোচনা চালাতে এবং সাহায্য চাইতে মহেন্দ্রপ্রতাপ, বরকতুল্লাহ সহ বেশ কিছু প্রতিনিধি নিয়ে কাবুলে একটি ইন্দো-জার্মান মিশন পাঠালো কমিটি। সেখানে আফগান সরকারের সাহায্য নিয়েই গড়ে ওঠে অস্থায়ী স্বাধীন সরকার।

আফগানিস্তানের নতুন আমীরের বিশ্বস্ত বন্ধু হিসাবেই রাশিয়ার সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্য নিয়েই বরকতুল্লাহ লেনিনের সঙ্গে দেখা করতে গেছিলেন। এর ফলে আমীর ব্রিটিশের সঙ্গে সন্ধিপত্র নাকচ করে দিয়েছিল। ‘ইজভেস্টিয়া’ সংবাদপত্রের জন্য দেওয়া একটি ইন্টারভিউতে মৌলবি বরকতুল্লাহ বলেছিলেন-“আমি কমিউনিস্ট নই, সোশ্যালিস্টও নই, বর্তমানে আমার রাজনৈতিক কর্মসূচি হল এশিয়া থেকে ইংরেজ বিতাড়নের। এশিয়ার ইউরোপীয় ধনতন্ত্র যার প্রধান প্রতিনিধি হল ইংরেজ-আমি তার ঘোরতর শত্রু।” স্পষ্ট অবস্থান নিঃসন্দেহে। তিনি তাঁর স্থির সংকল্প নিয়ে যাত্রা করেছেন বহু দেশে। আমেরিকায় গদর দলের সঙ্গেও দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তিনি।  

পরবর্তীকালে এই বরকতুল্লাহ-ই তাসখন্দ থেকে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে লেখেন-“…সারা পৃথিবীর এবং এশিয়ার জাতিগুলির অন্তর্ভুক্ত মুসলমানদের রুশ সমাজবাদের মহৎ নীতি হৃদয়ঙ্গম করার এবং গভীরভাবে ও সোৎসাহে তা গ্রহণের আজ সময় এসেছে। এই নতুন ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত গুণগুলিকে অনুধাবন ও ফলপ্রসূ করে তুলতে হবে এবং প্রকৃত স্বাধীনতার সংকল্প নিয়ে পররাজ্য গ্রাসী ও অত্যাচারী ব্রিটিশের আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য বলশেভিক বাহিনীতে যোগ দিতে হবে। মুসলমান ভাইসব, বিধাতার এই আহ্বান কান পেতে শোন, লেনিন ভাই ও রাশিয়ার সোভিয়েত সরকারে মুক্তি সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের যে বাণী তোমাদের কাছে এনেছেন তাতে সাড়া দাও।” বলশেভিক এবং প্যানইস্লামিস্ট-দের নেটওয়ার্ক সক্রিয়ভাবে জোড়ার চেষ্টা করতেন বরকতুল্লাহ।    

মায়া রামনাথ তাঁর “হজ টু ইউটোপিয়া” বইতে লিখছেন-বরকতুল্লাহ একা হাতে যোগসূত্র হিসেবে কাজ করেছেন বহু আন্দোলনের- যেমন ‘প্যান ইসলামিক আন্দোলন’, ‘এশিয়াবাসীর জন্য এশিয়া’, এবং ‘ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন’। বিশেষত ভারতীয় বিপ্লবীদের কাছে তিনি চিরকাল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন।   

বরকতুল্লাহ-র জীবন এবং আদর্শ সম্পর্কে অবহিত হওয়া বিশেষ প্রয়োজন। শুধু যে তিনি কাবুলের অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাই নয়, বরং তাঁর অবদান আরও বিস্তৃত। গোটা সময়টা জুড়ে তিনি একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ছিলেন, বিশেষ করে বিদেশে পরিচালিত বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে। তাই কোন ভাবনার জায়গা থেকে এই ধরনের পরিকল্পনা এবং কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছিল তার অনেকটাই ছবি পাওয়া যাবে তাঁর বক্তব্য, লেখাপত্র এবং ভাবনার গতিপ্রকৃতি থেকে। তাঁর মধ্যে ধর্মীয় ভাবাবেগের প্রভাব ছিল এ কথা অস্বীকার করছি না; তবে তাঁর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ভূমিকাকে কোনভাবেই লঘু করে দেখা ঠিক হবে না।  

ওবায়দুল্লাহ এবং ভারতের প্রথম সংবিধান

“ইয়ে জঙ্গ হমারী আখরি

ইস পার হ্যায় ফ্যাসালা!

সারে জঁহা কি মজনুমোঁ

উঠো কি ওয়াক্ত আ গয়া”

বিখ্যাত ‘ইন্টারন্যাশানাল’ গানের এই উর্দু তর্জমা প্রথম করেছিলেন ওবায়দুল্লাহ সিন্ধ্রির ছাত্র জাকারিয়া। দেওবন্দ শিক্ষাকেন্দ্র থেকে যাঁরা স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্র নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম ওবায়দুল্লাহ সিন্ধ্রি। শিক্ষক মাহমুদ আল হাসানের হাত ধরেই তাঁর বিপ্লবে হাতেখড়ি। অস্থায়ী সরকারের স্বরাষ্ট্রসচিব ওবায়দুল্লাহ প্রথম জীবনে ছিলেন শিখ ধর্মাবলম্বী, পরবর্তীকালে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তাঁর ডাকে লাহোরের ১৫ জন ছাত্র কাবুলে চলে আসেন। এঁদের মধ্যে অনেকেরই পরবর্তীকালে সঠিক হদিস পাওয়া যায় না। একমাত্র জাকারিয়ার কথা বাদ দিলে। জাকারিয়া পরবর্তীকালে কমিউনিস্ট হয়েছিলেন। কাবুলের স্বাধীন সরকারেও যোগ দিয়েছিল এই ছাত্ররা। সম্ভবত জাকারিয়া ছিলেন স্বাধীন সরকারের প্রচারমন্ত্রী। প্রসঙ্গত ওবায়দুল্লার আরেকটি পরিচয় এখানে দিয়ে রাখি। তিনি ছিলেন ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের কাবুল শাখার সভাপতি এবং সম্ভবত প্রতিষ্ঠাতাও। তিনিই একমাত্র বিদেশের মাটিতে কংগ্রেসের শাখা খুলতে সমর্থ হন।   

