সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

দ্বারকানাথের মৃত্যুমুখোশ

দ্বারকানাথের মৃত্যুমুখোশ

অনিরুদ্ধ সান্যাল

নভেম্বর ২৬, ২০২২ ২৬০

সন ১৮৪৬, ১লা আগষ্ট। সময় সন্ধ্যা সওয়া ছটা। লন্ডনের প্রাচুয্যপূর্ণ মেফেয়ার অঞ্চলের সুপ্রসিদ্ধ সেন্ট জর্জ হোটেল। ঠিকানা ৩২ নম্বর অ্যালবিমার্ল স্ট্রীট। ৫১ বছর বয়সের এক বাঙ্গালী ভদ্রলোক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। মৃত্যুশয্যাতেও তাঁর অগাধ সৌজন্যবোধের এতটুকু ঘাটতি দেখা যায়নি। তাঁর সদাহাস্য মুখে ছিল একটিই কথা “আমি সন্তুষ্ট”। ভদ্রলোকের নাম প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর – রবীন্দ্রনাথের পিতামহ, যার সম্বন্ধে কবিগুরু চিরকাল এক রহস্যময় নীরবতা বজায় রেখেছেন।

দ্বারকানাথের নিজে হাতে লেখা শেষ চিঠির তারিখ ১৯শে মে, ১৮৪৬। পুত্র দেবেন্দ্রনাথকে মৃদু ভৎসনা করে লিখেছেন, “আমি এখন পর্যন্ত অন্যান্য মহল থেকে যা শুনেছি, তোমার আমলা সম্পর্কে মিঃ গর্ডন আমাকে যতটুকু লিখেছেন, আমাকে এখন তাদের রিপোর্টের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত করেছে। এটা আমার কাছে আশ্চর্যের যে, আমার সমস্ত সম্পত্তি [এখনও] ধ্বংস হয়নি। তোমার সময়, আমি নিশ্চিত যে সংবাদপত্রের জন্য লেখালেখিতে এবং ধর্মপ্রচারকদের সাথে লড়াইয়ে বেশি নিয়োজিত হয়েছে, অথচ সবচেয়ে বেশি সতর্কতার সাথে (তাদের) নজর রাখার পরিবর্তে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি পর্যবেক্ষণ এবং রক্ষা করার জন্য তুমি তোমার  প্রিয় আমলাদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলে।” [অনুবাদ সম্পাদকের] তারপর একই চিঠিতে পুত্রকে বিস্তারিত নির্দেশ দিয়েছেন কীভাবে বর্তমান সংকটের মোকাবিলা করা যায়।

অন্যত্র লিখেছেন তাঁর পাঠানো শ্বেতপাথরের মূর্তি, ইতালীর বাদ্যযন্ত্র ও অন্যান্য উপভোগ্য সামগ্রী বেলগাছিয়া ভিলায় এবং অন্যত্র কীভাবে সযত্নে রাখতে হবে। ব্রাহ্মধর্ম ও তত্ত্ববোধিনী সভা নিয়ে অত্যধিক মাতামাতি করে দেবেন্দ্রনাথ পারিবারিক বাণিজ্যের অবহেলা করে ফেলেছেন, তাতে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হলেও নিরাশ হননি তাঁর পিতা। সেবছরই জুন মাসের শেষে তাঁর এক বান্ধবী সেসিলিয়া আন্ডারউডের (ডাচেস অফ ইনভারনেস) বাড়ীতে একটি পার্টি চলাকালীন দ্বারকানাথের এক মারাত্মক অসুস্থতা দেখা দেয়। কাঁপুনি দিয়ে আসে সাংঘাতিক জ্বর। তারপর উত্তোরোত্তর খারাপ হয় তাঁর অবস্থা। চিকিৎসক ডাঃ মার্টিন তাঁকে আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্য নিয়ে যান ব্রাইটনে। হুলি নামক এক ভৃত্য বিশ্বস্তভাবে সেবা করেন তাঁর মনিবের। কিন্তু অবস্থার কোন পরিবর্তন ঘটেনি। ২৭শে জুলাই অতি সন্তর্পনে তাঁকে আবার নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর প্রিয় সেন্ট জর্জ হোটেলে।

ক্ষুরধার বুদ্ধির অধিকারী দ্বারকানাথের নিশ্চয়ই বুঝতে বাকি ছিল না যে তাঁর জীবনাবসান আসন্ন। ছারখার হয়ে গেছে ‘ব্যারণ’ উপাধিলাভের আশা, বা দেশে ফিরে একক প্রচেষ্টায় অর্জিত প্রভূত সম্পত্তি উপভোগের সম্ভাবনা। বাঙ্গালী মানসে যার ভাবমুর্তি শুধুমাত্র এক অপব্যয়ী, ভোগবিলাসী, উড়নচণ্ডী ইংরেজদের আজ্ঞাধীন এক জমিদারের। তাহলে মৃত্যুকালে কি করে এসেছিল এই অদ্ভুত প্রশান্তি? তাঁর জীবনীকার কৃষ্ণ কৃপালানি লিখেছেন, “…তবুও তিনি এই তিক্ত হতাশাকে, প্রচণ্ড শারীরিক যন্ত্রণাকে শান্তভাবে গ্রহণ করেছিলেন, একটা  ম্লান হাসি দিয়ে মৃদুভাবে তিনি কেমন অনুভব করেছেন সে সম্পর্কে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে বলতেন, “আমি সন্তুষ্ট।” এটা সম্ভবত ইঙ্গিত করবে, তার জাগতিক-মনোভাব এবং বিলাসপ্রিয়তা সত্ত্বেও, অন্তর্লীন অভ্যন্তরীণ আধ্যাত্মিক সম্পদ ছিল।”[অনুবাদ সম্পাদকের]

কিন্তু কী হয়েছিল দ্বারকানাথের? প্রথমে ডাক্তারেরা এক ধরণের ম্যালেরিয়া বলে সন্দেহ করেন। অথচ তাঁর ডেথ সার্টিফিকেটে লেখা আছে, “জ্বর, ডান ফুসফুসের রোগ।” সেই সময় এক গুজব রটে যে মহারানী ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে তাঁর সখ্যতা থাকায় তিনি কয়েকজন ব্রিটিশ আমলার বিষনজরে আসেন এবং তাঁকে সরিয়ে ফেলার চক্রান্ত করা হয়। (উল্লেখ্য যে, সরকারিভাবে পড়াশোনা বিশেষ না করলেও দ্বারকানাথ মহারানীকে প্রথম দর্শনেই বিমোহিত করেন। ৮ই জুলাই, ১৮৪২ সালে ভিক্টোরিয়া তাঁর ডায়েরীতে লেখেন, “ব্রাহ্মণ অসাধারণভাবে ইংরেজিতে কথা বলেন , এবং খুব বুদ্ধিমান, আকর্ষণীয় মানুষ।.” এর সত্যি মিথ্যে যাচাই করা কঠিন, কিন্তু এমন একটি ধারণা ঠাকুর পরিবারের অন্দরমহলেও অন্ততঃ কিছু লোক পোষণ করতেন। ইঙ্গিত মেলে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত “অন দ্য এজেস অফ টাইম” গ্রন্থে; দ্বারকানাথের প্রসঙ্গে তিনি লেখেন যে তাঁর অকাল মৃত্যু ঘটেছিল “কিছুটা রহস্যময় পরিস্থিতিতে।”[অনুবাদ সম্পাদকের]

প্রসঙ্গতঃ দ্বারকানাথের মৃত্যুর কয়েক ঘন্টা আগে থেকে লন্ডন শহর জুড়ে খুব ঝড়বৃষ্টি হয়েছিল। তাঁর বন্ধু প্রখ্যাত সাংবাদিক জে এইচ স্টকলার তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, “তার মৃত্যুর সময় এক ভয়ঙ্কর বজ্রঝড় বিরাট  শহরের  ওপর দিয়ে গেল, যেন এটা  স্বাভাবিক যে এই  মহান এক ব্যক্তির এক বিস্ময়কর গাম্ভীর্যের মধ্যে চলে যাওয়া উচিত।”[অনুবাদ সম্পাদকের]

