সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

ইউরোপের ‘বটতলা’র পরিচয়: সমকালীন দৃষ্টিকোণ

ইউরোপের ‘বটতলা’র পরিচয়: সমকালীন দৃষ্টিকোণ

কুন্তল রায়

মার্চ ১১, ২০২৩ ৩৮০ 10

(বইয়ের নাম: চিপ প্রিন্ট অ্যান্ড দ্য পিপল: ইউরোপিয়ান পার্সপেক্টিভস অন পপুলার লিটারেচার; সম্পাদনা: ডেভিড অ্যাটকিনসন ও স্টিভ রাউড; প্রকাশক: কেম্ব্রিজ স্কলারস পাবলিশিং; প্রকাশ সাল: ২০১৯)

ইউরোপে সস্তা বই নিয়ে জোরদার চর্চা শুরু হয় গত শতকের সত্তরের সময় থেকে। পিটার বার্কের লেখা ‘পপুলার কালচার অফ আর্লি মডার্ন ইউরোপ’ (প্রথম প্রকাশ ১৯৭৮) সেখানকার সংস্কৃতি চর্চার জগতে মৌলিক পরিবর্তন এনেছিল, এতে কোন সংশয় নেই। প্রায় একই সময়ে চলতে থাকে ফরাসি বিপ্লব নিয়ে নতুন ভাবনাচিন্তা; আমেরিকার গবেষকরাও তখন অনেকটা আগ্রহী হয়েছিলেন সাধারণের সাংস্কৃতিক ইতিহাস নিয়ে। কারণ নয়া বাজার অর্থনীতিতে সংস্কৃতি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করছিল। স্বাভাবিকভাবেই এতদিনের প্রচলিত ইতিহাস চর্চার বাইরের বিভিন্ন দিকগুলি একে একে ইতিহাসের বিষয়বস্তু হিসেবে উঠে আসতে থাকে। এদের মধ্যে একটি বিষয় ছিল ‘জনপ্রিয় ছাপা’ চর্চা। এখন প্রশ্ন হল ‘জনপ্রিয় ছাপা’ কথাটির অর্থ কী? আমরা দুইভাবে এর উত্তর পেতে পারি। প্রথমত, পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে ছাপার যুগের প্রায় শুরুর থেকেই এমন ধরনের বই প্রকাশিত হয়, তাকে ঠিক বই বলা কঠিন — বরং আমরা অনুপুস্তিকা বলতে পারি। বাংলার ক্ষেত্রে যেমন তার নাম বললে আমরা সহজেই বুঝি – ‘বটতলার ছাপা’।

তবে স্থানভেদে এর বৈশিষ্ট্য একই রকম ছিল না। শুরুর সময়কালও নির্ভর করেছে একেক জায়গায় তার নিজস্ব চরিত্র অনুযায়ী, মোটামুটিভাবে এর সময়কাল ষোড়শ শতক থেকে ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত। এই দীর্ঘ সময়ে ইউরোপের নানান স্থানে সস্তা ছাপা শুরু হলেও এদের মধ্যে দুটো মিল অনেকেই উল্লেখ করেছেন। তার একটি হল ছাপাগুলি সাধারণ মানের, অর্থাৎ দাম কম রাখার জন্য খুব সাধারণ কাগজে যৎসামান্য বাঁধাইয়ে বা বিনা বাঁধাইয়ে তৈরি। আর যখন প্রতিটি দেশ তার মধ্যযুগীয় রীতি থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় পরিবর্তিত হচ্ছে সেই সময় এই ধরনের ছাপার সূচনার যুগ হিসেবে দেখা যায়। কোন কোন ইতিহাসবিদ এর সঙ্গে সেই অঞ্চলের বা ভাষাভাষী মানুষের শিক্ষার বিস্তারকেও যুক্ত করতে চেয়েছেন। এই ধরনের ছাপা সমাজে এক গভীর প্রভাব ফেলেছিল, এতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ বইগুলি হয়ে উঠেছিল খুব জনপ্রিয়। তাই এই বইগুলিকে ‘জনপ্রিয় সংস্কৃতি’র অঙ্গ হিসেবে মনে করা হত। পরবর্তীতে ইংল্যান্ডের প্রেক্ষাপটে একে ‘জনপ্রিয় সাহিত্য’ বা ‘জনপ্রিয় ছাপা’ বলা হয়।

ইউরোপে বিশ শতকের সাতের দশক থেকে যে ‘জনপ্রিয় ছাপা’র চর্চা শুরু হয়েছিল আজও তা নতুন নতুন নানা দিক উন্মোচন করে চলেছে। আগ্রহীজন এই কাজে প্রথমেই মনে করবেন ব্রিল প্রকাশনী সংস্থাকে। কারণ তারা ইংরেজি ভাষায় ধারাবাহিকভাবে এই বিষয় নিয়ে বই প্রকাশ করে চলেছেন। কেবল বই নয়, এই সংস্থা ১৯৭১ সাল থেকে ক্রমাগত তাদের পত্রিকা (Quaerendo) প্রকাশের মাধ্যমে ছাপা ও হাতে লেখা বইয়ের গবেষণাকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। তুলনায় আমাদের পরিচিত ইউনিভার্সিটি প্রেসগুলি (কেম্ব্রিজ বা অক্সফোর্ড) এই বিষয়ে অনেকটা পিছিয়ে আছে। ২০১১ সালে জড রেমন্ডের সম্পাদনায় ও অন্যান্যদের আগ্রহে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে যে ছয় খণ্ডে সস্তা ছাপার ইতিহাস প্রকাশিত হবার কথা ছিল তা এখনও দুই খণ্ডের বেশি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। আর সম্পাদক রেমন্ড প্রথম খণ্ডটিতে (দ্য অক্সফোর্ড হিস্ট্রি অফ পপুলার প্রিন্ট কালচার: চিপ প্রিন্ট ইন ব্রিটেন অ্যান্ড আয়ারল্যান্ড টু ১৬৬০) প্রায় ৪৫টির মত প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। সেখানে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সমগ্র জনপ্রিয় সাহিত্যকে দেখার একটি চেষ্টা হলেও খণ্ডটি অত্যন্ত অগোছালো আর বেশ কিছু অপ্রয়োজনীয় শব্দ-যজ্ঞে জর্জরিত। বইটি আগ্রহী পাঠকের কাছে বিষয়ের প্রতিনিধিত্ব করলেও তার আগ্রহ মেটাতে যথেষ্ট নয়। সস্তা ছাপা নিয়ে রেমন্ডের পাণ্ডিত্য প্রশ্নাতীত হলেও তার সম্পাদনা নিয়ে অস্বস্তি থেকেই যায়।

