সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

চাকমা নৃগোষ্ঠীর শিকড়ের খোঁজে

চাকমা নৃগোষ্ঠীর শিকড়ের খোঁজে

তৌফিকুল ইসলাম চৌধুরী

এপ্রিল ১০, ২০২১ ১০৩১ 0

বাংলাদেশে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ‘চাকমা’ বা ‘চাঙমা’ সমাজ নানাকারণে বিশিষ্টতার দাবিদার। সাহিত্য-শিল্পকলা-শিক্ষা-সংস্কৃতিতে অগ্রগামী এই জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের আদিবাসী নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠও বটে। বাংলাদেশে প্রধানত পাহাড়ি চাদর আবৃত পার্বত্য চট্রগ্রামেই তাদের মূল আবাস। এছাড়াও ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরামের দক্ষিণাংশে, অরুণাচল, মিকির হিলসেও চাকমারা বাস করে। মিজোরামে ‘চাকমা অটোনোমাস ডিষ্ট্রিক কাউন্সিল’ নামে একটি এলাকাও আছে। মায়ানমারের আরাকানে, বাংলাদেশের কক্সবাজারের টেকনাফে ‘দৈংতাক’ নামে চাকমাদের আর একটা শাখা বসবাস করে, যারা সেখানে বাংলাদেশী চাকমাদের মতো নিজেদের ‘চাঙমা’ বলে।

চাকমারা নিজেদের ‘চাঙমা’ বলে অভিহিত করলেও ‘চাঙমা’ শব্দটির উৎস আজও অনুদ্ঘাটিত। বর্মী ভাষায় ‘চাক’>’ চেক’ অর্থ ‘শাক্য’, ম্যাং অর্থ ‘রাজা’। এই হিসেবে ‘চাকম্যাং’ অর্থ ‘শাক্য রাজবংশীয়’ হতে পারে। চাকমা রাজা ভুবন মোহন রায় মনে করেন, “চাকমারা শাক্য রাজ বংশজাত মহামুনি বুদ্ধের বংশধর।” হয়তো ‘চাকম্যাং’ থেকেই চাকমা শব্দটি এসেছে। বাস্তবে দেখা যায়, চাকমারা জীবনাচারে প্রকৃতি পূজারী হলেও মূলতঃ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। বাংলাদেশের চট্রগ্রামের আলী কদমের কাছে মাতামুহুরী নদীতে প্রাপ্ত চাকমা বর্ণখচিত প্রাচীন বৌদ্ধ মূর্তিই প্রমান করে দূর অতীতেও তারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিল। রাজা ভূবন মোহন রায়ের দাবী অনুযায়ী তারা ‘চাকম্যাং’– ‘শাক্য রাজবংশীয়’ হতেই পারেন। আবার অনেকে মনে করেন, রাজা বিজয়গিরি ৭ চমুঃ সৈন্য নিয়ে চট্রগ্রাম-আরাকান জয়ের স্মারক হিসাবে ‘চমুঃ’ থেকে ‘চাম্মুয়া’ (বাঙালিরা চাকমাদের ‘চাম্মুয়া’ বলে থাকেন) বা ‘চাঙমা’ শব্দটি এসেছে। আবার কেউ কেউ এও মনে করেন, চম্পক নগরের ‘চম্পক’ থেকে চাঙমা নামটির উদ্ভব।

বাংলাদেশে চাকমারা কখন, কোথা থেকে এসেছে বা এদের উৎসস্হল কোথায়, সে প্রশ্ন  সঙ্গতভাবেই এসে যায়।