সে যুগে ইংলন্ডে শবদেহ দাহ করা বেআইনি ছিল। তাই রাজা রামমোহন রায়ের মত দ্বারকানাথকেও সমাহিত করা ছাড়া কোন উপায় ছিল না। নানান ব্যবস্থাপনা, শবদেহের পরীক্ষা (পোস্ট মোর্টেম) করতে কয়েকদিন সময় লাগে এবং ৫ই আগস্ট তাঁর কবর দেওয়ার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ হয়। গুণমুগ্ধ মহারানী ভিক্টোরিয়া চারটি রয়্যাল ক্যারেজ পাঠিয়েছিলেন। শবদেহের সঙ্গে চলেছিলেন পুত্র নগেন্দ্রনাথ, ভাগ্নে নবীনচন্দ্র, স্যার এডওয়ার্ড রায়ান, মেজর হেন্ডার্সন, ডাঃ এইচ এইচ গুডিভ, প্রখ্যাত স্থপতি উইলিয়াম প্রিনসেপ, মোহনলাল প্রমুখ গণ্যমান্যেরা। শবাধারের ঢাকনির ওপর রূপার পাতে মৃতের পরিচিতি লেখা ছিল,

“Baboo Dwarakanauth Tagore, Zumindar,

Died 1st August, 1846, Aged 51 Years.”

গন্তব্যস্থল উত্তর লন্ডনের কেনসাল গ্রীন সেমেটারি। উপস্থিত বন্ধুরা যে তাঁকে যথোচিত সম্মান দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। পদমর্যাদায় এই গোরস্থানটি ছিল ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবির ঠিক পরেই। ওয়েস্টমিনস্টারের রেওয়াজ ছিল “শুধুমাত্র আমন্ত্রণ দ্বারা” – এ কারণে কেনসাল গ্রীনে অনেক নামকরা ব্যক্তির তথা মনীষীর সমাধি হয়। যেমন ইংরেজ রাজ পরিবারের অগাস্টাস ফ্রেডেরিক ও ডিউক অফ সাসেক্সের; এছাড়া চার্লস ব্যাবেজ (আধুনিক কম্পিউটারের পথিকৃৎ), উইলিয়াম মেকপীস থ্যাকারে, ইসম্বার্ড কিংডম ব্রুনেল, উইলিয়ম উইলকি কলিন্স প্রমুখের। এই সেমেটারির প্রতিপত্তি সম্পর্কে কিছুটা কৌতুকভরে জি. কে. বেস্টারটন পরবর্তীকালে লিখেছিলেন,

“Before the Roman came to Rye, or out to Severn strode,

The rolling English drunkard made the rolling English road.

My friends we will not go again or ape an ancient rage

Or stretch the folly of our youth to be the shame of age,

But walk with clearer eyes and ears this path that wandereth

And see undrugged in evening light the decent Inn of death;

For there is good news yet to hear and fine things to be seen

Before we go to Paradise by way of Kensal Green.”

পরবর্তীকালে অবহেলায় এই সমাধির অবস্থা নিতান্তই করুণ হয়ে দাঁড়ায়; তদুপরি এটি দেখতে এতই নগন্য ও বৈশিষ্ট্যহীন যে আমি প্রথমবার গিয়ে খুঁজেও পাইনি। এমনকি ওখানে সমাহিত বিখ্যাত গোটা পঞ্চাশেক মনীষীদের তালিকায় দ্বারকানাথের নামও নেই। পরে জেনেছি একা আমি নই, দ্বারকানাথের জীবনীকার কৃষ্ণ কৃপালানি ও অধ্যাপক ক্লিং ব্লেয়ার প্রথমবার গিয়ে একই সমস্যার সম্মুখীন হন। এই প্রসঙ্গে পরে আসছি।

৬ই আগষ্ট ১৮৪৬-এর লন্ডন টাইমসের পাঁচ নম্বর পাতায় জানতে পারি আরো এক আশ্চৰ্য্য তথ্য – “বলা হয়েছে যে মৃত ব্যক্তির তীক্ষ্ণ চেহারা এবং বৈশিষ্ট্যগুলি মৃত্যুর পরে এতই সামান্য পরিবর্তিত হয়েছিল যে শোকপূর্ণ অনুষ্ঠানে সাধারণ দাপ্তরিক কাজ সম্পাদনের জন্য আহ্বান করা কর্মচারীদের বেশ অসুবিধার সাথে বোঝানো হয়েছিল যে আত্মা পালিয়ে গেছে। এই অবস্থায় মুখের একটি কাস্ট নেওয়া হয়েছিল।” [অনুবাদ সম্পাদকের]

মৃতব্যক্তির মুখের ছাঁচ নেওয়ার একটা রেওয়াজ ছিল সে যুগে, বিশেষ করে তিনি যদি হতেন বিখ্যাত কোন মনীষী। মনে রাখতে হবে যে, সেটা ছিল ফটোগ্রাফি আবিষ্কারের আগের যুগের ঘটনা। মুখের এই রকম ছাঁচকে বলা হত ‘ডেথমাস্ক’ বা ‘মৃত্যুমুখোশ’। ঠিক এমনটি করা হয়েছিল যখন তেরো বছর আগে ব্রিস্টলে মৃত্যুবরণ করেন রাজা রামমোহন রায়। রামমোহনের মৃত্যুমুখোশের একটি কপি ১৮৮৬ সালে কলকাতায় পৌঁছায় শিবনাথ শাস্ত্রীর সৌজন্যে, যদিও মূল ছাঁচটির হদিশ হারিয়ে যায় রামমোহন-জিজ্ঞাসুদের কাছ থেকে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ওরিজিনাল-টা খুঁজে পাই স্কটল্যান্ডের এক মিউজিয়ামের গুদামঘরে। কিন্তু দ্বারকানাথের ক্ষেত্রে তাঁর মৃত্যুমুখোশের কী হল – তার কোন হদিশ মেলে না। দ্বারকানাথের জীবনীকার ও বিবাহসুত্রে ঠাকুর পরিবরের অন্তর্গত কৃষ্ণ কৃপালানি স্বীকার করেছেন, “এইভাবে নেওয়া মুখের কাস্টের কী হয়েছিল তা জানা যায়নি।”

লন্ডন টাইমসের বিবরণ থেকে আরো জানতে পারি, “ভারতে পাঠানোর জন্য হৃৎপিণ্ডটি দেহ থেকে অপসারণ করা হয়েছিল, সেখানে বাবু যে সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন তার নীতি অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” [অনুবাদ সম্পাদকের]

