সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

দিব্যোক স্তম্ভ: বাঙালির পূর্বজদের বীরত্বগাথা

দিব্যোক স্তম্ভ: বাঙালির পূর্বজদের বীরত্বগাথা

শাহরিয়ার কবির

অক্টোবর ২৯, ২০২২ ১৭৫ ১১

অবশেষে দেখা হল! যাবো, যাবো করে বারবারই প্ল্যান চেঞ্জ করেছি বিভিন্ন কারণে। ১০/১০/২০২০ তারিখটি ম্যাজিকাল হলো আমার জন্য। হুট করেই প্রত্নতত্ত্বের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লাম বাড়ি থেকে দুপুর তিনটেয়, কিন্তু অলরেডি লেট! ৩৫ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে আগ্রাদ্বিগুণ দেখা শেষ করতেই বিকেল ৫টা। দিবর দিঘি আগ্রাদ্বিগুণ থেকে প্রায় ১৭ কি:মি:। যখন দিবর দিঘি থেকে ২ কি:মি: দূরে তখন ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমেছে। দিবর দিঘিতে পৌঁছে দেখি সন্ধ্যা উত্তীর্ণ! চারিদিকে অন্ধকার।

ঝটপট কয়েকটা ছবি নিলাম দূর থেকে, নাইট মোড অন করে। দূর থেকে সন্ধ্যার আবছায়া আলোয় দেখে আশ মিটলো না। দিঘিতে বাঁধা নৌকা চোখে পড়ল, মাঝিরও দেখা মিললো। ৫ গুণ ভাড়া দিয়ে রাজী করালাম নিয়ে যেতে স্তম্ভের কাছে। কাছে গিয়ে হাত দিয়ে স্পর্শ করলাম স্তম্ভটি। অবর্ণনীয় এক অনুভূতি! এই হল বাঙালির শৌর্য-বীর্যের প্রতীক। মাথা উঁচিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কত শতাব্দী ধরে। সান্ধ্য প্রণতি হে পূর্বজ’গণ!

দিব্যোক স্তম্ভ সম্পর্কে কথা বলার আগে আমাদের কৈবর্ত জাতি ও কৈবর্ত বিদ্রোহ নিয়ে কিছু আলোচনা করা প্রয়োজনীয়।

কৈবর্ত জাতির নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস বিশদে বলতে গেলে এ লেখার কলেবর বিপুলায়তন হয়ে যাবে। তাই সংক্ষিপ্ত আলোচনাই শ্রেয়।

বঙ্গীয় শব্দকোষ মতে কৈবর্ত অর্থ “দাশ, ধীবর, কেওট, জেলে। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অনুসারে, কৈবর্ত হলো শূদ্রার গর্ভে ক্ষত্রিয়জাত সঙ্করজাতি বিশেষ। মনুতে আছে, আয়োগবীর গর্ভে ব্রাহ্মণ-জাত নৌকর্ম্মজীবি “দাশ” নামক জাতি আর্যাবর্তে কৈবর্ত নামে খ্যাত। ভারতকোষ অনুসারে, “কে বৃত্তির্যেষাং ইতি কৈবর্ত।’ অর্থাৎ জলে যাদের জীবিকা, তারা কৈবর্ত। পুণ্ড্র-বরেন্দ্র অঞ্চলে কৈবর্ত জনগোষ্ঠী কবে এসে বসতি স্থাপন করেছিল এবং কোথা থেকে এরা এল এ নিয়ে নানা মুনির নানা মত। তবে মহাভারত ও অন্যান্য পুরাণে কৈবর্তভূমি বা কেবট্টভোগ নামে যে রাজ্যের কথা বলা হয়েছে তার অবস্থান কৃষ্ণা ও গোদাবরী নদীর অববাহিকা অঞ্চলসহ ওড়িশার কটক জেলার মহানদী অববাহিকা অঞ্চলে, অর্থাৎ প্রাচীন কলিঙ্গে। কৈবর্তদের প্রধান জীবিকা মাছ শিকার ও কৃষিকাজ। ২৬০ সাধারণ পূর্বাব্দে সম্রাট অশোকের কলিঙ্গ অভিযানে কৈবর্তদের সর্বনাশ হয়, নিজরাজ্য থেকে বিতাড়িত হয় তারা। ফলে বিপুল সংখ্যক কৈবর্ত রাঢ়, সুহ্ম, পুণ্ড্র ও সমতট অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করে এখানকার ভূমিপুত্রদের সাথে মিলেমিশে বাস করতে থাকে। নৃতাত্ত্বিকভাবে কৈবর্তরা দ্রাবিড় জাতিগোষ্ঠীর একটি অংশ। কলিঙ্গ থেকে আসা কৈবর্তরা একসময় এ ভূমির সন্তান হয়ে যায়। বরেন্দ্রীতে জালিক (মৎসজীবি) ও হালিক (কৃষিজীবি) এ দুই শ্রেণীর কৈবর্ত বসবাস করতো। এর পাশাপাশি কৈবর্তরা যুদ্ধনিপুণ জাতি হিসেবে সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতো।