অস্থায়ী সরকারের প্রেসিডেন্ট মহেন্দ্রপ্রতাপের স্বাক্ষরিত রেশমি কাপড়ের ওপর লেখা চিঠি বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্রোহীদের মধ্যে পাঠানো হয়। এতে লিপিবদ্ধ ছিল পরিকল্পনা এবং কর্মসূচী। ওবায়দুল্লাহও ছিলেন এই ষড়যন্ত্রের অন্যতম শরিক।

ইস্তানবুল থেকে ওবায়দুল্লাহ ৫৬ পাতার একটা পুস্তিকা প্রকাশ করেন। শিরোনাম-“The constitution of the federated republics of India.” ভারতবর্ষ সকল অধিবাসীদের নিজের দেশ-এটুকু বলেই ক্ষান্ত হননি তিনি। ভারতের মাটি থেকে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা উচ্ছেদ করে আমাদের দেশে এমন ব্যবস্থার পত্তন করতে চেয়েছিলেন যাতে শ্রমজীবী শ্রেণীগুলির কল্যাণ সুরক্ষিত হয় এবং তাঁদের হাতে থাকে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ। সেদিন তাঁরা জোর দিয়েছিলেন  ধর্মকে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে না ফেলার বিষয়টিতে। ধর্মের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন আজকের ভারতে বসে এ কথা সত্যি-ই মনে রাখার মতো। এক সম্প্রদায়, এক ভাষা, এক সংস্কৃতি, এক জীবনধারার অনুবর্তী হয়ে চলবে গোটা দেশ- এমন ধারনার  ঘোর বিরোধী ছিলেন ওবায়দুল্লাহ। কতগুলো স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য ও সম্প্রদায়কে নিয়ে একটি সংযুক্ত ফেডারেশন হিসাবে ভারতের গড়ে ওঠা কাম্য- এই ছিল তাঁর মত।

‘জয়হিন্দ’ স্লোগানের জন্মঃ আরও এক স্বাধীন সরকার

প্রায় সমসময় দ্বিতীয় স্বাধীন সরকারটির কথা বোধহয় আরও কম উচ্চারিত হয়। আগেই বলেছি বার্লিন কমিটি সেইসময় মোট চারটি মিশন পাঠায়। এর মধ্যে পারস্য মিশনে যুক্ত ছিলেন  পান্দুরঙ্গ খানখোজে, প্রমথনাথ (দাউদ আলী) দত্ত, আগাসে (বা মহম্মদ আলী), কেরসাম্প প্রমুখ বিপ্লবী। মনে রাখতে হবে পারস্যের বিভিন্ন জায়গায় তখন ব্রিটিশ সেনাবাহিনী মোতায়েন ছিল। ফলে এঁদের কাজ ছিল আরও কঠিন। প্রতি পদে সেনাবাহিনীকে মোকাবিলা করতে হয়েছে তাঁদের।

আফগানিস্তান আর বালুচিস্তানের সীমানা আবিষ্কার করতে সেদিকে এগিয়ে গেলেন প্রমথ (দাউদ আলী) দত্ত বাকি টিমকে ফেলে। কিন্তু বিধি বাম! বেশী দূর আর যেতে হল না। পড়ে গেলেন ব্রিটিশ সৈন্যের জালে। গুলি চলল। গুরুতর জখম হলেন প্রমথ। ফিরে এলেন সঙ্গীদের কাছেই। তাঁরাও পড়লেন মহা ফাঁপরে। এমন অবস্থায় তো তাঁকে ফেলে রেখে এগোনও যায়না। আগাসে রইলেন প্রমথর সঙ্গে কিরমানে। সাথীদের বিদায় জানিয়ে খানখোঁজে একা রওনা হলেন বাম-এর পথে। সেখানে গিয়ে বালুচদের সংঘবদ্ধ করার কাজে হাত লাগালেন তিনি। কিছু সাফল্যও পেলেন। বালুচদের একজন কৌমের সর্দার জীহান খান তাঁর সঙ্গে যোগ দিলেন। তাঁকে সামনে রেখেই একটি অস্থায়ী সরকার গড়ে তোলা সম্ভব হল।

ইতিমধ্যে মহেন্দ্রপ্রতাপের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ডেপুটেশন নিয়ে হাজির হন কন্সটান্টিনোপলে। সেখানে “আয়া সোফিয়া” মসজিদে তুর্কীর শেখ ইসলাম ইংরেজদের বিরুদ্ধে মুসলিম সমাজকে “জেহাদে” আহ্বান করে ফতোয়া দেন। এই ফতোয়াকে হাতিয়ার করে পারস্য-বেলুচিস্তানের আমীরের সঙ্গে দেখা করাও সহজ হয়। কিন্তু পরে তিনি বেঁকে বসলেন। ঘুষ দিয়ে তাঁকে হাত করে নিল ইংরেজরা। সুতরাং পান্দুরঙ্গ খানখোঁজে সেখান থেকে পালাতে বাধ্য হন। প্রায় হাজার বালুচদের নিয়ে গড়ে তোলা সৈন্যদল মারাত্মকভাবে বিধ্বস্ত হয়।    

আজ আই এন এ সৈন্যদল দ্বারা সৃষ্ট ধ্বনি “জয়হিন্দ” বিশাল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কিন্তু আমরা আদৌ জানি কি এই শব্দের উৎস কোথায়?  সে যুগে পারস্যে এবং অন্যান্য জায়গায় গদর দলের সৈন্যরা যে গান গাইত যুদ্ধে যাওয়ার সময়, সেই গানেও ছিল “জয়হিন্দ” শব্দটি।

“জয় জয় জয়কি হিন্দ!

তোপোঁ বন্দুক হাতিয়ারোঁ  সে,

আজাদ  করোজী হিন্দ!

হিন্দ হমারা যান হ্যায়,

আউর হিন্দ হমারা প্রাণ,

ভগত বনে হম হিন্দকী,

আউর হিন্দপে কোরবান!!” 

এত দ্রুত মুছে গেল কেন?

