সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ও আর এস এস জন্মকালের শতবর্ষঃ  দুই বিপরীত মেরুর জন্ম ও ফিরে দেখা সেই ক্রান্তিকাল

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ও আর এস এস জন্মকালের শতবর্ষঃ দুই বিপরীত মেরুর জন্ম ও ফিরে দেখা সেই ক্রান্তিকাল

বহ্নিহোত্রী হাজরা

অক্টোবর ৩, ২০২১ ৪১২

আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগে ১৯২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর ভারতের মাটিতে সংগঠিত চেহারায় পা রাখে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা দিবসকে ঘিরে ভিন্নমত এবং মতাদর্শগত বিতর্কে আকাশ বাতাস সরগরম হয়েছে সাম্প্রতিক অতীতেও। কিন্তু সেই বিতর্কে না ঢুকে আজ আমরা নতুন করে আলোচনা করতে বসেছি এই ঘটনার প্রেক্ষাপট নিয়ে, রুশ বিপ্লব কীভাবে বিভিন্ন ধারার স্বাধীনতা সংগ্রামীর মননে নাড়া দিয়েছে এবং কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠবার সূচনা লগ্নেই কিভাবে জন্ম নিচ্ছে আরেকটি বিপরীত ধারা- রাজনৈতিক হিন্দুত্ব।

কমিউনিস্ট গোষ্ঠীগুলি গড়ে ওঠার পূর্বক্ষণঃ

১৯২৫ এর প্রেক্ষাপটকে বুঝতে আমরা চোখ রাখব অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার পরবর্তী দেশের সার্বিক রাজনৈতিক আলোড়ন এবং আন্দোলনের ওঠাপড়ার দিকে। ১৯২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি উত্তর ভারতের গোরক্ষপুর জেলায় চৌরিচৌরার ‘অসহযোগ’ আন্দোলনকারী জনতা একটি থানায় আগুন ধরিয়ে দিলে পুলিশ গুলি চালায়। সেখানে ২৩ জন পুলিশ ও তিনজন আন্দোলনকারী নিহত হন। গান্ধীজীর পরিকল্পিত ‘অহিংস ও অসহযোগ’ আন্দোলন ক্রমেই সহিংস হয়ে ওঠে। চৌরিচৌরার ঘটনার ৮ দিন পর ১২ ফেব্রুয়ারি গান্ধীজী আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। অথচ সেটি ছিল সদ্য সমাপ্ত প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পর্যুদস্ত সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে আঘাত হানার জন্য সবচেয়ে অনুকূল সময়। এই ইতিহাস আমাদের অনেকেরই জানা। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে রাওলাট আইন পাস হলে, ভারতের ভাইসরয় ও ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল ১৯১৯ সালের ৬ এপ্রিল সেই আইন বলবৎ করে। এই আইন বলে ভারতবাসীর উপর দমনমূলক নানা বিধিনিষেধ আরোপিত হয়। সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার লঙ্ঘিত হয়, ন্যূনতম প্রমাণ দাখিল ব্যতিরেকেই সেনা ও পুলিশকে অনুমতি দেওয়া হয় সাধারণ ভারতীয়দের গ্রেফতার, জেল জরিমানা এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করবার। এছাড়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের  ভারতীয় সেনা পাঠানোর একতরফা সিদ্ধান্ত অনেক ভারতবাসীকেই ক্ষুব্ধ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক ছিল ইংরেজদের প্রতিপক্ষ। তুরস্কের সুলতান ছিলেন সমগ্র ইসলামী জগতের কাছে খলিফা। তুরস্ক তথা খলিফা বিরোধী এই যুদ্ধে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লাখ লাখ ভারতীয় মুসলমান সরব হন। প্রতিবাদের উদ্দেশ্যে মুসলমান নেতারা খিলাফত কমিটি গঠন করে তাঁদের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের ঔদাসিন্যের অবসান ঘটাতে সচেষ্ট হন। গান্ধীজী রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে একটি জাতীয় প্রতিবাদ আন্দোলনে নেতা হিসাবে সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে ওঠেন। সকল অফিস ও কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায়। ভারতীয়দের সরকারি স্কুল, পুলিশ বিভাগ, সেনাবাহিনী ও সরকারি চাকরি ত্যাগে উৎসাহিত করা হয়। আইনজ্ঞরা সরকারি আদালত বর্জন করেন। গণ-পরিবহন, ব্রিটিশ দ্রব্যসামগ্রী বিশেষত কাপড় বর্জিত হয়। মওলানা আবুল কালাম আজাদ, মুখতার আহমেদ আনসারী, হাকিম আজমল খান, আব্বাস তয়েবজি, মওলানা মহম্মদ আলি ও মওলানা শওকত আলী প্রমুখ মুসলিম নেতারা গান্ধীকে সমর্থন করেন। ১৯১৯ ও ১৯২০ সালে গান্ধী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। গান্ধীজীও খিলাফত  আন্দোলনকে সমর্থন করেন । অসহযোগ আন্দোলনের শুরুয়াত এভাবেই ঘটে। আপাতভাবে হলেও হিন্দু মুসলিমের মধ্যে একটি ঐক্যের সুর বেজে ওঠে। পরিস্থিতিকে বুঝতে সেই সময়ের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকেও চোখ রাখা খুব প্রয়োজন। প্রথম  বিশ্বযুদ্ধের ফলে অর্থনৈতিক সঙ্কট তখন তুঙ্গে। একদিকে তীব্র মূল্যবৃদ্ধি- নুন বিকোচ্ছিল ১৯১৪-র চারগুণ দামে, কেরোসিন পাওয়া যাচ্ছিল না; ওদিকে হস্তশিল্প, সূচিশিল্পের বিরাট ক্ষতি, মানুষের হাতে আয় তেমন নেই। ১৯১৮-১৯ এ দেশের বেশীরভাগ অংশে খারাপ ফলন, খাদ্যাভাবের পরিস্থিতি, ১৯১৮-১৯-এর ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারী এবং কারিগরদের বেকারি – সব মিলিয়ে সঙ্কট ব্যাপক চেহারা নেয়। যুদ্ধের মধ্যে চাপের পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশরা দেশীয় কিছু পুঁজিপতি গোষ্ঠীকে কিছুটা ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছিল। টাটা এবং বিড়লা শিল্পগোষ্ঠীর উত্থান এই সময়েই। গান্ধীজীকে প্রভূত পৃষ্ঠপোষকতা করে বিড়লা গোষ্ঠী। বোম্বের মিল মালিকরা অসহযোগ আন্দোলনে পৃষ্ঠপোষকতা করেন।

অসহযোগ ও খিলাফৎ আন্দোলন যে দেশজোড়া আলোড়ন তৈরি করেছিল তা অনেক অনেক বছর পর ব্রিটিশ সরকারকে সত্যি নাড়িয়ে দিয়েছিল। একদিকে দলে দলে মুহাজিরিন তরুণ আফগান আমীরের কাছে গিয়েছিল তাঁর সাহায্যে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়বে বলে। অন্যদিকে রুশ বিপ্লবের অভিঘাত ভারতের বুকে বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী ধারার বিপ্লবীদেরও অনেকাংশে প্রভাবিত করেছিল। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করি, ১৯১৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ ১৯২৫ সালেরও অনেক আগে কোলকাতার কলেজ স্কোয়ারে এক বক্তৃতায় প্রখ্যাত জননেতা বিপিন চন্দ্র পাল বললেন -“সারা বিশ্বজুড়ে আজ এক নতুন শক্তি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে তা হল জনগণের শক্তি।” রুশ বিপ্লবের অভিঘাতেই তাঁর এই উক্তি। রুশ বিপ্লবের অভিঘাত ব্রিটিশদের মধ্যে ত্রাসের উদ্রেক করে। তারা অনেকক্ষেত্রে অহেতুক ভয় পেতে থাকে। ১৯২১ সালের যুক্ত প্রদেশের কৃষক আন্দোলনে বলশেভিকবাদের ছায়া খুঁজে পায় ব্রিটিশরা যা আমরা বুঝতে পারি গোয়েন্দা রিপোর্টের বিবরণে। ব্রিটিশদের কমিউনিস্ট ভুত দেখা এমন পর্যায়ে পৌঁছয়, যে তাঁরা গান্ধীর মধ্যেও রুশ বিপ্লবের ভুত দেখতে শুরু করে। তবে ভয়টা পাওয়ার অবকাশ ছিল অন্য ক্ষেত্রে, সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

