সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

ইট-পাথরের ঢাকায় সহস্রাব্দ প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার

ইট-পাথরের ঢাকায় সহস্রাব্দ প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার

শাহরিয়ার কবির

জুলাই ২, ২০২২ ১১৯

ঢাকা শহর আইসা আমার আশা ফুরাইছে।

আরে লাল লাল নীল নীল বাতি দেইখ্যা নয়ন জুড়াইছে।

ঢাকা শহর আইসা আমার আশা ফুরাইছে,

মনের আশা ফুরাইছে।

কর্মব্যস্ত যান্ত্রিক ঢাকা শহর। কথায় বলে, ঢাকায় টাকা ওড়ে। সেই উড়ন্ত টাকা ধরার আশায় দেশের নানা প্রান্ত থেকে নাড়ীর টান উপেক্ষা করে মানুষ ছুটছে ঢাকায়। এভাবেই ঢাকা হয়ে উঠেছে মেগাসিটি, দুই কোটির বেশি মানুষে ঠাসা ঢাকা শহরে নাভিশ্বাস উঠে মানুষের। “যথা প্রদীপ্তং জ্বলনং পতঙ্গা…” আলোর পানে ধেয়ে আসা পতঙ্গের মতো তবুও মানুষ এসে জমছে প্রতিদিন।

২০০৮ সালে বেশ ঘটা করেই পালিত হলো রাজধানী ঢাকার ৪০০ বছর পূর্তির উৎসব। মনে খটকা থেকে যায়, আসলেই কি মাত্র চারশো বছরের পুরনো এ নগরী? আমার ধারণা, ঢাকা আরো পুরনো। আপনি যদি গুলশান-বনানী-ধানমণ্ডি-মতিঝিল দিয়ে ঢাকার বয়স মাপতে যান, মস্ত ভুল করবেন। আলো ঝলমলে গুলশান-বনানী থেকে একটু দূরে যান, দেখবেন মাটির লালচে রং। এমনকি মুঘলরা যেখানটায় জাহাঙ্গীরনগর পত্তন করেন, সে এলাকার মাটি আরো লালচে। এ রকম ভূমিরূপ তো মাত্র চারশো বছরের পুরনো হতে পারে না। ঢাকা পিলখানায় গুপ্তযুগের স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গিয়েছিল একটি পুরনো পুকুরপাড়ে, এগুলো ঢাকার প্রাচীনত্বের সাক্ষ্য নয় কি? ভূতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে জানা যায়, দশম থেকে অষ্টম খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ঢাকার সাভার পর্যন্ত ছিল সমুদ্র উপকূলবর্তী এবং ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গিয়েছে এ এলাকায়। ৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে সাভার অঞ্চলটি জেগে ওঠে এবং এ অঞ্চলটিকে পুণ্ড্রের শেষসীমা ধরা হতো। ঢাকা মহানগরের সন্নিকটস্থ সাভার, বিরুলিয়া, হেমায়েতপুর, সুয়াপুর, নান্না, ধামরাই প্রভৃতি জায়গাগুলোর প্রাচীনত্বের ছাপ এখনও বিদ্যমান। এমনকি বর্তমান ঢাকার রীতিমতো প্রাণকেন্দ্রেই ঢাকেশ্বরী মন্দির, যেটি সেনরাজ বল্লালসেন কর্তৃক স্থাপিত বলে অধিকাংশ গবেষক মনে করেন। সুতরাং ঢাকার বয়স নিদেনপক্ষে এক হাজার বছর হতে হয়। বর্তমানে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে যে কলকাতার বয়স হাজারো বছরের বেশি। ঢাকার প্রকৃত বয়স নিয়েও এমন গবেষণা অতি প্রয়োজন।

যাই হোক, ঢাকা জেলায় অবস্থিত সবচেয়ে প্রাচীন জায়গাগুলোর একটি নিয়ে আজকের মূল আলোচনা। ঢাকা মহানগর থেকে ২১ কিলোমিটার দূরে সাভার উপজেলা। বংশাই (বংশাবতী) নদীর তীরে অবস্থিত এ স্থানটি, ধলেশ্বরী নদী এ স্থানের কিছুটা দক্ষিণ দিকে বংশাই নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। ঢাকা মহানগরের মতোই সাভার খুবই কর্মব্যস্ত জায়গা। মূলত অত্যধিক শিল্পায়নের ফলে অসংখ্য কলকারখানার ভিড় সমগ্র সাভার এলাকায়। কাজের টানে সবসময়ই ছুটে চলেছে মানুষ এখানে। হাজারো কলকারখানার ভিড় এড়িয়ে সাভার বাজার থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে গেলেই একটু গ্রাম্য পরিবেশের দেখা পাওয়া যায়। সাভারের বিরুলিয়া ও আশেপাশের এলাকায় এখনও গ্রামীণ প্রকৃতির রেশ রয়ে গিয়েছে – ঘন গাছগাছালি, বাঁশঝাড়, পুকুর, দু-একটা মাটির দেওয়াল আর সর্বোপরি লালমাটির উপস্থিতি।

এক সময় এই সমস্ত অঞ্চলে পুরাকালের স্থাপত্যের ভগ্নাবশেষ, অনেক ইট ও মৃৎপাত্রের টুকরো চোখে পড়তো। কেবল তাই নয়, পুকুর খনন বা বাড়ির ভিত্তি খনন করতে গিয়ে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়ার কথা ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রমুখ গবেষকগণ জানিয়েছেন তাঁদের লেখনীতে। ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিকীকরণের ফলে সমস্ত কিছু, এমনকি এদিককার গ্রামীণ পরিবেশও বর্তমানে সঙ্কটাপন্ন। আজকের এই সাভার ছিল প্রাচীনকালের সম্ভার নামক বন্দর – সম্ভার থেকে সাভার। যেহেতু ৬০০ খ্রিষ্টপূর্বে সাভারের অবস্থান সমুদ্র উপকূলে ছিল, সেহেতু এখানে বন্দরের অবস্থিতি খুবই স্বাভাবিক। প্রচলিত একটি লোকগাথায় বলা হয়েছে, সাভার অঞ্চলটির নাম সর্বেশ্বর রাজ্য, রাজা হরিশ্চন্দ্রের রাজ্য। লোকগাথাটির উল্লেখ লেখার পরের অংশে রয়েছে।

এই সাভারে গুপ্ত ও গুপ্তোত্তর যুগের প্রচুর প্রত্ননিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। পাল আমলে সাভার পাল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং একজন সামন্তরাজা এই অঞ্চলের শাসনভার প্রাপ্ত হন। এই সময় বৌদ্ধধর্ম চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে সাভারে প্রচুর স্থাপনা গড়ে ওঠে। সাভারের বাজাসন, সুয়াপুর ও নান্না গ্রামগুলো বৌদ্ধ বজ্রযান চর্চার জন্য খ্যাতিসম্পন্ন ছিল। বৌদ্ধতন্ত্র অবক্ষয়ের দিকে এসে নানা কদাচারে যখন জড়িয়ে পড়ে, সেসময়ও বাজাসন, সুয়াপুর, নান্নায় বৌদ্ধচর্চা চলছিল। সুয়াপুর নামটি “সুখপুর” এর অপভ্রংশ বলে মত দিয়েছেন ড. দীনেশচন্দ্র সেন, তিনি নিজে সুয়াপুরের সন্তান। প্রাচীনকালের সুয়োরাণীর গল্পে সুয়ো অর্থ সুখ, আর দুয়ো মানে দুঃখ। আমরা আজও কাউকে খারাপ কাজের জন্য দুয়ো দিয়ে থাকি। বৌদ্ধদের জন্য সুখাবতী স্বর্গের সমতুল্য, সুয়াপুর > সুখপুর বৌদ্ধপ্রভাবের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। এখানে একসময় প্রচুর প্রাচীন স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ দেখা যেত। সুয়াপুরে মাটি খুঁড়তে গিয়ে মাটির নিচে ইটের স্থাপনা বেরিয়ে এসেছিল, যেটি দীনেশচন্দ্র সেন দেখেছিলেন। এ গ্রামের চারদিকে পরিখা এবং মাটির নীচে ইটের দেয়ালের ভিত্তি দেখা যেত। সম্ভবত পরিখা ও প্রাচীর দিয়ে সুরক্ষিত করা হয়েছিল গ্রামটি। এখানেই একটি প্রাচীন পুকুর শুকিয়ে গেলে সেখান থেকে একটি বাসুদেব মূর্তি ও পাথরের স্তম্ভ বেরিয়ে আসে। সেই বাসুদেব মূর্তিটি দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয়  ছেলেবেলায় তাঁর বাড়িতে দেখেছেন। পাশের গ্রাম নান্নার গ্রামটিও সুয়াপুরের মতোই প্রাচীন। গ্রামটি মুণ্ডিতমস্তক বৌদ্ধভিক্ষুদের আবাসস্থল ছিল একসময়। নান্না শব্দটির অর্থ ‘মুণ্ডিতমস্তক’। “সুয়াপুর নান্না, মদে ভাতে পান্না” এ প্রবাদ বাক্যটি উক্ত গ্রামদুটিকে ব্যঙ্গ করে একসময় চালু হয়। প্রবাদবাক্যটি বজ্রযানের অবক্ষয়ের সময় গ্রামদুটিতে মদ্যপানের আধিক্যের ইঙ্গিতবহ। বোঝা যায়, একসময়ের আলোকিত বৌদ্ধরা তন্ত্রচর্চা করতে করতে অবক্ষয়ের পথে নেমে পঞ্চ ম-কারে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ভৈরবীচক্রে বসেছিলেন এমন কয়েকজন মহিলাকে দীনেশচন্দ্র সেন অতিবৃদ্ধ অবস্থায় তাঁর গ্রামে দেখেছিলেন। তাঁর নিজের পিতামহের বড়দাদা রামনাথ মহাশয় নিজেও তন্ত্রচর্চার সময় শবারুঢ় হয়ে মারা যান। এখন ‘বাজাসন’ নামটির দিকে দেখা যাক। বাজাসন কথাটি বজ্রাসন কথাটির অপভ্রংশ, একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়। অনেকে বাজাসনকে ভুলবশত রাজাসনও বলে ফেলেন। বজ্রাসন> বাজাসন> রাজাসন>  রাজাশন। স্থাননাম ও এখানে প্রাপ্ত পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ থেকে জানা যায়, বজ্রযানীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল আজকের এই বাজাসন। গ্রাম তিনটি থেকে সামান্য দূরেই ধামরাই নামক স্থান, ধামরাইয়ের রথ দেশখ্যাত। এই ধামরাইয়ের প্রাচীন নাম ধর্মরাজিক, বৌদ্ধ সংস্কৃতির স্মৃতিবহ, ধর্মরাজিক > ধামরাই। এখানে একটি অশোকস্তম্ভের ভগ্নাবশেষ এখনও রয়েছে। ধর্মরাজিকে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসতো বৌদ্ধধর্ম শিক্ষার জন্য।

সাভারের বাজাসন গ্রামটি বেশ প্রাচীন তা আগেই বলেছি এবং গ্রামটি আয়তনে বেশ বড়। বাজাসন গ্রামে বেশ কয়েকটি সুউচ্চ ঢিবি ছিল, লোকে সেগুলোকে রাজা হরিশ্চন্দ্রের স্মৃতিবাহী ঢিবি বলতো। এর মধ্যে একটি ঢিবির নাম রাজবাড়ি ঢিবি বা হরিশ্চন্দ্রের প্রাসাদ। ঢিবিটি মূলত বাজাসনে হলেও এটিকে অনেকে মজিদপুর গ্রামে অবস্থিত বলেন। যেহেতু বাজাসন ও মজিদপুর একদম সন্নিকটস্থ এবং ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রমুখ গবেষকগণ এই জায়গাটির বর্ণনাকালে রাজাসন বা বাজাসন গ্রামের কথা উল্লেখ করেছেন, আমার লেখাতে বাজাসন বা রাজাসন নামটিই ব্যবহার করেছি। এ অঞ্চলটি ১৯২১ সালে ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালী পরিদর্শন করেন। এ সময় রাজাসনে ১৩/১৪টি উঁচু ঢিবির অস্তিত্ব ছিল। তিনি ১৯২৫ – ২৬ সালে এখানে স্বল্পপরিসরে খননকাজ পরিচালনা করেন। এর ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রত্ননিদর্শন সংগৃহীত হয়। তার আগে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে নিবারণচন্দ্র দাস মহাশয় সেটেলমেন্টের অফিসার হিসেবে এই অঞ্চল পরিদর্শন করেন। তিনি রাজাসনের বড় ঢিবিটিতে স্থানীয় কয়েকজনের সহায়তায় সামান্য খনন করেন। মাত্র ৪/৫ হাত খননের ফলে দুই হাত প্রস্থ ও ৩৫ হাত লম্বা ভিত্তি দেওয়াল পাওয়া যায়। তারপরে আরও কয়েকহাত খুঁড়লে অনেকগুলো প্রত্ননিদর্শন বেরিয়ে আসে, যার মধ্যে ছিল নকশাকার বাসনপত্র, পুষ্পপত্র, কোশাকুশি, টাট, থালা, ঘণ্টা, শঙ্খ, নানা ধরণের পাথরের টুকরো এবং একটি বামনদেবের মূর্তি অন্যতম। নিদর্শনগুলোর হদিস পরবর্তীতে পাওয়া যায়নি। এর পরের বছর ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালী এই ঢিবিগুলো পরিদর্শন করে একটি সংক্ষিপ্ত রিপোর্ট প্রকাশ করেন। রিপোর্টের কিয়দাংশ নিচে দেওয়া হল:

Steps are being taken to preserve six great mounds containing Buddhist remains at Sabhar near Manikganj in the Dacca district. These mounds have yielded terracotta plaques and Buddhist images in large numbers during casual excavations. Some partial excavations were carried out with the permission of the landlord by some private gentlemen under the leadership of Mr. Nalini Kanta Bhattashali of the Dacca Museum and the antiquities found have been deposited in the Museum at Dacca.

স্বাধীনতার পরে আশির দশক থেকে এই ঢিবিতে বেশ কয়েকবার উৎখননকার্য পরিচালিত হয়। এর ফলে একটি মাঝারি আকারের বৌদ্ধস্তূপ ও একটি বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ বেরিয়ে আসে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননিদর্শন পাওয়া যায় সে সময়। সেই সঙ্গে বাজাসনের প্রাচীনত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এই খননকার্যের বিষয়ে বলার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে সামান্য আলোকপাত করা প্রয়োজন।

যেহেতু আলোচ্য বিহারের ধ্বংসাবশেষ রাজা হরিশ্চন্দ্রের প্রাসাদ নামে খ্যাত, সেহেতু এই নামকরণের দিকেও একটু আলোকপাত করা যাক। বাজাসন ও এর আশেপাশে বেশ কয়েকটি ঢিবি ও প্রাচীন পুকুরের সঙ্গে রাজা হরিশ্চন্দ্রের নাম জড়িয়ে আছে। কিন্তু এই রাজার ঐতিহাসিকতার সপক্ষে কোন পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