পাল শাসনামলের প্রথমদিকে বরেন্দ্রীতে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সকল জাতিগোষ্ঠী সম্প্রীতির সাথে বসবাস করতে থাকে। ধর্মপাল ও দেবপালের সময় বৌদ্ধধর্মের, বিশেষত মহাযান মতের বেশ কিছু সংস্কার সাধিত হয়। ফলে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচুর গ্রন্থ রচিত হতে থাকে। এ সময়ে বিক্রমশীল বিহারের একজন পন্ডিত শুভাকরগুপ্ত রচনা করেন “আদিকর্ম রচনা” নামক একটি গ্রন্থ, যেখানে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ধর্মীয় আচার আচরণের বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়, যেমন বৌদ্ধ ভিক্ষুরা কিভাবে চলবে, কোথায় কোথায় ভিক্ষা নেবে, কার কার বাড়ি যাবে না ইত্যাদি। এ গ্রন্থটিতে কৈবর্ত জাতিকে মৎস শিকারী হওয়ার কারণে ব্রাত্য বলা হয়, অর্থাৎ এরা কখনো বৌদ্ধধর্মে আসতে পারবে না। পাল রাজগণ সে সময় এ গ্রন্থটির বিধিবিধান বাস্তবায়ন করেন নি, রাজ্যের অন্যান্য বিষয়ে মনোযোগ দেওয়াতে। প্রথম মহীপাল ও নয়পালের সময় এ শাস্ত্র আবারও সামনে চলে আসে। ফলে কৈবর্তরা বিপদে পড়ে যায় এবং তাদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে।

আবার পাল রাজগণ নানা ধর্মীয় আচার পালনের অংশ হিসেবে ব্রাহ্মণকে জমি দান করতেন, বিহারগুলির ব্যয় নির্বাহেও প্রচুর জমি দান করা হতো। পাল আমলের তাম্রশাসনগুলিতে এমন উদাহরণ আমরা অনেক পাই। এভাবে জমি দান প্রজাকুলের উপর করের বোঝা চাপানোর সমতুল্য। রাজা অনেক সময় কর মাফ করলেও দান গ্রহীতা ব্রাহ্মণ ও বিহারগুলি কর আদায়ে ছাড় দিত না। এসব ঘটনায় প্রজাদের মধ্যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে থাকে। এদিকে দ্বিতীয় মহীপাল দুর্বল ও অযোগ্য শাসক ছিলেন, রামচরিতে তাঁকে “অনীতিকবাম্ভরতে” অর্থাৎ আইন-বিরুদ্ধ কাজে লিপ্ত বলে অভিহিত করা হয়েছে। নিজের দুই ভাই শূরপাল ও রামপালকে কারারুদ্ধ করে রেখে নিজে যথেচ্ছাচার করা শুরু করেন দ্বিতীয় মহীপাল। এর ফলে কৈবর্তদের পাশাপাশি অন্যান্য জনগণ, এমনকি মন্ত্রী ও সেনাপতিরাও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। কৈবর্তরা যুদ্ধনিপুণ জাতি হওয়াতে পাল সেনাবাহিনীতে প্রচুর কৈবর্ত নিয়োজিত ছিল। বিক্ষোভ তাদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে এবং তারাও বিদ্রোহে যোগ দেয়।