সেই সময় দিকে দিকে শ্রমিক আন্দোলনও দানা বাঁধতে থাকে। অসহযোগের ডাককে সামনে রেখেও অনেক কারখানায় ধর্মঘট পালন করেন শ্রমিকরা। যদিও গান্ধীজী সচেতনভাবেই শ্রমিক ধর্মঘটকে অসহযোগের আওতার বাইরে রাখতে চেয়েছিলেন। ১৯২১ জুড়ে একটা বছরেই ৩৯৬ টি শ্রমিক ধর্মঘট হয়। এই ধর্মঘটে যুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৬ লক্ষ। জায়গায় জায়গায় সামন্ত বিরোধী কৃষক অস্থিরতা দানা বাঁধতে থাকে। ১৯২১ সালে রাজস্থানের মেবার জ্বলে ওঠে, যা উইলকিনসনের ভাষায় ‘বে আইনের উরবভুমি’তে পরিণত। বিজোলিয়ায় বিজয় সিং পথিক ও মানিকলাল বর্মা একটি শক্তিশালী কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলেন। কিন্তু ১৯২১ এর কংগ্রেসে মেবার সরকারকে তিরস্কার প্রস্তাবে বাধা দেন তৎকালীন কংগ্রেসি হিন্দুত্ববাদী নেতা মদনমোহন মালব্য। বিহারের দ্বারভাঙ্গা, মুজফ্‌ফরপুর, ভাগলপুর, পূর্ণিয়া ও মুঙ্গের জেলায় বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে তীব্র কৃষক আন্দোলন গড়ে ওঠে। রায়বেরেলি, প্রতাপগড়, ফৈজাবাদেও কৃষক আন্দোলন দানা বাঁধে। বহু জায়গায় কৃষকরা গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের সামন্ত-প্রভুদের বিরুদ্ধে লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। নিরস্ত্র আন্দোলনের আওতায় মানুষ আটকে থাকেনি বহু জায়গায়। তাই গান্ধীজী কী ভেবেছেন বা কী করতে চেয়েছেন সেই মাপকাঠিতে দেশজোড়া আন্দোলনের এই পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। সুদূরতম গ্রামে যেখানে গান্ধীকে কেউ কোনদিন দেখেনি, তাঁর বক্তব্য কেউ শোনেনি সেখানেও লোকমুখে গান্ধীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল মিথ। তাই সামন্ত প্রজার বিরুদ্ধে আন্দোলনেও গান্ধীর নামই ব্যবহার করছিলেন কৃষকরা। ব্রিটিশ রাজের পতন আসন্ন এমন একটা গুজবও ছড়িয়ে পড়ে। বহুদিনের অশান্ত মালাবারের মোপলারা জেগে ওঠে নতুন করে। ১৯২০-র মাঞ্জেরি সম্মেলনের পর খিলাফত নেতারা এই আন্দোলন তাঁদের হাতে তুলে নেন। এবার ২০ অগাস্ট পুলিশি সন্ত্রাসকে কেন্দ্র করে ফেটে পড়ে মোপলারা । যদিও হিন্দুদের একাংশের মতে এই আন্দোলন হিন্দু বিরোধী; তবু তাদের অভিযোগ খতিয়ে দেখে সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে দেখা যায় তা অনেকাংশেই সঠিক না। জনৈক হিন্দু ভুস্বামীর নথি পুড়িয়ে দেওয়া ছিল বিদ্রোহীদের মূল উদ্দেশ্য। এটা ঠিক যে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই মুসলমান কৃষক এবং তাঁরা ক্ষেপে ওঠেন হিন্দু জমিদারের বিরুদ্ধে। এই ঘটনা ভীষণভাবেই তাৎপর্যপূর্ণ কারণ অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার হতেই দিকে দিকে উত্তপ্ত দাঙ্গা পরিস্থিতি তৈরি হয়। অনেকক্ষেত্রে মুসলমান কৃষকরা বা নিম্নবর্গের মানুষ মনে করেন তাঁদের ঠকানো হয়েছে। অন্যদিকে খিলাফত নেতাদের সঙ্গে যৌথভাবে আন্দোলনের ডাক দেবার সিদ্ধান্তকে ভালোভাবে দেখেননি মদনমোহন মালব্য, লালা লাজপত রায়ের মতো হিন্দুত্ববাদী নেতারা। তাঁদের অনেকেই তখন কংগ্রেসের মধ্যেই সক্রিয়।  অসহযোগ আন্দোলনের সাফল্য ও লক্ষ লক্ষ ভারতীয়ের এই আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পর্যুদস্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে সন্ত্রস্ত করে তোলে। অসহযোগ ও খিলাফতের যুগ্ম আন্দোলনের ব্যর্থতা দেশীয় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মিলনে ছেদ ঘটায়। শুধু তাই নয় দেশ জোড়া এই আলোড়ন থমকে গিয়ে সাম্প্রদায়িক ফাটলকে আরও গভীর করে। বিভিন্ন অঞ্চলে শুরু হয় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা।

রুশ বিপ্লবের প্রভাব, ভারতে কমিউনিস্ট ধারার উদ্ভবঃ

১৯১৭ সালের নভেম্বরে সংঘটিত হল রুশ দেশের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। এর অভিঘাতে ভারতের বিপ্লবীদের সামনে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করার এক নতুন রাস্তা খুলে গেল। নভেম্বর বিপ্লবের এই আলোড়ন নিয়ে আলোচনায় ঢোকার আগে অন্য একটি ঘটনার উল্লেখ করব। জমিটা উর্বরই ছিল, কেবল প্রয়োজন ছিল আবাদ করার। আমরা অনেকেই হয়ত জানি না, ১৮৭১ সালে জনৈক কলকাতাবাসী প্রথম আন্তর্জাতিকের কাছে শাখা সংগঠন খোলার অনুমতি চেয়ে চিঠি পাঠান। সেই চিঠি নিয়ে আলোচনা হয় আন্তর্জাতিকের সভায়, আর উত্তরও আসে। মার্ক্স এর প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্ত করেন-“…এটা অনুভব করা গেল যে, ঐ দেশে (ভারতবর্ষে) আন্তর্জাতিক সংস্থা নবযুগ প্রতিষ্ঠা করবে।” কে সেই কলকাতা নিবাসী, তা গবেষকরা আজও খুঁজে পাননি। মনন গড়ে উঠছিল ধীরে ধীরে, আর তাতে ফল্গুধারার মতো আলোড়ন তুলল রুশ বিপ্লবকে ঘিরে আবেগ। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের যে ধারাগুলির মধ্যে থেকে গড়ে উঠেছিল কমিউনিস্ট পার্টি, তাকে প্রধান ৪টি ধারায় ভাগ করা যায়। যেমন ১) প্রবাসী বিপ্লবীদের একটি অংশ যারা বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে বিদেশের মাটিতে থেকে দেশের মুক্তির জন্য কাজ করে যাচ্ছিলেন। যাঁদের মধ্যে অনেকেই স্বাধীনতার লড়াইয়ের জন্যও প্রয়োজনীয় অস্ত্র এবং অর্থ সাহায্য যোগাড় করতেই বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন। এই বিপ্লবীরা মূলত কাজ করছিলেন জার্মানি, তুরস্ক, আফগানিস্তান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। জার্মানিতে এই বিপ্লবীরা বার্লিন কমিটি গড়ে তোলেন, যার সম্পাদক হন বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং পরে ভুপেন্দ্রনাথ দত্ত। এছাড়াও প্রথম দিকের উল্লেখযোগ্য কমিউনিস্ট নেতা নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বা এম. এন. রায় ছিলেন প্রবাসী বিপ্লবী। তিনি প্রথমজীবনে ছিলেন অনুশীলন সমিতির কর্মী এবং পরে বাঘাযতীনের নেতৃত্বে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক কাজকর্মে যুক্ত ছিলেন। অস্ত্রের সন্ধানেই প্রথমে বিদেশে পাড়ি দেন তিনি।

