সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

চর্যাপদে সমাজচিত্র

চর্যাপদে সমাজচিত্র

সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায়

অক্টোবর ৩, ২০২০ ১৯৪৯ ১০

বাঙালিমাত্রই চর্যাপদ নামটির সঙ্গে পরিচিত। বিষয়বস্তুর সঙ্গেও অল্পবিস্তর। এই চর্যাপদ তথা চর্যাগীতি, তার রচনাকার, রচনাকাল, লিপি, ভাষা, ছন্দ, সুর, বিষয়বস্তু, বহিরঙ্গের অর্থ, অন্তরঙ্গের অর্থ, বৌদ্ধ সাধন তত্ত্ব, দর্শন, কাব্যরস, সমাজজীবন – সবকিছু নিয়ে একটি জটিল বিষয়। এর সবকটি দিককে লেখায় আনা আমার সাধ্যাতীত। আমি চর্যাপদে উল্লিখিত সমাজচিত্র (তা রূপক অর্থে ব্যবহৃত হলেও) সম্পর্কে কিছু আলোচনার চেষ্টা করবো মাত্র।

তবে, কোনো গ্ৰন্থকে বুঝতে হলে, তার সম্পর্কে কিছু মৌলিক তথ্যও জানা আবশ্যক। যেমন –

প্রাপ্তি প্রকাশ

উনিশ শতকের শেষ ভাগে রাজেন্দ্রলাল মিত্র নেপাল ভ্রমণ করে সংস্কৃত ভাষায় রচিত কিছু পুথি উদ্ধার করেন এবং ‘Sanskrit Buddhist literature in Nepal‘ নামক এক পুস্তিকায় তার একটি তালিকা প্রকাশ করেন (১৮৮২ সাধারণাব্দ)। তাঁর মৃত্যুর পর পুথি সংগ্রহের দায়িত্বভার অর্পিত হয় মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর উপরে।তিনি তিনবার নেপালে যান।  প্রথমবারের অভিজ্ঞতার ফসল তাঁর লেখা ‘Discovery of living Buddhism in Bengal‘ গ্রন্থটি। পরের দুইবারের যেসব পুথি সংগ্রহ করেন সেগুলি হল– ডাকার্ণব, সুভাষিতসংগ্ৰহ, দোহাকোষপঞ্জিকা ও চর্যাপদের পুথি। ১৯১৬ সাধারণাব্দে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ‘হাজার বছরের পুরনো বাংলা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোঁহা’ প্রকাশ করেন, যার মধ্যে চর্যাপদও ছিল।

নামকরণ

চর্যাপদের ভাষার বিতর্ক শুরু হয় এর নামকরণ থেকেই। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী পুথিটি খন্ডিত আকারে পান। মুদ্রণের সময়ে তিনি এর নামকরণ করেন চর্যাচর্যবিনিশ্চয়। অনেকে মনে করেন পুথির প্রথমে “শ্রীলূয়ীচরণাসিদ্ধিরচিতেঽপ্যাশ্চর্যচর্যাচয়ে” এই বাক্যবন্ধে যে আশ্চর্যচর্যাচয় কথাটি আছে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রদত্ত নামটি তার থেকেই সৃষ্টি। এই জন্য বিধুশেখর শাস্ত্রী মত দেন, পুথির নাম হওয়া উচিত ‘আশ্চর্যচর্যাচয়’। অন্যদিকে প্রবোধচন্দ্র বাগচী মহাশয় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সঙ্গে একমত না হয়েও আশ্চর্য কথাটি রক্ষার পক্ষপাতী হন ও নাম দেন ‘চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়’। তবে শেষ পর্যন্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রদত্ত ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ নামেই ওই পুথি খ্যাত হয়। তাছাড়া গান/ পদগুলিকে বহু স্থানে চর্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বিনিশ্চয় কথাটিও তান্ত্রিক বৌদ্ধ ঐতিহ্যে পরিচিত (যেমন প্রজ্ঞোপায়বিনিশ্চয়সিদ্ধি)।

ডঃ অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় আরেক ভাবেও নামটির অর্থ কি ব্যঞ্জনা দিয়েছেন– “যে গ্রন্থ আচরণীয় ও অনাচরণীয় তত্ত্বসমূহকে বিশেষ রূপে নিশ্চয় করিয়া দেয় –তাহাই চর্যাচর্যবিনিশ্চয়”। তবে সাধারণভাবে আমরা চর্যাপদ, চর্যাগীতি এই নামগুলোও ব্যবহার করে থাকি।

রচনাকাল রচয়িতা

এই দুটি বিষয় পরস্পর সংযুক্ত। কারণ চর্যার কবিদের জীবৎকাল ধরে এই হিসাব বার করা সম্ভব। সেক্ষেত্রেও আবার প্রথম ও শেষ রচয়িতার জীবনকাল নির্ণয় জরুরী। এই রচয়িতাদের বলা হত সিদ্ধাচার্য। তিব্বতি মত অনুযায়ী এঁদের সংখ্যা চুরাশি জন (চৌরাশ সিদ্ধা)। এঁদের মধ্যে আবার (ভণিতা অংশ পাঠ করে), মনে হয় পদ লিখেছেন তেইশ জন। যদিও টিকা ও মূলপদে নামের পার্থক্য, শব্দার্থের বিভিন্নতা, (যেমন ১৭ নং পদের পদকর্তার নাম বীণাপাদ। কিন্তু এটি বাস্তবেই ব্যক্তিনাম কিনা সন্দেহ আছে) ইত্যাদি অসুবিধা রয়েই গেছে। এই তেইশজন হলেন — লুই, কুকুরী, বিরুয়া, গুডরী, চাটিল, ভুসুক, কাহ্ন/কাহ্নু, কামলি, ডোম্বী, শান্তি, মহিন্ডা, বীণা, সরহ, শবর, আজদেব, ঢেণ্ঢণপা, দারিক, ভাদে, তাড়ক, কঙ্কণ, জঅনন্দি, ধাম ও তন্ত্রী। এঁদের মধ্যে তো বটেই, ওই চুরাশি সিদ্ধাচার্য মধ্যেও লুই হলেন আদি সিদ্ধাচার্য। (রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতে অবশ্য সরহ)। লুই দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের চাইতে সামান্য বেশিবয়স্ক। এঁদের মিলিত রচনাটির নাম ‘অভিসময়বিভঙ্গ’। দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান 1038CE তে আটান্ন বছর বয়সে তিব্বত যাত্রা করেন এই সূত্র ধরে সুনীতিকুমার সিদ্ধান্ত করেছেন, ” The literary life of Lui, when he composed these songs, can vary well be placed in the second half of the 10th century..”. এটি চর্যার রচনাকালের উর্ধ্বসীমা। আবার নাথসাহিত্য, গোরক্ষনাথ ও তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্য, হেবজ্রপঞ্জিকা রত্নমালা গ্ৰন্থের সাক্ষ্য, ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ– ইত্যাদি জটিল পথ ধরে কাহ্নপাদের সময়কালকে (হেবজ্রপঞ্জিকার প্রণেতা পন্ডিতাচার্য কৃষ্ণপাদের সঙ্গে কাহ্নকে একীভূত করে) স্থির করা হয়েছে বারোশো শতকের মধ্যে। এটিকেই চর্যাগীতির রচনার নিম্নসীমা ধরা হয়। “The period 950-1200 A.D. would thus seem to be a reasonable date of give to these poems” (O.D.B.L.)

পদসংখ্যা চর্যার ভাষা

চর্যাগীতিতে পদের সংখ্যা ছিল একান্নটি। তার মধ্যে তিনটি পুরো পদ এবং একটির শেষাংশ পাওয়া যায়নি। চর্যাপদের টিকাকার হলেন মুনিদত্ত।

১৯২৬ সালে ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ‘The Origin and Development of the Bengali Language’ গ্রন্থে বিস্তারিত আকারে চর্যাপদের ভাষার বিষয়টি আলোচনা করেন। তিনি ধ্বনিতত্ত্ব (phonetics), ব্যাকরণ (morphology) ও ছন্দ বিচার করে সিদ্ধান্তে আসেন যে এটি আদিতম বাংলা ভাষায় রচিত। তবে এতে শৌরসেনী অপভ্রংশের প্রভাব রয়েছে এবং কিছু কিছু মৈথিলী শব্দও রয়েছে। ডঃ মহম্মদ শহীদুল্লাহ্ তাঁর গবেষণাপত্রে সুনীতিকুমারের মতকে সমর্থন করেছেন। পরবর্তী ভাষাবিদগণও এই সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়েছেন।

চর্যাভাষার আর একটি দিক হলো সন্ধ্যা/সন্ধা ভাষা। এই সন্ধ্যা/সন্ধা ভাষা বলতে কি বোঝাচ্ছে তা নিয়ে নানা ধন্দ। এক্ষেত্রে প্রথমেই মনে রাখতে হবে যে চর্যাগীতির মূলবিষয় বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের আধ্যাত্মতত্ত্ব।  সাধনবিষয়ক নির্দেশ দানের উদ্দেশ্যে এগুলি রচিত। তাই প্রত্যেকটি পদ দ্ব্যর্থক অর্থ প্রকাশ করে। এবং সেই জন্যই হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর বোঝা না বোঝায় মেশা ‘আলো আঁধারি ভাষা’; সন্ধা শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থবিচার (বিধুশেখর শাস্ত্রী কর্তৃক); সাঁওতাল পরগনা ও বীরভূমকে সন্ধা দেশ বলে অভিহিত করে এটিকে সেখানকার উপভাষা আখ্যা দেওয়া (পাঁচকড়ি‌ বন্দ্যোপাধ্যায়).. ইত্যাদি সব মাথায় রেখেও বলা যায় চর্যার ভাষা হল, “আসলে গূঢ়ার্থ প্রতিপাদক এক ধরনের বচনসংকেত”।

চর্যাগীতির সাহিত্যমূল্য কাব্যরস

চর্যাগীতি প্রধানত তত্ত্ববাদের বাহন, গৌণত কবিতা। এটা প্রথমেই স্বীকার করে নিতে হবে। কাব্যচর্চা করার জন্য সিদ্ধাচার্যরা এগুলি লেখেননি। “কাব্যের কাব্যত্বগুণ নির্ভর করে সৌন্দর্যব্যঞ্জনায় ও রসের উত্তরণে। এই বিচারের দুটি দিক– কাব্যের ভাবরস ও প্রকাশভঙ্গির চারুত্ব। চর্যাগীতি আধ্যাত্মসঙ্গীত হলেও বহিরঙ্গের রসাবেদনে ও সৌন্দর্য ব্যঞ্জনায় এগুলিকে কাব্যের কোটা থেকে বাদ দেওয়া যায় না।”.. অধ্যাপক জাহ্নবীকুমার চক্রবর্তীর এই উক্তি চর্যাপদের কাব্যমূল্য সম্পর্কে অবশ্যই একটি নির্ণায়ক অভিমত।

চর্যার ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট

উত্তর বিহার ও কলিঙ্গের অংশ এবং বাংলা ও কামরূপ– প্রধানত এই অঞ্চল চর্যাপদের পটভূমিকা বলে পণ্ডিতগণ মত প্রকাশ করেন। তবে নদীমাতৃক বাংলার ও বাঙালির জীবনযাত্রার বহু ছবি পদগুলিতে যেরকম প্রকট ভাবে উপস্থাপিত,তা বাংলার এক সহজ ও সাবলীল চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরে। আসলে রাষ্ট্রব্যবস্থার নিয়ামকদের জারি করা কোন বিশেষ সীমারেখাতে কাব্য দর্শন বা তত্ত্বকে বাঁধা যায় না, চর্যাগীতি এই সত্যকেই প্রকাশ করে।

চর্যাপদে সমাজ চিত্র

সামাজিক পরিবেশ-পরিস্থিতির উপস্থাপনা চর্যাগীতিতে কতটা রয়েছে, সেইটার সাধ্যমত অনুসন্ধানই এই লেখার উদ্দেশ্য ছিল। এখানে আবারও মনে রাখতে হবে পদগুলি দ্ব্যর্থক। একটি উদাহরণ তাই প্রথমেই দেওয়া যেতে পারে বোঝার সুবিধার জন্য–

ভব নির্বাণে পড়হ মাদলা।

মন পবন বেণি করন্ড কশালা ।।

জঅ জঅ দুন্দুহি সাল উছলিআঁ।

কাহ্ন ডোম্বী বিবাহে চলিআ।।

ডোম্বী বিবাহিআ অহারিউ জাম।

জউতুকে কিঅ আণুতু ধাম।।

অহনিসি সুরঅ পসঙ্গে জাঅ।

জোইনি জালে রএণি পোহাঅ।।

ডোম্বী এর সঙ্গে জো জোই রত্তো।

খণহ ন ছাড়ই সহজ উন্মত্তো।।

সাধারণভাবে এর অর্থ, বাজনা বাদ্য বাজিয়ে কাহ্নর ডোমিনীকে বিবাহ, মূল্যবান যৌতুক প্রাপ্তি, ও বধূর প্রতি বরের বিবাহপরবর্তী আসক্তি। কিন্তু এর গূঢ়ার্থ হলো, বিবাহ একটি রূপক। আসলে ডোমিনী দেবী নৈরাত্মা। তাঁর সাথে মিলনের অর্থ পরমতত্ত্ব জানা। মূল্যবান যৌতুকটি আসলে নির্বাণ। যে সাধক নৈরাত্মাকে উপলব্ধি করেন, অন্ধকার রাত তিনি পেরিয়ে যান জ্ঞানের আলোকে। এবং এই প্রাপ্তি সেই দুর্লভ সহজানন্দ। ফলে যিনি তাকে পান তিনি ক্ষণমাত্রেও তা থেকে বিচ্ছিন্ন হন না।

বাস্তবে প্রতিটি পদেই লুকিয়ে আছে এই সাধনতত্ত্ব। তবুও আমরা নদনদী, নৌযাত্রা, সাঁকো, নৌকার গড়ন, জলদস্যুর হানা, শুঁড়িবাড়ি, তাঁতি, ধুনুরি, হাতীধরা, হরিণ শিকার… এই রকম বহু খণ্ডচিত্র পাই পদগুলি থেকে।

পূর্ববর্তী অংশে একটি পদের ব্যাখ্যায় আমরা দেখেছি পদের গূঢ়ার্থ। এখন বলব – আসুন, ওইসব গূঢ়ার্থ আমরা ভুলে যাই। শিক্ষক যেমন জানেন ছাত্রকে কিছু বোঝাতে গেলে তার চেনা জগতের উদাহরণ সহযোগ কতটা কার্যকরী, চর্যার কবিরাও তা জানতেন। আর সেই জন্যই পারিপার্শ্বের সাধারণ বস্তুনিচয়কে তাঁরা বেছেছিলেন নিজেদের ভাবের বাহন হিসাবে। আমরাও সেগুলিকে এখন দেখব একেবারে সহজ দৃষ্টির আলোকে।

. বিভিন্ন সম্প্রদায় ও সাধনাচার চর্যার কবিরা ছিলেন বৌদ্ধ। তাই বলে এমনতো নয় যে বাংলায় তখন অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায় ছিল না।

১. জাহের বাণচিহ্ন রুব ণ জাণী

   সো কইসে আগম,বেএঁ বখাণী।।

যার (অর্থাৎ সহজস্বরূপের) বর্ণ চিহ্ন রূপ জানা যায় না, তা কিভাবে আগম বেদে ব্যখ্যাত হবে?

২. বহ্মণো হি ম জানন্ত হি ভেউ।

   এবই পঢ়িঅউ এ চ্চউবেউ।।

   মট্টি পাণী কুস লি পড়ন্ত।

   ঘরহিঁ বঁইসী অগগি হুণন্তঁ।।

   কজ্জে বিরহিঅ হুঅবহ হোমেঁ।

   অকখি উহাবিঅ কড়ুএঁ ধুমেঁ।।

ব্রাহ্মণরা সত্যকারের ভেদ জানে না। এভাবেই চতুর্বেদ পঠিত হয়। তারা মাটি জল কুশ নিয়ে (মন্ত্র) পড়ে,ঘরে বসে আগুনে আহুতি দেয়, নিষ্ফল অগ্নিহোমের ফলে শুধু কূটধুমের দ্বারা চোখ পীড়িত হয়।

৩. দীঽণকখ জি মলিনেঁ বেসেঁ।

   ণগগল হোই উপড়িঅ কেসেঁ।।

দীর্ঘ নখধারী মলিন বেশ নগ্ন যোগী নিজে নিজের কেশ উৎপাটিত করে।

৪. জই নগগা বিঅ হোই মুক্তি তাই সুনহ সিআলহ।

   লোমুপাড়ণেঁ অথ্থি সিদ্ধি তার জুবই নিতম্বহ।।

   পিচ্ছীগহণে দিধ্ ধ মক্ষ তা মারহ চমরহ।

   উঞ্ছে ভোঅণেঁ হোই জাণ তাই করিহ তুরঙ্গহ।।

যদি নগ্ন হলেই মুক্তি মিলতো তাহলে কুকুর শিয়ালেরও মুক্তি হত।(মাথার) লোমৎপাটনেও সিদ্ধি নেই। পুচ্ছগ্রহণে যদি মোক্ষ দেখা যেত তবে ময়ূরচামরেরও মোক্ষ হত। উচ্ছিষ্টভোজনে জ্ঞান হলে  হাতি ঘোড়ারও জ্ঞান জন্মাত।

৫. সঅল সমাহিঅ কাহি করি অই।

   সুখ দুখেতেঁ নিচিত মরি অই।।

ধ্যানসমাধিতে সুখ দুঃখের পরিনিবৃত্তি নেই।

৬. অইরিএহিঁ উদ্দুলিঅ চ্ছারেঁ।

   সীসসু বাহিঅ এ জড়ভাঁড়ে।।

   ঘরহী বইসী দীবা জালী ।

   কোণহিঁ বইসী ঘন্টা চালী।।

   অকখি ণিবেসী আসন বন্ধী।

   কণ্ণেহিঁ খুসখুসাই জন ধন্ধী।।

আর্য যোগীগণ ছাই মাখে দেহে। মাথায় বহে জটা ভার। ঘরে বসে দীপ জ্বালে। কোণে বসে ঘন্টা চালে। চোখ বুজে আসন বাঁধে এবং কান খুসখুস করে জনগণকে ধন্ধে ফেলে।

প্রথম দ্বিতীয় ও ষষ্ঠ পদে বেদ-ব্রাহ্মণ-আর্য যোগীদের, তৃতীয় ও চতুর্থ পদে জৈন সাধুদের, এবং পঞ্চম পদে হীনযানী বৌদ্ধদের উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া কাপালিক, রসসিদ্ধ যোগী– এদের উল্লেখও আছে।  [বলা বাহুল্য কোন সম্প্রদায়ের, এমনকি হীনযান মহাযানীদেরও সাধন রীতিপদ্ধতি চর্যাগীতির পদকর্তাদের ব্যাঙ্গের হুলের বাইরে নয়। তবে বর্তমান লেখায় সেটা আলোচ্য নয়।]

. সামাজিক শ্রেণী বিভাগ— চর্যার মধ্যে সমাজের যে শ্রেণীর জীবনের প্রতিফলন রয়েছে তাতে বোঝা যায়, এই সময়ে বাঙালি সমাজে শ্রেণীবৈষম্য এবং বর্ণাশ্রম বিধানকে কঠোর থেকে কঠোরতর করা হয়েছিল। তখন সমাজে ধনী লোক গরিবদের সহজেই পদতলে নিষ্পেষিত করতো। এর একদিকে ছিল অস্পৃশ্যতা, অন্যদিকে ছিল আর্থিক দিক দিয়ে দুর্বল মানুষকে সাধারণ জীবনযাপনের ন্যূনতম সুযোগ থেকে বঞ্চিত করণ। বলা যায় এই দুটি ছিল একে অপরের পরিপূরক। পদগুলি থেকে এটাও বোঝা যায়, ডোম, শবর, চণ্ডাল, ব্যাধ প্রমুখ অন্ত্যজদের বাস ছিল মূলত নগরের বাইরে।

১. নগর বাহিরে ডোম্বী তোহারি কুড়িআ।

   ছোই ছোই জাই সি বাহ্মণ নাড়িআ।।

শহরের বাইরে ডোম্বীর কুঁড়েঘর..

২. উঁচা উঁচা পাবত তহিঁ বসি সবরী বালী…

উঁচু পর্বতের উপরে শবরী বালিকা বালা    

আগের আলোচনায় আমরা দেখেছি যে চর্যাগীতিতে প্রতিফলিত সমাজের সিংহভাগ মানুষ ছিলেন অন্ত্যজ। তাই চর্যার সমাজচিত্র আলোচনায় এইসব মানুষের দারিদ্র্য সম্পর্কিত পদগুলি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

. দারিদ্র্য

টালত মোর ঘর নাহি পড়িএসি।

হাড়ীতে ভাত নাঁহি নিতি আবেসি।।

বেঙ্গস সংসার বড়হিল জাঅ।

দুহিল দুধু কি বেন্টে সামায়।।

বলদ বিআএল গবিআ বাঁঝে।

পিটা দুহিহ এ তিন সাঝে।।…

প্রতিবেশী বিহীন টিলার উপর আমার ঘর। হাঁড়িতে ভাত না থাকায় নিত্য উপোস। এদিকে ব্যাঙের সংসার বেড়েই চলেছে। এমনকি দোহা দুধও কি গরুর বাঁটের মধ্যেই ঢুকে যাচ্ছে…

হাঁউ নিরাসী খমনভাতারে।

মোহোর বিগোআ কহণ ণ জাই।।     

ফেটলিউ গো মাএ অন্তউড়ি চাহি

জা এথু চাহাম সো এথু নাহি।।

পহিল বিআণ মোর বাসনপূড়া।

নাড়ি বিআরন্তে সেব বায়ুড়া।।

জাণ জোবন মোর ভইলেসি সূরা।

মূল নখলি বাপ সংহারা।।

এই পদটির মধ্যে দিয়ে আসন্নপ্রসবা এক দরিদ্র রমণীর আক্ষেপ ধ্বনিত হয়েছে। প্রথমসন্তান প্রসাবের জন্য তার আঁতুড়ঘর চাই। কিন্তু তাও সে পাচ্ছে না।

কারোর কারোর দুবেলা দুমুঠো অন্ন সংগ্রহেরও সামর্থ্য ছিল না। তাই পদ্মের ডাঁটি খেয়ে ক্ষুণ্ণিবৃত্তি করতো।

. নদীনৌকামাঝিসাঁকো চর্যাপদে বারে বারে এই বিষয়গুলি উল্লিখিত হয়েছে। একে তো নদীমাতৃক বাংলা চর্যাগানের একটি বৃহৎ পটভূমি। তার উপর নদী মাঝি ও নৌকা আবহমান কাল ধরে রূপক হিসাবে বহুল প্রচলিত, যার শুরু সংস্কৃত কাব্যে। চর্যাগান থেকে বৈষ্ণবপদাবলী হয়ে বাউল গানের পথ ধরে ‘সোনার তরী’ ছুঁয়ে তা আধুনিকতম কবিতা পর্যন্ত বিস্তৃত। চর্যার এই সংক্রান্ত পদগুলি থেকে আমরা নানা ধরনের নৌকা, ভেলা, নৌকার প্রত্যঙ্গের নাম, বৈঠা, গোলুই, কাছি, হাল, খুঁটি, সেঁউতি ইত্যাদির উল্লেখ পাই। সর্বোপরি নদী পার কারি/কারিণীদের সঙ্গে পরিচিত হই।

গঙ্গা যমুনা মাঝেঁ রে বহই নাঈ।

তহিঁ বুড়িলী মাতঙ্গী জোইআ লীলে পার করেই।।

বাহ তু ডোম্বী বাহ লো ডোম্বী বাটত ভইল উছারা।

সদ্গুরু পাঅপসাএ জাইব পুনু জিনউরা

পাঞ্চ কেড়ুয়াল পড়ন্তে মাঙ্গে পিঠত কাচ্ছী বান্ধী

গঅণ দুখোঁলে সিঞ্চহু পাণী ন পইসই সান্ধি।।

চন্দ সূজ্জ দুই চকা সিঠি সংহার পুলিন্দা।

বাম দাহিণ দুই মাগ ন চেবই বাহ তু ছন্দা।।

কবড়ী ন লেই বোড়ী ন লেই সুচ্ছরে পার করই।

জো রথে চড়িলা বাহবা ণ জনই কুলে কুল বুড়ই।।

গঙ্গা যমুনার মাঝে নৌকা চলেছে। এখানে ডুবলে মাতঙ্গী তাঁর লীলায় যোগীকে পার করিয়ে দেন। ডোমনী, তুই বেয়ে যা। কারণ পথে দেরি হয়ে গেছে,সদ্গুরুর পায়ে পৌঁছাতে। পাঁচটি দাঁড় পড়ছে পিছনের গলুইয়ে কাছী বেঁধে। গগন দুখালে অর্থাৎ বৃষ্টি হলে,সেঁউতি দিয়ে জল সেঁচে যেতে হবে। চন্দ্র-সূর্য দুটি চাকা যা সৃষ্টিকে দন্ডমধ্যে সংহার করতে পারে। বাম ও ডান দুটি পথেই না গিয়ে তুই বেয়ে যা। আবার মাঝিনী কড়ি বা বুড়ি (কড়ির চাইতে বড়ো মুদ্রা) নেয় না। স্বেচ্ছায় পার করে। তবে ঠিকমতো বাইতে জানা চাই।

তিসরণ ণাবী কিঅ অঠকুআরী।

নিঅ দেহ করুনা শূণ্য মেহেরী।।

তরিত্তাভবজলধি জিম করি মাঅ সুইনা।

মঝ বেনী তরঙ্গম মুনিআ।।

পঞ্চ তথাগত কিঅ কেড়ুআল।

বাহঅ কাঅ কাহ্নি ল মায়াজাল।।..

ত্রিশরণ নৌকা, তাতে আটটি কুঠুরি আছে। নিজের দেহে করুণা ও শূন্যের মিলন ঘটিয়ে কাহ্ন ভবনদী পার হয়েছেন। স্রোতের মধ্যে তরঙ্গ মেপেছেন। পঞ্চ তথাগতকে নৌকার পাঁচটি দাঁড় করে কাহ্ন মায়াজাল বেরিয়ে যাচ্ছেন।

সোনা ভরিতী করুণা নাবী।

রূপা থোই নাহিক ধাবী।।

বাহতু কামলি গঅণ উবেঁসে।

গেলী জাম বহু উই কইসেঁ।।

খুন্টি উপাড়ী মেলিলি কাচ্ছি।

বাহতু কামলি সদগুরু পুচ্ছি।।..

নৌকা সোনায় ভরেছে। রুপার জন্য স্থান নেই আর। কমলি (কম্বলপা) তুই বেয়ে যা। সদ্গুরুর অনুমতি নিয়ে গগনের উদ্দেশ্যে কাছি তুলে খুঁটি উপরে বেয়ে যা তুই..

ধামার্থে চাটিল সাঙ্কম গঢ়ই।

পারগামি লোঅ নিভর তৈরি।।

ফাড্ডিহ মোহতরু পাটি জোড়িঅ।

অদঅ দিঢ় টাঙ্গী নিবাণে কোরিঅ।।..

চাটিলপা বলছেন পারগামী লোক যাতে নির্ভয়ে নদী পারাপার করতে পারে সেই জন্য তিনি কুঠারে (টাঙ্গী) ধার দিয়ে তাকে ধারালো করেছেন। এবং মোহগাছ ফেড়ে সাঁকোর পাটা  জোড়া দেওয়া হয়েছে।

মাহামোহসমুদা রে অন্ত ন বুঝসি ছাড়া।

আগে নাবন ভেলা দীসঅ ভন্তি পুছসি নাড়া।।

মায়ামোহ রূপ সমুদ্রের অন্ত বুঝিস না। আগে নৌকো ভেলা কিছুই নেই। তাই ভ্রান্তিতে পা দিস না।

চর্যাপদে জীবিকা, বিনোদন ও গার্হস্থ্য চিত্র নিয়ে যথেষ্ট উল্লেখ রয়েছে।

ঙ. বিভিন্ন জীবিকা

নৌকার উল্লেখ থেকে বোঝাই যায় যে মাঝি মাঝিনীর বৃত্তি ছিল অনেকের,যা আমরা আগের পর্বে দেখেছি। এছাড়া ছিল ধুনুরি, মদ্যপ্রস্তুতকারী, জেলে, কাঠুরে, শিকারি প্রমুখ।

ধুনুরি—

তুলা ধুনি ধুনি আঁসুরে আঁসু।

আঁসু ধুনি ধুনি নিরবর সেসু।।….

…বাহল বাট দুই আর দিশঅ।

শান্তি ভনই বালাগ ণ পইসঅ।।

তুলা ধুনে আঁশ। আবার সেই আঁশ ধুনে যে শাঁস,তা সুক্ষ্ম (নিরাবয়ব)।.. এই সূক্ষ্ম তুলো ওয়াড়ে ভরে সেলাই করা হবে এমনভাবে যে দুইপাশ একেবারে মিলে যাবে। চুলমাত্র সংযোগ রেখা দেখা যাবে না।

মদপ্রস্তুতকারী—

এক সে শুন্ডিনি দুই ঘরে সান্ধঅ।

চীঅন বাকলঅ বারুণী বান্দঅ।।..

……দশমি দুয়ারত চিহ্ন দেখিআ।

আইল গরাহক আপনে বহিআ।।

একজন শুঁড়িনি দুটি ঘরেই থাকে। চিকন বাকল দিয়ে মদ ছেঁকে রাখে। দুয়ারের নির্দিষ্ট চিহ্ন দেখে গ্রাহক নিজেই চলে আসে।

শিকারী—

কাহারে ঘিনি মেলি অচ্ছহু কিস।

বেটিল হাক পড়অ চৌদীস।।

আপনা মাংসেঁ হরিণা বৈরী।

খণঅ ন ছাড়অ ভুসুক অহেরি।।

তিন ন চ্ছুপই  হরিণা পিবই ন পাণী।

হরিণা হরিণীর নিলয় ন জানী।।

হরিণী বোলঅ সুন হরিণা তো।

এ বন চ্ছাড়ী হোহু ভান্তো।।

তরংগেতে হরিণার খুর ন দীসঅ।

ভুসুক ভণই মূঢ়হিঅহি ন পইসই।।

কাকে বা ঘৃণা করি আর কাকে ভালো বলি। চৌদিক বেড়ে যে হাঁক পড়েছে। আপন মাংসে হরিণ সকলের বৈরী। ব্যাধরা ক্ষণকালের জন্যও হরিণরুপী ভুসুককে ছাড়েনা।…পরের ছয় লাইনে চতুর্দিক থেকে আক্রান্ত ভীত হরিণের বর্ণনা রয়েছে। হরিণের দিক থেকে যে অনুভূতি, তার প্রাঞ্জল প্রকাশ। হরিণ জল খায় না, তৃণ ছোঁয় না। সে হরিণীর সন্ধান জানেনা। (তাই) হরিণী তাকে বলে যায়, এই বন ছেড়ে চলে যাও। (তখন) তূর্ণগতিতে ধাবমান হরিণের খূর দেখা যায় না।দ্রুতগতিতে ধাবমান হরিণের অদৃশ্য হওয়ার চিত্র কি আশ্চর্য গতিময়!!

আর একটি পদে..

জই তুমহে ভুসুক অহেরি।

জাইবে মারিঅসি পঞ্চজনা।।

নলিনীবনে পইসন্তে হোহিসি একুমনা।

জীবন্তে ভেলা বিহনি মএল রঅনি।।

হণবিনু মাঁসে ভুসুক পদ্মবন পইসহিলি।

মাআজাল পসরি রে বাঁধেলি মাআ হরিণী।।

নলিনী বনে প্রবেশে একমন হও। মায়াজাল প্রসারিত করে বধ কর মায়াহরিণ কে।.. গুহ্যার্থ যা ই থাক এবং শিকার কল্পনা যতই রূপক হোক — দৃশ্যটি শিকারের ই ।

আর আছে হাতির বিচরণ ও হাতি ধরা–

মুক্কউ চিত্তগএন্দ করুন এথ্থ বিঅপ্প ন পুচ্ছ।

গঅনগিরী ণইজল পিএউ তহিঁ তড় বসউ সইচ্ছ।।

চিত্ত গজেন্দ্রকে মুক্ত করো। এর কোন বিকল্প নেই। গগনগিরির নদী জল সে পান করুক। তার তটে সে বাস (বিচরণ) করুক স্ব ইচ্ছায়।

এরপর বীণাপাদের একটি গীতিতে হাতি ধরবার ফন্দি বলা হয়েছে। সারিগানের সুরে হাতির মনকে আগে বশ করতে হবে।

আলিকেলি বেণি সারি মুণিআ।

গঅবর সমরস সান্ধি গুণিআ।।

কিন্তু এমন ভাবে বশ করে, বন্য হাতিকে সুদৃঢ় বন্ধনে বেঁধে রাখা সত্ত্বেও, মদমত্ত হাতি সব খাম্বা ভেঙে.. দড়িদড়া ছিঁড়ে নলিনী বনেই প্রবেশ করত।

এবংকর দৃঢ় বাখোড় মোড়িউ

বিবিঅ বিআপক বান্ধন তোড়িউ।।

কাহ্ন বিলসঅ আসবমাতা।

সহজ নলিনী বন পইসি নিবিতা।।

এছাড়া তাঁত বোনা, বাঁশের চাঙারি তৈরি ইত্যাদি বৃত্তিধারী মানুষও ছিল। যারা জাতিতে ছিল ডোম।

তান্তি বিকণঅ ডোবি অবরণা চাংগেড়ী।।

চ. বিনোদন- দাবা খেলার চল ছিল এবং তা বেশ প্রিয়ও ছিল বলে মনে হয়।

করুণা পিহাড়ি খেলহুঁ নঅবল।..

… পহিলেঁ তোড়িআ বড়িআ মারিউ।

গঅবরেঁ তোড়িআ পাঞ্চজনা ঘালিউ।।

মতিএঁ ঠাকুরক পরিণিবিতা।

অবশ করিআ ভহবল জিতা।।

করুণার পিঁড়ীতে দাবা (নয়বল) খেলি। প্রথমে বোড়ে তুড়ে মারলাম। তারপরে গজ তুড়ে পাঁচজনকে ঘায়েল করলাম। মন্ত্রীকে দিয়ে ঠাকুরকে (রাজা) পরিনিবৃত্ত করলাম। অবশ করে ভববল জিতলাম, অর্থাৎ কিস্তিমাত করলাম।

নৃত্যগীত জনপ্রিয় ছিল। তবে সেটাও চর্যাগীতিতে অন্ত্যজকৃত। এরা নিম্নশ্রেণীর গায়ক গায়িকা যারা লাউ বাকলের সঙ্গে বাঁশ বা কঞ্চির ডাঁটি লাগিয়ে তার সাথে তন্ত্রী যোগে এক ধরনের বীণাজাতীয় যন্ত্র তৈরি করতো। এবং তার সাহায্যে গান গাইতো, দেশ-বিদেশে ঘুরে নাচ দেখাতো।

সূল লাউ সসি লাগেলি তান্তী।

অণহা দন্ডী একি কিঅত অবধূতী।।

বাজই আলো সহি হেরুঅ বীণা।

সুন তন্তিধনি বিলসই রুণা।।..

… ..  নাচন্তি বাজিল গাঅন্তি দেবী।

বুদ্ধ নাটক বিসমা হোই।।

সূর্য লাউ। শশী তন্ত্রী। অনাহত দণ্ড। সব এক করল অবধূতী। আলো হল সখী। বাজে হেরুক বীণা। শোনো তন্ত্রীধ্বনি–কি সকরুণ ভাবে বাজছে !!

বজ্রাচার্য নাচে,গায় দেবী–এইভাবে বুদ্ধনাটক সম্পাদন হয়। এখানে বুদ্ধ নাটক কথাটি লক্ষণীয়। এর মধ্যে দিয়ে, কোন বিশেষ ঘটনাকে নাটকে রূপদান করা হতো তা বোঝা যায়।

আবার একটি পদ্মের চৌষট্টিটি পাপড়ির উপরে নৃত্যের বর্ণনার ভিতর দিয়ে ডোম্বীর অসাধারণ নৃত্যকুশলতার চিত্র প্রকাশ পায়।

এক সো পদুমা চৌষট্টি পাখুড়ী।

তহিঁ চড়ি নাচঅ ডোম্বী বাপুড়ী।।

ছ. গার্হস্থ্য চিত্র গৃহিণী নারীর প্রতি পুরুষের অভিভাবকত্ব তখনো কিঞ্চিৎ দৃঢ় ছিল–

ণিঅ ঘরে ঘরণী জাব ন মজ্জাই।

তাব কি পঞ্চবণ্ণ বিহরিজ্জই।।

নিজের ঘরের ঘরনী যে পর্যন্ত না মজে, ততক্ষণ কি পঞ্চবর্গে বিহার করা যায়?

ঘরের কর্তা গিন্নির একসঙ্গে বসে খাওয়া, তখনকার দেশাচারের পক্ষে ছিল একেবারেই বেঠিক।

ঘরবই খজ্জই ঘরিণি এহি জহিঁ দেসহি অবিআর।

বিবাহের জৌলুসের চিত্র এবং যৌতুক প্রথা প্রচলিত ছিল।

চর্যাকবিদের বিষাদবোধ কোথাও পারিপার্শ্বিক চাপ, কোথাও সামাজিক অত্যাচার, কোথাও সাংসারিক অসংগতি থেকে উৎসারিত হয়েছে–

বাজণাব পাড়ি পউঁআ খালে বাহিউ

অদঅ বঙ্গালে দেস লুড়িউ…

অর্থাৎ নির্দয় জলদস্যু’ খাল বেয়ে এসে দেশ লুণ্ঠন করল।

সোন রুঅ মোর কিম্পি ন থাকিউ।

নিঅ পরিবারে মহাসুহে থাকিউ।।

চাউকোড়ি ভন্ডার মোর লইআ সেস।

জীবন্তে মইলে নাহি বিশেস।।

আগে আমি নিজের পরিবার নিয়ে মহাসুখে ছিলাম। এখন সোনা রুপা কিছুই থাকলো না। চার কোটি মূল্যের ভান্ডার (?) নিঃশেষে লুণ্ঠিত হয়েছে। এখন মরা বাঁচায় তফাৎ নেই।

আঙ্গণ ঘরপণ সুন ভো বিআতী।

কানেট চোরে নিল অধরাতী।।

সসুরা নিদ গেল বহুড়ী জাগঅ।

কানেট চোরে নিল কা গই ন মাগঅ।।

অর্ধেক রাতে বধুর কর্ণভূষণ চোরে নিল। শশুর ঘুমায় কিন্তু বধূ জেগে আছে। চুরি যাওয়া কর্ণভূষণ সে কোথায় খুঁজে পাবে?

আবার চর্যার কবি এও জানতেন, যে চোর সেই হলো সাধু (জৌ স চৌর সোই সাধী)। এ কি বর্তমানের কিছু দুর্নীতিপরায়ণ শান্তিরক্ষকের চিত্র নয়?

আর আছে মানুষের শেষ গতির চিত্র। মৃতকে দাহ করার বর্ণনা।

চারিবাসে গড়িল রে দিআঁ চঞ্চালী।

তহিঁ তোলি শবরো ডাহ কঅনা ।।

কান্দই সগুন সিআলী।

মারিল ভবসত্তা রে দহ দিধলী বলী।।

চার বাঁশের ভাটি দিয়ে শবের খাটিয়া গড়া হল। চেঁচাড়িও দেওয়া হল। তাতে শব তুলে দাহ করা হল। কাঁদল শেয়াল শকুন (আত্মীয়রা)। যে শবর সংসারকে মত্ত করেছে, সে মরে গেল। দশদিকে শ্রাদ্ধপিন্ডি দেওয়া হল। (এই পদের একটি ব্যাখ্যা পাচ্ছি, যেখানে বলা হচ্ছে শ্রাদ্ধে ঐসব আত্মীয় ভোজন না করিয়ে, দশদিকে অর্থাৎ প্রকৃতিতে ছড়িয়ে দিতে। বাস্তবিকই, আধুনিক মনোভাব!)

এছাড়া দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যবহৃত নানা উপকরণের মধ্যে ছিল…

তৈজসপত্র– হাঁড়ি, পিঠা (দুধ দোহানোর পাত্র), ঘড়ি (ঘড়া), ঘরুলি (গাড়ু), পিহাড়ি (পিঁড়ি)।

শৃঙ্গারদ্রব্য— দাপন আর অদশ (আরশি), কাপুর (কর্পূর), তাঁবোলা (তাম্বুল)।

অলঙ্কার— কানেট (দুল), ঘন্টা-নেউর (নুপূর), কাঙ্কন (কাঁকন), মুক্তিহার (মুক্তাহার), কুণ্ডল ইত্যাদি।

বাদ্যযন্ত্র— পড়হ (পটহ), মাদলা (মাদল), করন্ড (ঢোল), কশালা (কাঁসী), ডমরু, বীণা, বাঁশী।

অস্ত্রশস্ত্র— কুঠার, টাঙ্গি, কোঞ্চাতাল (তালাচাবি) ইত্যদি।

চর্যাপদ বর্ণিত সমাজের যতটুকু সম্ভব দেখার পর, আর কেবল একটি বিষয় নিয়ে সংক্ষিপ্ত কিছু কথা।

জ. চর্যাপদে নারী- আমরা জানি যে চর্যার গানগুলি সবই দ্ব্যর্থক। নারী এখানে শক্তি। কখনো বা দেবী নৈরাত্মা কখনো বা তারা। তবু বাইরের দৃষ্টি থেকে দেখলেও নারীর মর্যাদাজ্ঞান, পুরুষের সাথে পা মিলিয়ে শ্রমের পথে হেঁটে চলার দৃপ্ত ভঙ্গি,– আমাদের নজর কাড়ে।

শ্রেণী বিভক্ত সমাজব্যবস্থা অন্ত্যজ নারীর অবস্থান নির্দেশ করে নগরের বাইরে। সেই সমাজের মাথা যে ব্রাহ্মণ, তার ভ্রষ্টাচার কিন্তু একটা সময়ে এই ভেদরেখা ভুলে যায়।

নগর বাহিরি ডোম্বি তোহোরি কুড়িআ

ছোই ছোই যাহ সে ব্রাহ্মননাড়িয়া।।

কিন্তু ডোম্বিনী কাকে তার ঘরে প্রবেশাধিকার দেবে বা দেবেনা, তা সে স্থির করে নিজেই –

কইসনি হালো ডোম্বী তোহোরি ভাভরিআলী

অন্তে কুলীনজন মাঝেঁ কাবালী।।

ডোম নারী কুলীনদের বাইরে রাখে আর কাপালিককে (ঘরের) মধ্যে আনে। এজন্য কেউ কেউ তাকে মন্দ বলে, কেউবা তাকে কন্ঠলগ্ন করে রাখে।

উপসংহার

প্রতিটি চর্যাগানের প্রধান বিষয় সাধন তত্ত্ব। কিন্তু কিছু পদে চর্যার কবির রসসৃষ্টির আনন্দ যেন তত্ত্বকথাকে ছাপিয়ে গেছে। তত্ত্বের আগে স্থান পেয়েছে কবিত্ব। প্রকৃতি ও প্রকৃতিরূপা নারী, এক অনাবিল নির্মল সৌন্দর্যে ও আনন্দে ভাস্বর হয়ে উঠেছে। সেইরকম একটি পদ দিয়েই এই লেখার সমাপ্তি টানলাম।

উঁচা উঁচা পাবত তহিঁ বসই সবরী বালী।

মোরঙ্গী পীচ্ছ পরহিণ সবরী গিবত গুঞ্জরী মালী।।

উমত সবরো পাগল সবরো মা কর গুলী গুহাডা

তৌহারি ণিঅ ঘরণী ণামে সহজসুন্দরী

ণাণা তরুবর মৌলিল রে গঅনত লাগেলী ডালী

একেলা সবরী এ বনে হিন্ডই কর্ণ কুন্ডল ব্রজধারী….

উঁচু পর্বতের উপরে শবরীর বাস। তার পরনে ময়ূর পুচ্ছ ও গলায় গুঞ্জা মালা। তার এই রূপ দেখে শবর তাকে নিজের স্ত্রী বলে চিনতে পারছে না। অন্য রমণী মনে করে পাগল হয়ে উঠেছে। আর তাই শবরী তিরস্কার করে তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, ‘গোল করো না। আমি তোমারই ঘরনী সহজসুন্দরী।’ এক মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে তারা পরস্পরকে কাছে পাচ্ছে— নানা তরু মুকুলিত, যাদের পুষ্পিত শাখা আকাশে গিয়ে ঠেকেছে। সুন্দর অলংকারে সজ্জিত সেই সুন্দর বনে বিহাররত শবরীর সঙ্গে শবরের মিলন হচ্ছে। সেই মিলনশয্যার উপরে পুষ্পিত তরু শাখা ও বিস্তীর্ণ নীল আকাশের চন্দ্রাতপ সৌন্দর্যের আচ্ছাদন বিস্তার করেছে। এ যেন স্বয়ং সৌন্দর্যপ্রয়াসী প্রেমানুভূতিরই আত্মবিস্তার।

তথ্যসূত্র

১. বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত – অসিত কুমার বন্দোপাধ্যায়

২. চর্যাপদ তাত্ত্বিক সমীক্ষা – শামসুল আলম সাঈদ

৩. চর্যাগীতি পরিক্রমা – নির্মল দাস

৪. চর্যাগীতির ভূমিকা – জাহ্নবী কুমার চক্রবর্তী

৫. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস – সুকুমার সেন

৬. চর্যাপদ তাত্ত্বিক সমীক্ষা – শামসুল আলম সাঈদ

মন্তব্য তালিকা - “চর্যাপদে সমাজচিত্র”

  1. এক অতীতের চারণভূমি, স্বপ্নে দেখা মনে হচ্ছে।
    মনে ইচ্ছে ছিলো জানার তাই এতক্ষণ মোহাবিষ্ট থেকেছি। কতকিছু যে বলতে ইচ্ছে করছে কিন্তু হয় না।
    ভাল লাগলো। আর ও পাওয়ার আশায় রইলাম।

  2. বর্তমান বিচরণ ভূমিতে চলার পথে কত শব্দ সামনে আসে আর যায়। কিন্তু চর্যাপদের ভাষা গুলো আর দেখতে পায় না চর্যাপদের ভাষা গুলো যেমন কঠিন ছিল তেমন শুনতেও খুব ভালো লাগতো এক কথায় অসাধারণ।।।।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।