সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

ধর্ম, রাজনীতি ও একটি মূর্তি: প্রসঙ্গ গুপ্ত যুগ

ধর্ম, রাজনীতি ও একটি মূর্তি: প্রসঙ্গ গুপ্ত যুগ

কুন্তক চট্টোপাধ্যায়

নভেম্বর ১৪, ২০২০ ৬২১

ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে ধর্ম এবং রাজনীতির সম্পর্ক সমসাময়িক ভারতে খুবই প্রাসঙ্গিক। অন্তত স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রের যে রূপ আমরা দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম, তা গত কয়েক বছরে কিছুটা হলেও বদলেছে। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বহু দেশই ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটি সাংবিধানিক অর্থে ব্যবহার করলেও রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং ধর্মের সম্পর্ক কিন্তু ইতিহাসগত ভাবেই স্বীকৃত। আলোচ্য প্রবন্ধটি সেই আন্তঃসম্পর্ককেই মূল বিষয় ধরে রচিত। তবে এ ক্ষেত্রে স্থান ও সময় প্রাচীন কালে নিহিত। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, গুপ্ত যুগে মধ্য ভারতের বিদিশা নগরীই এই প্রবন্ধে আলোচিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে উদয়গিরির বরাহ অবতার মূর্তিটিকে। শিল্প ও স্থাপত্যের নিরিখে মূর্তিটি নতুন ভাবে বর্ণনার দাবি রাখে না। তবে রাজনৈতিক ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রেও মূর্তিটি বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য. প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় রাষ্ট্র ব্যবস্থা কীভাবে ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক আধিপত্য স্থাপন এবং একটি অঞ্চলকে সুসংহত করার চেষ্টা করে। সেই আলোচনার কেন্দ্রেই রয়েছে এই মূর্তিটি।

গুপ্ত শাসন ব্যবস্থা কিরকম ছিল তা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরেই ইতিহাসবিদ মহলে চর্চা রয়েছে। ভারতবর্ষের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসচর্চার সূত্রপাত ঔপনিবেশিক শাসকদের হাত ধরে। ঔপনিবেশিক ইতিহাসচর্চায় ভারতবর্ষের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পাশ্চাত্যের তুলনায় অনুন্নত হিসেবে দেখানোর সক্রিয় চেষ্টা চোখে পড়ে। বিশেষত মৌর্য শাসনের ইতিহাসচর্চায় চন্দ্রগুপ্তের সিংহাসন আরোহণকে যে ভাবে আলেকজান্ডারের আক্রমণের আড়ালে রাখার চেষ্টা হয়েছে তা বারবার সমালোচিত হয়েছে। সে দিক থেকে গুপ্ত শাসকেরা কিছুটা হলেও ঔপনিবেশিক ইতিহাসবিদদের কাছে গুরুত্ব লাভ করতে পেরেছিল। বিশেষত সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তির আলোকে সামরিক অভিযান এবং কেন্দ্রীভূত সাম্রাজ্য খোঁজার চেষ্টা করেছেন তাঁরা। জাতীয়তাবাদী ইতিহাসচর্চা ঔপনিবেশিক ইতিহাসচর্চার পাল্টা হিসেবে গড়ে উঠলেও গুপ্ত শাসনব্যবস্থার মধ্যে তাঁরাও সাম্রাজ্য ও গৌরবজনক অতীতের খোঁজ করেছেন। ১৯৫০-এর দশক থেকে মার্ক্সবাদী ইতিহাসচর্চা ভারতে নতুন ধারার প্রবর্তন করেন। রামশরণ শর্মা তাঁর ‘ভারতীয় সামন্ততন্ত্র’ তত্ত্বের উদ্ভবের ক্ষেত্রে গুপ্ত আমলে বিকেন্দ্রীভবনের প্রেক্ষাপটকে বিশেষ ভাবে আলোচনায় এনেছেন। ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় কেন্দ্রীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণের বিবাদের বাইরে গিয়ে সুসংহত রাষ্ট্রব্যবস্থা বা ‘ইন্টিগ্রেটিভ পলিটি’-র ধারণা দিয়েছেন। বর্তমান সময়ে আশিস কুমার ও কণাদ সিংহের গবেষণা সেই দিক থেকে বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে।