কার মাথায় এসেছিল এই উদ্ভট বুদ্ধি? কেই-বা মৃতদেহ থেকে হৃৎপিন্ডটা অপসারিত করলেন? কারাই-বা দাঁড়িয়ে দেখলেন এই বীভৎস কীর্তিকলাপ? মনে রাখতে হবে সেখানে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং ডা. গুডিভ এবং তার ছাত্রেরা। এঁদের মধ্যে অন্ততঃ দু’জন বিলেতে এসেছিলেন দ্বরাকানাথের দাক্ষিণ্যে। শিক্ষা বিস্তারে, বিশেষতঃ চিকিৎসাশাস্ত্র বিস্তারে, দ্বারকানাথের চরম উৎসাহ ছিল। বিলেতে ডাক্তারী পড়তে আসা প্রথম চারজন ভারতীয় ছাত্রের নাম – ভোলানাথ বসু, দ্বারকানাথ বসু, গোপলচন্দ্র শীল ও সূর্যকুমার চক্রবর্তী। শোনা যায় গোড়া হিন্দু ছাত্রদের যাতে শব ব্যবচ্ছেদের ব্যাপারে সংকোচ না থাকে তার জন্য ব্রাহ্মণ দ্বারকানাথ ঠাকুর গোড়ার দিকে নিজে উপস্থিত থাকতেন। তাই ছাত্রদের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল। এই চারজন ছাত্র ও তাদের গুরুমশাই ডাঃ গুডিভ দ্বারকানাথের সঙ্গে একই জাহাজে বিলেতে আসেন। কাজেই প্রয়োজনে এ কাজ এঁদের মধ্যে কেউ একজন নিপুণভাবে করে থাকতে পারেন। কিন্তু কেন করলেন এই কাজ? শবদেহ থেকে নির্গত হৃৎপিন্ড হিন্দু বা ব্রাহ্ম অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় কোন কাজে লাগে বলে বর্তমান লেখকের জানা নেই। তবে কী এর অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল? উপস্থিত ডাক্তারেরা কিছু সন্দেহ করেছিলেন? কোন অছিলায় হৃৎপিন্ডটা পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয় করতে? তাহলে সরকারী ডেথ সার্টিফিকেটে কি তাঁদের আস্থা ছিল না?

দ্বারকানাথের ডেথ সার্টিফিকেট

প্রসঙ্গতঃ সুৰ্য্যকুমার ছিলেন অসাধারণ মেধাবী এবং ডাঃ গুডিভের অতি প্রিয় ছাত্র। তুলনামূলক শারীরস্থান-তে ছ’শ ইউরোপিয়ান ছাত্রকে পরাভূত করে প্রথম স্থান ও স্বর্ণপদক অধিকার করে তিনি ইংরেজদের অবাক করে দিয়েছিলেন। সারা নামে এক ইংরেজ মহিলাকে বিয়ে করে খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করে সৌরজি কুমার গুডিভ চুকারবাট্টি নাম নিয়েছিলেন। পরে দেশে ফিরে ডাক্তারী প্র্যাকটিশ করে খুব নাম করেন। অদৃষ্টের খেলা এমনই যে ইনিও বিলেত সফরকালীন মাত্র ৪৭ বছর বয়সে মারা যান এবং ওঁকেও কেনসাল গ্রীন সেমেটারিতে সমাহিত করা হয়। ওঁর উত্তরসূরীদের মধ্যে সেফোলজিস্ট প্রণয় রায় এবং লেখিকা অরুন্ধতী রায় আজ বিশ্ববিখ্যাত।

আশ্চর্য ব্যাপার এই যে, হৃৎপিন্ডের কী হয়েছিল তাও জানা যায় না। কৃপালানি লিখেছেন, “হৃৎপিণ্ডের কী হয়েছিল তার কোনও রেকর্ড নেই, টাইমসের প্রতিবেদন অনুসারে এটি সরানো হয়েছিল।” [অনুবাদ সম্পাদকের]

তবে একথা জানা যায় যে বন্ধু ও আত্মীয়দের ইচ্ছা অগ্রাহ্য করে ব্রাহ্মমতে শ্রাদ্ধ করেছিলেন দেবেন্দ্রনাথ। তিনি লিখেছেন, হিন্দুমতে পিতার শ্রাদ্ধ না করতে মা পরলোক থেকে স্বপ্নাদেশ দিয়েছেন। দ্বারকানাথ সংস্কারমুক্ত হলেও হিন্দু বাছবিচারে নিমজ্জিত দিগম্বরী দেবীর কাছ থেকে এটা আশা করা তাঁর জীবিতকালেও কী যুক্তিযুক্ত?

কেন আসছি এইসব অপ্রিয়, অস্বাস্থ্যকর ও বিষাদগ্রস্ত প্রসঙ্গে? ডেথমাস্ক বা শবদেহ থেকে নির্গত হৃৎপিন্ড তুচ্ছ ব্যাপার নয় কি? কিন্তু আমার বক্তব্য যে, এই খুঁটিনাটিগুলি আদৌ তুচ্ছ বা অবান্তর নয়। দ্বারকানাথের স্মৃতি মুছে ফেলার বা তাঁকে দমন করার এক বৃহত্তর প্রয়াসের এটি একটি ক্ষুদ্র অংশ বা নিদর্শন মাত্র। আর এর ধরণটাও বেশ চতুর ও সুক্ষ্ম। দেশ পত্রিকার ১২ই ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৮ সংখ্যায় প্রিন্স দ্বারকানাথ প্রবন্ধের রচয়িতা স্বর্গত সিদ্ধার্থ ঘোষ লিখেছেন, “দ্বারকানাথকে প্রিন্স আখ্যায় ভূষিত করে প্রকারান্তরে তাকে বাঙ্গালী ভদ্রলোক জাত থেকে আলাদা করার পিছনে প্রধান ভূমিকা নিয়েছেন তাঁর পুত্র মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ। পৌত্র রবীন্দ্রনাথের উদাসীনতা যুগিয়েছে বাড়তি ইন্ধন।” ব্লেয়ার ক্লিং তাঁর রচিত দ্বারকানাথের জীবনী “পার্টনার ইন এম্পায়ার” বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন, “আমি আবিষ্কার করে অবাক হয়েছিলাম যে, কবি রবীন্দ্রনাথের পিতামহ এবং সাধক দেবেন্দ্রনাথের পিতা একজন ঝানু  ব্যবসায়ী ছিলেন যিনি জাহাজ, কয়লা খনি, বীমা কোম্পানি, ব্যাঙ্ক এবং নীল বাগিচার মালিক ছিলেন। সাথে সাথে আমি জাগতিক পিতা এবং তার অন্য জগতের পুত্রের মধ্যে একটি নাটকীয় দ্বন্দ্বের সম্ভাবনা অনুভব করতে পারি এবং দ্বারকানাথের গভীর হতাশার কথা কল্পনা করেছিলাম যখন দেবেন্দ্রনাথ কষ্টকরে তৈরী করা ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য চালিয়ে যেতে অস্বীকার করেছিলেন।এই ক্ষেত্রে গবেষণা আমার অনুমান নিশ্চিত করেছে; আমি আন্দাজ করেছিলাম যে ঠাকুর পরিবারের আদুললয় ঐতিহাসিকরা দ্বারকানাথের কৃতিত্বকে অতিরঞ্জিত করেছেন এবং আমি অবাক হয়ে আবিস্কার করেছি যে তিনি আসলে তারা যা বলেছিলেন তাই এবং আরও কিছু অতিরিক্ত।”[অনুবাদ সম্পাদকের]

ঠাকুরবাড়ীর ইতিহাস যাঁর নখদর্পণে, এহেন কৃপালানি লিখেছেন, “পিতার স্মৃতির প্রতি মহর্ষির অনাগ্রহ আরও আশ্চর্যজনক মনে হয় যখন কেউ বিবেচনা করে, যে রামমোহন রায়ের কাছ থেকে মহর্ষি তাঁর প্রধান ধর্মীয় অনুপ্রেরণা লাভ করেছিলেন, দ্বারকানাথের প্রতি তাঁর অগাধ স্নেহ ও শ্রদ্ধা ছিল কবি রবীন্দ্রনাথ কঠোর ও আধিপত্যশীল ব্যক্তিত্বের অধীনে বেড়ে উঠেছিলেন। তাঁর পিতার কাছ থেকে  তিনি কিছু মানসিক প্রতিবন্ধকতা আহরণ করেছিলেন যা তিনি “অনন্যসাধারণ মননের” অধিকারী প্রতিভাধর হওয়ার পরে কাটিয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু দ্বারকানাথের স্মৃতির প্রতি তার পিতার অনাগ্রহ দেখে মনে হয় তিনি [যেন] প্রতিহিংসা নিয়ে লালন করেছেন তাঁর স্মৃতি। দেবেন্দ্রনাথ তখন এবং তারপরে তাঁর পিতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে তাঁর  উল্লেখ করেছেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তার বিশাল রচনা এবং সংলাপে তাঁর পিতামহকে খুব কমই উল্লেখ করেছেন। দেখে মনে হবে যে তাঁর পিতার যেটি অনাগ্রহ ছিল তা তাঁর ক্ষেত্রে প্রায় বিদ্বেষপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।”[অনুবাদ সম্পাদকের]