শ্রদ্ধেয় দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, অলকা চট্টোপাধ্যায়ের লেখা “চুরাশি সিদ্ধর কাহিনী” বইয়ের ভূমিকার উত্তরকথনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ উত্থাপিত করেছেন। অষ্টম শতকের দিকে সমগ্র ভারতে শুরু হওয়া সিদ্ধ আন্দোলনের কিছুকাল পরে ঘটেছিল কৈবর্ত আন্দোলন, যেটি প্রকৃতপক্ষে গণবিপ্লবের রূপ নিয়েছিল। এত বড় গণবিপ্লবে নিশ্চয়ই কোন লোকনায়ক ছিলেন, যেমনটি ইতিহাসের অন্যান্য গণবিপ্লবে ঘটেছে। সিদ্ধগণের কারো কারো এ বিদ্রোহে প্রেষণা দেওয়া খুবই সম্ভবপর। চুরাশি সিদ্ধের বেশিরভাগ সিদ্ধ ব্রাহ্মণ্য রীতিনীতি ও অপরাপর বৌদ্ধদের অনেক কদাচারের বিরোধিতা করেছিলেন। সে যুগে বেশ কিছু সিদ্ধাচার্য রচিত দোহা প্রচারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। যেমন তিব্বতে অতীশ দীপঙ্করের জীবিতাবস্থায়ও সরহপাদ রচিত পদগুলো সেদেশে প্রচারের ক্ষেত্রে রাজশক্তি (স্বয়ং ডোম্-জ্যো-বেই-জুং-নে, ডোম বংশের জয়াকর, দীপঙ্করের একনিষ্ঠ শিষ্য) বাধা দিয়েছিলেন। সরহপাদ রচিত দোহার কয়েকটি ছত্র, যা উক্ত বইটিতে আধুনিক বাংলায় অনুদিত হয়েছে, তা এইরকম:

রকমারি কাঠের ডাণ্ডা ধরে

ওরা একদন্ডী, ত্রিদন্ডীর আজব বেশে

জ্ঞানীর ভাণ করে –

যেন তারা পরমহংস।

অথচ ধর্ম ও অধর্ম তফাত

কোনটাই তারা জানে না।

মিথ্যা কথা বলে শুধু

মানুষকে ঠকায়।

সুস্পষ্টভাবে সেকালে প্রচলিত রীতিনীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন সরহপাদ। কেবল সরহপাদ একা নন, সকল সিদ্ধাচার্যগণ আচার-সর্বস্ব সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছিলেন। সুতরাং পালরাজা দ্বিতীয় মহীপালের অনাচারের বিরুদ্ধে সিদ্ধগণের কেউ কেউ নিশ্চয়ই সমর্থন ও অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন।

এ সময় দিব্যোক পাল রাজদরবারে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি নিজেও জাতিতে কৈবর্ত ছিলেন এবং সম্ভবত কৈবর্ত সমাজের একজন অন্যতম প্রধান ছিলেন। জনমনে ক্ষোভের উত্তাপ তিনি ভালোই অনুভব করছিলেন, বিশেষত স্বজাতির দুর্দশা তাঁর অজ্ঞাত ছিল না। কিন্তু অযোগ্য মহীপাল কারো কথায় কর্ণপাত করেন নি। ফলে গণবিদ্রোহ শুরু হয়ে যায়। যে প্রজাপুঞ্জ একদিন গোপালকে সিংহাসনে বসিয়ে গৌরবময় পাল আমলের সূচনা করে, তারাই দ্বিতীয় মহীপালের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তাঁকে ক্ষমতাচ্যূত করে।

কৈবর্ত বিদ্রোহ বলা হলেও এ বিদ্রোহ বাংলায় সংঘটিত প্রথম সফল গণবিদ্রোহ সে বিষয়ে কোন সন্দেহই নেই। শ্রদ্ধেয় রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়ের মতে, “এ বিদ্রোহ কেবলমাত্র কৈবর্তদেরই বিদ্রোহ ছিল, এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। এ বিদ্রোহ ছিল মূলত কৃষক ও জনসাধারণের বিদ্রোহ, তাদের বহুদিনের শ্রেণীসংগ্রামের সশস্ত্র পরিণতি”।