২) প্যান ইসলামিক খিলাফত আন্দোলনের প্রভাবে জাতীয় বিপ্লবীদের একাংশ যুদ্ধের সময় দেশের বাইরে চলে যান এবং বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পর্যায়ে হিজরত আন্দোলনে যোগ দেন। ১৮০০০ মুসলমান যুবক এইভাবে আফগানিস্তানে চলে যান। এঁরা তুর্কিতে গিয়ে তুর্কিদের হয়ে লড়ার পরিকল্পনা করেন। তুর্কিদের বিরুদ্ধ গোষ্ঠী তুর্কোমেনদের পিছনে টাকা ঢালত ইংরেজরা। মুহাজিরিন বা হিজরতকারীরা অনেকেই বয়সে তরুণ।  হিন্দুকুশ পাহাড় পেরিয়ে তিরমিজ পৌঁছনোর পর আমুদরিয়ার জলপথে এগোনোর সময়ে তুর্কোমেনদের দ্বারা আক্রান্ত হন তাঁরা। সেই সময় লাল ফৌজ এসে পড়ায় তাঁরা প্রাণে বাঁচেন এবং লাল ফৌজের সঙ্গে একসাথে লড়াই করেন। এঁদেরই একটা বড় অংশ রুশ বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত হন এবং কমিউনিজম গ্রহণ করেন। মহম্মদ আলী, রফিক আহমেদ এই ধারার উল্লেখযোগ্য নেতৃত্ব।

৩) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেই পাঞ্জাব এবং আজকের হরিয়ানা অঞ্চল থেকে বহু মানুষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পানামা ইত্যাদি অঞ্চলে কাজের সন্ধানে গিয়েছিলেন। এঁরা সেখানে গড়ে তোলেন গদর পার্টি। এঁদের মধ্যেকার একদল বিপ্লবী কোমাগাতামারু নামে একটি জাহাজ ভাড়া করে বজবজের বন্দরে নোঙ্গর করেন। তারপরের ইতিহাস অনেকেরই জানা। লড়াকু এই বিপ্লবী দল দেখিয়ে দেয় ব্রিটিশদের চোখে চোখ রেখে লড়ার হিম্মত রাখে আমাদের দেশের মানুষ। ঘটে গেল এক ব্যর্থ অভ্যুত্থান, বহু শিখ মারা গেলেন, অনেকেই নিখোঁজ। যাইহোক, বলতে চাইছিলাম গদর বিপ্লবী ধারা নিয়ে। পরবর্তীকালে দেখা যায় এই গদর বিপ্লবীদের বড় অংশ আকৃষ্ট হন মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের প্রতি। তাঁদের মধ্যে অনেকে দেশে ফিরে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার কাজে হাত লাগান। প্রথম দিককার কমিউনিস্ট নেতৃত্ব হিসেবে রতন সিং, বাবা সন্তোখ সিং, বাবা গুরমুখ সিং এবং সোহন সিং ভাকনার নাম উল্লেখযোগ্য।

৪) এগুলি ছাড়া চতুর্থ একটি ধারাও এসে মেলে যার কথা উল্লেখ না করা অন্যায়। সেটা হল জাতীয় বিপ্লবীদের ধারা। জাতীয় বিপ্লবী বলতে জাতীয় কংগ্রেসের বামপন্থী অংশ, বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী সংগঠন, খিলাফত এবং আকালী আন্দোলনের বাম ঘেঁষা অংশ ইত্যাদি সবাইকেই ধরতে হবে। এই ধারার মধ্যে সেসময় বাংলায় সক্রিয় ছিল দুটো বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী- অনুশীলন এবং যুগান্তর। এই দুটি গোষ্ঠী থেকে বহু বিপ্লবী কমিউনিস্ট মতবাদের দিকে ঝুঁকেছেন।

এই চার ধারার পাশাপাশি শ্রমিক আন্দোলনের একটি ধারা ধীরে ধীরে বিকশিত হচ্ছিল যা সমাজতন্ত্রের বীজ বপন করতে এবং আন্দোলন গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। ১৯২০ সালের অক্টোবর মাসে শ্রমিক সংগঠন এ. আই. টি. ইউ. সি. গড়ে ওঠে। গোড়ার দিকের শ্রমিক আন্দোলন প্রসঙ্গে উল্লেখ করব একটি ঘটনা। ১৯০৮ সালে বাংলার সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের দুই বিপ্লবী ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকির আত্মবলিদানের ওপর বাল গঙ্গাধর তিলক “কেশরী” পত্রিকায় যে সমস্ত প্রবন্ধ লিখেছিলেন, তাতে ব্রিটিশ শাসক পাঠক মহলের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে  তিলককে ছ’ বছরের কারাদণ্ড দেয়। এই প্রেক্ষিতে টানা ৬ দিন ধর্মঘট করেন বোম্বের শ্রমিকরা। লেনিন তাঁর “বিশ্ব রাজনীতিতে দাহ্য পদার্থ” প্রবন্ধে এই বিষয়টি আলোচনা করেন। নিঃসন্দেহে এই ঘটনা শ্রমিক শ্রেণীর শক্তি এবং সচেতনতার একটি দৃষ্টান্ত। তবে রুশ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে শ্রমিক শ্রেণীর শ্রেণী সচেতন সংগ্রামী মানসিকতা পরিপূর্ণতা পেল। পরিণতিতে গড়ে উঠেছিল এ. আই. টি. ইউ. সি.। তবে এ. আই. টি. ইউ. সি.-র সম্মেলনে শ্রমিক প্রতিনিধিরা থাকলেও প্রাধান্য ছিল কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ এবং ধনী শ্রেণীর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী বছরগুলোয় বোম্বে, চেন্নাই ইত্যাদি অঞ্চলে মুহুর্মুহু শ্রমিক ধর্মঘট হয়। ১৯২১-এই ৩৯৬ টি শ্রমিক ধর্মঘট হয় দেশজুড়ে। কোলকাতার চটকলগুলোয় ১৩৭ টি ধর্মঘট হয়। ভারতে প্রথম মে দিবস উদযাপিত হয় ১৯২৩ সালে। সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ার যিনি পরবর্তীতে ১৯২৫-এর কানপুর সম্মেলনের সভাপতি হন, তিনিই একক উদ্যোগে মাদ্রাজের সমুদ্র উপকূলে আয়োজিত একটি সভায় নিজের মেয়ের লাল শাড়ি ছিঁড়ে লাল পতাকা উত্তোলন করে মে দিবস উদযাপন করেন।

চার জায়গায় কমিউনিস্টমণ্ডলীঃ

কমিউনিস্ট মণ্ডলী গড়ে উঠেছিল প্রথম চারটি জায়গায়- কলকাতা, বোম্বে, লাহোর এবং মাদ্রাজে। ভারতবর্ষ বিশাল দেশ, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গার দূরত্ব হাজার হাজার মাইল। মণ্ডলীগুলি ছিল আঞ্চলিক। অর্থাৎ আলাদা আলাদা ভাবেই কাজ করছিল। বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপগুলির মাঝে কেন্দ্র হিসাবে কাজ করছিল তখন তৃতীয় কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশানাল। প্রত্যেকটি গোষ্ঠী আলাদা আলাদা ভাবে যোগাযোগ রাখত কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশানালের সঙ্গে।

বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে উঠছিল মুজফ্‌ফর আহমেদকে ঘিরে। বাংলার শ্রমিক ধর্মঘটের একটা প্রভাব পড়েছিল তাঁর ওপর এবং ‘নবযুগ’ পত্রিকা পরিচালনার মধ্যে দিয়েও শ্রমিকদের সমস্যা নিয়ে গভীরভাবে ভাবা শুরু করেন তিনি। কংগ্রেসের মধ্যে থাকা বামপন্থী হিসেবে পরিচিত বাংলার নেতা ফজলুল হক পৃষ্ঠপোষকতা করতেন এই পত্রিকার। সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় উজ্জীবিত বাংলার দুটি পত্রিকার নাম এই অনুসঙ্গে না বললে অন্যায় হবে। রুশ বিপ্লবের আবেগে যখন বাংলার বুদ্ধিজীবী মহল বেশ আলোড়িত, সেই সময়ের জনপ্রিয় দুটি কাগজ “লাঙ্গল” আর “গণবাণী”-কে কমিউনিস্ট-দের পত্রিকা বলা চলে। লাঙ্গলের প্রধান পরিচালক ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম আর সম্পাদক মনিভূষণ মুখোপাধ্যায়। অল্প কিছুদিনের মধ্যে “লাঙ্গল” মিশে যায় গণবাণীর সঙ্গে। গণবাণীর সম্পাদক ছিলেন মুজফ্‌ফর আহমেদ। এরও আগে ১৯২৩ সাল নাগাদ প্রকাশিত হত সাপ্তাহিক “ধূমকেতু”। পত্রিকার সামনে লেখা থাকত- সারথিঃ নজরুল ইসলাম; মাথায় রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদবাণী-‘আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু’। সরকারী গোপন রিপোর্টে ধূমকেতু সম্পর্কে লেখা হয়েছে-“এই ধরনের কাগজের প্রধান কাজ হল শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করা ও শ্রমিকদের সংগঠন করা এবং সাম্রাজ্যবাদ ও ধনতন্ত্রের বিরোধিতা করা (সার্কুলার, ১৭ মে, ১৯২৩)। এভাবেই সেজে উঠেছিল তখন বাংলার মনন। কোলকাতার নাবিকদের মধ্যে যাতায়াত ছিল মুজফ্‌ফর আহমেদের, যা তাঁকে শ্রেণী সচেতন হয়ে উঠতে বিশেষ ভাবে সাহায্য করে। প্রাথমিক পর্যায় লেখালিখি, সাহিত্য এবং সাংবাদিকতার জগতে যদিও শুরুটা মুজফ্‌ফর আহমেদের হয় ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’-র সহকারী সম্পাদক হিসেবে। ১৯২২ সালের শুরুর দিকে মুজফ্‌ফর আহমেদ সাথে পান কমরেড আব্দুল রজ্জাক খান এবং কমরেড আব্দুল হালিমকে এবং তাঁরাও সংগঠন গড়ে তোলার কাজে হাত লাগান। কোলকাতার বুকে শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করার কিছু চেষ্টা থাকলেও তা প্রয়োজনের চেয়ে অনেক দুর্বল। এই ব্যাপারে মুজফ্‌ফর আহমেদ নিজেও স্বীকার করেছেন “ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার প্রথম যুগ” বইতে।

বোম্বের কথা বললে ঘুরে ফিরে একজনের কথা আসবে – কমরেড শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে। কলেজে ছাত্রাবস্থায় জঙ্গি আন্দোলন করে কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন তিনি। অনেক আশা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে। তবে গান্ধীজীর আদর্শে বিশ্বাস রাখতে পারেননি বেশিদিন। ১৯২১ সালে তাঁর ‘গান্ধী বনাম লেনিন’ লেখাটি পাঠক মহলে আলোড়ন তোলে। সে যুগে গান্ধীবাদের বিরুদ্ধে কলম ধরতে যথেষ্ট সাহস এবং দৃঢ়তার প্রয়োজন হতো। ১৯২২ সালে “সোশ্যালিস্ট” নামে একটি ইংরাজি সাপ্তাহিকও প্রকাশ করতেন ডাঙ্গে। ভারতে এই নামে এটাই প্রথম পত্রিকা। এই পত্রিকা মারফৎ বেশ কিছু তরুণ বুদ্ধিজীবী মার্ক্সবাদের প্রতি আকৃষ্ট হলেন। তাঁদেরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম সচ্চিদানন্দ ঘাটে- যিনি পরবর্তীকালে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব হিসেবে উঠে আসেন।

লাহোরে কাজ করছিলেন গোলাম হোসায়েন। তিনি একটি সরকারী কলেজের ইকনমিক্সের অধ্যাপক ছিলেন। খুশী মহম্মদ ওরফে মহম্মদ আলী ছিলেন ওঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। খুশী মহম্মদ সম্পর্কে দু-চার কথা বলে নিই এখানে। আফগানিস্তানের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেন যে মুজাহিদরা তাঁদের মধ্যে ছিলেন আলী। তিনি পরবর্তীকালে রুশ বিপ্লব দ্বারা অনুপ্রাণিত হন, সোভিয়েত সামরিক স্কুলে শিক্ষাও নেন এবং প্রবাসে গঠিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। তিনি কাবুলে এসে বন্ধুকে ডেকে পাঠালেন পেশোয়ার থেকে। দুই বন্ধুতে আলোচনা-পরামর্শ করলেন। তারপর চাকরি ছেড়ে লাহোর চলে আসেন গোলাম হোসেন। কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার কাজে হাত লাগান। “ইনকিলাব” নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হত গোলাম হোসেনের সম্পাদনায়। রেলওয়ে শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করছিলেন উনি। নর্থ ওয়েস্টার্ন রেলওয়ে ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সম্পাদক হন।

১৯২২ সালে মাদ্রাজের প্রবীণ উকিল সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ার কমিউনিস্ট বলে নিজেকে ঘোষণা করলেন। কংগ্রেসের গোয়া অধিবেশনে (১৯২২) তিনিই পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব তুলেছেন। কমিউনিস্টদের তরফে ১৯২১-এ আহমেদাবাদ কংগ্রেসে লিখিত বিবৃতি পাঠিয়ে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবী তোলা থেকে শুরু করে গোয়া কংগ্রেসে সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ারের এই প্রস্তাব উত্থাপন খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তখনও পর্যন্ত কংগ্রেস শুধুমাত্র স্বরাজের দাবীতে আটকে ছিল। দৃঢ়তার সঙ্গে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবী বিবৃতি আকারে প্রথম পেশ করে কমিউনিস্টরাই। সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ার বেশ কয়েকবার শ্রমিক ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করে কারাবরণ করেছিলেন।