মধ্যবিত্ত বাঙ্গালীর মনে দ্বারকানাথের ভাবমূর্তি একপেশে বা গতানুগতিক। একজন খ্যাতনামা বাঙ্গালী সাহিত্যিককে সম্প্রতি জিজ্ঞেস করেছিলাম, রবীন্দ্রনাথের লেখায় দ্বারকানাথের কোন উল্লেখ নেই কেন? তিনি ফস্ করে জবাব দিয়েছিলেন, ‘তার কারণ দ্বারকানাথ ছিলেন দুশ্চরিত্র।’ বিলেতে তাঁকে প্রতি মাসে নাকি এক কোটি টাকা পাঠাতে হত দেবেন্দ্রনাথকে। সত্যিই কি তাই? তিনি আরও বললেন যে, কলকাতার সান্স সুসি থিয়েটারের অভিনেত্রী এস্টার লীচ ও তাঁর কন্যার সঙ্গে দ্বারকানাথের খুব সখ্যতা ছিল। (এই ব্যাপার নিয়ে বেশ মুখরোচক কুৎসা রটিয়ে ছিলেন দেবেন্দ্রনাথের বন্ধু ও রামমোহনের দত্তক পুত্র রাজারাম। ১৮১৪ সালের জুন মাসে একটি চিঠিতে তিনি এ সবের বিবরণ জানান জ্যানেট হেয়ারকে।)

সুদর্শন ও তীক্ষ্ণাধী দ্বারকানাথের প্রতি অনেক মহিলা যদি আকৃষ্ট হয়ে থাকেন, তাতে আশ্চর্য্য হবার খুব কারণ নেই। আর যদি তিনি দুশ্চরিত্র ছিলেন, তাহলে কেমন করে পেরেছিলেন সে যুগের মনীষীদের যেমন রামমোহন রায়ের ভালোবাসা ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অগাধ শ্রদ্ধা? কৃপালানির বইতে উদ্ধৃত হয়েছে ক্ষিতীন্দ্রনাথের উদ্দেশ্যে বিদ্যাসাগরের মন্তব্য, “আমি দ্বারকানাথকে খুব ভালো করে চিনি। তার বিরুদ্ধে যা বলা হয়েছে তা নিছক দুর্নাম।” [অনুবাদ সম্পাদকের] অথচ দ্বারকানাথের সম্বন্ধে এই ধরনের বিকৃত ধারণা খুবই প্রচলিত আছে।

দ্বারকানাথের সঙ্গে অনেক মহিলার বন্ধুত্ব ছিল। কেউ কেউ তাঁকে অন্তরঙ্গতার সঙ্গে ‘Dwarky’ বলেও সম্বোধন করতেন। শার্লট হার্ভে নামে এক মহিলা তো বিয়ের আগে অন্ততঃ একবার নৈশভোজ করতে চেয়েছিলেন। ১৮৩৭ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, “তবে আমি বিশ্বাস করি যে বিয়ের আগে একবার আপনার সাথে খেতে পারব। বিশ্বাস করুন, সর্বদা চাই আপনার আন্তরিক হতে এবং আমি আর বলার সাহস করি না।” [অনুবাদ সম্পাদকের] এইসব ঘটনা সে যুগে হয়তো ঠাকুর পরিবারকে বিব্রত করেছিল। এজন্যই বুঝি ডেথ সার্টিফিকেটে উল্লিখিত জেমিমা পেইন সম্বন্ধে দ্বারকানাথের জীবনীকাররা (কিশোরীচাঁদ মিত্র, কৃষ্ণ কৃপালানি প্রমুখেরা) কেউই কোন উচ্চবাচ্চ করেননি। কে ছিলেন এই জেমিমা পেইন, যিনি মৃত্যুর সময় তাঁর কাছে ছিলেন? যাঁকে সাক্ষী ধরা হয়েছে “Jemima Payne, present at death, 32 Albemerle Street” – অর্থাৎ যার ঠিকানা দ্বারকানাথের সঙ্গে এক? এমন হতেই পারে যে তিনি সেই সেন্ট জর্জ হোটেলের কোন কর্মচারী বা ম্যানেজার ছিলেন। প্রশ্ন হতে পরে তাহলে তাঁর কোন উল্লেখ নেই কেন? (প্রসঙ্গতঃ রামমোহন যখন মৃত্যুশয্যায়, সেই সপ্তাহে তাঁর ঘর থেকে কে ঢুকেছেন বা কে বেরোচ্ছেন তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ রয়েছে তাঁর জীবনীকারদের লেখায়, তাঁর ডাক্তারের রোজনামচায়।) একথাও জানা যায় যে দ্বারকানাথ ক্লারেট বা অন্যন্য সুরাপান করতেন। তাই বলে তাঁকে দুশ্চরিত্র বলাটা আজকের দিনে অহেতুক নয় কি?

এবার দ্বারকানাথের ভোগবিলাসী আচরণ, বেহিসেবী খরচা, সাহেবদের নিয়ে খানাপিনা এবং উশৃঙ্খল ফুর্তির প্রসঙ্গে আসা যাক। দেবেন্দ্রনাথের কাছ থেকে জানা যায় যে, উক্ত কারণগুলির জন্য দ্বারকানাথের শেষ জীবনে কার-টেগোর কোম্পানি দেউলিয়া হবার উপক্রম হয়। এই কোম্পানি লাটে ওঠার পর মহর্ষি লিখলেন, “বিষয়সম্পত্তি সকলই হাত হইতে চলিয়া গেল। যেমন আমার মনে বিষয়ের অভিলাষ নাই, তেমনি বিষয়ও নাই; বেশ মিলিয়া গেল।” অথচ পৈতৃক সূত্রে পাওয়া দুটি জমিদারী ছাড়াও তাঁর নিজের অর্জিত দুটি জমিদারীর ট্রাস্ট ডিড রেখে গিয়েছিলেন দ্বারকানাথ। বিরাহিমপুর, পান্ডুয়া, কালীগ্রাম ও শাহজাদপুরের জমিদারীগুলি বহুপুরুষ ধরে ঠাকুর পরিবারের স্বচ্ছলতা বজায় রেখেছিল।

দ্বারকানাথ জমিদারীর সঙ্গে ঋণভার রেখে গিয়েছিলেন একথা অনস্বীকার্য। কিন্তু এখানেও আছে দেবেন্দ্রনথের অতিরঞ্জন। তিনি বলেছেন যে, ১৮৪৮ সালে কার-টেগোরের দেনা ছিল এক কোটি টাকা আর পাওনা ছিল সত্তর লক্ষ অর্থাৎ ত্রিশ লক্ষ টাকার ঘাটতি। অথচ সিদ্ধার্থ ঘোষের গবেষণা থেকে জানা যায় যে, কোম্পানীর মোট দেনা ছিল ২৫ লক্ষ ৮৬ হাজার টাকা; আর সমস্ত সম্পত্তি ও অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ ২৯ লক্ষ ২ হাজার ৯৫০ টাকা। (১৮৪৮ সালের ৫ই এপ্রিল বেঙ্গল হরকরার পাতায় প্রকাশিত এই তথ্য।) দেবেন্দ্রনাথ আরও লিখেছেন, ব্যক্তিগত ঋণশোধের জন্য দ্বারকানাথ ট্রাস্ট ডিডের সম্পত্তিও হস্তান্তর করতে রাজী ছিলেন। কিন্তু দ্বারকানাথের অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী পার্টনার গর্ডন এবং ইয়ং জানতেন ট্রাস্ট ডিডের সম্পত্তিতে এইভাবে হস্তক্ষেপ করার কোন অধিকারই ছিল না দেবেন্দ্রনাথের। তদুপরি ক্লিং-এর লেখা থেকে জানা যায় গর্ডন এবং স্টুয়ার্ট উভয়েই দেবেন্দ্রনাথ, নগেন্দ্রনাথ ও গিরীন্দ্রনাথকে সম্পূর্ণ আপোস-মীমাংসার সুযোগ দিয়েছিলেন। সিদ্ধার্থ ঘোষ লিখেছেন, “কার-টেগোর কোম্পানীর অবস্থা মোটেই শোচনীয় ছিল না … ঠাকুর পরিবারের সংস্রবচ্যুত হয়ে গর্ডন-স্টুয়ার্ট কোম্পানী নামে ১৮৬৭ সাল পর্যন্ত ব্যবসা চালিয়ে যান।” প্রসঙ্গতঃ উল্লেখযোগ্য যে মহর্ষি পরবর্তীকালে জমিদার হিসেবে যথেষ্ট বৈষয়িক বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছিলেন।