আশিস তাঁর গবেষণায় সাম্রাজ্যের ধারণার বদলে গুপ্ত শাসন ব্যবস্থাকে বৃহৎ ও অধীনস্থ শাসকের আলোকে বিশ্লেষণ করেছেন এবং সেখানে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্র শক্তিগুলির গুরুত্ব বিশ্লেষণ করেছেন। কণাদের গবেষণায় উঠে এসেছে গুপ্তদের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বৈষ্ণবধর্মের প্রভাব ও ব্যবহারের কথা। এই প্রসঙ্গে তাঁর গবেষণাতেও বরাহ অবতারের প্রসঙ্গ গুরুত্ব পেয়েছে।

উদয়গিরির পাদদেশে পাঁচ নম্বর গুহায় বরাহ অবতার মূর্তিটি রয়েছে। বরাহ অবতার বিষ্ণুর দশাবতারের অন্যতম এবং পৌরাণিক কাহিনীতে তিনি ধরিত্রী বা ভূদেবীর রক্ষাকর্তা। গুপ্ত শাসকেরা বৈষ্ণব ছিলেন তা তাঁদের ‘পরম ভাগবত’ উপাধি থেকেই স্পষ্ট। অধীনস্থ শক্তিগুলির ক্ষেত্রেও বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাব চোখে পড়ে। বিশেষত মধ্যপ্রদেশের বাগ সংলগ্ন এলাকায় বলখা শাসকদের যে তাম্রপট্ট পাওয়া যায় তাতেও এর প্রমাণ মেলে। কণাদ তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, গুপ্ত আমলেই কীভাবে বৈদিক বিষ্ণু ও ব্রাহ্মণ্যবাদী দর্শনের নারায়ণ মিশে পৌরাণিক বৈষ্ণবধর্মের সৃষ্টি করেছিল। সেই প্রসঙ্গেই বিষ্ণুর অবতারবাদ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত কেন বরাহ অবতারের মূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করলেন তার পিছনে শুধু ধর্মীয় আবেগকে গুরুত্ব দিলে বোধ হয় সার্বিক চিত্র ফুটে উঠবে না। বরং এই মূর্তিটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের আমলে গুপ্তেরা শকদের হারিয়ে মালবের উপরে আধিপত্য স্থাপন করে এবং সে ক্ষেত্রে এলাহাবাদ প্রশস্তিতে উল্লেখিত মালব ও সনকানিকর মতো মিত্রশক্তিগুলি বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। এই শক্তিগুলি অধীনে থাকলেও রাজত্ব বিস্তারের ফলে নিজেদের মতো করে রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করার চেষ্টা গুপ্তরা করেছিল। তার হাতিয়ার হিসেবে ব্রাহ্মণ্যবাদ ও পৌরাণিক বৈষ্ণবধর্মকে বিজিত এলাকায় নিজেদের উন্নত শক্তি বা ‘এলিট পাওয়ার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজন ছিল গুপ্ত শাসকদের। সেই নিরিখে দেখলে বিদেশি বলে চিহ্নিত শক শক্তির হাত থেকে ভূমিকে রক্ষা করার যে প্রচার তা এই বরাহ অবতারের উপরেই মেলে এবং নিজেকে সেই বরাহ অবতারের সমকক্ষ হিসেবে প্রচার করার প্রচেষ্টাই ছিল মূল। কণাদ সিংহ তাঁর গবেষণায় এই প্রক্রিয়াকে ‘রাজার নতুন ধরনের দৈবসত্ত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদিও এ ক্ষেত্রে কণাদের সঙ্গে আমি সহমত নই। ‘রাজার দৈবসত্ত্ব বা ডিভাইন কিংশিপ’ ধারণাটি মূলত কুষাণদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সেখানে কুষাণ শাসকদের মূর্তি দেবকুলে প্রতিষ্ঠা এবং সেগুলিকে উপাসনার প্রমাণ মেলে। কুষাণ পুরালেখতে ‘দেবপুত্র’ শব্দটিও মেলে। বলা যেতে পারে, শাসককে একটি কাল্ট হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন কুষাণেরা। কিন্তু গুপ্তদের ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। ফলে দৈবসত্ত্ব শব্দটি এখানে ব্যবহার করা সমীচীন নয়। বরং এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ধর্মদর্শন বা পলিটিক্যাল থিয়োলজি এবং এলিটিজম শব্দটি অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। মূলত সেই দেবতার আড়ালে উন্নত মানের শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই ছিল গুপ্তদের লক্ষ্য এবং সেই কাজে ধর্মীয় দর্শনকে কাজে লাগানো হয়েছিল।