রেমন্ডের বইটির এই সীমাবদ্ধতার উল্লেখ এছাড়াও অন্য একটি কারণে একে দেখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করি। পিটার বার্ক থেকে জড রেমন্ড পর্যন্ত এই দীর্ঘ যাত্রায় ইংল্যান্ডের ইতিহাসবিদদের এই ধরনের ছাপার ইতিহাস রচনায় কেবল নিছক বর্ণনা নয়, নতুন মেথডলজিকে ব্যবহার করার ক্ষেত্রেও ছিলেন অগ্রগণ্য। ২০১০-এর পর থেকে প্রায় গোটা ইউরোপে অন্য এক ধরনের জাতীয়তাবাদের শুরু হয়। এর ফলে সমগ্র ইউরোপের ক্ষুদ্র দেশগুলিতে প্রাগাধুনিক সাংস্কৃতিক ইতিহাস চর্চার প্রতি আগ্রহ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। এই বিনিয়োগের মূল লক্ষ্য হল অতীতের সস্তা ছাপার যতটা সম্ভব বিস্তারিত ক্যাটালগ তৈরি করা ও প্রাপ্ত ছাপাগুলি ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষিত করা। ইভা মিকোজ যেমন হাঙ্গেরির ক্ষেত্রে বলেছেন, ১৯৭০-এর সময় পর্যন্ত মৌখিক সাহিত্যকে সংরক্ষণের হিড়িক ছিল। এরপর মৌখিক ধারা ক্রমশ ফুরিয়ে আসতেই সবাই সস্তা ছাপার প্রতি আকৃষ্ট হয়। স্বাভাবিকভাবেই এই কাজ করতে গিয়ে সারা ইউরোপের জনপ্রিয় ছাপার সংজ্ঞা, সম্পর্ক ও সামাজিক প্রভাবের উপর নতুন ধরনের দৃষ্টিপাত ঘটে। সহজেই বোঝা যায় পুরোনো মেথডলজি দিয়ে, ব্যাখ্যা দিয়ে আর কাজ এগোচ্ছে না। এক্ষেত্রেও ব্রিল প্রকাশনী অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এসেছে। তাদের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হলেন স্বয়ং ইউরোয়েন সালমন। সালমন আজ সারা বিশ্বের কাছে ডাচ পেনি প্রিন্টের চর্চাকে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন তা সত্যিই বাকি গবেষকদের কাছে দৃষ্টান্তমূলক নজির।

এবার বর্তমান বইটির প্রকাশের সময়ের কথায় আসা যাক। ২০১১ সাল থেকে ২০১৯ সাল এই আট বছরে নতুন করে ইউরোপের স্ট্রিট লিটারেচারকে দেখা ও তার সামাজিক মূল্যায়ন নিয়ে নবতর ভাবনার যুগ। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে প্রাপ্ত সস্তা ছাপাগুলির ডিজিটাইজেশন হচ্ছে তা আগেই বলা হয়েছে। এই সূত্রে ২০১৯ সালে দুটি বই প্রায় একই সঙ্গে প্রকাশিত হয়। একটি সলমন, রেসপোচার এবং হান্নু সালমির সম্পাদিত ‘ক্রসিং বর্ডারস, ক্রসিং কালচারস: পপুলার প্রিন্ট ইন ইউরোপ (১৪৫০-১৯০০)’ আর দ্বিতীয় বই এইটি। দু’টি বই একই বিষয় নিয়ে আলোচিত হলেও চরিত্রের দিক দিয়ে বেশ খানিকটা আলাদা। সালমান সম্পাদিত বইটি ‘দ্য ইউরোপিয়ান ডাইমেনশনস অফ পপুলার প্রিন্ট কালচার’ (ইডিপিওপি)-এর একটি প্রজেক্ট-এর গবেষণাপত্রগুলি নিয়ে ছাপা হয়েছিল। বইটিতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সস্তা ছাপার গবেষণার পদ্ধতি বা মেথডলজিকে নিয়ে মৌলিক আলোচনা হয়েছে। অধিকাংশ অংশে সংখ্যাতত্ত্বের ব্যবহার, ছাপা ও ছবির সামাজিক বিশ্লেষণ ইত্যাদির মাধ্যমে নতুনভাবে দেখার চেষ্টা হয়েছে ও সদ্যপ্রাপ্ত পুরোনো বইগুলিকে বিশ্লেষণ করে এই আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে ওই বইটিতে সম্পাদকদের আগ্রহে নেদারল্যান্ডস, ইতালি ও জার্মানি যতটা গুরুত্ব পেয়েছে বাকি পশ্চিম ইউরোপের দেশের প্রতিনিধিত্ব (ফ্রান্স, স্পেন বা ইংল্যান্ড) নেই বললেই চলে।