কানপুর সম্মেলনঃ

ব্রিটিশদের কমিউনিস্ট ভূত দেখার প্রবণতার কথা তো আগেই বলেছি। কমিউনিস্ট মতবাদের সঙ্গে শ্রমিকদের একাত্ম হওয়ার সুযোগ না দিতে তারা প্রথম থেকেই বদ্ধপরিকর ছিল। বিভিন্ন প্রদেশে যে কমিউনিস্ট নেতৃত্ব কাজ করছিলেন তাঁদের ১৯২৩ সালের মে মাসে গ্রেপ্তার করে কানপুরে নিয়ে আসা হয়। এই মামলাই কানপুর ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবে পরবর্তীতে আলোচিত হয়। সেই সময় কমিউনিস্ট নেতৃত্বের অনেকের মধ্যেই সর্বভারতীয় পার্টি তৈরির ভাবনা দানা বাঁধে। যদিও কানপুরের সম্মেলনের ডাক তাঁরা দেননি। দিয়েছেন অন্য এক ব্যক্তি — নাম সত্যভক্ত। সেই প্রসঙ্গে ঢুকছি তার আগে কমিউনিস্ট নেতা শ্রী ঘাটের একটি বক্তব্যের অংশ দেখে নিই-“কানপুর ষড়যন্ত্র মামলার পর আমরা সমাজবাদী মণ্ডলীর কর্মীরা শ্রমিকশ্রেণীর একটি পার্টি গঠনের কথা ভাবিতেছিলাম। এমন সময় দৈনিক সংবাদপত্রে কানপুরে দেশের সকল কমিউনিস্ট কর্মীর একটি সম্মেলনের বিজ্ঞপ্তি দেখা গেল। এই সম্মেলন ১৯২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতীয় কংগ্রেসের কানপুর অধিবেশনের সময়ই অনুষ্ঠিত।” তা এই সংবাদপত্রে বিবৃতি দিয়ে কমিউনিস্ট নেতাদের সম্মেলনে যিনি ডাকলেন তিনি কে? তাঁকে ঘিরে এত রহস্যই বা কিসের? খটকা লাগার সামান্য হলেও অবকাশ রয়েছে। আমরা জানি এর বেশ আগেই লেনিনের কলোনিয়াল থিসিস গৃহীত হয়েছে আন্তর্জাতিকে। আন্তর্জাতিকের সঙ্গে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ  সম্পর্ক রেখে এদেশে কাজ করছিলেন কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা। বিভিন্ন প্রদেশে কমিউনিস্ট কর্মীরা সক্রিয় থাকলেও কোনও সর্বভারতীয় পার্টি গড়ার কথা ভাবেননি তাঁরা। হঠাৎই এমন একজন সম্মেলন ডাকলেন যার সঙ্গে দূর দূর থেকেও কমিউনিস্ট কার্যকলাপের কোনও সম্পর্ক ছিল না। মুজফফর আহমেদ তাঁর লেখা “ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার প্রথম যুগ” বইতে লিখেছেন-“কানপুরের মোকদ্দমা (কানপুর ষড়যন্ত্র মামলা) চলার সময় মাঝে মাঝে দর্শকদের আসনে একজন লোক এসে বসতেন। তাঁর নাম ছিল সত্যভক্ত। এটা কিন্তু তাঁর মা বাবার দেওয়া নাম ছিল না। গান্ধীজীর সবরমতী আশ্রমে তিনি এই নাম গ্রহণ করেন। সেখানে সত্যের পরীক্ষা নিরীক্ষা চলত কিনা।”  অর্থাৎ সত্যভক্তের উত্থান সরবমতী আশ্রম থেকে। সত্যভক্ত ছিলেন রাজস্থানের ভরতপুরের অধিবাসী। উত্তরপ্রদেশে জাতীয় কংগ্রেস কর্মী হিসেবে কাজ করছিলেন। ঐতিহাসিক সুপ্রকাশ রায় তাঁকে সরাসরি গান্ধীজীর ‘দালাল’ হিসেবে দেখেছেন এবং বলতে চেয়েছেন গান্ধীজীর পরিকল্পনার অঙ্গ এই সম্মেলন। সুপ্রকাশ রায় মনে করেছেন গান্ধী কমিউনিস্ট উত্থানে ভয় পেয়েই আগাম এই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছেন এই আলোড়নকে একটি গণ্ডিতে বেঁধে ফেলা এবং কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশানাল সহ বিশ্বের অন্যান্য কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে জাতীয়তার মোড়কে গোটাটা বেঁধে রাখার জন্যে। যদিও তথ্যের ভাঁড়ারে এতটা ভেবে নেবার সপক্ষে তেমন যুক্তি নেই তবু এই সত্যভক্তের উত্থান খানিক রহস্যের তো বটেই। তবে ভারতের মাটিতে সংগঠিত চেহারায় কমিউনিস্ট পার্টির আত্মপ্রকাশের সঙ্গে তাঁর নাম যেভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে, তাঁকে নিয়ে আলোচনা হতে বাধ্য।  সম্মেলনে বারে বারে ঘুরে ফিরে উঠে এসেছে একটি দ্বন্দ্ব- পার্টির চরিত্র কেমন হবে?  তা হবে জাতীয় চরিত্রের নাকি আন্তর্জাতিকের অঙ্গ হবে ভারতের পার্টি। এই দ্বন্দ্বরই সূত্র ধরে নাম নিয়ে বিস্তর জলঘোলা। পার্টির নাম ‘ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’ হবে নাকি ‘ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি’?  ‘ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি’ নামটি সত্যভক্তই প্রস্তাব করেন। তাঁর জোর স্বভাবতই ছিল জাতীয়তার দিকে, কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক-এর সঙ্গে কোনরকম সংযোগ রাখার বিরোধী তিনি। তবে এক্ষেত্রে বলি জাতীয়তা বনাম আন্তর্জাতিকতার বিরোধ কিন্তু তাঁর একার নয়। দেখে নিই সভাপতি সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ার বক্তব্য-

“ভারতীয় কমিউনিজম আর রাশিয়ার বলশেভিকবাদ এক নয়। কারণ রাশিয়ার জনগণ তাহাদের উপযোগী যে ধরনের সাম্যবাদকে গ্রহণ করে তাহাই বলশেভিকবাদ কিংবা কোন বলশেভিকের প্রয়োজন আছে বলিয়া আমি মনে করি না। …আমরা সমগ্র বিশ্বের কমিউনিস্টদের সহিত একমত আছি, কিন্তু বলশেভিকদের সহিত আমাদের কোনও সম্পর্ক নাই।”

সম্মেলনে ৩০ জনকে নিয়ে কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সম্পাদক হন এস. ভি. ঘাটে। পার্টি প্রতিষ্ঠা দিবস নিয়ে ১৯৬৪ সালের পর দুটো মতের মধ্যে প্রবল দ্বন্দ্ব দেখা যায়। সি. পি. আই. (এম.), ১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবরকে পার্টির প্রতিষ্ঠা দিবস ঘোষণা করে। অর্থাৎ তাসখন্দে যে পার্টি তৈরি হয়েছিল তাকেই গুরুত্ব দেয়। ভিন্ন মত থাকা সত্ত্বেও এ কথা অনস্বীকার্য যে ভারতের মাটিতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিকাশের কথা মাথায় রেখে কানপুর সম্মেলনের গুরুত্ব অপরিসীম। মুজফফর আহমেদ তাঁর বই “ভারতের  কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার প্রথম যুগ”-এ লিখছেন- “বিভিন্ন স্থানে কমিউনিস্টদের সংহত করে কানপুরের কনফারেন্সেই আমরা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি প্রথম গঠন করলাম।”

সম্মেলন শেষ হবার চার দিন পর শুধু কেন্দ্রীয় কমিটি থেকেই নয় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি থেকেই পদত্যাগ করতে চেয়ে চিঠি পাঠালেন সত্যভক্ত। এই আলোচনায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সত্যভক্তের এই শেষ সংযোগটুকুর কথা না বললেই নয়। পরবর্তীকালে হিন্দু মহাসভায় যোগ দেন সত্যভক্ত।

ধর্মের প্রশ্নে তৎকালীন বিভিন্ন কমিউনিস্ট নেতাদের অবস্থানঃ

ধর্ম নিয়ে বামপন্থী-কমিউনিস্টদের অবস্থান কি? মার্ক্স ধর্মের ব্যাপারে কি ধারণা পোষণ করেন? এই ব্যাপারটা নিয়ে একধরনের ধোঁয়াশা ও ভুল ধারণা সবসময়ই রয়ে গেছে। মার্কসের বহুল প্রচারিত “ধর্ম জনগণের জন্য আফিম স্বরূপ”- এই উদ্ধৃতিটি খণ্ডিত ভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে অনেক ধোঁয়াশাপূর্ণ ধারণা তৈরি হয়ে রয়েছে সমাজে। অনেক সময় সাধারণভাবে বামপন্থী-কমিউনিস্টদের ‘নাস্তিক’ মনে করা হয়।