প্রথম স্বাধীন সরকার গঠন নিঃসন্দেহে স্বাধীনতা সংগ্রাম অধ্যায়ের বিশাল তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। তবু প্রশ্ন থাকে এত পরিকল্পনা সত্ত্বেও এই সরকার ভেঙে পড়ল কেন? বার্লিন কমিটি পরিচালিত মিশনগুলোই বা শেষমেশ ব্যর্থ হল কেন? প্রত্যক্ষ কারণ বেশ কিছু রয়েছে। এদিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অটোম্যান সাম্রাজ্যের পতন ঘটলে ব্রিটিশরা আরো ভালো সুবিধা পেয়েছিল। তারা তুরস্ক ও ইরান পুনরায় দখল করে নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে বসে। অর্থ বা অস্ত্রশস্ত্রের ঘাটতি, আফগান সরকারের সরাসরি সাহায্য প্রত্যাখ্যান ইত্যাদি নিঃসন্দেহে বিরূপ প্রভাব ফেলে… কিন্তু গভীরে গিয়ে আরও অনেক বিষয়-ই ভাবার অবকাশ রয়েছে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বার্লিন কমিটি কাবুল ছাড়াও বাগদাদ, পার্সিয়া, সুয়েজ ক্যানাল ইত্যাদি নানা জায়গায় মিশন পাঠায়। আমেরিকার গদর দলের সঙ্গে সংযোগ রেখেই কাজ করে। প্রায় গোটা বিশ্বজুড়ে জাল বিস্তার করে কমিটি। তাঁদের ভাবনা ছিল বিশ্বের অন্যান্য স্বাধীন রাষ্ট্রের সাহায্য নিয়ে বাইরে থেকে আক্রমণ করে দুর্বল করতে হবে ইংরেজদের। পরিকল্পনা ছিল ইরান হয়ে আক্রমণ করতে করতে বেলুচিস্তানে যাবে, তারপর প্রবেশ করবে পাঞ্জাবে। এজন্য গঠন হয়েছিল ‘ভারত স্বাধীনতা সেনাবাহিনী’।  এর পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে চলা বিপ্লবোদ্যমের  সঙ্গে বিশেষ সংযোগ রাখারও চেষ্টা ছিল। ১৯১৫-১৬ সালে বাংলা এবং উত্তর ভারতের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ভাল সংযোগ ছিলও বটে। কিন্তু সব সত্ত্বেও একটা সমস্যা থেকেই গেছে ধারাবাহিকভাবেই। এই গোটা কর্মকাণ্ডের কোথাও ভারতের খেটে খাওয়া সাধারণ জনগণের সক্রিয় উপস্থিতি নেই। বিপ্লব যজ্ঞে তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণের কথা যেন ভাবাও তেমন হয়নি। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, ভারতের কুলি মজুর, কৃষকদের থেকে বিপ্লবীদের যোজন যোজন দূরত্ব। মানসিক দূরত্বও বিস্তর। বরং অভিজাত শ্রেণী, জমিদার, বা দেশীয় রাজাদের কাছে টানার চেষ্টা অনেক বেশী ছিল। অনেক ক্ষেত্রে ভাবা হয়েছে বিপ্লব আরম্ভ হলে জনতা এমনিই জাগ্রত হবে, হুড়মুড় করে এসে পড়বে ঝাণ্ডার তলায়। ‘জেহাদ’ ঘোষণা হলেই মুসলিম সমাজ লড়তে এগিয়ে আসবে শ’য়ে শ’য়ে। এই ভাবনা ছিল ঠুনকো। কাঁচের মতো । ঠোকা খেয়েই ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল। সমস্যাকে অনুভব করা যাবে একটা সত্যিকারের গল্পের মধ্যে দিয়ে।  

মস্ত একটা হলঘরে বসে আছেন লেনিন। প্রতিনিধি দলের সকলে ঢুকলেন একে একে। মহেন্দ্রপ্রতাপ এসে বসলেন লেনিনের একদম পাশে। লেনিন লক্ষ্য করলেন সকলে বসলেও একজন খাড়া দাঁড়িয়েই রইলেন। শেষোক্ত ব্যক্তি বরকতুল্লাহ-র পরিচারক ইব্রাহিম। প্রভুর সামনে আর কী করে তিনি আসন গ্রহণ করেন! তাই সঙ্কোচে দাঁড়িয়ে রয়েছেন এক কোণে। বেশ অবাক হলেন লেনিন। ডেকে নিয়ে তাঁর পাশে একটি চেয়ারে ইব্রাহিমকে বসালেন তিনি। অন্য সকলে ইংরাজিতেই কথাবার্তা চালালেও ইব্রাহিমকে প্রশ্ন করা হলে সে প্রত্যুত্তর দেয় ভাঙা ভাঙা রুশে। অত্যন্ত খুশি হলেন লেনিন। তাঁর পরিচয় জানতে চাইলেন আগ্রহভরে। ইব্রাহিম বলল- সে পাঞ্জাবের এক কৃষক সন্তান। যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে তক্ষুনি দোভাষী ডাকিয়ে লেনিন ইব্রাহিমের সঙ্গে আলাপচারিতায় মেতে গেলেন। উদ্দেশ্য, ভারতবর্ষের কৃষকদের অবস্থা আর তাঁদের ওপর শোষণের রূপ সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারণা ইব্রাহিমের কাছ থেকে পাওয়া। প্রায় আধঘণ্টা সময় কাটালেন ইব্রাহিমের সঙ্গে।    

ওদিকে মহেন্দ্রপ্রতাপ, বরকতুল্লাহ সহ প্রতিনিধি দলের তাঁবড় তাঁবড় বিপ্লবী তো হতবাক। ভাবছেন, তাঁদেরই একজন ভৃত্যের সঙ্গে কী এত কথা থাকতে পারে লেনিনের! ভুপেন্দ্রনাথ নিজে তাঁর লেখা “অপ্রকাশিত রাজনৈতিক ইতিহাস” বইতে স্বীকার করেছেন এই গল্প তাঁর চোখ খুলে দিয়েছিল। দেশের শ্রমিক কৃষককে স্বাধীনতা আন্দোলনে সামিল করা, তাঁদের দিকে বিশেষভাবে মনোনিবেশ করা কতটা জরুরি সেদিন বুঝতে পেরেছিলেন তিনি।    

এক্ষেত্রে কিছুটা পর্যায়ে ব্যতিক্রম বলা যায় একমাত্র পাঞ্জাবের গদর বিপ্লবীদের। তাঁরা বেশিরভাগই  পাঞ্জাবের কৃষক ঘরের সন্তান। আমেরিকায় গিয়ে মূলত বিভিন্ন মিলে কাজ করতেন। কেউ কেউ ক্ষেতির কাজও করতেন। অনেকে সুগার প্লান্টেশনে কাজ করতেন। তাঁদের ভাবনায় অসাম্প্রদায়িক মনোভাব, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মনোভাব আরোপিত, লোকদেখানো  বা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া নয়।  এ বিষয়ে খুব সুন্দর একটা উদাহরণ দেব। বরকতুল্লাহ একবার মসজিদ নির্মাণে  আমেরিকায় বসবাসকারী শিখদের  কাছে কিছু সাহায্য চেয়েছিলেন। এক শিখ শ্রমিক তাঁর যা কিছু সম্বল সমস্ত জড়ো করে নির্দ্বিধায় বরকতুল্লাহ-র হাতে তুলে দেন। মোট অঙ্কটা ছিল প্রায় ৯০০ ডলার। অন্যান্য শিখ শ্রমিকরাও যথাসাধ্য দান করেন। ধর্মের ব্যাপারে এতটাই উদার ছিলেন তাঁরা।    