তাহলে দ্বারকানাথের মৃত্যুর পর কার-টেগোর বা ইউনিয়ন ব্যাংক চালনার ব্যাপারে তার এত অনীহা কেন দেখা গিয়েছিল? এর উত্তর পাওয়া যায় ঠাকুর পরিবারের-ই ক্ষিতীন্দ্রনাথের লেখায়, “একটি বৃহৎ কারবার চালাইতে গেলে যে বুদ্ধি, দূরদর্শিতা এবং সর্বোপরি যে সংযম আবশ্যক, সত্যের অনুরোধে চলিতে বাধ্য দেবেন্দ্রনাথ প্রমুখ তিন ভ্রাতার কেহই তাহা প্রাপ্ত হন নাই। পরিশ্রম করিয়া, মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়া অর্থোপার্জনে তাঁহারা তিনজনেই অসমর্থ ছিলেন বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। … দেবেন্দ্রনাথ আসলে শান্তিপ্রিয় মানুষ ছিলেন। বেশ চুপচাপ করিয়া দর্শনশাস্ত্ৰ আলোচনা করিবেন, আর নিঝঞাটে প্রয়োজন মতো টাকাকড়ি জমিদারি হইতে আসিলেই দেবেন্দ্রনাথ সুখী।”

দেবেন্দ্রনাথের প্রতি রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অটল আনুগত্যসম্পন্ন। অথচ চরিত্রের দিক থেকে তাঁর মিলটা ঠাকুর্দার সঙ্গেই বেশী। কৃপালানি লিখেছেন, “…রবীন্দ্রনাথ এতটা গোঁড়া ব্রাহ্ম ছিলেন না যে, দ্বারকানাথের মত যারা হিন্দু উপাসনার গোঁড়া রীতিতে বিশ্বাস করতেন তাদের সকলকে ঘৃণা করবেন; তার উপন্যাস ‘গোরা’ এবং অন্যান্য অনেক লেখা তার বুদ্ধিবৃত্তির উদারতার যথেষ্ট সাক্ষ্য বহন করে; তিনি তপস্বী ছিলেন না এবং জাগতিক মানসিকতাকে অবজ্ঞা করেননি। প্রকৃতপক্ষে, তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, তাঁর ব্যক্তিগত বাধা সত্ত্বেও, জীবনের প্রতি পূর্ণ রক্তের প্রেমে। তাহলে কেন তিনি তাঁর পিতামহের প্রশংসা করতে ব্যর্থ হলেন যার কাছে তিনি কেবল তাঁর অস্তিত্বের বস্তুগত স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য ঋণী ছিলেন না, তাঁর বহুমুখী প্রতিভা, তাঁর জীবনের প্রতি সম্পূর্ণ-ভালবাসা, সঙ্গীত, শিল্প এবং থিয়েটারের প্রতি তার ভালবাসা, তাঁর উদাত্ত দৃষ্টিভঙ্গি, তাঁর সর্বজনীন মানসিকতা, এবং অবশ্য ই বিদেশ ভ্রমণের প্রতি তাঁর ভালবাসা [এসেছে তাঁর থেকেই ]? তিনি আরও বলেছেন যে, “রবীন্দ্রনাথ যদি তাঁর পিতামহের জীবন ও কর্মকাণ্ড, তাঁর  উদার আবেগ এবং মানবতাবাদী কাজগুলি অধ্যয়ন করার কষ্ট সহ্য করতেন তবে তিনি তাঁকে বুঝতেন এবং প্রশংসা করতেন।”[অনুবাদ সম্পাদকের]

একাধিকবার লন্ডনে গেলেও একবারের জন্যও তিনি কেনসাল গ্রীনে ঠাকুর্দার সমাধিস্থলে গিয়েছিলেন বলে জানা যায় না। কাজেই যখন জানতে পারি যে কার-টেগোরের আর্থিক সংকটের বিষয় অতিরঞ্জন, গর্ডন-ইয়ং-এর ভূমিকা, প্রতিকূল মন্তব্য ইত্যাদি দেবেন্দ্রনাথের কীর্তিকলাপ নিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করার রাস্তা তিনি বন্ধ করে দিয়ে গেছেন, তখন খুব আশ্চৰ্য্য হই না। স্বয়ং ক্ষিতীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “ইহার (কার-টেগোর) সম্বন্ধীয় কাগজপত্র পূজ্যপাদ রবীন্দ্রনাথের কর্তৃত্বে এবং তাঁহার আদেশে দগ্ধীভূত হওয়াতে এই কারবার যে কত বিস্তৃত ছিল এবং কী রূপে পরিচালিত হইত তাহার বিবরণ উদ্ধার করিবার কোন আশা নাই।” মূল্যবোধের যে সংকটের তাগিদে ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ এই কাণ্ডটি করেন ব্লেয়ার ক্লিং বিশ্লেষণ করেছেন তাঁর “রবীন্দ্রনাথ’স বনফায়ার” প্রবন্ধে। ক্লিং-এর মতে, এটি কবির আবেগ ও অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে এক আবেগপূর্ণ প্রতিক্রিয়া। কিন্তু ক্ষিতীন্দ্রনাথের ব্যাখ্যাটিও যে সমানভাবে প্রযোজ্য তাতে লেখকের কোন সন্দেহ নেই।

সিদ্ধার্থ ঘোষের মতে দ্বারকানাথের প্রতি রবীন্দ্রনাথের মনটিকে বিষিয়ে দেন দেবেন্দ্রনাথ। ঠাকুর্দার মৃত্যুর ১৭ বছর পরে রবীন্দ্রনাথের জন্ম; তিনি কখনই দ্বারকানাথের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসেননি। অথচ তাঁর জ্যেষ্ঠভ্রাতা সত্যেন্দ্রনাথের ছিল ঠাকুর্দার প্রতি সম্পূর্ণ অন্য মনোভাব। অসাধারণ মেধাবী সত্যেন্দ্রনাথ এক সুকঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রথম ভারতীয় আই. সি. এস. হন -একথা সর্বজনবিদিত। বিলেতে প্রশিক্ষণের সময় তিনি দেবেন্দ্রনাথের কবলমুক্ত অবস্থায় ঠাকুর্দার স্মৃতির সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করেন। এই সময়েই তাঁর শিশুপুত্র টোবির ঠান্ডা লেগে মৃত্যু ঘটে এবং তাকে দ্বারকানাথের কবরের কাছেই সমাহিত করা হয়। (জ্ঞানদানন্দিনীর স্মৃতিকথায় এই ঘটনা জানা যায়, যদিও বর্তমান লেখক বহু চেষ্টা করেও এর সঠিক স্থান নির্ণয় করতে পারেননি।) ঠাকুর্দার প্রতি বিদ্বেষ থাকলে সত্যেন্দ্রনাথ নিশ্চয়ই এরকম হতে দিতেন না।