ড. দীনেশচন্দ্র সেনও একই সুরে মত দিয়েছেন, যে বিদ্রোহ দমনে চৌদ্দটি রাজ্যের রাজন্যবর্গ মিলিতভাবে রামপালকে সহায়তা করেছিল, সে বিদ্রোহের স্বরূপ ও ব্যাপ্তি সহজেই অনুধাবন করা যায়। এবং অবশ্যই কেবলমাত্র একটি জাতিগোষ্ঠী (কৈবর্ত) দ্বারা এমন প্রতিরোধ অসম্ভব।

শ্রদ্ধেয় রমাপ্রসাদ চন্দ এ বিদ্রোহকে “দিব্যোর নেতৃত্বাধীনে রাষ্ট্রবিপ্লব” বলে অভিহিত করেছেন।

রামচরিতের ১/৩১ শ্লোকের টীকা থেকে মহীপাল ও অনন্ত সামন্তচক্রের যুদ্ধের কথা জানা যায়। অল্পসংখ্যক সৈন্য নিয়ে যুদ্ধ করতে আসা মহীপাল পরাজিত ও নিহত হন। রামপাল এ সময় স্বজনদের নিয়ে রাষ্ট্রকূট রাজ্যে চলে যান। সামন্তচক্র বুঝতে পারেন, সঠিক হাতে ক্ষমতা না দিলে রাজ্যে শৃঙ্খলা আসবে না। তাই সবার মনোনয়নে সিংহাসনে বসেন দিব্যোক।

স্যার যদুনাথ সরকার ভোজবর্মার তাম্রশাসনের ৮ম শ্লোকের ভিত্তিতে মন্তব্য করেছেন: দিব্যের বীর বলিয়া এত বেশি সুনাম ছিল যে লোকে তাহা একটা উপমার কথা মনে করিত, যেন তিনি বীরত্বের সীমা, ইহার বেশি বীর কেহই হইতে পারে না। তিনি মহীপালের পিতা বিগ্রহপালের সময় প্রসিদ্ধিলাভ করিয়াছিলেন।

স্যার যদুনাথ সরকার আরও মত প্রকাশ করেছেন, “দিব্য এমন সাধুপুরুষ যে অত অবহেলা অত্যাচার পাইয়াও নিজের মনিব মহীপালকে রাজ্যলোভে বা প্রতিহিংসার রাগে আক্রমণ করেন নাই। যখন মহীপালের শাসন প্রজাদের অসহ্য হইয়া উঠিল, যখন দিব্য দেখিলেন যে দেশ উদ্ধার, লোকের মান-সম্ভ্রম রক্ষা করা তাহারই কর্তব্য, তখন তিনি বিদ্রোহী দলে যোগ দিলেন”।

শ্রী রমাপ্রসাদ চন্দও একই মত পোষণ করে বলেছেন, “দিব্যের বিদ্রোহ করিবার প্রবৃত্তি ছিল না। ঘটনাচক্রে অবশ্য কর্তব্য বলিয়া তিনি রাজদ্রোহ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন।“

এতো গেল দিব্যোকের ক্ষমতা লাভের কথা। এখন আসা যাক দিব্যোক স্তম্ভের কথায়।

দিবর স্তম্ভ বা দিব্যোক জয়স্তম্ভ বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার পত্নীতলা থানার দিবর দিঘির মধ্যস্থলে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। এ দিঘি স্থানীয় জনগনের কাছে কর্মকারের জলাশয় নামেও পরিচিত। দিঘিটি ৪০/৫০ বিঘা বা ১/২ বর্গ মাইল জমির উপর অবস্থিত। দিবর দিঘির মধ্যস্থলে অবস্থিত আটকোণ বিশিষ্ট গ্রানাইট পাথরের এতবড় স্তম্ভ বাংলাদেশে বিরল। এ কথাও উল্লেখ্য যে, দিব্যোক স্তম্ভ বাংলায় স্থাপিত জয়স্তম্ভগুলোর মধ্যে প্রথম।

এ স্তম্ভের সর্বমোট উচ্চতা ৩১ ফুট। পানির উপরে ১০ ফুট, পানির নীচে ১০ ফুট ও পানির নীচে মাটির মধ্যে প্রোথিত ১১ ফুট। এ স্তম্ভে কোন লিপি নেই। স্তম্ভের উপরিভাগ খাঁজ কাটা অলঙ্করণ দ্বারা সুশোভিত। একটি পাথরখন্ড কেটে এ স্তম্ভটি নির্মিত হয়েছে।