রাসবিহারীর নেতৃত্বে ১৯১৫-র বিপ্লব পরিকল্পনার ঠিক আগে ‘তসি মারু’ এবং ‘মাশিমা মারু’ নামে দুটি জাহাজে ঝাঁকে ঝাঁকে গদর বিপ্লবী এসে পৌঁছন ভারতে। তাঁদের ঠেকাতে ব্রিটিশদের অনেক বেগ পেতে হয়েছিল। 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষিতে স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছিল আরেকটি জায়গা। হতে পারে তা ক্ষণস্থায়ী, স্বাধীন সরকার গঠন সেখানে হয়নি তবু ব্রিটিশ মুক্ত হয়ে প্রায় পাঁচটা দিন তাঁরা শহর দখল করে রেখেছিল, স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়েছিল, টেনে নামিয়ে দিয়েছিল ইউনিয়ন জ্যাক; নিতান্ত সাধারণ কৃষক পরিবার থেকে আসা সেনারা নিজেদের চেষ্টায় মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল।  সেদিনের সেই প্রথম স্বাধীনতার স্বাদ, সেই ঔদ্ধত্য, সেই স্পর্ধা আজও আমাদের নাড়া দেয়, ভাবায়। তবু স্বাধীন ভারতের ইতিহাসের একটা কোণাতেও সেই ইতিহাস স্থান পেয়েছে একথাও কি জোর দিয়ে বলা যায়? স্কুল পাঠ্য বইতে তো উল্লেখও থাকে না। সবার অলক্ষ্যেই থেকে গেছে স্বপ্নের সেই ৫টি দিন-মাথা তুলে দাঁড়ানোর প্রথম প্রচেষ্টা। এমনকি ইতিহাসবিদদেরও খুব বেশী যে দৃষ্টি গেছে তা নয়, বরং বেশিরভাগই যাঁরা এই নিয়ে কাজ করেছেন তাঁদের মধ্যে অনেকেই একে দেখাতে চেয়েছেন নিতান্ত আঞ্চলিক ঘটনা হিসেবে। ব্রিটিশরাও ঠিক তাই চেয়েছিল। এর সঙ্গে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের যোগ, গদর বিপ্লবীদের প্রভাব, বিদ্রোহীদের স্বাধীনতা স্পৃহাকে চেপে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বারে বারে। আজ স্বাধীনতার ৭৩ বছর পর বসে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে তাঁদের সেই অনমনীয় স্বাধীনতা স্পৃহা, সাহস আর আত্মত্যাগকে কুর্নিশ জানাতেই হচ্ছে।

স্বাধীনতার অন্য স্বাদ

২১ ফেব্রুয়ারি, সাল ১৯১৫। সকাল থেকেই ফিফথ লাইট ইনফান্ট্রির অফিসারদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। সিপাহীদের কুচকাওয়াজে আসতে দেরী কেন? সুবেদার ডান্ডি খাঁর তো দেখাই নেই। এমনটা তো হবার কথা নয়।   

ডান্ডি খাঁর জরুরী তলব হল অফিসে। হাজির হলেও অন্যান্য দিনের মতো দুই অফিসারকেই অভিবাদন জানালেন না ডান্ডি খাঁ। তাঁর চোখে এক অদ্ভুত স্থির দৃষ্টি। দু’জন অফিসারই তুমুল ক্ষেপে  উঠলেন। ‘নেটিভ’-দের এমন অবাধ্যতা তো রাজশক্তি ভালোভাবে মেনে নেবে না। খিস্তি করে উঠলেন এক অফিসার-“শুয়ার কী বাচ্চা, কেঁও তুম প্যারেড মে নেহী আয়া?” মুহূর্তমধ্যে রিভলভার বার করলেন ডান্ডি খাঁ। সচকিত হয়ে উঠল দু’জোড়া চোখ- ভয়ার্ত, বাকরুদ্ধ। আর অপেক্ষা করলেন না ডান্ডি খাঁ। গর্জে উঠল তাঁর রিভলভার। ঝাঁজরা হয়ে পড়ে রইল দুটি নিথর দেহ। বাইরে এসে তিনি ‘ফলো ইন’ অর্ডার দিলেন। নিমেষে সিপাহীরা দখল করল অস্ত্রাগার। বণ্টন করে দেওয়া হল সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র। কেল্লার সব ব্রিটিশ অফিসারকেই হত্যা করা হল। শহরের রাস্তায় রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ল ২৫০ বিদ্রোহী। বেছে বেছে লালমুখো সাহেবদের খতম করল তাঁরা। সাধারণ জনসাধারণের ওপর কিন্তু কোনরকম নিপীড়ন হয়নি। এর মধ্যে কিছু সাহেব পালাতে সক্ষম হল। তারা গিয়ে ভিড়ল একটি জাহাজে। জাহাজ থেকেই রেডিওর মারফৎ খবর পাঠাতে লাগল-“হেল্প! হেল্প! বিদ্রোহীরা দখল  নিয়েছে কেল্লার!”

এদিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জারের রাশিয়া এবং জাপান ছিল ব্রিটিশদের পক্ষে। ফলে তারাও  ব্রিটিশদের সাহায্যে হাত লাগাল। বিদ্রোহের তৃতীয় দিন এসে ভিড়ল রুশ যুদ্ধ জাহাজ।ঢাল বেয়ে কেল্লার দিকে সদর্পে উঠতে লাগল রুশ সেনারা। কেল্লার তরফে তখন শুধু নীরবতা। ওদের ঢাল বেয়ে বেশ খানিকটা উঠতে দিল বিদ্রোহীরা। তারপরে সুযোগ বুঝে এক্কেবারে শিলাবৃষ্টির মতো গুলির তোড় ছুটে এল রুশ বাহিনীর দিকে। প্রায় প্রত্যেক রুশ সেনা সেদিন নিহত হয়েছিল। আরও দুইদিন দখলে রইল কেল্লা। কিন্তু পঞ্চম দিনে জাপানী জাহাজ বহুদূর থেকেই কামান দাগতে শুরু করে। এ তরফেও পাল্টা দু-চারটে কামান দাগা হয় বটে ; কিন্তু শেষরক্ষা হয় না। কেল্লার দখল আর ধরে রাখতে পারেন না বিদ্রোহীরা। অনেকে তো সেদিনই কামানের গোলা আর একটানা গুলি বর্ষণে মারা যান। যাঁরা বেঁচে রইলেন তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হল। ব্রিটিশরা তখন পৈশাচিক বদলার জন্য তৈরি। জনগণের সামনে এঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে চায় রাজশক্তি। ফলে ঠিক হল কেল্লার দেওয়ালের ধারে হবে বিচার। পরিখার অপর পাড় থেকে জনগণ তা দেখবে।

একটা স্বপ্নকে অঙ্কুরেই বিনাশ হতে দেখেছিল সেদিন সিঙ্গাপুরের জনগণ। কেল্লার দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে ৬ জন বিদ্রোহী। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ২০-২৫ জন গোরা সৈনিক উদ্যত রিভলভার হাতে। গর্জন করে উঠলেন এক সাদা অফিসার- “দাস জাস্টিস ইজ ডান!” অন্যজন হেঁকে হুকুম দিলেন- “ফায়ার!” সবকটি রাইফেল গর্জে উঠল একসঙ্গে।

প্রথম ৬-জনের মধ্যে ছিলেন না ডান্ডি খাঁ। এরপর একসঙ্গে আরও ২২ জনের বিচার হয়। তাঁদের দিকে তাক করে গর্জে ওঠে প্রায় ১০০ টি রিভলভার-পর পর দু-বার। সকলেই পড়ে গেলেন, কেবল পড়লেন না ডান্ডি খাঁ। দু’চোখ বিস্ফারিত তাঁর -শান্ত চোখ দুটিতে এক  অদ্ভুত প্রশান্তি আর দৃঢ়তা, -টলছেন, কিন্তু পড়তে চাইছেন না। আবার হুকুম হল-“ফায়ার!”

রোমহর্ষক চিত্রনাট্যের মতো এই বিবরণটি পাই শৈলেশ দে-র লেখা “আমি সুভাষ বলছি” বইতে উদ্ধৃত প্রত্যক্ষদর্শী পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তীর বয়ান থেকে। গল্পটি নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণা যোগায় আজও। তবু এটুকু উল্লেখ করতেই হবে তথ্যের দিক থেকে বেশ কিছু গরমিল রয়েছে বা বলা ভালো অনেক ক্ষেত্রেই তা মেলেনি অন্যান্য ঐতিহাসিকদের বয়ান বা সরকারী নথির সঙ্গে। কে ঠিক বলছেন? কে বেঠিক? এই বিতর্কে না গিয়েও সংক্ষেপে দু-একটি লেখা থেকে একটু উল্লেখ করছি। শৈলেশ দে-র এই বইতে বলা হয়েছে মোট সাত দিন শহর ছিল বিদ্রোহীদের সম্পূর্ণ দখলে। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি উমা মুখার্জি তাঁর “Two Great Indian Revolutionaries” বইতে লেফটেন্যান্ট জেনারেল  ম্যাকমুনের যে বয়ান দিয়েছেন তা বিপরীত কথা বলে। ১৫ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় বিদ্রোহ আর ১৮ ফেব্রুয়ারি বিকেলের মধ্যেই পরিস্থিতি চলে আসে সম্পূর্ণ ইংরেজদের হাতের মুঠোয়। এখানে তুলে দিচ্ছি সেই উদ্ধৃতি-

“By the morning of the 18th the aggregate of armed forces was sufficient for general ridout to occupy the whole of the scene of the tragedy, Tanglin, Alexandra Barracks, and Normanton….By the evening of the 18th, the situation was completely in hand, and residents returned to their houses. Some 300 mutineers only were at large, and these were driven into the jungle…Two of the leaders were hanged, thirty-eight were shot, all in public. The incident was over, and the 5th light Infantry were no more.”  

কিন্তু এ তো গেল ব্রিটিশ পক্ষের বক্তব্য। আসুন, বরং দেখি অন্যান্য ঐতিহাসিকরা এই বিষয়ে কি বলছেন। ঐ কিট গিন (Ooi Keat Gin) সিঙ্গাপুর বিষয়ে তাঁর “Between Homelands and Ummah” প্রবন্ধে লিখেছেন প্রায় সাত দিন শহর দখল ছিল বিদ্রোহীদের- যা মিলে যাচ্ছে   শৈলেশ দে-র বইয়ের সঙ্গে। আবার সুপ্রতীপ দেবদাস তাঁর “স্বাধীনতা সংগ্রামী চরিতাভিধান” বইতে উল্লেখ করেছেন যে পরবর্তী চারদিন সিঙ্গাপুরে ব্রিটিশ শাসনের চিহ্নমাত্র ছিল না। অর্থাৎ ধরে নেওয়া যায় ১৫ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী আরও চারদিন সিঙ্গাপুর স্বাধীন ছিল। আবার হিথার স্ট্রীট সাল্টার তাঁর “The Local was Global: The Singapore Mutiny” প্রবন্ধে বলেছেন দু দিনের মধ্যেই দমন করা হয়েছিল বিদ্রোহ। ফলে এখানে প্রচুর মতানৈক্য রয়েছে। কতজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় বা কতজনকে খাড়া করা হয় ফায়ারিং স্কোয়াডের  সামনে সে নিয়েও রয়েছে বিস্তর বিভ্রান্তি। স্বাধীনতা সংগ্রামী চরিতাভিধানে বলা হয়েছে মোট ২৭ জনকে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়। হিথার স্ট্রীট সাল্টারের “The Local was Global: The Singapore Mutiny” প্রবন্ধে উনি লিখছেন- ২২ মার্চ ১৯১৫, মোট ২১ জনকে রায় শোনানো হয়-সেখানেই সুবেদার ডাণ্ডি খান, জমাদার চিস্তি খান সহ ৫ জনকে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে গুলি করে মারার আদেশ দেওয়া হয় আর ১৬ জনকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। সব মিলিয়ে ফিফথ লাইট ইনফান্ট্রির ২০৩ জন সেনার মধ্যে ৪১ জন কে ফাঁসি এবং ৬৩ জনকে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়। আবার ঐ কিট গিন (Ooi Keat Sin) তাঁর প্রবন্ধে ৪১ জনের ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছেন। এ বিষয়ে শৈলেশ দের বইতে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই। প্রথমে ৬ জনের ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুর ঘটনার বর্ণনা রয়েছে আর পরে আরও ২২ জনের বিচারের কথা বলা হয়েছে। যাইহোক সংখ্যা নিয়ে নানা গোলমাল থাকলেও গুলির সামনে অদ্ভুত দৃঢ়তা নিয়ে খাড়া দাঁড়িয়ে থাকা ডাণ্ডি খাঁ-র মৃত্যুর বিবরণ আমরা প্রায় একই ভাবে পাই বেশীরভাগ সূত্র থেকেই। ডান্ডি খাঁ আর চিস্তি খানের মৃত্যু মুহূর্ত নিয়ে একজন ইংরেজের বক্তব্যই শুনি-

“The condemned men Subedar Dunde Khan and Jamadar Chiste Khan dressed in plain native clothes in step with the escort marched erect and steadily to the execution posts, to which they were tied by the ankles. Facing the firing part at eight paces their bearing never faultered. The condemned men stood rigidly to attention. They were not blindfolded. Whatever their crimes, their calm and dignity at the end was impressive.”(Dickinson 1960)

সিঙ্গাপুর নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু আলোচনায় ঢোকার আগে বিদ্রোহের কারণ এবং সূত্রপাত প্রসঙ্গে দু-চার কথা বলব এখন। ডান্ডি খান-ই কি প্রথম বন্দুকটা ঘুরিয়ে ধরলেন সাদা চামড়ার অফিসারের দিকে? শৈলেশ দে-র বিবরণ তথা পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তীর বয়ানে তো সেরকমটাই পাই। স্বাধীনতা সংগ্রামী চরিতাভিধানে যে বর্ণনা পাই তা হুবহু না হলেও অনেকটাই মেলে। তবে ঐ কিট তাঁর লেখায় একটু অন্যভাবে ধরেছেন। আসুন দেখে নেওয়া যাক তিনি কি বলছেন- 

“It was announced that the 5th LIR was to be transferred for military duty abroad but the destination was not announced to the rank and file due to security reason. The Nile was to transport the regiment for this transfer and scheduled to arrive on 18 February. But the Nile arrived three days ahead on the morning of the 15th. The would-be mutineers were caught unaware and hurriedly forced to advance their plan of revolt. Meanwhile orders were given that men of the regiment were detailed to unload ammunition (35,000 rounds of rifle and 10,000 machine gun rounds) and two machine guns from the Nile on two trucks in the after noon before sundown. This menial task was undertaken at Alexandra Barracks. The first truck left without incident. In the midst of the second truck being loaded, the sepoy Ismail Khan fired the first shot killing the truck’s crew as well as those of the other remaining trucks. The mutineers seized all the trucks and their loads.”

এই বিবরণকে যদি সত্যি বলে ধরে নিই তাহলে বিদ্রোহের অন্যতম প্রত্যক্ষ কারণ হিসেবে উঠে আসবে ইচ্ছার বিরুদ্ধে ফিফথ লাইট ইনফান্ট্রিকে ফ্রন্ট-এ বিদেশের মাটিতে যুদ্ধে পাঠানোর পরিকল্পনা। এখানে লেখক পরিষ্কার বলেছেন ইসমাইল খান নামে এক বিদ্রোহী প্রথম গুলি ছোঁড়েন। এবার  আমরা বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ কারণ এবং পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে আলোচনায় ঢুকি।

ব্যঙ্গ করে ফিফথ লাইট ইনফান্ট্রিকে বলা হত “Loyal 5th”, ব্রিটিশদের প্রতি তাঁদের ঐতিহাসিক আনুগত্যের জন্য, সিপাহী বিদ্রোহ দমনে তাঁদের ভূমিকার জন্য সেই  ফিফথ লাইট ইনফান্ট্রি  হঠাৎ ক্ষেপে উঠল কেন? প্রাথমিক বিদ্রোহ দমনের পর ব্রিটিশ কোর্টে এনকোয়ারি হয়েছিল বিদ্রোহের কারণ খুঁজতে। ব্রিটিশ ছাড়াও মালয়, চিনা এবং ভারতীয় সাক্ষীদের হাজার হাজার পাতার সাক্ষ্য রয়েছে। তবু বিষয়টাই চোখ টানেনি অধিকাংশ ঐতিহাসিকের। ভারতের বৃহত্তর স্বাধীনতা সংগ্রামের অঙ্গ হিসাবে এই ঘটনাকে স্বীকৃতি দিতে তো চাননি অনেকেই। প্রথমে দেখে নিই ব্রিটিশ কোর্টে এনকোয়ারির সময়ে কিভাবে বিবৃত করা হয়েছে কারণগুলো। কর্তব্যরত ব্রিটিশ অফিসারদের মধ্যে কিছু চাপা উত্তেজনা কাজ করেছে যা নিয়মশৃঙ্খলার ব্যাঘাত ঘটায়। বাহিনীর ভারতীয় সেনাদের মধ্যে কিছু অসন্তোষ দানা বাঁধে। বাইরের কিছু প্রভাব ছিল পাশাপাশি-যেমন এক ভারতীয় ব্যবসায়ী কাশিম মনসুর বিদ্রোহের কথা প্রচার করছিল সেনাদের মধ্যে এবং জার্মান যুদ্ধবন্দীদেরও একটা ভূমিকা ছিল বিদ্রোহীদের মানসিকভাবে দলে টানার ব্যাপারে। এছাড়া পদন্নোতি নিয়ে পারস্পরিক হিংসাও ছিল সেপাহীদের মধ্যে। এ পর্যন্তই চিহ্নিত করেছে ব্রিটিশ কোর্ট। যদিও এই রিপোর্টকে সঠিক ঘটণার ধারে কাছেও বলা যায় কিনা সন্দেহ। ব্রিটিশরা তড়িঘড়ি এমন কিছু সাক্ষ্য যোগাড় করেছিল যা বিদ্রোহের কোনও বৃহত্তর যোগকে সুচতুরভাবে এড়িয়ে যায়। বারবার জোর দেওয়া হয় আঞ্চলিক ঘটনা হিসাবে চিহ্নিত করার ব্যাপারে।