এই মূর্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উদয়গিরিকে বেছে নেওয়া হল কেন সেই প্রশ্ন স্বাভাবিক ভাবে ওঠে। ইতিহাসের আলোচনায় ক্ষেত্র বা স্পেস-এর ধারণা খুবই প্রাসঙ্গিক। ভৌগোলিক ক্ষেত্র কীভাবে ইতিহাস এবং মানব সমাজের কাজকর্মকে নিয়ন্ত্রণ করে সেই চর্চাও ইতিহাসবিদ মহলে সুবিদিত। এই প্রসঙ্গে হেনরি লেফেব্রের একটি কাজ প্রণিধানযোগ্য। মার্ক্সীয় তত্ত্বকে ভিত্তি করে তিনি একটি ক্ষেত্রের বিকাশ তাঁর বিস্তারিত গবেষণায় দেখিয়েছেন।১০ একই ভাবে ভূগোলকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নিয়ে আসার পথিকৃৎ হিসেবে রয়েছেন লুসিয়েঁ ফেবর। শুধু স্পেস নয়, বিভিন্ন ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য এবং নদী, বাণিজ্যপথের মতো বিষয় কীভাবে ইতিহাসকে প্রভাবিত করেছে তা তাঁর রচনা থেকে স্পষ্ট হয়।১১ আলোচ্য প্রবন্ধের ক্ষেত্রেও সেটি গুরুত্বপূর্ণ। উদয়গিরির ভৌগোলিক অবস্থানের বিশ্লেষণ সেটিকে স্পষ্ট করবে। উদয়গিরির অবস্থান বেসনগর বা প্রাচীন বিদিশায়। নগর শব্দটি জুড়ে থাকায় বুঝতে অসুবিধা হয় না যে এই জনপদটির শহুরে চরিত্র ছিল। একই ভাবে উদয়গিরির দুপাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে বেস ও বেতোয়া (প্রাচীন বেত্রবতী) নদী। মালবের একেবারে পূর্বে অবস্থিত এই জনপদটির সঙ্গে আশপাশের এলাকার সংযোগও সুবিদিত। ফলে শহুরে এলাকায় বাণিজ্যিক অর্থনীতির প্রভাব থাকাটাই যুক্তিযুক্ত। এই বাণিজ্য নগরী এবং বাণিজ্য পথের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বিভিন্ন এলাকার বণিকদের সমাগম ছিল। বেসনগরে জৈন ধর্মের প্রভাব থেকে সেই বণিকদের যাতায়াতের প্রমাণও মেলে। উদয়গিরির অবস্থান দেখে বোঝা যায় সেটি একটি জনপরিসরের ক্ষেত্র ছিল। অর্থাৎ ভূগোলের ভাষায়, একই সঙ্গে এটি অ্যাবসোল্যুট ও রিলেটিভ স্পেস। অর্থাৎ যে ভৌগোলিক ক্ষেত্রের বাস্তব অস্তিত্ব রয়েছে এবং সেই ক্ষেত্রকে ঘিরে বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচরণও রয়েছে। মালব যেহেতু গুপ্ত রাষ্ট্রের একেবারে হৃদয়স্থল বা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত ছিল না, তাই সেই এলাকায় নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা করা রাজনৈতিক ভাবেই দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের কাছে প্রয়োজনীয় ছিল। বরাহ অবতারের আড়ালে সেই রাজনৈতিক ভাবমূর্তি তৈরি করার পরে এমন একটি জায়গায় মূর্তি প্রতিষ্ঠা করার অর্থ জনমানসে তার প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেওয়া। এই যুক্তির পিছনে আরও প্রমাণ হিসেবে উঠে আসে সনকানিক রাজা এবং দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের মন্ত্রী বীরসেনের দুটি পুরালেখ। যা সামগ্রিক ভাবে গুপ্ত শাসকদের উচ্চমর্যাদা স্থাপনের পরিপূরক।১২