দিবর দিঘির মধ্যস্থিত জয়স্তম্ভ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য সম্পর্কে ৩টি পৃথক মত পাওয়া যায়:

এক: দ্বিতীয় মহীপালকে পরাজিত ও হত্যা করার সাফল্যকে স্মরণীয় করে রাখতে দিব্যোক এ জয় স্তম্ভ নির্মাণ করেন। দীনেশ চন্দ্র সেন “বৃহৎ বঙ্গ” গ্রন্থে লিখেছেন – “কৈবর্তরাজ ভীমের খুল্ল পিতামহ দিব্যোক দ্বিতীয় মহীপালকে যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করিয়া বিজয়োল্লাসে যে স্তম্ভ উত্থাপিত করিয়াছিলেন তাহা এখনও রাজশাহী জেলার এক দিঘির উপরে মস্তক উত্তোলন করিয়া বিদ্যমান”। উল্লেখ্য পূর্বে নওগাঁ রাজশাহী জেলার অন্তর্ভূক্ত ছিল।

দুই: দিব্যোকের রাজত্বকালে পালরাজ রামপাল বরেন্দ্র উদ্ধারের চেষ্টা করে দিব্যোকের নিকট পরাজিত হন। দিব্যোক এই সাফল্যের স্মৃতি রক্ষার উদ্দেশ্যে দিঘির মধ্যস্থিত এ স্তম্ভ নির্মাণ করেন। সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতের পরিচিতি পর্বে অনুবাদক বিজয় স্তম্ভ নির্মাণের কারণ সম্পর্কে নিম্নলিখিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন: “পূর্ববঙ্গের ভোজ বর্মার তাম্রশাসন হইতে জানা যায় দিব্যের বীরত্ব খ্যাতি তৎকালে উপমার বিষয় ছিল। অত্যল্পকালই বরেন্দ্রী দিব্যের রক্ষণাধীন থাকে। পূর্বোদ্ধৃত মনহলি লিপির ১৪শ শ্লোক ও রামচরিতের ১/২৯ শ্লোক একত্রে পাঠ করিলে জানা যায় দিব্যের রাজত্বকালে রামপাল (১০৮২ – ১১২৪) একবার পিতৃরাজ্য উদ্ধারে সচেষ্ট হইয়া ব্যর্থকাম হন। দিনাজপুর জেলার (বর্তমানে নওগাঁ) দিবর দিঘি নামক জলাশয় ও তন্মধ্যস্থিত শিলাস্তম্ভ আজও তাহার স্মৃতি রক্ষা করিতেছে”।

তিন: ভীম এ স্তম্ভটি নির্মাণ করেন এবং পিতৃব্যের পূণ্যস্মৃতি রক্ষার্থে স্তম্ভটি তার নামে উৎসর্গ করেন।

বর্তমান মুর্শিদাবাদে সাগরদিঘিতেও দিব্যোকের অভিযান হয়েছিল এবং সেই স্থানে একটি বিজয়স্তম্ভ প্রোথিত হয়। রামপাল কর্তৃক সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের পরে এটি ভেঙে ফেলা হয়েছিল।

দিব্যোক সম্পর্কে সোমব্রত সরকারের লেখা “দুই বাংলার বাউল আখড়া” বইয়ের সামান্য অংশ খুবই প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় উদ্ধৃত করলাম:

বরেন্দ্র কৈবর্ত্যনায়ক দিব্যোক পাল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। রাজা দ্বিতীয় মহীপালকে হত্যা করে তখনই বরেন্দ্র ভূমিতে কৈবর্ত্যাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