সত্যেন্দ্রনাথের জন্ম হয় ১৮৪২ সালে, অর্থাৎ যে বছর দ্বারকানাথ তাঁর প্রথম ইউরোপ সফর সেরে দেশে ফেরেন সেই বছরে। তাঁর বয়স যখন চার বছর, সেই সময় দ্বারকানাথ দ্বিতীয় ও অন্তিমবারের জন্য ইউরোপ ভ্রমণে বেরোন। শিশুমনে হয়তো প্রশ্রয়পূর্ণ ঠাকুর্দার কিছু স্মৃতি রয়ে গিয়েছিল। ঠাকুরবাড়ীতে তিনিই দ্বারকানাথের পরে প্রথম কালাপানি পার হন। হয়তো সে কারণেও তিনি ঠাকুর্দার প্রতি সমবেদনা অনুভব করতেন। নিজের বুদ্ধি ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার দরুণ তিনি দ্বারকানাথের স্বতন্ত্র মুল্যায়ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এছাড়া বিলেতে পৌঁছনোর পরপরেই তার একটি অভিজ্ঞতা হয়। সে সম্বন্ধে নিজে কিছু না বললেও তাঁর সুহৃদ মনমোহন ঘোষের লেখা একটি চিঠিতে এই ঘটনাটি আমরা জানতে পারি। এর আগেই উল্লেখ করেছি যে দ্বারকানাথের বৈশিষ্ট্যহীন সমাধিটি কেনসাল গ্রীনে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ওখানে সমাহিত প্রথম ৫০ জন বিখ্যাত মনীষীদের মধ্যে দ্বারকানাথের নাম নেই। বস্তুতঃ ১৯ই মে, ১৮৬২ সালে জ্ঞানেন্দ্রনাথকে লেখা চিঠিতে মনমোহনের বিরক্তি, ক্রোধ ও নৈরাশ্য স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। এই চিঠির কিছু অংশ নীচে উদ্ধৃত করছি। মনে রাখতে হবে যে এই চিঠির বিষয় হচ্ছে মনমোহন ঘোষ ও সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কেনসাল গ্রীন প্রথমবার দর্শনের অভিজ্ঞতা –

” জায়গাটির নামটি অবশ্যই আপনার হৃদয়কে এক ধরণের বিষণ্ণ শ্রদ্ধায় ভরিয়ে দেবে, মহান ব্যক্তিটি সেখানে তাঁর চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে আছেন। সমাধিটির দৃশ্যটি, যদিও এটির  নীচে শুয়ে থাকা মৃত ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধাকে জাগ্রত করেছিল, একই সাথে আমরা যা দেখেছি তার সঙ্গে আমরা বাড়িতে যে বর্ণনা শুনেছিলাম তা কীভাবে মেলানো যায় তা আমাদের এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলেছিল। এ ব্যাপারে যাদের হাত ছিল তা দেখে আমরা উভয়েই বিরক্ত হয়েছিলাম। আমরা শুনেছিলাম যে বাংলাতে একটি শিলালিপি সহ একটি সুদর্শন সমাধি রয়েছে কিন্তু আমরা জানতে পেরেছি যে এগুলি নিছক বানানো এবং সম্পূর্ণ মিথ্যা।এটি একটি  পাথরের খণ্ড ছাড়া আর কিছুই নয় (মারবেল নয়) প্রায় ৩ হাত দৈর্ঘ্যের নিচের শব্দগুলি ছাড়া কোন শিলালিপি নেই”[অনুবাদ সম্পাদকের]:

‘D.T.

Dwarkanath Tagore of Calcutta

Absit: 1st August, 1846’

এই পাথরের টুকরোটিতে খোদাই করা কটি অক্ষর ছিল, যা একটি লোহার শিকল দিয়ে ঘেরা এবং আছে ৪টি সাইপ্রেস গাছ, যারা প্রায় মারা যাচ্ছে। এর পাশে আমরা আরও কয়েকটি সমাধি এবং সুন্দর স্মৃতিস্তম্ভ দেখেছি, কিন্তু আমাদের মনে যে চিন্তা এসেছিল তার কারণে আমরা সবসময় অস্বস্তিতে ছিলাম। ইংল্যান্ডে আসার সময় আমরা যার উদাহরণ অনুসরণ করেছিলাম, এবং সেই সফরের জন্য আমরা কেবল যাঁর কাছে ঋণী ছিলাম, তিনি একটি অতি নগণ্য সমাধিতে আছেন, আর তাঁর দরবারিরা সুন্দর মার্বেল সমাধির নীচে শুয়েছিলেন যার উপরে সুদর্শন শিলালিপি রয়েছে। আমাকে বলা হয়েছে যে আপনার মামাকে (মহর্ষি) সেই সমাধির জন্য হাজার হাজার টাকা দিতে হয়েছে। আমি জানলাম এটির দাম ২ পাউন্ড বা ২০ রুপির বেশি নয়৷ সংক্ষেপে এটি ছিল সারা দেশে আমাদের দেখা সবচেয়ে কুৎসিত সমাধি … আপনি কি আমাদের মামার সাথে এই সব বলবেন, আমার শ্রদ্ধার সাথে তাকে বলবেন যে আমি এই বিশ্বাসঘাতকতা নিয়ে বেশ বিরক্ত … আপনি তাকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন দেরি না করে, আমাদের জানাবেন যে, তিনি তার পিতার সমাধি পরিবর্তন করতে চান কিনা এবং তাতে একটি যোগ্য শিলালিপি স্থাপন করতে চান কিনা এবং এই উদ্দেশ্যে তিনি কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে চান।যদি তিনি শীঘ্রই সিদ্ধান্ত নেন এবং জুলাই মাসের মাঝামাঝি আমাদের জানান, তাহলে আমরা ১লা আগস্ট বার্ষিকীতে একটি নতুন সমাধি তৈরি করতে পারি।.”[অনুবাদ সম্পাদকের]

দ্বারকানাথ ঠাকুরের সমাধি

এই সনির্বন্ধ অনুরোধের কোন উত্তর মেলেনি দেবেন্দ্রনাথের তরফ থেকে। তবে এই অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সত্যেন্দ্রনাথ আসল ব্যাপারটা বিশেষতঃ দেবেন্দ্রনাথের অতিরঞ্জন ও দ্বারকানাথের স্মৃতিকে খাটো করার প্রয়াস নিশ্চয় ভালই বুঝেছিলেন।

পিতার প্রতি দেবেন্দ্রনাথের মনোভাব কেন এতটা প্রতিকূল হয়েছিল? তাঁর লেখায় এ বিষয়ে স্ববিরোধিতার অনেক পরিচয় পাওয়া যায়। আশ্চৰ্য্য বিষয় এই যে দ্বারকানাথ ও দেবেন্দ্রনাথ দুজনের জীবনেই আদর্শ চরিত্র বলতে দ্বারকানাথের মা অলকাসুন্দরী (আসলে মাসী, তিনি দ্বারকানাথকে দত্তক নিয়েছিলেন) এবং রাজা রামমোহন রায়। অথচ তাদের প্রভাবে কী করে এঁরা দুই বিপরীত পথের দিশারী হলেন?