  • কর্ণেল ফেইরীর ধারণা, চাকমাদের আদি নিবাস বার্মা বা মায়ানমারে। আরাকানি কাহিনী গ্রন্থ “দেঙ্গ্যাওয়ার্দি আরেদফুং”-এ চাকমা বিষয়ে প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়, ৪৮০ মগী সনে (১১১৮—১৯ সাধারণ অব্দে) একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার প্রসঙ্গে। এতে বলা হয়, “এ সময়ে পেগো (আধুনিক পেগু) দেশে আলং চিছু নামে জনৈক রাজা ছিলেন। পশ্চিমের বাঙালিদের সাথে মিলে চাকমাগণ, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে”।  
  • তিব্বতী ঐতিহাসিক লামা তারানাথের একটি বক্তব্য থেকে মনে হয়, ১১৯৭ সালের দিকেও এতদঞ্চলে চাকমাদের বসবাস ছিল। লামা তারানাথ বলেন, মুসলিমদের মগধ (বিহার) বিজয়ের প্রাক্কালে বহু সংখ্যক বৌদ্ধ ভিক্ষু কুকিভূমিতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। ঐসময় রাজা বালাসুন্দ্রের পুত্রদের মধ্যে অতীতবাহন চকমা’র রাজা ছিলেন।
  • ইশ্বর প্রসাদের উক্তি থেকে জানা যায়, তুর্কীদের বিহার বিজয়ের ঘটনা ঘটে প্রায় ১১৯৭ সালের দিকে। এটা কারও অজানা নয় যে, আরাকানসহ পার্বত্য চট্রগ্রাম সুদূর অতীতে কিরাত ভূমি এবং পরবর্তীকালে ‘কুকীল্যাণ্ড’ বা কুকীভূমি নামে পরিচিত ছিল। এখানে CHACOMAS বা ‘চাকমা’র রাজা ছিলেন অতীতবাহন।
  • পর্তুগীজ নাবিক Zoa De Borrows ১৫৫০ সালে কর্ণফূলী নদীর পূর্ব অববাহিকায় ‘চাকমাস’ নামে একটি এলাকা চিহ্নিত করেন, যেখানে অনেক আগে থেকেই চাকমাদের বসবাস ছিল বলে অনেকে মনে করেন। বিরাজ মোহন দেওয়ান ‘চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থের ২৯২ পৃষ্ঠায়, ১৪১৮ সালে চাকমাদের বাঙ্গালা দেশে প্রবেশের কথা জানান। ধারণা করা হয়, চর্তুদশ শতাব্দীতে চাকমারা ‘লায়েট মিও’-এর পশ্চিমে মধ্য-আরাকানের পাহাড়ী এলাকাতেও বসবাস করতেন।
  • ১৭৮৭ সালের ২৪ জুন ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর চট্রগ্রাম প্রতিনিধির কাছে ব্রহ্মরাজের লেখা একটি চিঠি থেকে মনে হয়, অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে কিছু সংখ্যক চাকমা মায়ানমারের আরাকান থেকে পালিয়ে পার্বত্য অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিল। চিঠিতে বলা হয়, “চূকমা (চাকমা), কিওকোপলাইস (লুসাই), মরিঙ(মুরং), মগ(মারমা) এবং আরাকানের অন্য অধিবাসীরা পালিয়ে গিয়ে আপনার সীমান্তের নিকটবর্তী পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছে।”
  • Prof. Pierre Bessaignet’s তার Tribesmen of Chittagong Hill Tracts গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, “চাকমারা মঙ্গোলীয় জাতির সম্ভবতঃ আরাকানী গোত্র থেকে উদ্ভুত — যদিও বহু বাঙালির সাথে তাদের অসবর্ণ বিয়ে হয়েছে”।