তুলনায় ডেভিড অ্যাটকিনসন ও স্টিভ রাউডের সম্পাদিত এই বইটি অনেক বেশি বিস্তৃত ও চারিত্রিকভাবে বর্ণনামূলক। এরা দুইজনে বেশ কয়েক বছর ধরে সস্তা ছাপা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদনার কাজ করছেন এবং প্রথমদিকে তাদের মূল লক্ষ্য ছিল পশ্চিম ইউরোপের বটতলার বই। এই বইটি পশ্চিম ইউরোপের ও বাইরের অংশের বটতলা সাহিত্য নিয়ে আমাদের আগ্রহী করে। মোট ১৪টি অধ্যায়ে প্রায় সমসংখ্যক দেশের সস্তা ছাপার বর্ণনা এখানে পাওয়া যায়। ভূমিকার অংশ তুলনামূলকভাবে ততটা দাগ কাটতে পারেনি। দ্বিতীয় অধ্যায় ও তৃতীয় অধ্যায়ের বিষয়বস্তু স্পেনের সস্তা ছাপা। ইংরেজি ভাষায় ছাপার ইতিহাস চর্চায় ইংল্যান্ড ও জার্মানিকে যতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়, স্পেন সম্বন্ধে তুলনায় আলোচনা কম হয়েছে। কিন্তু প্রায় সমস্ত রকম ছাপাই ষোড়শ শতক থেকে স্পেনে দেখা যায়। উপন্যাসিকা, ছোটগল্প, বীররসের গল্প যেমন ছিল আবার একেবারে নিরক্ষর মানুষের জন্য ছবির ছাপা অ্যালেলুইয়া-ও দেখা যায়। স্পেনীয় ভাষায় তাদের সস্তার ছাপা বইকে বলা হতো প্লেগোস সোয়েলতোস, বাংলায় বলা যায় ‘ঝরা পাতা’। সাধারণত এই বইগুলি বাঁধানো থাকত না, তাই এমন নাম দেওয়া হয়েছিল। স্পেনের এই ছাপা নিয়ে অ্যালিসন সিনক্লেয়ারের লিখিত প্রবন্ধটি অনেক বেশি আকর্ষণ করে। তিনি ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যগুলিকে বিবেচনা করে সেখানকার সস্তা ছাপার চরিত্রকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। রবিন হুডের যে গল্প আমরা পড়ে এসেছি সেটা প্রথমে কোন দেশে বা কোন ভাষায় লেখা হয়েছিল তা আজ আর নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। তবে স্পেনে এই ধরনের গল্প সম্পর্কে সাধারণের খুব আগ্রহ ছিল। মেক্সিকোতে সস্তা ছাপায় ডাকাতদের গল্পের বৈশিষ্ট্য ভিন্নতর ছিল।

চিত্র–১ স্পেনের অ্যালেলুইয়া

জনপ্রিয় ছাপার ইতিহাসের অপর এক নবজ্যোতিষ্ক ফ্রান্সের ডেভিড হপকিনস। যাঁরা সাম্প্রতিককালের সস্তা ছাপা নিয়ে লেখালেখি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল তাঁরা অধিকাংশই জানেন হপকিনস অত্যন্ত বলিষ্ঠ একজন গবেষক এবং ডার্নটন বা গ্রঁজে চার্টিয়ের পরবর্তীকালে ফ্রান্সের সস্তা ছাপা আর তার প্রভাব নিয়ে যে কয়েকজন সম্ভাবনাময় গবেষক রয়েছেন ডেভিড হপকিনস তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। এই বইটিতে তিনি ফ্রান্সের ব্যালাড বা গীতিকা ও ব্রডসাইট (একটা বড়ো পোস্টারের মত পাতায় ছাপা) নিয়ে আলোচনা করেছেন। এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ফ্রান্সের সস্তা ছাপার সূচনা কিন্তু প্যারি শহরে নয়, শুরু হয়েছিল থ্রঁয় শহরে, সপ্তদশ শতকের প্রায় শুরুর সময় থেকে। সেখানে দুই পারিবারিক প্রেস ও প্রকাশনার মধ্যে [Oudot এবং Garnier] বাজার দখল নিয়ে প্রতিযোগিতা ছিল।  আমাদের এতদিনের ধারণা ছিল ফ্রান্সে রচিত স্বল্পমূল্যের উপন্যাসগুলি আকারে অনেক বড় ছিল (প্রায় ৭২ থেকে ২০০ পৃষ্ঠা)। হপকিনস তুলনামূলকভাবে কম পৃষ্ঠার ছাপা আমাদের সামনে এনেছেন ও সেগুলো সংখ্যায় তুলনামূলকভাবে মুদ্রণ-সমৃদ্ধ ফ্রান্সে কেন কম সেই নিয়ে আলোচনা করেছেন। এই প্রবন্ধটি বইয়ের অন্যতম সেরা অংশ।

ফ্রান্সের যে ভূভাগ থেকে জলপথে ইংল্যান্ড সবচেয়ে কাছে সেই প্রদেশটির নাম ব্রিটনি, অনেকে বলেন এই অংশ নাকি ‘ফ্রান্সের ব্রিটেন’। বইটিতে আলাদা করে ব্রিটনির নিজস্ব ভাষায় লেখা ও ছাপা নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন দানিয়েল জিরাওদ। ব্রিটনির ছাপা নিয়ে ইংরেজিতে খুব বেশি একটা লেখা পাওয়া যায় না। তাই এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধটি আমাদের ব্রিটনির সস্তা ছাপা সম্পর্কে খানিকটা ধারণা দেয়।

ডাচ পেনি প্রিন্ট নিয়ে চতুর্থ অধ্যায়টি লিখেছেন ইউরোয়েন সালমন, যার কথা অত্যন্ত প্রশংসার সঙ্গে আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। সদ্য ৬২ বছরের এই তরুণের অক্লান্ত চেষ্টায়, প্রায় দু’শোর বেশি প্রবন্ধ ও বর্তমানে ২৩টিরও বেশি বই লেখা বা সম্পাদনার মধ্যমে তিনি ডাচ পেনি প্রিন্টকে ইউরোপের ইতিহাস চর্চায় অনন্য স্থান দিয়েছেন। এখানে অপ্রাসঙ্গিক হলেও একটা কথা বলা প্রয়োজন যে, তিনি কেবল একজন সম্পূর্ণ গবেষক নন, কিভাবে ডাচ পেনি প্রিন্ট সংরক্ষণ ও তার চর্চা হবে অর্থাৎ এই কাজের বিপুল ব্যয়ভার চালানোর জন্য বিভিন্ন সংস্থা, প্রকাশক ও বিশ্ববিদ্যালয়কে যুক্ত করে নানাভাবে অর্থের জোগাড় করে চলেছেন। আমরা যতটা অন্যকে অভিযোগ করতে জানি, নিজের জীবনকে বাজি রেখে গবেষণার কাজ চালিয়ে যাওয়ার হিম্মত রাখি কি?