খুব কাছের থেকে দেখা কী এমন ঘটনা কী ঘটেছিল যার জন্য দেবেন্দ্রনাথ তাঁর পিতার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হন? ১৮৩৩ সালে রামমোহন যখন চরম আর্থিক সংকটের সম্মুখীন এবং ম্যাকিন্টশ কোম্পনীর কাছে তাঁর টাকা পয়সা আটকে ছিল, সে সময় দ্বারকানাথ কেন তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেননি? কেন তিনি ম্যাকিন্টশ কোম্পনীর যাবতীয় সম্পত্তি কিনতে ব্যস্ত ছিলেন? তিনি কী রাজা রামমোহনের দুরবস্থার কথা জানতেন না? নাকি সেই মূহুর্তে ভোগবিলাসে, সুন্দরী রমণীর সাহচর্য্যে এত বিভোর ছিলেন যে খেয়াল হয়নি? অথচ রাজার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে তিনি শিশুর মতো কেঁদেছিলেন এবং পরে ব্রিস্টলে তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রিন্সেপকে দিয়ে নির্মাণ করিয়েছিলেন এক চমৎকার স্মৃতিসৌধ। এসব কান্ডকারখানা কী ছিল দ্বারকানাথের এক গভীর অপরাধবোধের অভিব্যক্তি? এসব কাছের থেকে দেখেই কি ব্রাহ্মধর্মের ধারক-বাহক ও রামমোহনের মানসপুত্র দেবেন্দ্রনাথের মনে তাঁর পিতাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার বাসনা প্রবল হয়ে উঠেছিল?

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর

হয়তো বা মৃত্যুর তিনদিন আগে অলকাসুন্দরীকে গঙ্গাযাত্রায় (তাঁর ধর্মান্ধ মাতা দিগম্বরী দেবীর প্রভাবে?) নিয়ে যাওয়ায় ঘোর মনোমালিন্য ঘটেছিল পিতার সঙ্গে? দ্বারকানাথ তখন উত্তর ভারত সফর করছিলেন। একুশ বছর বয়সের নাতির কাছে মিনতি করেছিলেন অলকাসুন্দরী। আরো বলেছিলেন দ্বারকানাথ উপস্থিত থাকলে এরকমটা কখনোই হতে দেবেন না। ঠিক বোঝা যায় না কী কারণে প্রিয় ঠাকুমার কথায় কর্ণপাত করেননি দেবেন্দ্রনাথ। ফিরে এসে এই খবর পেয়ে দ্বারকানাথ যে পুত্রের এরকম অর্বাচীনতায় অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন তা অনুমান করা যায়। কারণ পরবর্তীকালে দিগম্বরী দেবী যখন মরণাপন্ন অসুস্থ হন তখন গঙ্গাযাত্রা করতে দেননি দ্বারকানাথ। বরং শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা করিয়েছেন। “রবীন্দ্রনাথ’স বনফায়ার” প্রবন্ধে ক্লিং লিখেছেন, “দেবেন্দ্রনাথের বিদ্বেষের উৎস হতে পারে তাঁর পিতার আচরণের জন্য তাঁর মায়ের লজ্জা ও বিব্রতবোধ। এই অনুভূতি সারাজীবন স্থায়ী হবার মত  যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল।” তিনি আরো লিখেছেন, “তাঁর বাড়ির মহিলাদের  গোঁড়ামি থেকে সামান্যতম বিচ্যুতিও সহ্য করতে পারতেন না। ১৮৪২ সালে যখন তিনি ইউরোপ থেকে ফিরে আসেন এবং শুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠান করতে অস্বীকার করেন, তখন তাঁরা তাকে অপবিত্র মনে করে এবং জোড়াসাঁকো প্রাঙ্গণের একটি পৃথক ভবনে নির্বাসিত করেন। বালক দেবেন্দ্রনাথ, জোড়াসাঁকোর অন্দরমহলে লালিত-পালিত, ইউরোপীয় মহিলাদের সাথে তাঁর বাবার সম্পর্কের বিষয়ে পরচর্চা এবং নিচু কথা শুনে বেড়ে ওঠেন।”[অনুবাদ সম্পাদকের]

সিদ্ধার্থ ঘোষ আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, “ম্লেচ্ছ আচরণের জন্য স্বামী সহবাসে অসম্মতি জানিয়েছিলেন বলে দ্বারকানাথ-পত্নীর হিন্দু-সাত্বিকতা প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু এই ঘটনার পর খ্যাতি-প্রতিপত্তির শিখরবাসী হয়েও দ্বারকানাথ যখন তাঁর বৈঠকখানা বাড়িয়ে নিজেকে সরিয়ে আনেন, স্ত্রী-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করে, তখন সেটা কোন গুণ হিসাবে ধরা পড়ে না আমাদের মধ্যবিত্ত মননে। দিগম্বরী দেবী শুধু টাকার প্রয়োজনে স্বামীর সামনে এসে দাঁড়াতেন, তারপর ঘড়া ঘড়া গঙ্গাজল ঢেলে শুদ্ধ করতেন নিজেকে।”

দ্বারকানাথ প্রজাবৎসল ছিলেন না। তাঁকে নিপাট ভালো মানুষ বলেও ভাবা সম্ভব নয়। কিন্তু তাঁর গুণ ছিল অনেক। সিদ্ধার্থ ঘোষ লিখেছেন, “এই বিপুল কর্মকান্ডের কেন্দ্রে আছেন মাঝারি উচ্চতার, পেলব চেহারার একটি মানুষ – দ্বারকানাথ ঠাকুর আর তাঁর ম্যানেজিং এজেন্সি সংস্থা – কার-টেগোর অ্যান্ড কোম্পানী। সময়টা ১৮২০ থেকে ১৮৪৬, যে পর্বে কোলকাতায় একটা মিনি ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভোলিউশন প্রায় ঘটতে চলেছিল। সতীদাহ প্রথার উচ্ছেদে ও সামাজিক হিত সাধনে রামমোহনের অনুরাগী ও সহযোদ্ধা দ্বারকানাথ। আধুনিক চিকিৎসা ও ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা বিস্তারে উদ্যোগী। অন্ধ ও কুষ্ঠরোগাক্রান্তের হিতার্থী, কলকাতা নগরের উন্নতিকামী জাস্টিস ফর পিস্, একাধিক সংবাদপত্রের স্বত্ত্বাধিকারী, মুদ্রাযন্ত্রের স্বাধীনতা অর্জনে প্রয়াসী, কলকাতা থিয়েটার ও চরুকলা সংস্থার পৃষ্ঠপোষক। দ্বারকানাথের চেয়ে রোমাঞ্চকর ব্যক্তিত্ব উনবিংশ কেন বিংশ শতাব্দীতেও বিরল।”

১৯৪৩ সালে ইংরেজ সাংবাদিক এইচ এন ব্রেলস্ফোর্ড শিল্পপতি জামশেদজী টাটার প্রসঙ্গে লেখেন, “কেন টাটারা অনন্য বা প্রায় অনন্য ? ভারতীয় বা ইংরেজ, যারা একই ধরনের  উদ্যোক্তা ছিল, পঞ্চাশ বা ষাট বছর আগে যাদের একই ধরনের  কাজ করা উচিত ছিল তারা কোথায় ছিল?” এর প্রত্যুত্তরে ব্লেয়ার ক্লিং দেখিয়েছেন যে জামশেদজীর আবির্ভাবের ষাট বছরেরও বেশী আগে সেইরকমের ক্ষমতাবান ব্যাক্তিত্ব ছিলেন দ্বারকানাথ। উপরন্তু দ্বারকানাথের সমস্ত কাজ একটি জীবনে একাহাতে করা। তিনি নাসেরওয়াজীর মতো কর্মদক্ষ পিতার পথনির্দেশ পাননি, আবার দোরজীর মতো সুযোগ্য পুত্রও পাননি তাঁর বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যকে চিরস্থায়ী করার জন্য পাননি ঠাকুর পরিবারের মহিলাদের শ্রদ্ধা ও সহায়তা। এখানে উল্লেখ্য, টাটা পরিবারের মহিলারা জামশেদজীর পুত্রদের শিক্ষা দিয়েছিলেন তাঁকে শ্রদ্ধা করতে, তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করতে – এর নজির পাওয়া যায় ক্লিং-এর লেখায়।

এহেন দ্বারকানাথকে আমরা ভুলে গেলাম কী করে? কোথায় বা গেল সেই মৃত্যুমুখোশ? দেবেন্দ্রনাথ, নগেন্দ্রনাথ, নবীনচন্দ্র, কিশোরীচাঁদ মিত্র – কারো লেখা থেকে এ বিষয়ে কিছু জানা যায় না। সংরক্ষণের ব্যাপারে আমাদের জাতিগত স্বভাবটাই দুর্বল। কিন্তু অবজ্ঞা, অবহেলা, ইতিহাসবোধের অভাব কোন শোচনীয় পর্যায় পৌঁছলে এরকম একটি মূল্যবান জিনিষ বেমালুম হারিয়ে যায়? ১৯শে মে, ১৮৪৬-এর পর দ্বারকানাথ আর কোন চিঠি লেখেননি এটা বিশ্বাস করা কঠিন। তাঁকে ঘিরে নাবালক নগেন্দ্রনাথ ও নবীনচন্দ্র ছাড়াও অনেক বিচক্ষণ লোকজন ছিলেন, যেমন তার চিকিৎসক ডাঃ মার্টিন। তাদের কাউকে কোন নির্দেশ দেননি দ্বারকানাথ? তিন বছর আগে করা উইলে কোন পরিবর্তন করার কথা কী তাঁর মাথায় আসেনি? নাকি এই সমষ্টিগত স্মৃতিবিলোপ কারো আদেশে ঘটেছিল? অথবা সেইসব কাগজপত্র রবীন্দ্রনাথের আদেশে দগ্ধীভূত দলিল দস্তাবেজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত?

আক্ষরিক অর্থে যে মৃত্যুমুখোশটি অন্তর্হিত হয়েছে, তা ছাড়াও এখানে ভাবার্থে একটি ‘মৃত্যুমুখোশ’ বর্তমান, যার অন্তরালে নিবার্সিত আসল দ্বারকানাথ। সেই মুখোশ উন্মোচন করে নতুন করে তার মূল্যায়ন করার সময় এসেছে। অতীন্দ্রিয়বাদ থেকে দূরে সরে আসা, শিল্পায়ন ও বিশ্বায়ণে অগ্রণী আজকের ভারতবর্ষে হয়তো দেখা যাবে যে প্রথম বহুজাতিক উদ্যোক্তা হিসেবে তার প্রাসঙ্গিকতা কবিগুরুর চেয়ে কিছু কম নয়।

সহায়ক গ্রন্থাবলীঃ

১। কিশোরীচাঁদ মিত্র, ‘দ্বারকানাথ ঠাকুর’, ১৯৬২

২। ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘দ্বারকানাথ ঠাকুরের জীবনী’, ১৩৭৬

৩। ব্লেয়ার বি ক্লিং, পার্টনার ইন এম্পায়ার ; দ্য এবং অফ এন্টারপ্রাইজ ইন ইস্টার্ণ ইন্ডিয়া, ১৯৭৭

৪। সিদ্ধার্থ ঘোষ, প্রিন্স দ্বারকানাথ’, দেশ পত্রিকা, ১২ ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৪

৫। ব্লেয়ার বি ক্লিং, ‘দ্য টাটাস্ অ্যান্ড দ্য টেগোরস্ টোনি স্টুয়ার্ট সম্পাদিত ‘শেপিং বেঙ্গলী ওয়ান্ডর্স পাবলিক অ্যান্ড প্রাইভেট’, মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি, ১৯৮৯

৬। ব্লেয়ার বি ক্লিং, ‘রবীন্দ্রনাথ’স বনফায়ার’, ভবতোষ দত্ত সম্পাদিত ‘রবীন্দ্রনাথ টেগোর কমেমোরেটিভ ভল্যুম’, বিশ্বভারতী প্রেস, ১৯৯০

৭। টাইমস অফ লন্ডন, আগস্ট ৫ ও ৬ সংখ্যা, ১৮৪৬ ৮। কৃষ্ণ কৃপালানি, দ্বারকানাথ টেগোরঃ এ ফর্গটেন পাইওনিয়ার’, ন্যাশানাল বুক ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া, ১৯৮০

দ্বারকানাথ ঠাকুরকে নিয়ে নিয়ে ডকুমেন্টারি:

১। https://www.youtube.com/watch?v=e4QGcLnVQX8

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ

১। সমস্ত ইংরেজি উদ্ধৃতির বঙ্গানুবাদ করেছে পোর্টালের সম্পাদক

২। পোর্টাল সম্পাদক সম্পূর্ণ নিবন্ধটির সামান্য পরিমার্জন করেছেন 

ডঃ অনিরুদ্ধ সান্যালের জন্ম কলকাতায়। পড়াশোনা সাউথ পয়েন্ট স্কুলে; সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের ইকোনমিক্সের স্নাতক। ডালাসের সাদার্ণ মেথোডিস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে ইকোনোমিক্সে পি এইচ ডি। শখ সর্বভারতীয়দের জন্য ডকুমেন্টরি ফিল্ম তৈরি। দ্বারকানাথ ঠাকুরকে নিয়ে ডকুমেন্টরি- https://www.youtube.com/watch?v=e4QGcLnVQX8

মন্তব্য তালিকা - “দ্বারকানাথের মৃত্যুমুখোশ”

  1. পুরো লেখাটাই অত্যন্ত সমৃদ্ধ।তবে তার মধ্যে আবার শেষ প্যারাটি লেখাটির একটি সার্থক মূল্যায়ন উপস্থাপিত করেছে।
    রবীন্দ্রনাথ পিতার বাধ্য সন্তান ছিলেন।সাহানা দেবী বিধবা হবার পর তার পুন্রবিবাহের ব্যবস্থা নাকচ করার পিতৃআদেশ তিনি বেশ দায়িত্ব নিয়ে পালন করেছিলেন। যাইহোক,আসল কথা হলো, একবার জনমানসে যার যে স্থান নির্দিষ্ট হয়ে যায়,আমরা সেই সম্পর্কে আর ফিরে ভাবিনা।তাই এই ব্যতিক্রমী লেখাটি ভালো লাগলো।এমন আরো লেখা পাবার আশা রাখলাম।

  2. একটি ব্যতিক্রমী লেখা। কিন্তু চমৎকার মুন্সিয়ানায় ও প্রাঞ্জল ভাষায় ভারি সুন্দর উপস্থাপন করেছেন লেখক। বহু অজানা বিষয়ে অবগত হলাম। অজস্র ধন্যবাদ।

  3. Being a Santiniketan born of an Ashramite kanya, enriched with such good edited facts on Extremely talented Dwarkanath intrigued me always having exposed to Project Wealth creation in India since 1975-2014 , that distances away Bengali from it as follows,
    1) Lack of Marshall or Kshatra ability.
    2) The ease of Life in such magnanimous Gangetic Delta.
    3) Lack of Brahmanatya discipline due to Sraman influence like Buddha and Jain one.
    4) 1820-46 the British evolving East Indian co intrest imbibed per 1815 James Mill written 5 volumes of Indian History inculcated on us at its interst, where all viz Ram Mohon to others were captive in it, viz John Stuart Mill was James Son over Epitomized per such History interpretation where we all were victim.
    This self having lived in 64 destinations across India exposed to various Ethnicity viz Chettiar at South, Persi of Kolkata, Jsr, Gujarati Patel & Jain of Ahmedabad, Mangalorians, Marwaris of Rajasthan, Western U. P etc.
    Moreover such are also the story how whole of Cur Tagore wealth along Gurusaday Road came to Birlas also intrigued me with Jain wealth management psyche at large of Sett legacy of Rajasthan via Islam.

  4. চমৎকার লেখা। দ্বারকানাথ ঠাকুর সম্মন্ধে ইতিহাস বইয়ের বাইরে খুব একটা কিছু পড়িনি। অনেক কিছু জানা গেলো।