পাল রাজসভার সভাকবি ছিলেন সন্ধ্যাকর নন্দী। স্বভাবতই তিনি রামচরিত এর পাতায় দিব্যোকদের বিদ্রোহকে হেয় প্রতিপন্ন করবেনই। কবিমশাই তাই দিব্যোককে দস্যু আখ্যা দিলেন। প্রজাবিদ্রোহকে ধর্মবিপ্লব বলে দেগে দিয়ে তিনি ভরস্য আপদম বলে বর্ণনা রাখলেন ‘রামচরিত’ এর পাতায়। বিকৃত হল ইতিহাস। বাঙালি ধরতেই পারল না ঠিক ভাবে, এগারো শতকে কৈবর্ত্যদের গণবিদ্রোহের উত্তাপ। সন্ধ্যাকর দিব্যোকের সামাজিক অবস্থান, বৃত্তি সব বেমালুম চেপে গেলেন। বললেন না তাঁর নামিত এই দস্যু সমাজের প্রতিনিধিরাই এগারো বারো শতকে গোটা বাংলা ভূমি জুড়ে কেবট্ট নামে পরিচিতি পেয়েছিল। এঁদের কেউ কেউ শিক্ষিত ছিলেন, সংস্কৃত চর্চা করতেন, কবিতাও লিখতেন। ‘সদুক্তি কর্ণামৃত’ নামক সংকলিত কাব্যগ্রন্থে পপীপ রচিত একখানি পদও বর্তমান। পপীপ জাতে ছিলেন কৈবর্ত, শিক্ষিত উচ্চবর্ণের ভাগ করা লোকায়ত বাংলার প্রতিনিধি। জীবিকা বৃত্তির দিক থেকে কৃষক ও জেলে সমাজের প্রতিনিধি।

সন্ধ্যাকরের রাজ সন্তুষ্টির ব্যাপার ছিল। সেজন্যই তিনি পাল রাজবংশের জয়গান গাইতেই ব্যস্ত ছিলেন। রাজবংশের আভ্যন্তরীণ অন্তর্দন্দ্ব; মহীপালের নির্বুদ্ধিতা, রামপালের বিচক্ষণতা– এসব বোঝাতেই তিনি ব্যস্ত। রামচরিত লিখতে বসেছেন তিনি। তাই রামপালের বিচক্ষণ বুদ্ধিমত্তা–পাল রাজাদের সেনাবাহিনীর পক্ষে এই বিদ্রোহ দমন কোনোভাবেই সম্ভব নয় বুঝে নানান ছোট বড় রাজা ও সামন্ত সৈন্য সংগ্রহ করে সেই বিদ্রোহ দমনের কাহিনী লিখতে গিয়ে সন্ধ্যাকর এটা অবশ্য বুঝিয়ে দিলেন যে, কৈবর্ত্য সংগঠন কী বিপুল জোরদার ছিল।

দিব্যোকের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই রুদোক, রুদোকের পর তাঁর ছেলে ভীম। দ্বিতীয় মহীপাল যখন দিব্যোকের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন, তখন তাঁর দুই ভাই শূরপাল ও রামপাল কারাগার থেকে পালিয়ে গিয়ে পালবংশের অধিকৃত এক অংশে রাজত্ব করতে থাকেন। এরপর দিব্যোকের উৎখাতের জন্য সৈন্য সংগ্রহ, শূরপালের মৃত্যু, রামপালের সিংহাসনে বসা, মগধ, ওড়িশা, বরেন্দ্ৰভূমি, দণ্ডভুক্তি বা হালের মেদিনীপুর, বগড়ী বা নতুন গড়বেতা, কুজটি বা গালভরা সাঁওতাল পরগনা সহ বিস্তীর্ণ এলাকার সামন্ত রাজাদের এক করে কৈবৰ্তরাজ ভীমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শেষমেশ তাঁকে বন্দী করে, তাঁর পরিবারবর্গকে নৃশংসভাবে হত্যা করে কৈবর্ত্যদের বরেন্দ্রভূমি থেকেই বলা চলে একেবারে উৎখাত করেন রামপাল।

সন্ধ্যাকর নন্দী রামচরিতের পাতায় সেই জয়গানই গেয়েছেন। কিন্তু লোকায়ত তথা নীচু মানুষদের গণ অভ্যুত্থানকে যতটা সম্ভব হেয় প্রতিপন্ন করে বেমালুম চেপে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন, যেটুকু যা বেরিয়ে পড়েছে তা তাঁর ওই কলম চালানোর অসতর্কতায়। আর হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মশাই সম্পাদনাকালে দৃষ্টিগোচরে এনেছেন বিষয়টি। শিক্ষিত বাঙালি তাই প্রামাণ্য নথিকে আর অস্বীকার করতেই পারেনি।