উপসংহারে বলা যেতে পারে, গুপ্ত আমলের শাসন কাঠামোয় ধর্মীয় দর্শন একটি বিশেষ জায়গা অবলম্বন করেছিল এবং তা প্রতিভাত হয়েছিল রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে। উদয়গিরির একটি মূর্তি প্রতিষ্ঠা থেকেই তার বিস্তারিত প্রমাণ মেলে। একই সঙ্গে গুপ্ত আমলে বিভিন্ন এলাকায় যে ভাবে মন্দির প্রতিষ্ঠার রীতি চালু হয়েছিল তা পরবর্তী কালেও বিদ্যমান ছিল। সে দিক থেকে দেখলে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ধর্মকে ব্যবহার করা গুপ্ত সাম্রাজ্যকে একটি সূচনাপর্ব বলা যেতে পারে।

টীকা ও সূত্র-

১. Vincent. A. Smith, The Oxford History of India, Oxford, New Delhi, 1981 (Fourth Ed. P. Spear), pp. 164-77

২. R.C. Majumdar (ed.), The Classical Age, Bharatiya Vidyabhavan, Delhi, 1954, pp. 1-13

৩. R.S. Sharma, Indian Feudalism (AD 500-1200), Macmillan India, Madras, 1965 (Second ed. Reprint 1990),  pp. 1-8, see also Sharma, Indian Feudalism: Origins and First Phase (c. AD 300-750) in Kunal Chakrabarti and Kanad Sinha (ed.), State, Power and Legitimacy: The Gupta Kingdom, Primus, New Delhi, 2019, pp. 516-77

৪. B.D. Chattopadhyaya, State and Economy in North India: Fourth to Twelfth Century, Studying Early India, Archaeology, Texts, and Historical Issues, Permanent Black, New Delhi, 2008, pp. 233-62

৫. Ashish Kumar, Subordinate Rulers under the Gupta Monarchs: Political Integration and State Formation in Central and Eastern India, in Chakrabarti and Sinha (ed.), op.cit, pp. 612-38

৬. Kanad Sinha, Puranic Vainshnavism and the Guptas: A study of Kingship, Legitimacy and Religion, op.cit, pp. 684-90

৭. K.V. Ramesh and S.P. Tewari, A Copper-Plate Hoard of the Gupta Period from Bagh, Madhya Pradesh (New Delhi: Archaeological Survey of India, 1990).

৮. Sinha, op.cit

৯.ibid.

১০. Henri Lefebvre, The production of Space, (Translated by Donald N. Smith), Blackwell, Oxford, 1991 (reprint 1994)

১১. Lucien Febvre, A Geographical Introduction to the History, (Trnsltd. By Mountford and Paxton), Trench Tubner, 1925, pp. 295-352

১২. J.F. Fleet (ed.), CII, Vol. III, Calcutta, 1888, pp. 21-24, 34-38

মন্তব্য তালিকা - “ধর্ম, রাজনীতি ও একটি মূর্তি: প্রসঙ্গ গুপ্ত যুগ”

  1. কি যে ভালো লাগলো লেখাটি। বিশেষ করে, উদয়গিরি স্থান টি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভূগোলের ও যে চিন্তা ভাবনা করা হয়েছিলো, খুব চিত্তাকর্ষক মনে হোল বিষয়টি। অনেক ধন্যবাদ।