সমকালীন পরিপ্রেক্ষিতকে বিচার করে বলতে পারি দুটো বৃহত্তর ভাবাবেগ মূলত কাজ করেছিল। একটা অবশ্যই “প্যান ইসলামিজম” এবং দ্বিতীয়টা “গদর আন্দোলন”। প্রসঙ্গত বলে রাখি রেজিমেন্টের বেশীরভাগ সেনাই ছিলেন শিখ, পাঠান এবং পাঞ্জাবী মুসলমান। হিথার স্ট্রীট সাল্টার তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন বিদ্রোহের কারণ খুঁজতে গিয়ে প্রথমেই শুরু করতে হবে মালয় স্টেট গাইডস রেজিমেন্ট থেকে। তাঁদের বিশাল ভূমিকা ছিল এই বিদ্রোহে এবং প্রভাবও ছিল ফিফথ লাইট ইনফান্ট্রির ওপর। বিদেশে তাঁদের যুদ্ধ করতে পাঠানো হবে, স্থানান্তরিত করা হবে জানার সঙ্গে সঙ্গেই অস্বীকৃত হয় সেনারা। তাঁরা স্পষ্ট জানায় বিদেশের মাটিতে যুদ্ধে যেতে বাধ্য নয় তাঁরা। তাঁদের মনে একটা আশঙ্কাও কাজ করছিল বিদেশের মাটিতে তাঁদের মুসলিম ভাইদের বিরুদ্ধে তাঁদের অস্ত্র ধরতে হবে। মালয় স্টেট গাইডস-এর  ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিক্ষোভের পরে পিছু হটতে বাধ্য হয় ব্রিটিশ। এখানে কাশিম মনসুরের ভূমিকা কিছুটা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর হাত দিয়ে তুর্কীর রাষ্ট্রদূতের কাছে চিঠি পাঠানোর চেষ্টা করেন মালয় স্টেট গাইডস-এর এক কর্পোরাল। বিদ্রোহের জন্য তৈরি গাইডস। শুধু তুর্কীর কাছ থেকে প্রত্যক্ষ সাহায্যের অপেক্ষায়। এই মর্মেই চিঠি পাঠান তাঁরা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত চিঠিটি ধরা পড়ে এবং কাশিম মনসুরের কার্যকলাপ ব্রিটিশরা এতটাই বিপজ্জনক মনে করে যে তাঁকে পরবর্তীকালে ফাঁসি দেয়। ৩১ মে ১৯১৫ ফাঁসির দড়ি গলায় পরলেন কাশিম মনসুর। আজীবন তিনি গদর পার্টির সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।  

নভেম্বর ১৯১৩ তে প্রকাশিত হয়েছে “Hindustan Ghadar”-এর প্রথম সংস্করণ। শুধু আমেরিকা, কানাডা বা ভারত নয় এই পত্রিকা পৌঁছয় দক্ষিণ এবং পূর্ব আফ্রিকা, হং কং, বার্মা, মালয়, সিঙ্গাপুর সহ বিশ্বের নানা প্রান্তে।

অভিষেকেই যুদ্ধ ঘোষণা গদরের

“What is our name? Mutiny.

What is our work? Mutiny.

Where will the mutiny break out? In India.

When? In a few years.

Why? Because the people can no longer bear the oppression and tyranny practiced under British rule and are ready to fight and die for freedom.”

সিঙ্গাপুর, হংকং, মালয় সহ বিভিন্ন জায়গায় শিখ গুরুদুয়ারাগুলি হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিপ্লবের পীঠস্থান। পত্রিকা বিলি করা হত ওখানেই। এ প্রসঙ্গে হিথার স্ট্রিট সাল্টারের বক্তব্য থেকে ধার করেই বলি ফিফথ লাইট ইনফ্যান্ট্রির সিপাহীদের প্রায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল সিঙ্গাপুরের কম্পং জাভা মসজিদে। ব্রিটিশদের ভাষায় বললে সেখানে একজন ‘বিপজ্জনক ব্যক্তি’ জ্বালাময়ী ভাষণ দিতেন এবং বিদ্রোহে উস্কানি দিতেন। এমনকি ব্রিটিশরা এও বলে তিনি নাকি একজন সুফি সাধক, নাম -নুর আলম শাহ এবং তিনি গদর পার্টির সদস্য।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এই বিদ্রোহে রয়েছে তা হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষিতে জার্মানি এবং ভারতীয় বিপ্লবীদের সম্পর্ক এবং তার ভূমিকা গোটা সময়টা জুড়ে। অনেকটাই কাছাকাছি এসেছিল সেই সময় ভারতীয় বিপ্লবীদের একটা অংশ এবং জার্মানির পররাষ্ট্র বিভাগ। জার্মানি শুধুমাত্র নৈতিক সমর্থন দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি। রীতিমত আর্থিক, পরিকাঠামোগত এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা সহ পাশে দাঁড়িয়েছিল। বেশ কিছু প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবী এবং জার্মান প্রতিনিধি নিয়ে গড়ে উঠেছিল বার্লিন কমিটি। এর প্রত্যক্ষ না হোক পরোক্ষ প্রভাব অবশ্যই পড়েছে সিপাহীদের মনে। তাঁদের মধ্যে প্রকট হয়েছে জার্মানির পক্ষে ভাবাবেগ এবং গড়ে উঠেছে একটা ভরসার জায়গা। বিশেষত ডাণ্ডি খাঁ, চিস্তি খান, তাজ মহম্মদ বা ইমতিয়াজ আলীর মতো বিদ্রোহীর মুখে বারবার শোনা গেছে জার্মানির জয়ের সম্ভাবনার কথা। কতটা প্রভাব ফেলেছিল এই আত্মবিশ্বাসের জায়গা তা ধরা পড়বে ল্যান্স নায়েক ফজল অসিমের একটি বক্তব্যে-

“All I can tell you is this: that Chiste Khan used to talk to my section in ‘D’ Company and tell them all the news with regard to the war that was unfavorable to the Sirkar [British government]. We used to hear news of the successes of the British, at which we were very pleased. Chiste Khan would say the exact opposite; that the British had been defeated, etc।” সাক্ষ্য দেওয়ার সময় ল্যান্স নায়েক এও বলে,  সে শুনেছিল ডাণ্ডি খান, আবদুল আলী, চিস্তি খান বলাবলি করছে যে খুব তাড়াতাড়ি জার্মান জিতবে এবং ব্রিটিশ রাজের বদলে গড়ে উঠবে জার্মান রাজ। জার্মান যুদ্ধবন্দীদের সঙ্গে তাঁরা এ নিয়ে প্রচুর আলোচনাও করত এবং আশা করেছিল বিদ্রোহে এই যুদ্ধ বন্দীরা তাঁদের সহযোগিতাও করবে মুক্তি পেলেই। প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান অনুযায়ী নিয়মিত তাজ মহম্মদ কে জার্মান কোয়ার্টারে যেতে দেখা যেত।  

