সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

সাঁওতাল মহাবিদ্রোহ – ফিরে দেখা

সাঁওতাল মহাবিদ্রোহ – ফিরে দেখা

নবাঙ্কুর মজুমদার

জুন ৩০, ২০২২ ১৩৫ ১৩

(গ্রন্থ নাম: সামাজিক প্রেক্ষাপটে সাঁওতাল মহাবিদ্রোহ, লেখকের নাম: শিবানন্দ পাল, প্রকাশক: হিরামনি মান্ডি, মুদ্রণ: সিঞ চাঁদো, প্রাপ্তিস্থান: পন্ডিত রঘুনাথ মুর্মু আরশালবাতি ওয়েলফেয়ার সোসাইটি)

সাঁওতাল বিদ্রোহ। ভারতের আদিবাসী বিদ্রোহগুলির মধ্যেকার এক মহাবিস্ফোরণ। সাঁওতাল বিদ্রোহের নাম শোনেননি এমন লোক মেলা ভার। ১৮৫৫ সালে সিধু কানুর নেতৃত্বে ভাগনাডিহির মাঠে সাঁওতাল বিদ্রোহের ডাক দেওয়া হয়েছিল, ইংরেজরা এই বিদ্রোহ কঠোর হাতে দমন করেছিল ইত্যাদি সাধারণ তথ্যগুলো আমরা সবাই জানি। তাহলে এ বিষয়ে একটা নতুন বই আবার কষ্ট করে পড়তে যাব কেন? এই বইটার পাঠপ্রতিক্রিয়া দিতে যখন বসেছি, তা তো নিশ্চয়ই বলব, তবে তার আগে বইটার নাম, প্রকাশক, বিপণন ও মুদ্রণ শিল্পীর নামগুলোর দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। পন্ডিত রঘুনাথ মুর্মু আরশালবাতি ওয়েলফেয়ার সোসাইটি নামে এক অলাভজনক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা যখন এমন এক গবেষণালব্ধ বইয়ের বিপণনের দায়িত্ব নিয়েছে যার লভ্যাংশ সাঁওতাল সমাজের জনসেবামূলক কাজে লাগানো হবে তা সর্বাংশে ব্যতিক্রমী বইকি!

লেখক শিবানন্দ পালের ইতিপূর্বে অনেকগুলো বই প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু এই বইটি লিখতে গিয়ে লেখককে কি নিবিড় গবেষণা করতে হয়েছে তা বইটির প্রতিটি ছত্রে, প্রতিটি বাক্যে পাঠক অনুভব করতে পারবেন। দিনের পর দিন লেখক সাঁওতাল পরগণায় পড়ে থেকেছেন আর সাঁওতাল বিদ্রোহের সামাজিক প্রেক্ষাপটের সন্ধানে চষে ফেলেছেন গ্রাম গ্রামান্তরের আদ্যোপান্ত।

প্রায় ৪০০ পাতার এই গবেষণাধর্মী বইকে ১০৫ টি পর্বে ভাগ করা হয়েছে, যে পর্বগুলির উল্লেখ পাঠকের সুবিধার জন্য প্রতিটি পৃষ্ঠায় করা আছে। শেষদিকে যথারীতি তথ্য কৃতজ্ঞতার সংযোজন তো আছেই, আছে অভিধানের মত করে সাজানো এক অত্যন্ত কার্যকরী নির্ঘন্ট। এতবড় গবেষণামূলক বইয়ে কোন নির্দিষ্ট নাম বা তথ্য পেতে চাইলে তা যাতে গরু খোঁজা না করতে হয় তা নিশ্চিত করেছে এই নির্ঘন্ট। আর আছে আজকের সাঁওতাল পরগণার কিছু ছবি যা সেদিনের সেই মহান বিদ্রোহের সাথে এযুগের পাঠকের মেলবন্ধন ঘটাবে।