চিত্র-২ ডাচ পেনি প্রিন্ট

যদিও সালমনের এই প্রবন্ধটি অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকের দৈব ও দৈত্যদানোর উপর ছাপা পেনি প্রিন্ট নিয়ে, কিন্তু এর মাধ্যমে সস্তা ছাপার ভূমিকা নিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আপনি যদি বাংলায় ঊনবিংশ শতকের প্রথম ভাগের বটতলার ছাপা দেখেন তবে খেয়াল করবেন অধিকাংশ ছাপাই ধর্মীয় বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে, যা তার আগে মৌখিক সাহিত্যরূপে ছিল বা তৈরি হচ্ছিল। ওই শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ক্রমশ ছাপার বিষয় নাগরিক চাহিদার পরিবর্তনের কারণে পালটে যেতে থাকে। আমরা বটতলা বলতেই যে একরৈখিক ধারণা নিয়ে চলি, তাকে প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাচ্ছেন সালমন। তিনি বলছেন, বইয়ের চাহিদার বাইরে বিষয়ের চাহিদাকে বোঝা সস্তা ছাপার ইতিহাসকে দেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে ও তা দিয়ে সমাজের নাগরিক চরিত্রের পরিবর্তনের বিশ্লেষণ করা দেতে পারে। মনে রাখতে হবে তার উল্লিখিত দুই শতকের দৈত্যদানোর গল্প কেবল শিশু সাহিত্য নয়, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরও মনের খোরাক।

নেদারল্যান্ডস-এর ক্ষেত্রে যেমন সালমন, তেমনই নরওয়ের জন্য শিব গৌরি ব্রানজেয়েক।  তবে তিনি গোটা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান স্কিলিং ব্যালাড নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার প্রবন্ধে চারটি দেশ রয়েছে, এগুলি হল ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন ও ফিনল্যান্ড। এই চারটি দেশের মধ্যে সুইডেনে প্রাপ্ত ও সংরক্ষিত ছাপার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, কমবেশি ৪১ হাজার। মোট প্রাপ্ত ছাপার সংখ্যার বিচারে এরপর রয়েছে নরওয়ে (২৮ হাজার), ডেনমার্ক (২৬ হাজার) ও শেষে ফিনল্যান্ড (৭ হাজার মত)। ছোটো ছোটো অনুচ্ছেদে তিনি একটি সংক্ষিপ্ত, সামগ্রিক ও তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

নরওয়ের জনপ্রিয় ছাপা নিয়ে আলাদা করে প্রবন্ধ লিখেছেন অ্যাস্ট্রিড নোরা রেজম। গবেষণা জগতে দুই ধরনের ক্ষেত্র থেকে কৃতিদের আসতে দেখা যায়। বেশি সংখ্যায় আসেন যারা সরাসরি ক্লাসরুমে পড়ানোর সঙ্গে জড়িত, আর দ্বিতীয়ভাগের গবেষকরা আসেন ভিন্নতর গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র থেকে। নোরা এই দ্বিতীয় ভাগে পরেন। তিনি নরওয়ের জাতীয় গ্রন্থাগারের রিসার্চ লাইব্রেরিয়ান। বর্তমানে গ্রন্থাগারে চলতে থাকা সেখানকার সস্তা ছাপার (নরওয়েতে এর নাম স্কিলিংস্ট্রেইক, স্কিলিং অর্থ এক পয়সা ও স্ট্রেইক হল গীতিকা) উপর একটি প্রজেক্ট পরিচালনা করছেন। এই লেখায় নরওয়ের স্কিলিং লেখকদের সঙ্গে পরিচিতি যেমন হয়, সেই সঙ্গে ছাপার বিষয়বস্তু নিয়েও আলোচনা রয়েছে। নরওয়ের পথে গান গাওয়া ও সেই সঙ্গে সস্তা ছাপা বিক্রির রেওয়াজ ছিল ঊনবিংশ শতক পেরিয়ে এমনকি বিংশ শতকের শুরুর বেশ কিছু বছরেও। নোরা নরওয়ের সেই অন্ত্যজ সাহিত্যের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়েছেন। সেখানকার লোকজ গান নিয়ে তার গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে অনেক আগেই, ২০০৯ সালে।

পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপ থেকে এবার যেতে হবে আরও পূর্বদিকে। রাশিয়ার সাহিত্যের প্রতি বাঙালিদের আগ্রহ আজকের নয়। তবে রাশিয়ার বটতলার সাহিত্য অর্থাৎ ল্যুবক নিয়ে আমাদের খুব একটা ধারণা নেই। হান্না চুচভেন্নার প্রবন্ধটি অতুলনীয়। তিনি শুরুতেই বেশ খানিকটা আলোচনা করেছেন রাশিয়ায় ছাপা বই প্রবেশের ইতিহাস নিয়ে। ক্রমশ ল্যুবক ও তার ছবি কী করে জনপ্রিয় হতে লাগলো সেই বর্ণনাও রয়েছে। তবে তাঁর লেখায় নগরায়ণ এ কাজে কতটা প্রভাবিত করেছিল সেই বিষয়ে খুব বেশি জানা যায় না। রাশিয়ার প্রায় সব ধরণের ছাপারই প্রধান ঘাঁটি ছিল মস্কো। এই প্রবন্ধটি একেবারেই মস্কোর সস্তা ছাপাকেন্দ্রিক।

রাশিয়ার উপর প্রবন্ধটি নিয়ে আলোচনায় কয়েকটা সাধারণ বিষয় উল্লেখ করা দরকার। প্রথমত, কোন ধরণের পাঠক ও ক্রেতার কথা মাথায় রেখে প্রকাশকরা কম দামের কাগজে ছাপাচ্ছেন সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। শিশু বা সদ্য পড়তে পারা পাঠকদের কাছে শব্দের পাশাপাশি ছবি খুব আগ্রহ তৈরি করে। অক্ষরের প্রাধান্য প্রাথমিকভাবে তুলনামূলক পাঠপটু পাঠকদের জন্য রচিত হয়। এছাড়াও  ছন্দে লেখা সমবেত পাঠের বা শ্রবণাগ্রহী মানুষের কাছে বেশি পছন্দের। একজন সুর করে পড়লে বাকিদের শুনে মনে রাখতে সুবিধা হয়। গদ্যরচনা তুলনামূলকভাবে ব্যক্তিপাঠে উৎসাহ দেয়। ল্যুবক মূলত ছবির বই, সামান্য অক্ষরে সজ্জিত। যত সময় এগিয়েছে শব্দ সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এখানে একটি প্রযুক্তিগত দিকও রয়েছে; কাঠের ব্লকে অক্ষর স্পষ্ট করে ফুটিয়ে তোলা কঠিন; তাই লিথোগ্রাফ আসায় ছাপায় অক্ষরের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। হান্নার এই প্রবন্ধটি শেষ হচ্ছে ল্যুবকের শেষ সময় অর্থাৎ রুশ বিপ্লবে এসে। বিপ্লবের পরে ছাপা সংক্রান্ত আইনের মাধ্যমে এর অবলুপ্তির ব্যাখ্যা করা হলেও সারা ইউরোপেই কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আর সস্তা ছাপার রমরমা দেখা যায় না। মোটামুটি একই সময়ে গোটা ইউরোপেই এই সস্তা ছাপার প্রতি আগ্রহ কমে আসা নিয়ে অনেক গভীর চিন্তাভাবনা দরকার।

চিত্র-৩ রাশিয়ার সেই অতি বিখ্যাত জার বিরোধী বেড়াল ও ইঁদুরের গল্পের ল্যুবকের একটি পৃষ্ঠার চিত্র

রাশিয়ার পরেই রয়েছে ইউক্রেন। ইউক্রেনের ল্যুবকের প্রাথমিক পরিচিতির জন্যে ভিক্টোরিয়া ভলসেনকোর এই প্রবন্ধটি বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। এখানে তিনি যতটা সাধারণ ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, ইউক্রেনের ল্যুবক নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে তা স্পর্শ করা হয়নি। রাশিয়ার সংস্কৃতির সঙ্গে ইউক্রেনের জাতীয়তাবাদের যে বিরোধ রয়েছে তা বর্তমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সকলেই অবগত। ইউক্রেনে সস্তা ছাপার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় ১৮৭০ থেকে ১৯১০-এর দশক পর্যন্ত। যদি আমরা কিছুক্ষণের জন্য এই প্রবন্ধটিকে সরিয়ে তেতিয়ানা কারইভার লেখা একটি প্রবন্ধকে দেখি, সেখানে চিত্রিত আছে কিভাবে বড়ো সংস্কৃতি ছোটো সংস্কৃতিকে গ্রাস করে, তার একটি রূপ। কোন ভাষার ছাপাকে ব্যক্তির প্রচেষ্টা, আন্দোলন বা উৎকৃষ্ট সাহিত্যকীর্তির মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখা যায় না, তাকে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে অত্যাবশ্যকীয় করে তুলতে হয়। ইউক্রেনের সস্তা ছাপার সবচেয়ে বড়ো প্রকাশনা সংস্থা সেখানকার রাজধানী কেইভ-এ ছিল না, ছিল মস্কোতে। রাশিয়ার ল্যুবক যে জারের সন্দেহের তালিকায় থাকবে তা বলাই বাহুল্য কারণ সেই ছাপায় প্রকাশ্যে বা চোরাগোপ্তায় জার বিরোধী প্রচার চলেছিল। ইউক্রেনিয়ান ল্যুবকও রাজরোষের বাইরে ছিল না। এই বইয়ের ক্রেতা সাধারণত ইউক্রেন থেকে আগত মস্কো ও তার আশেপাশের বসবাসকারী ইউক্রেনিয়ানদের মধ্যে বেশি জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু দেখা গেল এক প্রজন্মের ব্যবধানেই আর তারা এই ভাষায় বিনোদনমূলক বই পড়তে আগ্রহী নয়। সেই সঙ্গে জার সরকার সেই বইগুলির উপর যে আইন প্রণয়ন করেন তাতে তাকে ইউক্রেনের সংস্কৃতির প্রতি নির্দয় বলেই মনে হয়। বিপ্লবের পরে এই মানসিকতার কোন পরিবর্তন হয়নি। ইউক্রেনে জন্ম নেওয়া লেখক নিকোলাই গোগোলকে ইতিহাসের ব্যতিক্রম বলে ধরা যেতে পারে।

বুলগেরিয়ার সস্তা ছাপা নিয়ে আলোচনায় ক্লাস রঁৎ দুটো বিষয়কে সরাসরি নির্ণায়ক বলে মনে করেছেন। প্রথমত ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত দেশটি অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন থাকার কারণে সেখানে পশ্চিম ইউরোপীয় আধুনিকতা প্রবেশ করতে অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছিল। তাই সস্তা ছাপার আগমনও অনেকটা পিছিয়ে যায়। আর ছাপার বিষয়ে এলিটিস্ট চর্চা পিছিয়ে যাওয়ার কারণ সোভিয়েতের রাজনৈতিক আগ্রাসন। তবে রাশিয়ার ভাঙ্গনের পরে পশ্চিমা প্রভাব বৃদ্ধি পেতেই যে বুলগেরিয়ার স্লাভ ভাষাভুক্ত অঞ্চলে সস্তা ছাপার সম্বন্ধে গবেষণা শুরু হয়েছে, এমন নয়। বরং তিনি স্বীকার করেছেন একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে সেখানেও ভাষাগত জাতীয়তাবোধ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলস্বরূপ এই অঞ্চলের বিভিন্ন সমাজের ছাপা রচনাগুলিকে ক্রমশ এলিট চর্চায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন গত শতকের সাত বা আটের দশকে স্লাভ অঞ্চলের মৌখিক সাহিত্যগুলিকে সংগ্রহের প্রতি আগ্রহ দেখা যায়। কিন্তু যখন ভুবনায়নের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে তখন মৌখিক রচনা প্রায় অবলুপ্ত হয়ে আসছে। এই সময় থেকে বিভিন্ন ধরনের সস্তা ছাপার প্রতি গবেষকরা আরও আকৃষ্ট হচ্ছেন।

রঁৎ বুলগেরিয়ার সস্তা ছাপাকে (পিতর দিনেকভ যাকে উল্লেখ করেছেন ‘থার্ড লিটারেচার’ নামে) কয়েকটি ধারায় বিভক্ত করে বর্ণনা করেছেন। কথা সাহিত্যের (ফিকশন) মধ্যে রয়েছে (১) গদ্য, যার মধ্যে একদিকে রয়েছে প্রচলিত ধারা (বীররস ও ভক্তিরসের গল্প, মজার গল্প, প্রচলিত গল্প ইত্যাদি) আর (২) সহজ উপন্যাস (প্রেমরস, রহস্য-রোমাঞ্চ, ডিটেকটিভ গল্প, আর গুপ্তধনের অভিযান)। দ্বিতীয় ধারায় রয়েছে পদ্য বা গীতিকা, যার মধ্যে প্রচলিত ও সমকালীন কাব্যের সঙ্গে পরিচিতি ঘটে। আর তৃতীয় ধারায় রয়েছে বিভিন্ন স্বাদের নাটক। নন-ফিকশনের মধ্যে প্রধানতম হলো ধর্মীয় সাহিত্য, সাধু-সন্তদের জীবনীমূলক গল্প। আর এর দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে ধর্ম বহির্ভূত বিভিন্ন ধারার রচনা, যেমন – স্থানীয় ইতিহাস, রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক ঘটনা, সহজ চিকিৎসা পদ্ধতি, রান্নার বই ইত্যাদি নানা ধরনের বিষয়ের উপর সস্তা ছাপা।

বলকান অঞ্চলের রাজনৈতিক সত্তার সঙ্গে সেখানকার জনসংস্কৃতি কিভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল তা রুট হয়তো এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধটিতে দেখাতে পারেননি, তবে অটোমান সাম্রাজ্য থেকে মুক্তির পর পশ্চিমের আধুনিকতার আগ্রাসী প্রতিনিধিত্বে তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ও সেখানকার বটতলার বিকাশের কথা বারবার উল্লেখ করেছেন। পশ্চিম ইউরোপের থেকে আমদানি করা সাহিত্যের অনুবাদ প্রথমে পরোক্ষে ও পরে সরাসরি কিভাবে সস্তা ছাপার বাজার দখল করেছিল তার মনোগ্রাহী বর্ণনা দিয়েছেন।

দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ অধ্যায় পর্যায়ক্রমে হাঙ্গেরি ও স্লোভেনিয়ার সস্তা ছাপার পরিচিতি নিয়ে। ইভা মিকোজ বিগত প্রায় দশ বছর ধরে হাঙ্গেরির ছাপা নিয়ে গবেষণা করছেন। চতুর্দশ অর্থাৎ শেষ অধ্যায়টি ইতালির উপর লেখা, এবং এই প্রবন্ধটি সম্পর্কে কয়েকটা কথা বলতেই হয়। ইতালির বটতলা ছাপা বলতে ‘স্ট্যাম্পে পপলারে’কেই বোঝানো হয়। এখানে তিনি স্ট্যাম্পে পপলারের ইতিহাস নিয়ে কোন আলোচনা করেননি। তার প্রবন্ধের মূল দিক ছিল কিভাবে ভেনিসে সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে সস্তা বই ব্যবসা হত সে সবের উপর। ভেনিসের সেন্ট মার্ক্স স্কোয়ারের আশেপাশের ফুটপাথ সেই সময়ে বইয়ের দোকানে ভর্তি ছিল। কে কোথায় কতদিনের জন্য এখানে বিক্রির জন্য অস্থায়ী দোকান খুলতে পারবেন বা প্রকাশক বই ছাপাতে পারবেন তা নির্ভর করত সেখানকার বুক গিল্ডের কড়া অনুশাসনের উপর। লরা কর্নেলোস ভেনিসের গিল্ডের সেইসব দলিলগুলি দেখেছেন ও সেখান থেকে প্রতি বছর কী পরিমাণ বই ছাপা হয়েছিল বা কোন ধরনের বইগুলির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল তা উল্লেখ করেছেন। তবে গিল্ড সেখানকার একমাত্র নিয়ন্ত্রক ছিল না। পৌরপ্রধান মাঝে মাঝে গিল্ডের বাইরের সদস্যদের বই বিক্রির অনুমতি দিতেন। এই নিয়ে প্রশাসনিক চাপানউতোর চলেছিল বেশ কিছুদিন। লরা প্রবন্ধের শেষে কিছু পরিভাষার উল্লেখ করেছেন যা ভেনিসে অষ্টাদশ শতকে অত্যন্ত পরিচিত ছিল। রোজা সালবার্জ ২০১৬ সালে সস্তা ছাপার প্রেক্ষিতে ভেনিসকে উল্লেখ করেছিলেন এফিমেরাল সিটি বা ক্ষণস্থায়ী শহর হিসেবে। লরার প্রবন্ধটি যেন সেই বড়ো ক্যানভাসের এক মিনিয়েচার।

চিত্র–৪ ইতালির ‘স্ট্যাম্পে পপলারে’

শেষে আলোচনা করা যায়, এই বইটি কেন পড়ব সেই নিয়ে। এর বেশ কিছু কারণ রয়েছে। বইটির বিষয়-সম্পাদনা অতীব চমৎকার। পুরো বইটি না পড়লেও বোঝা যায় এর লক্ষ্য হল, ইংরেজি ভাষায় তুলনামূলক কম আলোচনা হয়েছে এমন বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশের সস্তা ছাপার প্রাথমিক বর্ণনাকে এক জায়গায় করা। আমার জানা ইংরেজি ভাষায় এতগুলো দেশের সস্তা ছাপার বর্ণনা দিয়ে এমন আর দ্বিতীয় কোন বই নেই। সালমন সম্পাদিত যে বইটির উল্লেখ করা হয়েছিল তা মূলত বিশ্লেষণধর্মী। কিন্তু এইটি বর্ণনামূলক। দেশ নির্বাচন নিয়ে দোষ ধরাটা অনুচিত। কারণ বইয়ের মূল থিমের উপর লেখার জন্যে মনোমতো লেখক পাওয়া কঠিন হয়। তবুও বলতে পারি ইতালি বা নেদারল্যান্ডসের মত দেশগুলি নিয়ে ইংরেজি ভাষায় অনেকটাই চর্চা আছে। একই কারণে ইংল্যান্ড ও জার্মানিকে এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফ্রান্সের উপস্থিতি এক্ষেত্রে বেমানান হলেও হপকিনসের লেখাটি বইয়ের মূল্যবান সম্পদ। অ্যাডাম ফক্স তার সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থে১০ (২০২০) নিশ্চিতভাবেই প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন যে স্কটল্যান্ডের সস্তা ছাপা নিয়ে না বলা এখনও অনেক দিক রয়েছে। নয়াল ও সায়োসেন আয়ারল্যান্ডের উপর গ্রন্থটি প্রকাশ করেন সেই ১৯৯৭ সালে। এই বইটিকে বটতলা চর্চার সাম্প্রতিকতম মেথডলজি মেনে লেখা প্রথম বই বলা যেতে পারে। নয়াল বইটি কিছু পরিমার্জন করে ২০১০ সালে লিলিপুট প্রেস থেকে নতুনভাবে প্রকাশ করেছেন। কিন্তু গত দশ বছরে তার নতুন পর্যবেক্ষণগুলি কেমন তা নিয়ে কৌতূহল থেকেই যায়। এই সম্পাদকদ্বয়ের মাধ্যমে প্রকাশিত ২০১৬ সালের বইটিতে অবশ্য আয়ারল্যান্ড নিয়ে লেখা ছিল।

পশ্চিম ইউরোপের জনপ্রিয় সাহিত্যের ক্ষেত্রে আইবেনিয় ভাষায় ছাপা ও পর্তুগালের পরিচিতি সম্পর্কে ইংরেজি ভাষার পাঠকরা অন্ধকারে রয়েছেন সবচেয়ে বেশি। মনে রাখতে হবে পর্তুগালের সঙ্গে ল্যাতিন আমেরিকার প্রায় সব দেশের সস্তা ছাপার সরাসরি যোগাযোগ ছিল, যদিও তাদের চরিত্র পর্তুগালের থেকে অনেকটাই আলাদা। পেড্রো মার্কোয়েজের লেখা১১ পর্তুগালের ‘পাপেল ভোলানতে’ (সেখানকার সস্তা ছাপা) নিয়ে প্রবন্ধটি থেকে আমরা জানতে পারি অষ্টাদশ শতকে নারীদের সামাজিক মর্যাদা কেমন ছিল ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের রচনা বা ছাপা ও তাদের মধ্যে সাক্ষরতার সংখ্যাধিক্য নারীদের কী ধরনের প্রতিকৃতি তৈরি করে। তিনি এই প্রবন্ধে সেই সময়কে দেখার জন্য যে উত্তরাধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির ব্যবহার করেছেন অ্যালিসন সিনক্লেয়ারের স্পেন নিয়ে প্রবন্ধটিতে তারই প্রতিচ্ছবি দেখা যায়।

বইটিতে হাঙ্গেরির মত দেশের সস্তা ছাপার পরিচিতি পাঠককে আগ্রহী করবে এতে সন্দেহ নেই। বাংলার গবেষকদের স্লাভ ভাষাভুক্ত অঞ্চলের ইতিহাস আরও বেশি করে জানা দরকার, সংস্কৃতিতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাবকে বোঝার জন্য। স্লোভেনিয়ার পাশাপাশি বসনিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার সস্তা ছাপা নিয়ে লেখা ভবিষ্যতে এদের সম্পাদনায় আশা করি। বিষয়-সম্পাদকদের অক্লান্ত চেষ্টার ফসল এই বইটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় একটি কাজ। যারা আগামীতে সস্তা ছাপা নিয়ে গবেষণা করবেন তাদের জন্য বইটি অবশ্যপাঠ্য বলা যেতেই পারে।  

পাদটীকা

১. অনেক উদাহরণের মধ্যে বিশেষভাবে যে বইটির নাম বলা যায় Robert Darnton ও Daniel Roche সম্পাদিত ‘Revolution in Print: The Press in France, 1775-1800’, University of California Press, 1989.

২. অনেকেই এই বিষয়ে ইজরাইলের ইতিহাসবিদ Fania Oz-Salzberger-এর লেখা “Languages and Literacy” প্রবন্ধটির উদাহরণ দেন। তবে আমার মতে লেখিকা যথাযথভাবে এই বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। (দ্রষ্টব্য: Hamish Scott সম্পা:, ‘The Oxford Handbook of Early Modern European History, 1350-1750: Volume I Peoples and Place’, Oxford University Press, 2015, pp. 192 – 209.)

এই নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা পাওয়া যায় Heidi Brayman Hackel-এর লেখা ‘Popular Literacy and Society’, যেহেতু এই প্রবন্ধটি মূলত ইংল্যান্ড-কেন্দ্রিক তাই পশ্চিম ইউরোপের বাকি দেশের শিক্ষা ও সস্তা ছাপার সম্পর্কের বাস্তব চিত্র সম্বন্ধে এ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় না। এছাড়া তার পপুলার লিটারেসির তত্ত্ব সর্বাংশে মেনে নেওয়া কঠিন। (দ্রষ্টব্য: Joad Raymond সম্পা:, ‘The Oxford History of Popular Print Culture: Cheap print in Britain and Ireland to 1660’, Oxford University Press, 2011, অষ্টম অধ্যায়)

৩. ব্রিল প্রকাশনা সংস্থা ‘Library of the Written Word’ সিরিজে এখনও পর্যন্ত মোট ১১৭টি বই প্রকাশ করেছে।

৪. বর্তমানে স্ক্যান্ডিনেভিয়া, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া ও আইবেরীয় ভাষার ছাপা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা চলছে।

৫. বইটি সম্বন্ধে জানতে দেখা যেতে পারে, বর্তমান লেখকের কলমে ‘ইউরোপের জনপ্রিয় ছাপার চর্চা ও সমকাল’ (দ্রষ্টব্য: সঞ্জীব মুখোপাধ্যায় সম্পা:, ‘বই ও পাঠের ভবিষ্যৎ, খণ্ড -১’, নির্ঝর, কলকাতা, ২০২৩, পৃ: ২৯৫ – ৩০২)।

৬. ২০১৬ সালে তাঁরা যৌথভাবে সম্পাদনা করেন ‘Street Ballads in Nineteenth-Century Britain, Ireland, and North America: The Interface between Print and Oral Traditions’ এবং ২০১৭ সালে ‘Street Literature of the Long Nineteenth Century: Producers, Sellers, Consumers’ প্রকাশ করেন। এই দুটো বইয়ের মধ্যেই তাঁদের বিষয়-সম্পাদনার মুনশিয়ানা প্রকাশ পেয়েছিল। বর্তমান বইটি আরও বড়ো ক্যানভাসে রচিত হয়েছে।

৭. ব্রিটনিতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বা ফরাসি দেশ থেকে বেরিয়ে আসার স্বাধীনতাকামী আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে তাদের সংস্কৃতি নিয়ে আগ্রহ বৃদ্ধি পেতে দেখা যাচ্ছে। ২০২২ সালে Théodore Hersart La Villemarqué এর সম্পাদনায় ‘Ballads and Songs of Brittany’ সংকলনটি প্রকাশিত হয়েছে।

৮. শিব গৌরি ব্রানজেয়েক-এর লেখাপত্র নিয়ে প্রাথমিক ধারণার জন্য দেখা যেতে পারে –

https://www.facebook.com/groups/1803711656387813/search/?q=%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%AC%20%E0%A6%97%E0%A7%8C%E0%A6%B0%E0%A6%BF

৯. Tetiana Karoyeva, “A Repertoire of Lubok Books Covering Ukrainian History (1830s – 1910s)”, ‘Slavic & East European Information Resources’, 2021, Volume 22, Issue 2, pp. 133–146.

১০. Adam Fox, ‘The Press and the People: Cheap Print and Society in Scotland, 1500-1785’, Oxford University Press, 2020.

১১. Pedro Marques, “The Papel Volante: A Marginalized Genre in Eighteenth-Century Portuguese Culture?”, ‘Portuguese Studies’, Vol. 33, No. 1, Modern Humanities Research Association, 2017, pp. 22-38.

[বিশেষ কৃতজ্ঞতা: শিখা খন্দকার]

মন্তব্য তালিকা - “ইউরোপের ‘বটতলা’র পরিচয়: সমকালীন দৃষ্টিকোণ”

  1. প্রথমতঃ বটতলার বা সস্তা সাহিত্য ও তার প্রকাশনা নিয়ে সারা পৃথিবীতে এধরনের আলোড়ন চলছে জানা ছিলো না।
    এই সব সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই আম জনতার মধ্যে পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং জনসংকৃতিগুলি লিপিবদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা।
    আলোচ্য বইটি মনে হয় অনেকটাই সফল।
    সব থেকে ভালো লাগলো এই প্রবন্ধটি লেখক অত্যন্ত অধ্যাবসায়ে ও যত্নে আমাদের মতো অতি সাধারণ পাঠকের মনোগ্ৰাহী করে তুলেছেন। ঋদ্ধ হলাম।

    1. ধন্যবাদ। ইউরোপে এই নিয়ে পরপর বেশ কয়েকটি ভালো বই প্রকাশিত হয়েছে। ইতিহাস তথ্য ও তর্ক গ্রুপে সে নিয়ে সামান্য কিছু আলোচনা করেছি। ভবিষ্যতে আরো বিস্তারিতভাবে লেখার ইচ্ছে আছে।

  2. আগের অন্য লেখাগুলোর মতোই সুন্দর গোছানো লেখা। খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, পড়তেও ভালো লাগে।
    একটা কথা জানতে চাই। স্পেনের যে বইগুলো ‘ঝরা পাতা’ সেগুলো বাঁধাই করা হত না । তাহলে কীভাবে তৈরি হত?

  3. আপনি বটতলা সাহিত্য নিয়ে একটি বই লিখতে পারেন তো। দু-মলাটে থেকে যাবে। অনেক প্রকাশকই এখন আগ্রহী এই নিয়ে বই করতে। আপনি আগ্রহী হলে আমার এক পরিচিত প্রকাশকের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারি। ধন্যবাদ।

    1. লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। সব লেখাকে বই করতে হবে এমন কোন কথা নেই। আর যে ধরনের বই আজকাল বের হচ্ছে তাতে অপটু লেখক আর অপরিণামদর্শী প্রকাশকদের সংখ্যা বেড়ে গেছে মনে হয়। ধন্যবাদ। আপনার প্রস্তাব ভেবে দেখবো যদি আগামী দশ বছর পর এই নিয়ে আগ্রহ থাকে।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।