বারেবারেই প্রবাদপ্রতিম কমিউনিস্ট নেতা এম. এন. রায় সহ অনেকেরই বক্তব্যে দেখা গেছে যে সাম্প্রদায়িকতার অ্যাজেন্ডাকে তাঁরা বুর্জোয়াদের বা ভারতের প্রেক্ষিতে সাম্রাজ্যবাদীদের অ্যাজেন্ডা হিসেবে দেখেছেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে এলিটশ্রেণীর ইন্ধনে ঘটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখেছেন। কথাটা অনেকাংশে সঠিকও বটে। তবু এই দাঙ্গার ক্ষেত্রে বা সাম্প্রদায়িকতার বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে অনেকক্ষেত্রেই ব্যাপক জনগণেরও অংশগ্রহণ করার ব্যাপারটা চোখে পড়ে এবং ঠিক তা উড়িয়ে দেওয়াও যায় না। যদিও ইন্ধন এলিট অংশ এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সচেতন ঠিকেদারদের তরফ থেকেই আসে বারে বারে। প্রশ্ন হল সাধারণ মানুষ, এমনকি শ্রমিক শ্রেণীও এতে অংশগ্রহণ করছেন কেন? সময়টা ছিল এমন যে সবেমাত্র অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন গান্ধীজী। অসহযোগ আর খিলাফৎ আন্দোলনের দাবীকে জুড়ে দেশজোড়া ডাক দেওয়া এবং হিন্দু-মুসলিম আপাত ঐক্যের সুর প্রথম থেকেই ভাল চোখে দেখছিলেন না মদনমোহন মালব্যের মতো তৎকালীন হিন্দুত্ববাদী নেতাদের অনেকে। ওদিকে আন্দোলন প্রত্যাহারের পর মুসলমানদের বড় অংশ মনে করেছেন তাঁরা প্রতারিত হয়েছেন এই গোটা প্রক্রিয়ায়। নিম্নবর্গের মুসলমানরা বহু জায়গায় আঞ্চলিকভাবে হিন্দু-এলিটদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। সার্বিকভাবে বিভাজন রেখা আরও গভীর হয়েছে সাময়িকভাবে,  যে সেতু বন্ধন করা হয়েছিল তার তলায় তলায়। এই প্রেক্ষিত নিয়ে আগেও আলোচনা করেছি। এরকম একটা পরিস্থিতিতে ১৯২৩ এর অক্টোবরে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য প্রসঙ্গে ম্যানিফেস্টোতে লেখা হচ্ছে-“The consciousness of [their] union is interfered with by large doses of conflicting religious dogma administered by method of exploitation of the ignorant masses by able doctors of divinity.” পরিষ্কার ভাবেই এই অবস্থান সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী। তখনও কংগ্রেসের মতো সংগঠনে উল্লেখযোগ্য পদে থাকছেন একাধিক হিন্দু মহাসভার নেতা। সেই সময় দাঁড়িয়ে কমিউনিস্ট পার্টির দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল সাম্প্রদায়িক সংগঠনের সদস্যদের জন্য। এই অবস্থান নিঃসন্দেহে ধর্ম নিরপেক্ষ অবস্থান। কিন্তু এরই মাঝে খটকা লাগার মতো কিছু বক্তব্য এবং অবস্থান একটা প্রশ্ন উস্কে দেয়। কমিউনিস্ট নেতারা এতদিনকার অভ্যস্ত রাজনৈতিক ধারার রেশ থেকে কি মুক্ত হতে পেরেছিলেন- ধর্ম, সংস্কৃতি এবং জাতীয়তার প্রশ্নে? এই প্রশ্ন কেন করছি বুঝতে আমরা প্রথমে একজন উল্লেখযোগ্য নেতার কমিউনিস্ট হওয়ার আগের রাজনৈতিক ধারা থেকে গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার দিকে চোখ রাখব। এম. এন. রায়ের কথা আলোচনা করবো এখন। তিনি ২৪ পরগণা জেলার এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মান। বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট থেকে স্নাতক হন এবং সেই সময়ই তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। গণ আন্দোলনের চেয়ে সশস্ত্র বিপ্লবের ধারা তাঁকে বেশী আকর্ষিত করেছিল। তিনি যোগ দিয়েছিলেন অনুশীলন সমিতিতে এবং বিপ্লবী বাঘাযতীনের সঙ্গেও কিছুদিন কাজ করেছিলেন। এখানে বাংলার অনুশীলন-যুগান্তরের ধারা এবং সারা দেশের প্রেক্ষিতে সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবী ধারা প্রসঙ্গে কয়েকটা কথা বলা যেতে পারে। দমকা হাওয়ার মতো বিপ্লবী উদ্দীপনা এনে দেওয়া স্লোগান “বন্দেমাতরম’ এক ধরণের ধর্মীয় আবেগ উস্কে দেয়, যেখানে জন্মভূমিকে মাতৃদেবতা হিসেবে কল্পনা করা হয়। যে জাতীয়তাবাদী ভাব, শব্দবন্ধ বিপ্লবীদের মুখে মুখে ফিরত তা অনেকাংশেই হিন্দু সংস্কৃতির আওতায় থাকা একটা জাতীয়তার আবেগ। এই আবেগকে অরবিন্দ ঘোষ থেকে বাল গঙ্গাধর তিলক প্রত্যেকেই লালন-পালন করেছেন এবং মিশিয়ে দিয়েছেন বিপ্লবী ধারার মধ্যে। এ প্রসঙ্গে ডেট্রিক রিটজ বলেছেন-” It was the system of intellectual and social norms within a particular religion rather than the belief in God that became the bedrock of infant nationalism. The protagonist were mostly Hindus motivated by a mixture of (Bengali) nationalist feelings and apprehensions about loosing ‘their’ Bengal to muslims, who formed majority in the eastern part, Aurobindo Ghosh in Bengal and Bal Gangadhar Tilak in Maharashtra were the movement’s most vociferous proponents. It was particularly the latter who would attain a place of honor in Communist historiography.” এম. এন. রায়ের ধারাবাহিকভাবে দুর্বলতা থেকেছে তাঁর ছেড়ে আসা অনুশীলন-যুগান্তরের বিপ্লবী ধারার প্রতি। তাঁর জীবনীকার শিবনারায়ন রায় লিখেছেন তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস প্রসঙ্গে- “…a brahmachari whose devotion as a sakta to the mother goddess had been reinforced and politicized by his devotion to motherland.”  কোনও ব্যক্তিকে নিয়ে কাটাছেঁড়া করা কিন্তু আমার এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। সেই সময়ের কমিউনিস্ট নেতৃত্বের মধ্যে থাকা ঝোঁকগুলোকে খুঁজে বের করতেই এই প্রসঙ্গের অবতারণা। দুর্বলতা শুধু এম. এন. রায়ের একার ছিল না। তিলক সম্পর্কে বলতে গিয়ে অনেক কমিউনিস্ট নেতা আবেগঘন হয়ে পড়েছেন, কেউ কেউ কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বলেছেন, সেই সময় নাস্তিক্যের কথা তো ভাবাই যেত না, ফলে ধর্মের প্রশ্নে এই ঝোঁক থাকা খুবই সঙ্গত। কয়েকটি উদ্ধৃতি দেব এই নিয়ে। কমিউনিস্ট পার্টির স্বনামধন্য তাত্ত্বিক গঙ্গাধর অধিকারী লিখছেন- “Tilak’s valuable ideas had drawn the ordinary class into a mass movement whose outlook seemed of little interest to him. He revered Tilak as a fighter and a saviour.” বি. টি. রনদিভেরও তিলকের প্রতি যথেষ্ট সম্ভ্রমের ভাব ছিল। ডাঙ্গে কৈফিয়তের ঢঙ্গে বলেছেন- “Naturally in those days [..] there was no question of being an atheist or anything.” এমনকি হিন্দু মহাসভার নেতা লালা লাজপত রায়ের ক্ষেত্রেও একই অবস্থান নিয়েছেন কমিউনিস্ট নেতৃত্বের এক অংশ। টি. ভি. পারভাতের মতো উল্লেখযোগ্য কমিউনিস্ট ব্যক্তিত্ব চিঠি পাঠাচ্ছেন “সোশ্যালিস্ট” পত্রিকার সম্পাদকের কাছে  সোশ্যালিস্ট লিগের সভাপতি হিসেবে লালা লাজপত রায়ের নাম প্রস্তাব করে।    কয়েনের অপর পিঠের দিকেও দেখা দরকার। মৌলানা হসরত মোহানীর মতো কমিউনিস্ট নেতৃত্ব তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে ইসলামের সঙ্গে সাযুজ্য টানছেন কমিউনিজমের। তিনি এক জায়গায় বলেছেন- “কোরানে একমাত্র প্রার্থনার পরেই জোর দেওয়া হয়েছে জাকৎ -এর উপরে আর প্রথম খলিফা নির্দেশ করার একমাত্র কারণ হল এই যে সুদখোর আসলে কোনও কাজ না করে তাঁর পুঁজি খাটিয়েই মুনাফা করে- এটা যেমন কমিউনিজমের তেমনই ইসলামের নীতিরও বিরোধী।” মুজফ্‌ফর আহমেদের মতো নেতারও আবার মৌলবাদী ইসলামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল একথা বলেছেন প্যাট্রিক হেসের মতো ঐতিহাসিক। ধর্মের প্রশ্নে এই আপোষকামী ঝোঁকের সঙ্গে সঙ্গে অনেকক্ষেত্রে আবার দেখা গেছে অদ্ভুত নির্লিপ্ততা এবং সাম্প্রদায়িকতার সমস্যাকে লঘু করে দেখার প্রবণতা। এম. এন. রায় এক জায়গায় বলেছেন-“The inevitable and inexorable development of nationalism on purely secular lines would by itself obliterate communalism and revolutionary nationalism even was the deadly enemy of communalism.”(“Unity”, Vanguard, 15 November 1924). উপমহাদেশের ভিতরে এবং বাইরে কর্মরত জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীরা যেখানে বারে বারেই ধর্মীয় এবং এমনকি সাম্প্রদায়িক এজেন্ডাকে অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেছেন স্বাধীনতার লড়াইয়ের সঙ্গে, সেই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এই বিশুদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের দাবী আদৌ করা যায় কি?