  • Burma  National  Ideology গ্রন্থের চতুর্থ পৃষ্ঠায় মায়ানমারের মোট ১৮টি জাতিগোষ্ঠীর নাম উল্লেখ করা হয় এতে ০২ নং ক্রমিকে চাকমা’র কথা বলা হয়েছে, যারা ধর্মে বৌদ্ধ এবং মায়নমারের পশ্চিমাংশে বসবাস করে। এ ধরনের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত থেকে মনে হয়, চাকমারা মিয়ানমার বা আরাকানি বংশোদ্ভুত।
  • ‘চাকমা পরিচিতি’ গ্রন্থে সুগত চাকমা কিন্তু ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি বলেছেন, “অনেক লেখক চাকমা রাজ্যের সন্নিকটে আরাকানের অবস্হান, চাকমা বর্ণের সাথে আরাকানী বর্ণের সাদৃশ্য, উভয় অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব ইত্যাদি লক্ষ করে চাকমাদের বর্মী অথবা আরাকানী বংশোদ্ভুত বলে মনে করেছেন। কিন্তু পরবর্তীকালে গবেষণায় প্রমানিত হয়েছে যে, চাকমাদের বর্ণমালা দক্ষিণের আরাকানী বর্ণমালার সাথে নয়, বরঞ্চ উত্তরের অহোমদের পুরাতন বর্ণমালার সাথে একই পরিবারভুক্ত। আর চাকমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, পূজা-পার্বণ, উৎসব, পোষাক-পরিচ্ছেদ, রীতিনীতি ইত্যাদির সাথে বর্মী ও আরাকানীদের এতবেশী অমিল যে, চাকমারা কোন অবস্হাতেই বর্মী ও আরাকানী বংশোদ্ভুত হতে পারে না ; বরঞ্চ ঐগুলির সাথে আসাম ও ত্রিপুরার বিভিন্ন উপজাতিয়দের সংস্কৃতির মিল দেখা যায়। এ থেকে আমরা এ সিদ্বান্তে উপনীত হতে পারি যে, চাকমারা আসাম–ত্রিপুরার দিক থেকেই পার্বত্য চট্রগ্রামে এসেছিল”। তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ব বিভাগের শিক্ষক, প্রাবন্ধিক প্রশান্ত ত্রিপুরা তার ‘পার্বত্য চট্রগ্রামের উপজাতীয়দের নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস অনুসন্ধান’ বিষয়ে প্রবন্ধে আরাকান ও ত্রিপুরা- উভয়ের সাথে চাকমাদের সম্পর্ক খুঁজেছেন। তিনি মনে করেন, “চাকমাদের ক্ষেত্রেও নিকট অতীতে আরাকানের সাথে এবং সুদূর অতীতে হয়তো ত্রিপুরা রাজ্যের সাথেও সম্পর্ক ছিল”।
  • তবে চাকমারা মনে করেন, তাদের আদি নিবাস চেইন প্যেংগো বা চম্পকনগর। চম্পকনগর কোথায় অবস্হিত সে ব্যাপারে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারত, মায়ানমার ও দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কয়েকটি জায়গায় ‘চাম্পা’ নামে এলাকার সন্ধান পাওয়া যায়। মনে করা হয়, ‘চাম্পা’ থেকে ‘চম্পকনগর’ কথাটি এসেছে। ভারতের হিমাচল প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, বিহারের ভগলপুর ও পুনিয়া, মায়ানমারের আরাকানে, ভিয়েতনামের ‘চাম্পা’ এবং ত্রিপুরা রাজ্যে ‘চাম্পা’ ও ‘চম্পকনগর’ এলাকার সন্ধান পাওয়া যায়। চীনা পর্যটক ফা-হিয়েনের (৪২৯ সাধারণ অব্দ) বর্ণনায় জানা যায়, চম্পনগর ছিল তখনকার ভাগলপুরের কর্ণপুর রাজ্যের রাজধানী। চাকমা সমাজে একটি লোকগীতি খুবই জনপ্রিয়। এতে চম্পকনগর নয়, নূরনগরের উল্লেখ আছে, যা পার্বত্য ত্রিপুরায় অবস্থিত। লোকগীতিটি নিম্নরুপ:

“ডোমে বাজায় ঢোল– দগর /

ফিরে যাইয়ূম নূর নগর।”

চাকমাদের উৎসে ফেরার এই যে আকুতি, তা জানিয়ে দেয়, নূরনগর পরগণা তথা ত্রিপুরার সাথে তাদের একটা প্রাচীন যোগসূত্র রয়েছে। আসলে ত্রিপুরা রাজ্যের নূরনগরই কিংবদন্তির চম্পকনগর। ‘চাকমা জাতি’ গ্রন্থের লেখক সতীষ চন্দ্র ঘোষ তা-ই মনে করেন।১০ তবে Tribesmen of Chittagong Hill Tracts গ্রন্থে প্রফেসর পিয়েরে বেসেইনে (Prof. Pierre Bassaignet) ‘চাকমা রাজপরিবারের ইতিহাস’ অংশে রাজা ভূবন মোহন রায়ের যে লেখাটি হুবহু তুলে ধরেছেন, তাতে দেখা যায়, চম্পক নগরের অবস্হান ইরাবতী নদীর পূর্বতীরে। এতে বলা হয়, হিমালয়ের পাদদেশে কালাপা–নগরকেন্দ্রীক ‘শাক্য’ চাকমা রাজবংশীয় রাজা শুদ্রজিৎ মৃত্যুমুখে পতিত হলে তার যুবক ছেলে সমুদ্রজিৎ রাজা হন। তিনি মন্ত্রী শ্যামলের সহায়তায় কিছু সময় রাজত্ব করলেও মাত্র কুড়ি বছর বয়সে ঈশ্বরের ধ্যানে মগ্ন হয়ে রঙ্গীন পৈতা পড়ে ভিক্ষু বনে যান। ফলে তার সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে। তখন মন্ত্রী শ্যামল কালাপানগর পরিত্যাগ করে হিমালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব পার্শ্বে একটি নতুন সাম্রাজ্যের পত্তন করেন। তার ছিল একপুত্র, নাম চম্পাকলি। চম্পাকলি ইরাবতি নদীর পূর্ব তীরে একটি নতুন নগর গড়ে তোলেন। তার নামানুসারে এর নাম রাখা হল চম্পকনগর।’১১

চাকমা ইতিহাস পাঠে জানা যায়, উচ্চ ব্রহ্মের (মায়ানমার) চাকমা রাজ্য ধ্বংস হয়ে গেলে কুমার সূর্যজিৎ (চজুং) উচ্চ ব্রহ্মের ‘মংজাম্রু’ নামে রাজধানীকেন্দ্রিক এক নয়া রাজ্যের পত্তন করেন। সূর্যজিৎ-এর মৃত্যুর পর তার ভাইপো মইসাং (১৪১২–১৪১৮) রাজা হন। তিনি কর দিতে না পেরে বৌদ্ধ ভিক্ষুর পথ অবলম্বন করেন। তার রাজত্বকালে ‘মংজাম্রু’তে রাজা মইসাং-এর প্রজাকল্যাণে নির্লিপ্ততা ও মগদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ চাকমারা  নিজেদের পূর্বপুরুষের পূণ্যভূমি চম্পকনগর ফিরে যেতে আকুল হয়ে উঠে। নীচের চাকমা লোকগীতিতে তারই প্রতিধ্বণি শোনা যায়ঃ