এ তো গেল বইয়ের বাহ্যিক খুঁটিনাটি। কিন্তু মূল প্রশ্ন সাঁওতাল বিদ্রোহের যাবতীয় প্রতিপাদ্য কি সত্যিই এই বইতে ফুটে উঠেছে? বিদ্রোহ কেন হল, কীভাবে এগোল, দমনই বা কি পন্থায় হল, সেযুগের আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভাবনা চিন্তা, ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণির মনোভাব, ইংরেজদের মানসিকতা—সবটাই স্বচ্ছতোয়া নদীজলের মত চোখের সামনে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন অসাধারণ মুন্সিয়ানায়।

সেকালের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত কিছু কিছু প্রবন্ধ ও চিঠিপত্র লেখক এ বইতে প্রকাশ করেছেন সাঁওতাল বিদ্রোহ নিয়ে সমকালীন মানুষের মনোভাব বুঝতে। যেমন ‘সমাচার সুধাবর্ষণ’ পত্রিকার ২২শে সেপ্টেম্বর, ১৮৫৫ সংখ্যায় লেখা হচ্ছে, “অন্তঃকরণে বিরক্তি না জন্মালে কেউ রাজার বিরুদ্ধাচরণ করে না। রাজারা প্রজার রক্ষক, সেই রাজা যদি প্রজাদের বিরক্তির কারণ না বুঝে অস্ত্র ধারণ করে তাহলে প্রজারা কি করে? পর্বতের দক্ষিণাংশবাসী সাঁওতালদের রেলের কর্মচারিরা একগুণে দশগুণ খাটালেন, তদুপযুক্ত বেতন দিলেন না। চুক্তিমতো বেতন চাইলে তাদের মারধর করে বের করে দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ সাঁওতাল কান্তাদের বলাৎকার করার জন্যই সাঁওতালদের জাতক্রোধ দলবদ্ধ হয়েছে—এটাই একটা মূল কারণ”।

তবে এটাই যে তাবৎ ভারতবাসীর একমাত্র মনোভাব ছিল ভাবা ভুল হবে। সংবাদ প্রভাকরের মত নামী পত্রিকায় প্রকাশিত একটি চিঠির উল্লেখ লেখক বইয়ের ৩০৫ পৃষ্ঠায় করছেনঃ

১৮ জুলাই, ১৮৫৫ সাহাবাজপুর,

সম্পাদক প্রবর,

              সাঁওতালদের ভয়ঙ্কর অত্যাচারে দুস্তর দুঃখ পারাবারে নিমগ্ন। প্রাণভয়ে কাতর আছি, গত দিবস মিস্টার সেন্ট জন সাহেব এখানে কতগুলি লোক নিয়ে এসে সাঁওতালদের আক্রমণ করেন। একপ্রকার যুদ্ধ হয়। শ্রাবণের ধারার মতো সাঁওতালরা তির বৃষ্টি করতে থাকে। আমরা খুব ভয় পেয়েছিলাম কিন্তু তাতে বিশেষ কোন হানি হয় নাই। একটা তির একজন সাহেবের মাথায় লেগেছিল, তাতে তার টুপি উড়ে যায়। সাহেবরা বন্দুক চালাতেই সাঁওতালরা পালায়। এখন ভয়, জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে প্রজাদের সর্বনাশ করবে। জঙ্গলের নানা রাস্তা তাদের জানা। ইংরেজ সেনাদের সাধ্য নাই তাদের পিছু ধাওয়া করে! সাঁওতালরা যখন রাজসেনা দেখেও ভয় পায় না, অত্যাচার চালাচ্ছে, তখন এই যুদ্ধ তাড়াতাড়ি মিটবে বলে মনে হয় না”।