একই সময়ে রাজনৈতিক হিন্দুত্বের উত্থান- এ কি সমাপতন?

এখন আলোচনা করব সেই হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-মৌলবাদী শক্তির উত্থান নিয়ে যারা আজকের দিনে সংগঠিত চেহারায় হিন্দুত্ববাদের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। ১৯২৫ সালের বিজয়া দশমীতে যেদিন ‘রাম অসুরদের রাজা রাবণকে হত্যা করেছিলেন’- সেই দিনটিকে হেডগেওয়ার নামে একজন উল্লেখযোগ্য হিন্দুত্ববাদী নেতা বেছে নিলেন আর.এস.এস. অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠার জন্য। এই সংগঠন গড়ে তোলার পিছনের উদ্দেশ্য, পরিকল্পনাকে বুঝতে, পরিস্থিতি এবং পরিপ্রেক্ষিত বুঝতে চোখ রাখব হেডগেওয়ারের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠা এবং ওঠাপড়ার দিকে।  ১ এপ্রিল ১৮৮৯ সালে একটি তেলেগু ব্রাহ্মণ পরিবারে হেডগেওয়ার  জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার মহারাষ্ট্র ও অন্ধ্রপ্রদেশের সীমান্তের কাছাকাছি কান্দকুর্তিতে চলে এসেছিল, যেখানে মধ্য ভারতের তিনটি নদী মিলিত হয়, গোদাবরী, ভানজারা এবং হরিদ্রা। পরিবারের বিশেষত্ব ছিল বেদের শিক্ষা।

১৯২০ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিকে নাগপুরে কংগ্রেসের নিয়মিত অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এটা আশ্চর্যের  বিষয় যে, গান্ধী এমন একটি শহরে কংগ্রেসের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন, যেখানকার কংগ্রেস নেতারা লোকমান্য তিলকের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ছিলেন এবং গান্ধীপন্থী ধারার বিরোধী ছিলেন। আর.এস.এস.-এর প্রতিষ্ঠাতা কেশব বি. হেডগেওয়ার নাগপুরের রাজনীতি এবং সামাজিক জীবনে অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। সেই অধিবেশনে হেডগেওয়ার তরুণ কংগ্রেস ভলান্টিয়ারদের সংগঠিত করেছিলেন। ১৯২০ সালে নাগপুর অধিবেশনের জন্য হেডগেওয়ার যে স্বেচ্ছাসেবক গোষ্ঠীর নাম এবং ইউনিফর্ম ঠিক করেছিলেন তাই পরবর্তীকালে গ্রহণ করে আর.এস.এস.। তাই আসুন, আমরা এর উত্থানকে আরও কাছ থেকে দেখি।

অল্প বয়সে বেদের শিক্ষায় আগ্রহ পেতেন না হেডগেওয়ার। আধুনিক শিক্ষার স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখানেই তরুণ জাতীয়তাবাদী ডাক্তার শিবরাম মুঞ্জের সংস্পর্শে আসেন। মুঞ্জেই তাঁর প্রথম রাজনৈতিক গুরু। মুঞ্জে হেডগেওয়ারকে কোলকাতার ন্যাশানাল মেডিক্যাল কলেজে পাঠান, যেখানে ৬ বছর থাকাকালীন তিনি অনুশীলন সমিতিতে যোগ দিয়েছিলেন। রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সংযোগ রাখতেন হেডগেওয়ার। ১৯১৬ সালে নাগপুরে ফিরে যান হেডগেওয়ার। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে নাগপুরে একটি বিশাল সংখ্যক জিমনেশিয়াম গড়ে তোলা হয়েছিল। সেখানে অস্ত্র সংগ্রহ করা হত, প্রশিক্ষণ দেওয়া হত এবং বিভিন্ন বিপ্লবী গোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা ছিল । হেডগেওয়ার কংগ্রেস অধিবেশনের জন্য প্রায় ১২০০ স্বেচ্ছাসেবক সংগঠিত করতে ভি. এল. পরঞ্জপেকে সহায়তা করেছিলেন। অন্যান্য তিলকপন্থীর  সাথে, হেডগেওয়ার অনুভব করেছিলেন যে গান্ধী খিলাফত আন্দোলনকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। নাগপুরে গান্ধী কংগ্রেসের এজেন্ডায় গো-রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে অস্বীকার করলে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত হন। আগস্টের আগেই মারা যাওয়া তাঁদের নেতা তিলক ছাড়া আর কেউ  নাগপুরে গান্ধীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। এক বছরের মধ্যে স্বাধীনতা এবং বয়কট  স্লোগানের আশ্বাস ছিল তখন গান্ধীর দিক থেকে এবং হেডগেওয়ার এই পরীক্ষাটিতে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি মহারাষ্ট্রে ধারাবাহিক বক্তৃতা দিয়েছিলেন এবং ইচ্ছাকৃতভাবে আইন ভঙ্গ করেছিলেন। ১৯২১ সালের জুন মাসে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং বিচার করা হয়। ১৯২২ থেকে ২৪-এর মধ্যে নাগপুরের গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদদের নিয়ে অনেকগুলি মিটিং সংগঠিত হয়। ১ অগাস্ট ১৯২৩ সালে  হিন্দু মহাসভা বেনারসে মিলিত হয়, যেখানে অনেক বিশিষ্ট কংগ্রেস সদস্য উপস্থিত ছিলেন। এই সাধারণ হিন্দু প্ল্যাটফর্মে অনেক মতাদর্শগতভাবে বিরোধী হিন্দু গোষ্ঠী মিলিত হয়েছিল। যেসব মতামত প্রকাশ করা হয়েছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের অবনতি এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্বলতা সম্পর্কে হিন্দু ভারতের অনেকের আবেগকে প্রতিফলিত করেছিল। মূল বিষয় ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন। ধারণা করা হয়েছিল যে মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ এবং হিন্দুদের উপর আক্রমণে সক্ষম। ১ অক্টোবর জেলা  কালেক্টর একটি ‘দিন্দি’ মিছিল নিষিদ্ধ করেন। হেডগেওয়ার ছিলেন সেই হিন্দু নেতাদের মধ্যে একজন যারা সরকারি নিষেধাজ্ঞা ভাঙার চেষ্টা করেছিলেন। নাগপুরের প্রাক্তন শাসক পরিবারের উত্তরাধিকারী রাজা লক্ষ্মণরাও ভোঁসলের পূর্ব-অধীনে একটি হিন্দু সভার আয়োজন করা হয়েছিল। মুঞ্জে ছিলেন সহ-সভাপতি এবং হেডগেওয়ার এর সচিব। শহরে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়ে, হেডগেওয়ার বিনায়ক দামোদর সাভারকরের হিন্দুত্বের একটি হাতে লেখা ম্যানুস্ক্রিপ্ট পড়েছিলেন; যা হিন্দু জাতি সম্পর্কে তাঁর চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। ১৯২৫ সালের মার্চ মাসে হেডগেওয়ার সাভারকারের পরামর্শ চেয়েছিলেন এবং দুই দিন তাঁর সঙ্গে ছিলেন। এর পরেই, তিনি একটি গোষ্ঠী গঠন করেছিলেন যার নাম আর.এস.এস.। দশেরার উৎসবের পরপরই হেডগেওয়ার রাষ্ট্রীয় স্বয়ম্‌সেবক সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। আমরা জানি যে নাগপুরের অনেক কংগ্রেস-পুরুষ যারা রেসপন্স-সিভিস্টদের সমর্থন করেছিল তারা আর.এস.এস.-এ যোগ দিয়েছিল। সদস্যদের শহরের একটি জিমনেশিয়ামে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। রবিবার সকালে, তারা একটি দল হিসাবে জড়ো হবে। মঙ্গলবার এবং বৃহস্পতিবার, একটি রাজনৈতিক ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়। এটি পরবর্তীতে বৌদ্ধিক অংশ হিসেবে গড়ে ওঠে। দশেরার উৎসবের পরপরই হেডগেওয়ার রাষ্ট্রীয় স্বয়ম্‌সেবক সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। মনে হতে পারে এই ঘটনাক্রম এবং সম্পূর্ণ বিপরীত একটি ভাবধারার উত্থানের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠার সম্পর্ক কোথায়? একই সময় দুটি ধারার উত্থান তো নিছকই সমাপতন। শুধুমাত্র প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েই শেষ করছি না এই আলোচনা। পরিবেশ, পরিপ্রেক্ষিত, ১৯২৫-এর আগের সময়টা কেমন ছিল তা নিয়ে খানিকটা আলোচনা করেছি ইতিমধ্যেই। আমরা দেখতে পাব এর পরের ঘটনাক্রমে সারা পৃথিবী জুড়ে কি অদ্ভুত মিল। ধীরে ধীরে বিশ্ব এগোচ্ছে একটা তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের দিকে যা পরিপূর্ণ চেহারা পাচ্ছে ১৯৩০-এ। একদিকে স্পেন, ইতালি, জার্মানি সহ একাধিক দেশে ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থান এবং তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, লড়াই গড়ে তুলছে জনগণ সমাজতান্ত্রিক ধারায়। কমবেশি বিশ্বের অনেক প্রান্তেই ফ্যাসিবাদী উত্থানের পাল্টা রাস্তা হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে সমাজতান্ত্রিক ধারার সংগ্রাম। ভারতের ক্ষেত্রেও অদ্ভুতভাবে এই দুই পরস্পর বিরোধী ধারা উঠে এল একই সময়-একই বছর। পরবর্তী পৃথিবীতে দীর্ঘ-দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে এই দুই বিপরীতমুখী ধারার রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। এখনও আমরা দাঁড়িয়ে সেই রক্তক্ষরণের মধ্যেই। ১৯২৫ সালের সেই সময়টা গর্ভধারণ করেছে এমন অনেক কিছুর যা আমরা আজও এড়িয়ে যেতে পারি না- ভুলতে পারি না। একশ বছর আগে সেই সময়ের গর্ভে জন্ম নিয়েছে অজস্র সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনার নেতি ও ইতি দুই দিকই রয়েছে। সেই সম্ভাবনার বিকাশ আজকে আমাদের সময়কে একটা চেহারা দিয়েছে, ভবিষ্যতে চেহারার বদল হবে, আগমন ঘটবে নতুনের। ইতিহাস যেন দুই বা ততোধিক বহু বিপরীতের সংগ্রাম। প্রয়োজন তাই আরও গভীর মনোনিবেশের, সেই সময়ের প্রতি।

গ্রন্থতালিকা

1) মজুমদার মঞ্জুকুমার, দত্ত ভানুদেব,  বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস অনুসন্ধান, প্রথম খণ্ড, কলকাতাঃ মনীষা, ২০১৪

2) সরকার সুমিত, আধুনিক ভারত ১৮৮৫১৯৮৭ কলকাতাঃ কে পি বাগচি অ্যান্ড কোম্পানি, ২০১৩

3) রায় সুপ্রকাশ, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাসের রূপরেখা ১৯২৮১৯৬৮ কলকাতাঃ র‍্যাডিকেল ইম্প্রেশন, ২০১০

4) Dange, Sripad Amrit. Selected Writings, vol I P 137-140

5) Mukhopadhyay, Ashoke Kumar, ed. India and Communism: Secret British Documents. Calcutta: National Book Agency, 1997

6) Roy Sibnarayan, ed. Selected works of M. N. Roy 4 vols. Delhi:Oxford University Press 1989-97

7) Roy, Sibnarayan. In Freedom’s Quest: A study of the life and works of M.N. Roy, vol.1. Calcutta: Minema Associates, 1998

6) আহমেদ মুজফফর, আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ১৯২০১৯২৯, কোলকাতাঃ ন্যাশানাল বুক এজেন্সি, ১৯৭০

7)  আহমেদ মুজফফর, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার প্রথম যুগ, কোলকাতাঃ ন্যাশানাল বুক এজেন্সি, ১৯৮৩

8) Chattopadhyay Gautam, Communism and Bengal’s freedom movement: 1917-1929, Kolkata: People’s Publishing House, 1970

9) Indian Annual Register II, p 367

10) Document of the History of the Communist Party of the India vol I, Ed. by G. Adhikary, p. 341

11) Hesse Patrick, “Communism and communalism in the 1920s : Notes on a neglected nexus”, South Asia Chronicle 5/2015, 12-22

12) Hesse Patrick, “To the masses: Communism and religion in north India, 1920-47” (PhD diss., Humboldt University of Berlin, 2015) 53-92

13) Manjar Habib, “Communist movement and communal question in India, 1920-1948”, (PhD diss., Aligarh Muslim University, 2008) 22-75

14) Anderson Walter, “The Rashtriya Swayamsevak Sangh-I”, Economic and Political Weekly, March 11, 1972, 1-4

15) আপডেট স্টাডি গ্রুপ, সঙ্ঘ পরিবার ও হিন্দুত্ববাদ ভিত্তি উদ্ভব ও বিকাশ, কোলকাতাঃ সেতু প্রকাশনী, ২০২১

মন্তব্য তালিকা - “ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ও আর এস এস জন্মকালের শতবর্ষঃ দুই বিপরীত মেরুর জন্ম ও ফিরে দেখা সেই ক্রান্তিকাল”

  1. বেশ ভাল তথ্যসমৃদ্ধ বিশদ আলোচনা, হঠাৎ শেষ হয়ে গেল, ভবিষ্যতে আরও বিস্তারিত ও পরবর্তী প্রেক্ষাপট আলোচনার আশা রাখি।

  2. মুজফ্ফার আহমেদের মৌলবাদী ইসলামের কোনো ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ সম্পর্কে প্যাট্রিক হেসের মতামতকে লেখিকা কি কনক্লুসিভ এভিডেন্স মনে করছেন? মনে রাখা দরকার, মুজফ্ফার আহমেদ একজন রাজনীতিবিদ। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বিভিন্ন ব্যক্তির বিভিন্ন কারণে হতেই পারে, এমন কি বিতর্কমূলক কারণেও। এক্ষেত্রে অনেক প্রামাণ্য হতো আহমেদের নিজস্ব জীবনচর্যা বা লেখালেখিতে সাম্প্রদায়িকতার প্রতি কোনো সহিষ্ণুতা বা কম্প্রোমাইজের মানসিকতা দেখা গেলে। যেখানে মানুষটির পুরো জীবনটা সম্পর্কে সমস্ত তথ্যই আছে, সেখানে কোনো প্রমাণ ছাড়া লেখিকা শুধু হেসের ওপর নির্ভর করতে চাইলেন কেন, বোঝা গেল না।

  3. খুব ভালো প্রবন্ধ, পড়ে সমৃদ্ধ হলুম। দুটি ব‍্যাপারে খটকা আছে। লেখিকা লিখেছেন ‘১৯১৯ ও ১৯২০ সালে গান্ধী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন।’ সাধারণ পাঠ‍্য বইতে ১৯১৯ সালে কংগ্রেস সভাপতি হন মোতিলাল নেহরু এবং ১৯২০ সালের কংগ্রেস সভাপতি হিশেবে সি. বিজয়রাঘবচারিয়ার নাম রয়েছে। গান্ধী একবারের জন্যই সভাপতি হন ১৯২৪ এর বেলগাঁও অধিবেশনে। আবার লেখিকা লিখেছেন ‘কংগ্রেসের গোয়া অধিবেশন (১৯২২)’। ১৯২২ সালে কংগ্রেসের অধিবেশন বসেছিল গয়াতে, সভাপতি চিত্তরঞ্জন দাশ। এই ব‍্যাপারে লেখিকার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।