“এল মইসাং লালস নেই, ন এলে মইসাং কেলশ নেই,

চল বাপ ভেই চল যেই, চম্পক নগরৎ ফিরি  যেই।

ঘরত  গেলে মগে পায়, ঝারত গেলে বাঘে  পায়,

মগে ন পেলে বাঘে পায়, বাঘে ন পেলে মগে পায়।

অর্থাৎ ঘরে ও জঙ্গলে মগ ও বাঘের ভয়। মইসাং রাজার ব্যাপারেও

কোন আশা-ভরসা বা আগ্রহ নেই। তাই বাপ-ভাই সবাই চল চম্পকনগর ফিরে যাই।

জনশ্রুতি আছে, আদিতে চেইনপ্যেংগো বা চম্পকনগরে এক রাজা ছিলেন। তার নাম ছিল সাংবুদ্ধা। তার ছিল দুই ছেলে, বিজয়গিরি ও সমরগিরি। বড় ছেলে বিজয়গিরি একদিন (সম্ভবত ৫৯০ খ্রিষ্টাব্দে) রাজার অনুমতি নিয়ে সেনাপতি রামাধনসহ ০৭ (সাত) চমু (এক চমু =২৬,০০০ জন)  সৈন্য-সামন্ত নিয়ে দক্ষিণে যাত্রা করেন এবং কাঞ্চননগর, আরাকান (অক্সাদেশ), সাপ্রেকুল জয় করেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষে স্বদেশে ফেরার পথে তিনি জানতে পারেন যে, এরই মধ্যে তার বৃদ্ধ পিতার মৃত্যু হয়েছে এবং ছোটভাই সমরগিরি চম্পকনগরের সিংহাসন দখল করে নিয়েছেন। তখন তিনি মনের দুঃখে আর স্বদেশে ফিরলেন না। সাপ্রেকুলে থেকেই রাজত্ব করতে লাগলেন। সাপ্রেকূলে তিনি এক উঁচু বংশীয় রমণীকে বিয়ে করেন এবং তার অনুগত সৈন্যদেরও স্হানীয় মেয়েদের বিয়ে করতে অনুমতি দেন। এভাবে সাপ্রেকূলে বিজয়গিরি বংশের চাকমাদের বিস্তৃতি ঘটে।

‘সাপ্রেকূল’ কোথায় অবস্হিত তা আজও অনুদ্ঘাটিত  তবে বিরাজ মোহন দেওয়ান ‘চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে ১৪১৮ সালে চাকমাদের বাংলাদেশে আগমনের কথা জানান। এছাড়া ইতিহাস বলে, “১৫৪৬ সালে একজন চাকমা রাজা উত্তর দিক থেকে গিয়ে তৎকালীন আরাকানের অধীন কক্সবাজারের প্যাঁওয়া (রামু) দখল করেন”। (স্যার এ. পি. ফেইরী — ১৮৮৩)। আজও রামু বাজার থেকে কক্সবাজার যাওয়ার পথে রামুর দুই মাইল দূরবর্তী বাকখালী নদীর তীরে ‘চাকমার কূল’ নামে একটি ইউনিয়ন দেখতে পাওয়া যায়, যেখানে এককালে চাকমারা বাস করতো বলে জনশ্রুতি রয়েছে। হয়তো এটিই সেই ঐতিহাসিক ‘সাপ্রেকূল’, যা চাকমার কূল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। কান পাতলেই ইতিহাসে এর অনুরণনও শোনা যায়। জানা যায়, পার্বত্য চট্রগ্রাম মূলত কুকি দলের নানা উপজাতি দ্বারা অধ্যুষিত ছিল। পরে কুকিদের আরও উত্তর-পূর্ব দিকে বিতাড়িত করে চাকমারা  বাংলাদেশের  চট্রগ্রামের দক্ষিণাংশসহ আরাকান দখল করে। ড. হেইন্স বেকার্ট এর প্রবন্ধ ‘দ্য চাকমাস’-এর আলোকে বলা যায়, অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে চাকমারা মাতামুহুরী নদী সংলগ্ন দক্ষিণের পাহাড়ী এলাকায় বসবাস করতো। চট্রগ্রামের দক্ষিণাংশ তথা সাতকানিয়াও এই সময় চাকমা অধ্যুষিত ছিল। কক্সবাজারের হারবাঙ এর রাখাইন সমাজে জনশ্রুতি আছে, সাতকানিয়া নামটি এসেছে চাকমা ‘সাককান্যা’ (চাকমা রাজকন্যা) শব্দ থেকে। ব্রিটিশ জরিপ কর্মকর্তা মিঃ রেনেল পরবর্তীকালে (১৮৮৩ ইং) ঐ এলাকার নাম উল্লেখ করেন Saccanya বলে। তবে ব্রহ্মযুদ্ধের সময় (১৮২৪—৫২) আরাকান হতে মগরা এসে এই এলাকা (সম্ভবত সাপ্রেকূলসহ চট্রগ্রামের দক্ষিণাংশ) থেকে চাকমাদের বিতাড়িত করে চট্রগ্রাম জেলার দক্ষিণ অংশ অধিকার করলে চাকমারা পার্বত্য চট্রগ্রামের দিকে গিয়ে সেখানে স্হায়ীভাবে বসবাস করতে থাকে। অবশ্য ষোড়শ শতকেও চাকমাদের মূল জনগোষ্ঠী চট্রগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের কর্ণফূলী অববাহিকায় যে স্বাধীনভাবে আলাদা রাজ্যে বসবাস করতো, তার নজিরও ইতিহাসে রয়েছে। পর্তুগীজ নাবিক Zoa De Borrows ১৫৫০ সালে ‘Descripcao Do Reino De Bengla’ নামে একটি মানচিত্র আঁকেন। এতে ২৩ ডিগ্রী উত্তর অক্ষাংশ থেকে ২৪ ডিগ্রী উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে কর্ণফূলী নদীর অববাহিকায় ‘CHACOMAS’ নামে ১টি জায়গা চিহ্নিত করেন।১২ অনেকেরই ধারণা, এটি চাকমাদেরই বসতি অঞ্চল। এছাড়া নিকট অতীতে, ১৮৬০ সালে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী কর্তৃক চাকমা রাজ্য সম্পূর্ণ দখল করার পূর্বে চাকমা রাজাদের প্রশাসনিক সদর দপ্তর বা রাজধানী ছিল চাকমা রাজ্যের সবচেয়ে বড় ও উৎপাদনশীল তালুক চট্রগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার রাজানগরে। পরে এই দপ্তর রাঙামাটিতে সরিয়ে নেয়া হয়। বর্তমানে চাকমা রাজা হিসেবে রাঙামটিতে সমাসীন আছেন ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন, তিনি রাজত্ব করেন, কিন্তু শাসন করেন না। তার রাজ’ পদবীটি প্রতীকি পদ মাত্র।

তথ্যসূত্র

১) ভূবন মোহন রায়, চাকমা রাজবংশের ইতিহাস , পৃষ্ঠা – ৩৭, ১৯১৯

২) Colonel Phayer, The History of Burma, page-37

৩) দেঙ্গ্যাওয়ার্দী আরেদফং, পৃষ্ঠা–১৭

৪) Heing Bechert, Contemporary Buddhism in Bengal & Tripura. Vol–04,  No-3 & 4– 1967

৫) Ishwar Prasad, A Short History of the Muslim Rule in  India, Allahabad,  India,1970

৬) বিরাজ মোহন দেওয়ান, চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত , সরোজ আর্ট প্রেস,  রাঙ্গামাটি, বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ২৯২, ১৯৬৯

৭) প্রফেসর পিয়েরে বেসেইনে, পার্বত্য চট্রগ্রামের উপজাতি-, অনুবাদ–অধ্যাপিকা সুফিয়া খানম, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ৯, ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৭,

৮) সুগত চাকমা, চাকমা পরিচিতি,  বরগাঙ পাবলিকেশন্স, রাঙামাটি, বাংলাদেশ,  ১৯৮৩ ইং, পৃষ্ঠা–০২

৯) প্রশান্ত ত্রিপুরা, পার্বত্য চট্রগ্রামের উপজাতীয়দের নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস অনুসন্ধান, বাংলাদেশের উপজাতি ও আদিবাসী অংশীদারিত্বের নতুন দিগন্ত, সম্পাদনা –হাফিজ রশিদ খান, পৃষ্ঠা–১৮, অক্টোবর  ১৯৯৩

১০) সতীষ  চন্দ্র ঘোষ, চাকমাজাতি , কলিকাতাঃ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ গ্রন্থাবলী, পৃষ্ঠা ১১, ১৯০৯

১১) প্রফেসর পিয়েরে বেসেইনে, পার্বত্য চট্রগ্রামের উপজাতি-, অনুবাদ–অধ্যাপিকা সুফিয়া খানম, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ১১২ , ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৭

১২) Journal of the Asiatic Society of Pakistan. Vol–8, No-2, 1963

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।