দিব্যোক স্তম্ভ নিঃসন্দেহে বরেন্দ্রবাসীদের একটি গর্ব। বাঙালির পূর্বজ বীর দিব্যোক, রুদক ও ভীমের কীর্তিগাথা চির অম্লান করে রেখেছে এ জয়স্তম্ভ। দিব্যোক স্তম্ভের আশপাশে অর্থাৎ এই নওগাঁ জেলাতে আজও অনেক জায়গার নাম কৈবর্ত তিন নায়কের নামে। দিবর দিঘির গ্রাম ও ইউনিয়নের নাম যথাক্রমে দিবরগ্রাম ও দিবর ইউনিয়ন। একই উপজেলায় শিহাড়া ইউনিয়নে রয়েছে কৈবর্তখন্ড নামের একটি গ্রাম। একই জেলার মহাদেবপুর উপজেলায় ভীমপুর ইউনিয়ন, মান্দা উপজেলায় কাঁশাপাড়া ইউনিয়নে কৈবর্তপুর গ্রাম, নিয়ামতপুর উপজেলায় রসুলপুর ইউনিয়নে ভীমপুর গ্রাম এগুলো সবই কৈবর্তরাজদের স্মৃতিবহ। এছাড়া ভীমপুর, দিব্যস্থলি, ভীমনগর, কৈবর্তগ্রাম, ভীমপাড়া, রুদ্রকুন্ড এ সমস্ত জায়গার নামও কৈবর্ত বিদ্রোহের স্মৃতিবহ বলে ইঙ্গিত দেয়। এটি সুস্পষ্ট যে বাংলাদেশের নওগাঁ ও রাজশাহী জেলার বিরাট অঞ্চল কৈবর্ত বিদ্রোহের মূল কেন্দ্র ছিল।

কৈবর্ত রাজাদের অনেক জনহিতৈষী কাজ আজও চোখে পড়ে। কতশত পুকুর ও দিঘি খনন করেছিলেন তাঁরা বরেন্দ্র অঞ্চলের জলকষ্ট দূর করতে। অপরদিকে নদীবহুল বরেন্দ্রীতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করতে রাজা ভীম তৈরি করেন শত কিলোমিটার দীর্ঘ মাটির দেয়াল, যা  ভীমের জাঙ্গাল নামে পরিচিত। আজও সারা বরেন্দ্রী জুড়ে উঁচু ও দৃঢ় ভীমের জাঙ্গাল চোখে পড়ে। বাংলাদেশের মানুষ দিব্যোককে সশ্রদ্ধচিত্তে মনে রেখেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নতুন ও নিজস্ব ভবনের সামনে দিব্যোক স্তম্ভের অনুরূপ সাতটি স্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে আত্মবলিদান করা সূর্যসন্তান সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের স্মরণে এ সাতটি স্তম্ভ। বাংলার ইতিহাসে ঘটে যাওয়া প্রথম গণবিপ্লব এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করা বীরগণ একটি সুতোয় বাঁধা। সাতটি স্তম্ভ তারই বহিঃপ্রকাশ।

তথ্যসূত্র:

১. সোমব্রত সরকার দুই বাংলার বাউল আখড়া, আত্মজা পাবলিশার্স ঢাকা ২০১৮

২. খন্দকার মাহমুদুল হাসান প্রাচীন বাংলার ধুলো মাখা পথে, পার্ল পাবলিকেশন্স, ঢাকা

৩. অলকা চট্টোপাধ্যায় চুরাশি সিদ্ধর কাহিনী, অনুষ্টুপ প্রকাশনী, কলকাতা

৪. ড. দীনেশচন্দ্র সেন রায়বাহাদুর বৃহৎ বঙ্গ (১ম খন্ড), কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৩৪১

৫. রাখালদাস বন্দোপাধ্যায় বাঙালার ইতিহাস (১ম খন্ড), প্রকাশক—শ্রীহরিদাস চট্টোপাধ্যায় মেসার্স গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স,২০৩৷১৷১ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা

৬. মাহবুব সিদ্দিকী বরেন্দ্র কৈবর্ত বিদ্রোহ ও রামাবতী নগরী, হেরিটেজ রাজশাহী, রাজশাহী, ২০২০

৭. হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বঙ্গীয় শব্দকোষ (১ম খন্ড), সাহিত্য অকাদেমী, নিউ দিল্লী

৮. অযোধ্যানাথ বিদ্যাবিনোদ মহারাজা দিব্য,

৯. সন্ধ্যাকর নন্দী রামচরিতম,

১০. পত্নীতলা উপজেলার ওয়েবসাইট http://patnitala.naogaon.gov.bd/

পেশায় ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট ও এক্সিকিউটিভ কোচ, শাহরিয়ার কবির সাহিত্য ও ইতিহাসের একজন একনিষ্ঠ ছাত্র। বিভিন্ন প্রত্নস্থল ঘুরে দেখতে ভালবাসেন। ইতিহাস চর্চায় তাঁর প্রধান বিষয়বস্তু প্রাচীন যুগ এবং পুণ্ড্র-বরেন্দ্র অঞ্চল নিয়েই তাঁর প্রধান বিচরণ কেন্দ্র।

মন্তব্য তালিকা - “দিব্যোক স্তম্ভ: বাঙালির পূর্বজদের বীরত্বগাথা”

  1. এই লেখাটি পড়ে কৈবর্ত বিদ্রোহ ও তার নায়কের সম্মন্ধে জানতে পেরে শ্রদ্ধার সাথে
    হৃদয়ঙ্গম করলাম।
    লেখক কে প্রভূত সাধুবাদ জানাই।
    ধন্যবাদ আপনাকে শাহরিয়ার কবির মহাশয়।

  2. কৈবর্ত বিদ্রোহ সম্পর্কে জানতাম ভাসা-ভাসা। আর একটু বিশদভাবে জানতে পারলাম। খুব উপযোগী লেখা। শ্রদ্ধা জানাই শাহরীয়র কবীর মহাশয়কে।

  3. চমৎকার উপস্থাপনা। সহজ ভাষায় কৈবর্ত বিদ্রোহ সম্পর্কে এমন তথ্যপূর্ণ ও বিস্তারিত আলোচনা পেয়ে খুবই উপকৃত হলাম। ধন্যবাদ লেখক মহাশয়কে।

  4. সেই কবে ইতিহাসে দু’পাতা পড়েছিলাম বাংলার কৈবর্ত বিদ্রোহ নিয়ে। মনেই ছিল না। মনে রাখার দরকারও ছিল না রুটি রুজির তাগিদে। কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত অথচ প্রাঞ্জল ও গভীর লেখাটি কাঁপিয়ে দিল। আত্মবিস্মৃত বাঙালি হিসেবে যুগপৎ লজ্জিত ও ঋদ্ধ হলাম। ধন্যবাদ অশেষ তাঁদের সবাইকে যারা এই স্বর্ণ স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দিলেন।

  5. আমার বাসাটা নওগাঁর জেলার পাশে হওয়াতে জায়গাটায় অনেকবার গিয়েছি। বন্ধু-বান্ধব ঘুরতে যাওয়া হতো। নিছক বিনোদনের জন্য। কিন্তু দিবর দিঘী এর সুদীর্ঘ, সুউচ্চ ইতিহাস রয়েছে তা এতকাল অজানায় ছিলো। লেখকের অনুকম্পায় জানতে পারলাম। এত তথ্যবহুল লেখা সত্যিই প্রশংসনীয়। লেখককে অশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

    নওগাঁ জেলার ধামইরহাট থানার অন্তর্গত ৬ জাহানপুর ইউনিয়নের ‘ভীমের পান্টি’ নামে এইরকম একটা স্তম্ভ রয়েছে। আমার বাসার খুব কাছাকাছি তবে ইতিহাস অজানা। এইরকম একটা তথ্যবহুল লেখা পেলে ইতিহাস জানতে পারতাম। উপকৃত হতাম।

    ভীমের পান্টির লোকেশনঃ ৬ নম্বর জাহানপুর ইউনিয়নটি মঙ্গলবাড়ি বাজারে। সেখান থেকে যেতে হবে হরগৌরি শিব মন্দিরে। ভ্যানে বা অটো তে গেলে সর্বোচ্চ ৫ টাকা নিবে। আর এই মন্দিরের পাশে ভীমের পান্টিটি অবস্থিত।

    1. ভীমের পান্টি নিয়ে লেখকের একটি বিস্তারিত লেখা আছে। আপনি ফেসবুক গ্রুপে সার্চ করলে পাবেন।