প্রাচীন গ্রন্থাবলীতে আমরা দুইজন রাজা হরিশ্চন্দ্রের নাম পাই। একজন হরিশ্চন্দ্র সম্পূর্ণ পৌরাণিক, যিনি দানশীলতার কারণে সুবিখ্যাত। আরেকজন রাজা হরিশ্চন্দ্র সম্পর্কে আমরা জানতে পারি ময়নামতি ও গোপীচন্দ্রের আখ্যান থেকে। রাণী ময়নামতি তাঁর পুত্র গোপীচন্দ্রের বিয়ে দিয়েছিলেন সম্ভার রাজা হরিশ্চন্দ্রের কন্যা অদুনার সঙ্গে এবং উপঢৌকন হিসেবে রাজা তাঁর আরেক কন্যা পদুনাকেও প্রেরণ করেন ময়নামতির প্রাসাদে।

পশ্চিমদিকে ছিল রাজা হরিচন্দ্র নরপতি।

তাহার ঘরে ছিল কন্যা অদুনা যুবতী।।

*****

তাহার পাছে করিল বিভা হরিচন্দ্রের কন্যা।

পৃথিবীর মধ্যে সেহি রূপে গুণে ধন্যা।।

সমস্যা হলো, চন্দ্রবংশের যে সমস্ত রাজাদের নাম বিভিন্ন তাম্রশাসনের মাধ্যমে পাওয়া যায়, সেখানে গোপীচন্দ্র নামে কোন রাজা ও ময়নামতি নামে কোন রাণীর কথা পাওয়া যায় না। অনেক গবেষক রাজা গোবিন্দচন্দ্রকে গোপীচন্দ্র হিসেবে মনে করলেও এখনও এই বিষয়ে কোন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মেলেনি। তারপরেও রাণী ময়নামতির উপাখ্যান, তাঁর তন্ত্রসাধনার কথা কেবল বাংলাতেই নয়, বাংলার বাইরেও শতশত বছর ধরে প্রচলিত। যদি এই উপাখ্যানের সামান্যতমও সত্য হয়, তাহলে সম্ভার রাজ্যের রাজা হরিশ্চন্দ্রকেও সত্য বলে ধরে নিতে হবে।

আরেকটি লোকগাথার উল্লেখ আমি শুরুর দিকে করেছি, যেখানে সাভারকে প্রাচীন সর্বেশ্বর রাজ্য হিসেবে বলা হয়েছে। এ রাজ্যের রাজার নামও হরিশ্চন্দ্র।

বংশাবতীর পূর্বতীরে সর্বেশ্বর নগরী

বৈসে রাজা হরিশ্চন্দ্র জিনি সুরপুরী।

এই রাজা হরিশ্চন্দ্রের দুই স্ত্রীর নাম কর্ণবতী ও ফুলেশ্বরী। দুই রাণীর স্মৃতিবাহী স্থান যথাক্রমে কর্ণপাড়া ও রাজফুলবাড়িয়া, সাভার থেকে অল্প দূরেই অবস্থিত। এই হরিশ্চন্দ্রকে পালদের সামন্তরাজ হিসেবে ধারণা করা হয়।

রাজা হরিশ্চন্দ্র হিসেবে আরও দুইটি সম্ভাব্য নাম সামনে আসে। একজন বর্মবংশের রাজা হরিবর্মদেব, যাঁর ৪২ রাজ্যাঙ্কে রাজধানী বিক্রমপুর হতে উৎকীর্ণ তাম্রশাসন পাওয়া গিয়েছে ফরিদপুরে। এই তাম্রশাসন থেকে জানা যায়, হরিবর্মদেব একজন পরম বৈষ্ণব ছিলেন। হরিবর্ম আর হরিশ্চন্দ্র একজন হওয়া সম্ভব। তবে বৈষ্ণব রাজা হরিবর্মের বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক হরিশ্চন্দ্র হওয়ার সম্ভাবনা প্রশ্নবিদ্ধ। চতুর্থ সম্ভাব্যতা হলো, এই রাজা হরিশ্চন্দ্র চন্দ্র অথবা পালরাজদের দ্বারা নিয়োজিত কোন সামন্তরাজা হতে পারেন। এর সপক্ষে আমরা উপরে উল্লিখিত লোকগাথার কথা বলতে পারি। সর্বশেষ, সাভার অঞ্চলে রণবীর সেন নামক স্থানীয় জমিদারের পুত্রের নাম রাজা হরিশ্চন্দ্র। এঁর পুত্র ১৩৭৭ খ্রিষ্টাব্দে সাভার মঠ স্থাপন করেন বলে জানা যায়। শ্রদ্ধেয় দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয় রাজা হরিশ্চন্দ্রকে বৌদ্ধরাজা হিসেবে মত দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, রাজা হরিশ্চন্দ্র বৌদ্ধধর্মের পথে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন এবং নিজে অত্যন্ত দীনভাবে জীবনযাপন করতেন। শেষ বয়সে তাঁর রাজ্যের বৌদ্ধ বিহারগুলোর দেখাশোনা করে তিনি দিনাতিপাত করতেন। রাজা হরিশ্চন্দ্রকে “রাজর্ষি” বলা হত এই কারণে। মোটামুটি এই কয়েকজন হরিশ্চন্দ্রের কথা আমরা ইতিহাস ও প্রাচীন গ্রন্থাবলীতে পাই। নিঃসন্দেহে কোন একজন রাজা হরিশ্চন্দ্র এই অঞ্চলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, নাহলে এত ঘটনা, স্থাননাম ও লোকগাথা পাওয়া যেত না।

এখন ১৯৯০ – ৯১ সালে এই ঢিবিতে পরিচালিত প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের বিষয়ে কিছু তথ্য দেওয়া যায়। উৎখননের ফলে একটি বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ ও একটি মাঝারি আকারের বৌদ্ধস্তূপ পাওয়া যায়। স্তূপটির কেবল মেধি ও অন্তের অংশটুকু অবশিষ্ট ছিল। স্তূপটিতে তিনটি নির্মাণকালের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। প্রথম পর্যায়ে মেধিটির পরিমাপ ২৬.২১ × ২৫.২১ মিটার ছিল। এর চারপাশে ৪.৪১ মিটার প্রশস্ত প্রদক্ষিণ পথ রয়েছে। সর্বোপরি রয়েছে ১.৩৭ মিটার চওড়া বেষ্টনী প্রাচীর। প্রদক্ষিণ পথে চারদিক থেকে আরোহণের জন্য চারটি প্রবেশপথের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। দ্বিতীয় নির্মাণকালে স্তূপটিকে ১.৮২ মিটার বর্ধিত করা হয়েছিল। ফলে প্রদক্ষিণ পথের প্রশস্ততা ১.২১ মিটারে দাঁড়িয়েছিল। এ সময় তিনদিকের প্রবেশপথ বন্ধ করে কেবল দক্ষিণদিকের পথ খোলা রাখা হয়। তৃতীয় নির্মাণকালে মেধি ও বহিঃপ্রাচীরকে “এক বিংশতি রথ” মঞ্চের আকৃতি দেওয়া হয়। এছাড়া স্থাপত্যটির উপর ৬১ সেন্টিমিটার পুরু নিরেট পিণ্ডাকার প্রলেপ দিয়ে এটির স্থায়িত্ব বৃদ্ধির চেষ্টা করা হয়।

স্তূপটির সংলগ্ন দক্ষিণ অংশে পাওয়া গিয়েছে একটি মাঝারি আকারের বিহারের ধ্বংসাবশেষ, যেটি পূর্ব-পশ্চিমে ৫৫.৭৭ মিটার ও উত্তর-দক্ষিণে ৫৫.৪৭ মিটার দৈর্ঘ্যের। বিহারটির উত্তরবাহুতে পরবর্তীকালে সংযোজিত প্রবেশপথ পাওয়া গিয়েছে। দক্ষিণ দিকের প্রবেশপথটি সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় অনাবৃত হয়েছে। বিহারটির চারদিকে ৩.৬০ মিটার পুরু সুরক্ষা প্রাচীর ছিল। এই সুরক্ষা প্রাচীর ঠেস দিয়ে ভেতরের দিকে একসারি কক্ষ ছিল, প্রতিটি কক্ষ ৩.৭১ × ৩.২৭ মিটার আয়তনের এবং প্রত্যেকটিতে ১.৭০ মিটার প্রবেশপথ ছিল। কক্ষগুলোর প্রবেশপথের সামনে ২.১০ মিটার প্রশস্ত টানা বারান্দা ছিল। বিহারের মধ্যবর্তী অংশে খোলা চত্বর ছিল। বিহারে ব্যবহৃত ইটগুলো আয়তনে ৩৬.৮ × ২৫.৪ × ৪.৫ সেন্টিমিটার থেকে ২৫.৪ × ২৩ × ৫ সেন্টিমিটার। আঠালো কাদামাটি দিয়ে গাঁথুনি দেয়া হয়েছিল। বিহারে কয়েকটি নির্মাণযুগের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। সবচেয়ে উপরের স্তরে একটি স্বর্ণ ও একটি রৌপ্য মুদ্রা পাওয়া যায়, যেগুলো হরিকেল শ্রেণির শৈলীমণ্ডিত, ৭ম থেকে ৮ম শতকের। এছাড়া বিহারের বর্জ্য ও জঞ্জাল থেকে কয়েকটি ব্রোঞ্জের ধ্যানীবুদ্ধ মূর্তি ও কয়েকটি তান্ত্রিক মূর্তি পাওয়া যায়, যেগুলো ৮ম থেকে ৯ম শতকের বলে গবেষকগণ মত দিয়েছেন। সব মিলিয়ে, বিহারটির সময়কাল ৭ম থেকে ১০ম শতাব্দী।

রাজাসন বা বাজাসনের এই বিহারটির নাম নির্ণয়ের জন্য কোন পোড়ামাটির সিল বা এইরকম কিছু পাওয়া যায়নি। তবে সেক্ষেত্রে আমরা প্রাচীন গ্রন্থাবলীর সাহায্য নিতে পারি।

বাজাসন গ্রাম ও এই বিহারের অবস্থান অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের জন্মস্থান বজ্রযোগিনী গ্রাম এবং বঙ্গ জনপদের রাজধানী বিক্রমপুর থেকে খুব বেশি দূরে নয়। অতীশ দীপঙ্করের জীবনীকার পাগ্-সাম্-জাঙ্গ এর মতে, অতীশের জন্মস্থান বিক্রমপুর বজ্রাসন বিহারের পূর্বদিকে। শরৎচন্দ্র দাস মহাশয়ও বলেছেন, বজ্রাসন বিহারের পশ্চিমদিকে বজ্রযোগিনী গ্রামে অতীশের জন্মস্থান। তিনি লিখেছেন:

Dipankara was born A.D. 980 in the royal family of Gaur at Vikramanipur in Bangala, a country lying to the east of Vajrasana.

অলকা চট্টোপাধ্যায় তাঁর “অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান” বইয়েও এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। আরো জানা যায়, অতীশের প্রাথমিক শিক্ষাজীবনের একটি অংশ কেটেছে বজ্রাসন বিহারে। বজ্রাসন নামে বৌদ্ধদের একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্র রয়েছে বুদ্ধগয়ায়, তবে সেটি অতীশের জন্মস্থান থেকে যথেষ্ট দূরে এবং সেখানে বিহার নেই। অপরপক্ষে বাজাসনের ভৌগোলিক অবস্থিতি, স্থাননাম, বজ্রযানীদের স্মৃতিচিহ্ন ও পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে এটি অনুমান করা কঠিন নয় যে, বাজাসনের বিহারটি সেই বজ্রাসন বিহার। বিষয়টি যথেষ্ট রোমাঞ্চকর!

শরৎচন্দ্র দাস মহাশয় বাজাসন নিয়ে তাঁর লেখায় বাজাসন বিহারটি নিয়ে একটি বিশেষ ঘটনা উল্লেখ করেছেন। নান্না গ্রামের তৎকালীন জমিদার শ্রীযুক্ত কৃষ্ণচন্দ্র রায় মহাশয় ঘটনাটি শরৎচন্দ্র দাস মহাশয়কে বলেছিলেন। ঘটনাটি এই রকম: বাজাসনের রাজবাড়ি ঢিবিতে একজন সন্ন্যাসী বাস করতেন। একদিন সেখানে হঠাৎ আরেকজন কাপালিক এসে থাকতে শুরু করেন। কাপালিক কোন কাপড় পরতেন না, কিছু খেতেন না। কেউ জোর করে খাবার দিলে খেতেন আর কাপড় দিলে পরতেন। আর দিনরাত সেই বাজাসন ঢিবিতে বসে ধ্যান করতেন। কাপালিকের বয়স জিজ্ঞেস করলে বলতেন ৩৫০ বছর। এতে অনেকে তাঁকে পাগল ভাবতো। পার্শ্ববর্তী রঘুনাথপুর গ্রামের পণ্ডিত সার্বভৌম মশায় একদিন কাপালিককে দেখতে এসে তাঁর মুখে শুদ্ধ সংস্কৃত শ্লোক শুনে আশ্চর্য হয়ে যান। কাপালিক সবাইকে বলতো, এই ঢিবির নিচে পঞ্চমুণ্ডি শিব আছেন, আরো অনেক কিছু আছেন। তোমরা এটি খনন কর। যেভাবে কাপালিক এখানে এসেছিলেন, হঠাৎ সেভাবেই একদিন চলে গেলেন। এর বহু বছর পর এই ঢিবিতে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি নিবারণচন্দ্র দাস মহাশয়ের নেতৃত্বে খনন করলে অনেক কিছু বেরিয়ে আসে।

বাজাসনে গেলে নিভৃত পরিবেশে অনেক কিছুই সম্ভব মনে হয়। অতীতে বিচরণ করতে করতে বাস্তবটাকে অলীক মনে হয়। কিন্তু মাত্র এক কিলোমিটার দূরে গেলেই সহসা কর্মকোলাহল ও ব্যস্ত সাভারের গাড়ির হর্ণ, কলকারখানার শব্দ, মানুষের কোলাহল অতীতের কথাগুলো অলীক বানিয়ে দেয়। মনে হয়, এই ইট-কাঠ-পাথরের শহরে কোথায় প্রাচীন ঢিবি, কোথায় বজ্রাসন বিহার, কোথায় বজ্রযানীরা। সবই অলীক, সবই মায়া, কেবল ছুটে চলাই বাস্তবতা।

১. Annual Report of The Archaeological Survey of India 1924 – 25

২. Indian Pandits in the Land of Snow, Sarat Chandra Das

৩. প্রশ্নোত্তরে বাঙলাদেশের পুরাকীর্তি (২য় খণ্ড), আবুল কালাম মোহাম্মদ জাকারিয়া

৪. বিক্রমপুর-রামপালের ইতিহাস, কমল চৌধুরী সম্পাদিত

৫. বৌদ্ধ পুরাকীর্তি, ড. জিতেন্দ্র লাল বড়ুয়া

৬. বাংলাদেশের বিহার ও প্রত্নসম্পদ, বিপ্রদাস বড়ুয়া

৭. গোপীচন্দ্রের সন্ন্যাস, আবুল কালাম মোহাম্মদ জাকারিয়া সম্পাদিত

৮. ঘরের কথা ও যুগসাহিত্য, ড. দীনেশচন্দ্র সেন রায়বাহাদুর

পেশায় ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট ও এক্সিকিউটিভ কোচ, শাহরিয়ার কবির সাহিত্য ও ইতিহাসের একজন একনিষ্ঠ ছাত্র। বিভিন্ন প্রত্নস্থল ঘুরে দেখতে ভালবাসেন। ইতিহাস চর্চায় তাঁর প্রধান বিষয়বস্তু প্রাচীন যুগ এবং পুণ্ড্র-বরেন্দ্র অঞ্চল নিয়েই তাঁর প্রধান বিচরণ কেন্দ্র।