বেশ কয়েকটা আলোচনার সূত্র ধরে অন্তত এটুকু বোঝা গেছে সিঙ্গাপুরের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিত অনেকটাই বিস্তৃত। শুধুমাত্র আঞ্চলিক ক্ষোভের জায়গা থেকে তো নয়ই বরং স্বাধীনতা স্পৃহা থেকে এবং বৃহত্তর জাতীয়তা বাদী আন্দোলনের প্রভাবেই সিপাহীরা বন্দুকটা ঘুরিয়ে সঠিক শত্রুকে চিনে নেয়। সামান্য কয়েকদিনের জন্য হলেও অনুভব করে স্বাধীনতার স্বাদ, দৃষ্টান্ত তৈরি করে সারা ভারতের আপামর জনগণের জন্য। অনেকে স্বীকৃতি দেননি, কেউ কেউ দিয়েছেন তবে এটা বড় পাওনা যে সিঙ্গাপুরের এই বিদ্রোহকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন স্বয়ং লেনিন।  

মনে হতে পারে সিঙ্গাপুরকে এত গুরুত্ব দিচ্ছি কেন? গুরুত্ব এই জন্য দিচ্ছি যে সেই সিঙ্গাপুর দেখিয়ে দিয়েছিল কোনও বড় নেতা ছাড়া, অভিজাত প্রভাবশালী নেতৃত্বের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ছাড়াই সাধারণ সেনারা কি করতে পারে। তাঁদের স্বাধীনতা স্পৃহা বা চেতনা কোনও অংশেই কম নয়। বরং তাঁদের সাহস, উদ্দীপনা বা আত্মসম্মানবোধের সামনে মাথা ঝোঁকাতে হবে অনেক রথী মহারথীকে। কিন্তু খামতির জায়গা যেটা সেটা হল আঞ্চলিকতার মধ্যে, একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে যাওয়ার প্রবণতা। সেটা সচেতন ভাবে না হলেও সেই আগুন দাবানল হয়ে ছড়িয়ে যেতে পারেনি। সবটা জোড়ার কাজটা বাকি রয়ে গেছে। গদর আন্দোলনের মতো সিঙ্গাপুরও একটা ব্যতিক্রম যেখানে মূলত কৃষক ঘরের ছেলেরা যারা সাধারণ সিপাহী হিসাবে দূর দেশে পড়ে থাকত তাঁরা ঘুরে দাঁড়াল, বিদ্রোহ করল। সাধারণভাবে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারায় প্রতিনিধিত্ব কতিপয় অভিজাতশ্রেণীর এবং মূলত মধ্যবিত্ত ছাত্র যুবর। খেটে খাওয়া মানুষ, নিম্ন বর্গীয় মানুষ, বা শ্রমিক-কৃষক কে ছুঁতে পারেনি বিপ্লবীরা। তাঁদের আত্মত্যাগ, সাহস বা স্বাধীনতা স্পৃহা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না কিন্তু সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে সামিল করার প্রশ্নে তাঁরা দীর্ঘ সময় জুড়ে উদাসীন-ই থেকেছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতকে মাথায় রেখে এই ব্যতিক্রম থেকে অনেক কিছুই শেখার আছে। 

গ্রন্থ তালিকা

১) সেহানবিশ  চিন্মোহন, রুশ বিপ্লব প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবী  কোলকাতাঃ র‍্যাডিকাল ইম্প্রেশন, ২০১৯।

২) দত্ত ভুপেন্দ্রনাথ, ভারতের দ্বিতীয় স্বাধীনতার সংগ্রাম কোলকাতাঃ র‍্যাডিকাল ইম্প্রেশন, ২০১৭

৩) দত্ত ভুপেন্দ্রনাথ, অপ্রকাশিত রাজনৈতিক ইতিহাস কোলকাতাঃ নবভারত পাবলিশার্স, ১৯৮৪

৪) মুখার্জী উমা, Two Great Indian Revolutionaries Kolkata: Dey’s Publishing, 2004

৫) দাশগুপ্ত সৌম্যব্রত, অগ্নিপুরুষ ভুপেন্দ্রনাথ দত্ত কোলকাতাঃ র‍্যাডিকাল ইম্প্রেশন, ২০১৮

৬) Puri  Harish K, Ghadar Movement National Book Trust, India, 2011

৭) Ker James Campbell, Political Trouble in India 1907-1917 Calcutta, reprinted,Delhi: Oriental Publishers, 1973

8) O’ Dwyer Sir Michael Francis, India as I knew it -1885-1925 London: Constable & Co.,1925

৯) সেন সত্যেন, বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা  ঢাকাঃ জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ১৯৮৬

১০) চক্রবর্তী পূর্ণচন্দ্র, সে যুগের আগ্নেয়পথ

১১) Streets-Salter Heather. “The Local Was Global: The Singapore Mutiny of 1915.” Journal of World History 24, no. 3 (September 2013): 539-576. University of Hawai’i Press.

১২)  Gin Ooi Keat. “Between Homeland and “Ummah”: Re-visiting the 1915 Singapore Mutiny of the 5th LightInfantry Regiment of the Indian Army”. Social Scientist 42, no. 7/8 (July–August 2014): 85-94. 

১৩) দেবদাস সুপ্রতীপ, স্বাধীনতা সংগ্রামী চরিতাভিধান  কোলকাতাঃ ডাঃ ননীগোপাল দেবদাস মেমোরিয়াল ট্রুাস্ট


মন্তব্য তালিকা - “প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এক স্বাধীন ভারত সরকার আর মুছে যাওয়া অভ্যুত্থানের গল্প”

  1. তথ্য পূর্ণ ঐতিহাসিক সত্য। লেখকের পরিশ্রম আমাদের সমৃদ্ধ করলো । এত বিস্তৃত বিবরণ অনেকেই জানেন না । শৈলেশ দের আমি সুভাষ বলছি সাপ্তাহিক বসুমতী তে ধারাবাহিক বেরিয়েছিল। পরে বই আকারে প্রকাশ পায়। যাই হোক্, লেখকের পরিশ্রম সার্থক।
    ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা রইলো ।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।