এই চিঠিতে যেমন সে সময়ের মধ্যবিত্ত বাঙালি বিদ্রোহকে নিছক সাঁওতালদের অত্যাচার ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারছে না, দেশবাসীর এ ধরণের মনোভাব কেন তার ব্যাখ্যা লেখক এভাবে দিচ্ছেন, ‘সেদিনের শিক্ষিত সম্প্রদায় কৃষিকেন্দ্রিক অভ্যুত্থান গুলি সুনজরে দেখেননি। জমির সঙ্গে সম্পর্ক প্রায় সবারই ছিল। মুৎসুদ্দিগিরি জীবনধারায় মধ্যবিত্ত সুলভ মানসিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সাঁওতালরা ছিল বুনো, অসভ্য, ছোটজাতের মানুষ। তাঁদের চোখে ইংরেজদের অগ্রপ্রসারের ইতিবাচক ব্যবস্থাপনায় নিজেদের প্রতিষ্ঠার কথা ভেবে ইংরেজ তোষণ স্বাভাবিক ছিল’।

এই যে বিদ্রোহ সম্বন্ধিত বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল, এগুলোকে নিরপেক্ষ ভাবে ধরার জন্য লেখক চিঠিপত্র, নানান রিপোর্ট এসব গুরুত্বপূর্ণ দলিল এমনভাবে সাজিয়েছেন যাতে বিদ্রোহীদের, ইংরেজ সাহেবদের আবার মধ্যবিত্ত বাঙালিদের চিন্তাভাবনার ভাঁজগুলো ভালভাবে বুঝতে পারা যায়। কিন্তু এমনও নয় যে বইটি কেবল তথ্যের কচকচিতে ভরা। তেমন ব্যাপার তো নয়ই বরং লেখাটিতে এত সুন্দর ছোট ছোট গল্পের সমাহার, পাঠক কখন যে সাঁওতাল বিদ্রোহের দিনগুলি আর তার আগের সময়কালে পৌঁছে গেছেন নিজেই বুঝতে পারবেন না।

পাহাড়িয়াদের দুটি শাখা মালপাহাড়িয়া ও সূর্য পাহাড়িয়া—তাদের সাথে জমির অধিকার নিয়ে সাঁওতালদের বিরোধ, অবধারিত ভাবে ইংরেজদের হস্তক্ষেপের সুযোগ, আর সুযোগ মানেই বানরের পিঠে ভাগের মত সুযোগকে কাজে লাগানো—সাঁওতাল বিদ্রোহের মুখবন্ধটি যেন প্রস্তুত করে দেয়। তিনজন ব্রিটিশ আধিকারিক- ক্যাপ্টেন আলেকজান্ডার, লেফটেন্যান্ট থম্পসন, লেফটেন্যান্ট রেড, এদের ষড়যন্ত্রের ফলে কিভাবে একটু একটু করে সাঁওতালরা খাদের কিনারায় চলে যায় তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হান্টার সাহেব ইত্যাদি কিছু কুটিল ষড়যন্ত্রী মানুষের লেখায় সাঁওতালদের বাঙালি বিদ্বেষের উল্লেখ কিভাবে বিভেদের বীজ বুনতে সাহায্য করেছে তার পাশাপাশি নিরীহ নির্ধন সাঁওতালরা কিভাবেই বা ষড়যন্ত্রের বলি হল—প্রথমে পাহাড়িয়াদের সাথে মনোমালিন্য, পরে মহাজনের অত্যাচার, বারে বারে প্রতিকার চেয়ে ইংরেজের দ্বারস্থ হওয়া—বঞ্চিত মানুষগুলোর মর্মবেদনার চলচ্ছবি হয়ে উঠেছে এ বই। মহাজনদের অত্যাচারের বিষয়ে কমিশনারের কাছে লেখা নরসিং মাঝি ও কুদরু মাঝির ১৮৫৪ সালের আবেদনপত্র, যা ছিল সাঁওতাল বিদ্রোহের দাউদাউ দাবানলের আগের প্রথম স্ফুলিঙ্গ তা কি আদৌ ইংরেজদের কাছে কোন গুরুত্ব পেয়েছিল? কেমনই বা ছিল সেই আবেদনপত্রের বয়ান? এসব প্রশ্ন, প্রতিপ্রশ্ন আর তার উত্তর লেখক যুগিয়ে গেছেন নিরন্তর।

ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে লেখক তারিখ ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ সমসাময়িক যেসব দলিল দস্তাবেজের উল্লেখ করেছেন, সাঁওতালদের উপর অত্যাচারের মাত্রা বোঝার জন্য তা যথেষ্ট। আবার অন্যদিকে সিধু, কানু, চাঁদ, ভৈরবদের সঙ্গে দুর্গা মাঝি, মটরু পারগানা, রাম পারগানা, চাম্পাই মাঝি, হাড়মা মাঝি, মুরলি মাঝি, বিজয় মাঝি, গারভু মাঝি, শ্যাম পারগানা প্রমুখ অন্যান্য নেতৃস্থানীয় সাঁওতালদের মাটি কামড়ে পড়ে থাকা লড়াইয়ের ঘাম-রক্তের স্বাদ-গন্ধ তাদের ছোট ছোট হাসি কান্না, দুর্দশা, টেনশন, মানবিক চেতনা সবকিছুই দৃষ্টি নিরপেক্ষ ভাবে ফুটে উঠেছে ‘সামাজিক প্রেক্ষাপটে সাঁওতাল মহাবিদ্রোহ’ নামে বইটিতে। বাদ যায় না সাঁওতালি গানও। গানের কথাতেও কেমন সাঁওতাল সমাজের স্বাধীনতার চেতনা ধরা দেয়ঃ

“… নুরিচ নারাড় গাই কাডা নাচেল লাগিৎ পাচেল  লাগিৎ

সেদায় লেকা বেতাবেতেৎ ঞাম রুয়াড় লাগিৎ

তবে দবোন হুল গেয়া হো”।

… হাল লাঙল গরু মোষের জন্য

আগের মত স্বাধীন জীবনের জন্য

হুল করবোই করবো।

এ তো গেল বিদ্রোহের সময়কালের কথা। এখন কেমন আছে সাবেক সাঁওতাল পরগনা? সেদিনের বিদ্রোহের দিনগুলো পার করে বহু যুগ ধরে বহু পথ ঘুরে আরো বহু বহু পথ পেরিয়ে এসেছি আমরা। মনের দিক থেকে এগোতে পেরেছি কি? স্মৃতিতে, সম্মানে বুকে জড়িয়ে রাখতে পেরেছি কি সেসব অমূল্য ঐতিহাসিক ঐতিহ্য? খোঁজ নেবার জন্য লেখক বেরিয়ে পড়েছিলেন সরোজমিনে সাঁওতাল পরগণা দেখতে, ভাগনাডিহির সেই মাঠটি খুঁজতে, যে মাঠে দাঁড়িয়ে ১৮৫৫ সালে কমপক্ষে দশ হাজার সাঁওতালি মানুষের উপস্থিতিতে সিধু-কানু ডাক দিয়েছিলেন সাঁওতাল হুলের—

সেই মাঠ কি লেখক আদৌ খুঁজে পেলেন? নাকি দেখে এলেন একটু একটু করে জবরদখল হয়ে যাওয়া এক ইতিহাস ক্ষেত্রকে? সবটা বলে দিলে বইটা পড়ার মজাই নষ্ট হয়ে যাবে যে, তাই এটুকু তোলা থাক পাঠকের খুঁজে দেখার জন্য।

বইটা সম্পর্কে এত ভাল ভাল কথা বললাম, সমালোচনা যোগ্য কি কিছুই নেই? আছে তো বটেই, বিশেষ করে আমরা যখন খুঁতখুঁতে বাঙালি। কিন্তু সেসব খুঁত এতটাই নগণ্য যে, সেসব নিয়ে অযথা সময় নষ্ট না করে বইটার স্বাদ উপভোগ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

মন্তব্য তালিকা - “সাঁওতাল মহাবিদ্রোহ – ফিরে দেখা”

    1. ধন্যবাদ। আপনি ইতিহাস তথ্য ও তর্ক ফেসবুক পেজে নজর রাখবেন, ওখানে এই সমস্ত লেখার লিঙ্ক গুলি পেয়ে যাবেন।

  1. এ যেনো ইতিহাসের আর একটা দিক উন্মোচিত হলো। গবেষণাধর্মী লেখার জন্য লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই।