সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

অথ মন্বন্তর কথা

অথ মন্বন্তর কথা

শর্মিষ্ঠা দত্তগুপ্ত

নভেম্বর ৬, ২০২০ ৫৯৯ ১০

১৯৪৪-এর অক্টোবর মাসে বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’ নাটক প্রথম মঞ্চস্থ হয় কলকাতার শ্রীরঙ্গম থিয়েটারে। তারপর গণনাট্য সংঘের এই নাটকটি ভারতের নানা জায়গায় ‘ভয়েস অফ বেঙ্গল’-এর অঙ্গ হিসেবে মঞ্চস্থ হয়ে কীভাবে সাড়া ফেলে দিয়েছিল, সে কথা ইতিহাসে লেখা আছে উজ্জ্বল অক্ষরে। কিন্তু যা হয়তো সেভাবে লেখা নেই, তা হলো ‘নবান্ন’ নাটকের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মনে পঞ্চাশের মন্বন্তরের অভিঘাত। যেমন ধরুন, সে সময়ে আশুতোষ কলেজের ছাত্রী ১৮/১৯ বছরের তৃপ্তি মিত্র কীভাবে দেখেছিলেন মন্বন্তরকে, ‘নবান্ন’-এ ছোট বউ বিনোদিনীর ভূমিকায় অভিনয়ের সময় কীভাবে উৎসারিত হতো তাঁর সেই দেখা—এগুলোর কথা আমাদের অজানাই রয়ে গেছে অনেকাংশে।

কথাটা কী জন্যে তুললাম বলি। মাস-দুয়েক আগে আমি একটি দৈনিকের জন্য অতিমারীর প্রেক্ষিতে বাংলার মেয়েদের মন্বন্তর-বিরোধী কাজ নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখি। লেখাটা বেরোবার পর শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পঞ্চাশের মন্বন্তর নিয়ে কথা প্রসঙ্গে উঠে আসে সে সময়ে রিলিফের কাজে ছাত্র ফেডারেশানের ভূমিকা এবং সেই সূত্রে তৃপ্তি মিত্রের কথা। তৃপ্তি মিত্র ছাত্র ফেডারেশানের সদস্য হিসেবে দুর্ভিক্ষের সময় হাজরা মোড়ের কাছে যে রিলিফ কিচেন চালানো হতো, সেই কাজে অংশীদার ছিলেন। তৃপ্তি মিত্রের মুখে শমীক’দা শুনেছিলেন একদিন যখন তাঁরা কলেজের কাছে রান্না-করা খাবার দিচ্ছিলেন কিছু অভুক্ত মানুষজনকে, তখন লাইনে-দাঁড়ানো একজনের দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির মনে হচ্ছিল বেশিক্ষণ দাঁড়ানোর ক্ষমতা ওই অনাহারে অসুস্থ মহিলার নেই। তৃপ্তি খাবার তুলে দিতে যান ওঁর থালায়, কিন্তু থালায় খাবার নিয়েই পর মুহূর্তে মহিলা ঢলে পড়েন তৃপ্তির হাতের ওপর এবং মারা যান কিছুক্ষণের মধ্যে। তৃপ্তি বলেন তাঁর মধ্যে রয়ে গেছিল চোখের সামনে দেখা এরকম বেশ কিছু মর্মান্তিক ঘটনা। ‘নবান্ন’-এ তা প্রাণ পায় অন্যভাবে।

গণ নাট্য সঙ্ঘের শিল্পীদের মনে মন্বন্তরের ঘাত-প্রতিঘাত নিয়ে অবশ্য এই লেখা নয়। সে নিয়ে লেখার ধৃষ্টতা/ ক্ষমতাও আমার নেই। গত কয়েক মাস যে অভূতপূর্ব সময়ের মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি, সেই চরম সঙ্কটকালে পঞ্চাশের মন্বন্তরের কথা বারবার মনে পড়ছে। লকডাউনের কারণে আমাদের চারপাশে বেশিরভাগ মানুষের কাজ নেই, খাওয়া জুটছে না। শাকসবজি, আলুর দাম হুহু করে বাড়ছে। মানুষ দু-বেলা খাওয়া জোটাবার জন্যে দ্রুত জীবিকা পরিবর্তন করছেন। বারো-তেরো বছরের বাচ্চা ছেলেরা স্কুল-ছুট হয়ে ফল-সবজি বিক্রি করতে নেমেছে। কিশোরী মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে দ্রুত এবং পাচারকারীরা হয়ে উঠছে অতি সক্রিয়। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি বেশি দিন চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করে আছে, ভাবতে শিউরে উঠি।

খুঁটিয়ে পড়া জরুরি মনে হয় মন্বন্তরের ইতিহাস ও বিশেষ করে তাঁদের কথা যাঁরা মোড়ে মোড়ে ‘মৃত্যুর জয়ডঙ্কা’ শুনে হাত লাগিয়েছিলেন ‘প্রাণের দুর্গ’ ফিরে বানানোর কাজে। এই ফিরে পড়ার সময় লক্ষ করছি কিছু ইতিহাস কীভাবে অনেকটাই চাপা পড়ে গেছে। যেমন ধরুন, যুদ্ধ-মন্বন্তরের পরে পরেই তেভাগা আন্দোলনে বাংলার কৃষক মেয়েদের ও বিমলা মাজীর মতো নেত্রীর ভূমিকা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। আজ থেকে ৭৫/৮০ বছর আগে গণ নাট্য সঙ্ঘের সাংস্কৃতিক কাজে শিল্পী মেয়েদের অংশগ্রহণ নিয়েও চর্চা হয়েছে বেশ কিছু। অথচ আমরা সেভাবে মনে রাখিনি যে গণনাট্য সঙ্ঘ এবং তেভাগা আন্দোলনের অনেক কর্মীই রাজনীতিতে এসেছিলেন মন্বন্তর-বিরোধী কাজের সূত্রে। যেমন, গণনাট্য সঙ্ঘের প্রখ্যাত গায়িকা রংপুরের মেয়ে রেবা রায়চৌধুরী ১৭-১৮ বছর বয়সে সেখানকার গ্রামেগঞ্জে মিছিল ও পথসভা করে বেড়াতেন ১৯৪৩-৪৪-এ রিলিফ আদায়ের জন্য, যেগুলো শুরু হতো তাঁর কণ্ঠে হরিপদ কুশারী ও অন্যান্যদের লেখা মন্বন্তরের গান দিয়ে। প্রথমে তিনি ছিলেন ছাত্র আন্দোলনে, তারপর অল্পদিনের মধ্যেই রংপুরে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির নবীন সদস্য। ওদিকে ১৯৪২-৪৩-এ সাইক্লোন-মহামারী-দুর্ভিক্ষ বিধ্বস্ত মেদিনীপুরে চোদ্দ-পনেরো বছরের বালবিধবা বিমলা মাজীর আন্দোলনে হাতেখড়ি হয় গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে মিল্কক্যান্টিন আর মেডিকাল রিলিফ সেন্টারের কাজ শিখে, যেগুলো জেলায় জেলায় শুরু করেছিল ফ্যাসিবিরোধী মেয়েদের মঞ্চ হিসেবে যুদ্ধের সময় গড়ে-ওঠা মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি। বিমলাকে তখন বাড়ি থেকে সাদা থান পড়ে বেরোতে হতো; গ্রামের বাইরে বাস রাস্তার কাছে গিয়ে সাদা থান পাল্টে তিনি পড়ে নিতেন রঙিন শাড়ি।  রেবাকে তাঁর বাবা প্রায় বন্দী করে রাখতে চেয়েছিলেন বাড়ির বাইরে এভাবে ঘুরে বেরিয়ে গান, ত্রাণ সংগ্রহ ও কালোবাজারির বিরুদ্ধে মিটিং-মিছিলে শরিক হওয়ার জন্য।

মন্বন্তর-বিরোধী কাজে ছাত্র ফেডারেশান, গণ নাট্য সঙ্ঘ ও মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির যে বিরাট ভূমিকা ছিল সেটা আমরা সেভাবে চর্চা করি নি বলে আমার মনে হয়। এই লেখায় আমি কেবল দুর্ভিক্ষের সময় আত্মরক্ষা সমিতির কাজের ধরন ও গুরুত্ব নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করব। তার আগে দেখে নেব মন্বন্তর কীভাবে আঘাত হেনেছিল গ্রাম-বাংলার মেয়েদের জীবনে।

‘পঞ্চাশে লাখ প্রাণ দিছি, মা বোনেদের মান দিছি’

প্রথম অবস্থায় আমরা দেখিয়াছি স্ত্রী-পুত্রকে ছাড়িয়া পুরুষেরা গ্রাম হইতে খাদ্যের সন্ধানে শহরে চলিয়া গিয়াছে। অসহায় স্ত্রী-পুত্র শেষ পর্যন্ত দুঃস্থে পরিণত হইয়াছে। ২৪ পরগণার গ্রাম হইতে মেয়েরা শহরে চলিয়া আসিয়াছিল। তারপর যখন গ্রামে ফিরিয়া গেল, তাদের স্বামীরা তাদের ঘরে লইল না। এমনি ভাবেই ঘর ভাঙন শুরু হইল। . . . অভাবের তাড়নায় স্বামী স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে বিক্রয় করিয়া দিয়াছে, এই রকম খবর ঢাকা, জলপাইগুড়ি, নেত্রকোণা, ফরিদপুর, দিনাজপুর প্রভৃতি জেলা হইতে পাওয়া গিয়াছে। . . . রংপুরের নীলফমারী মহকুমার খবরে প্রকাশ যে একমাসে প্রায় ১০০ ঘর চাষী তাদের পরিবারকে টাকার বিনিময়ে জোতদারের কাছে বিক্রি করিয়াছে। . . . কমরেড বসন্ত চক্রবর্তী লিখিতেছেন—কিশোরগঞ্জ ইউনিয়ানে গুপ্ত মেয়ে ব্যবসায়ী দল গঠিত হইয়াছে। ১০ হইতে ১৫ জন যুবতীকে ৮/১০ টাকা দামে কিনিয়া লয় এবং জলপাইগুড়ি জেলার কোনো কোনো জায়গায় বিক্রয় হইত। একটি মেয়ে দুইবার বিক্রয় হইয়াছে। . . . চট্টগ্রাম রিলিফ হাসপাতালে যেসব দুঃস্থ নারী থাকে, দেখা যায় যে তাদের অধিকাংশই যৌন ব্যাধিতে আক্রান্ত। ইহাদের একজনের হঠাৎ কলেরা হয়। তখন সে হঠাৎ তাহার ছেঁড়া শাড়ির আঁচল হইতে ২টি টাকা বাহির করিয়া নার্সকে দেয়। এ টাকা কোথা হইতে পাইল জিজ্ঞাসা করায়, জানিতে পারা যায় ইহা তার সন্তান বিক্রয়ের দাম। প্রথমে সন্তান বিক্রয়, তারপর দেহ বিক্রয়, ইহাই দুঃস্থদের জীবনের গতি হইয়া দাঁড়াইছে।

এই সময়ে আরো একটা সঙ্কট ভয়ঙ্কর রূপে দেখা দিল, তা হলো বস্ত্র সঙ্কট। ঘরে ঘরে মেয়েদের অঙ্গে এক ফালি কাপড় নেই। গ্রামের গরিব ঘরের মেয়েরা এমনকি কলাপাতা, কচুপাতা দিয়েও কোনমতে লজ্জা নিবারণ করেছে। ছেলেমেয়েরা বাইরে বেরিয়ে স্কুলে যাওয়ার মতো পোশাক পায়নি।

বাংলার মন্বন্তরে ৩৫ লক্ষ মানুষ, হয়তো বা তার অনেক বেশি, মারা গিয়েছিলেন খাদ্যের অভাবে। ইংরেজ শাসক যুদ্ধ জয় এবং জাপানীদের পরাজয় নিশ্চিত করতে তৈরি করেছিলেন এই দুর্ভিক্ষ। সৈন্যদের জন্যে সমস্ত খাদ্যশস্য ও অন্যান্য রসদ সংগ্রহের ফলে তীব্র সঙ্কট তৈরি হয়। পাল্লা দিয়ে চলতে থাকে চালের দাম বাড়া, বাজার থেকে উধাও হয়ে যাওয়া ও কালোবাজারি। ‘ফুড’ বলে একটা কথা চালু হয় মুখে মুখে। ‘গরিবের মুখে না উঠে যে চাল ডাল তেল নুন গুদোম থেকে গুদোমে কেনাবেচা হয়ে চালান যায়, তাকে বলে ফুড’—তীব্র শ্লেষে মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন তাঁর ‘ছিনিয়ে খায় নি কেন’ গল্পে।

‘ফুড’-এর অভাবে মৃত্যুর কথা আমরা কিছুটা জানি। কিন্তু এখানে যে দুটো উদ্ধৃতি দিলাম, তা থেকে আমরা খানিকটা আঁচ করতে পারি যে ’৫০-এর মন্বন্তরে চরম খাদ্য সঙ্কটের পাশাপাশি বাংলার মেয়েদের জীবনে, বিশেষ করে বর্ণ ও শ্রেণিগতভাবে প্রান্তিক মেয়েদের জীবনে আর কী ধরনের গভীর বিপর্যয় নেমে এসেছিল। যেমন, খাদ্যের মতো বস্ত্র দুর্নীতিও চরমে ওঠার ফলে কাপড়ের অভাবে আত্মহত্যা করেছেন সে সময়ে অনেক মেয়ে, সেটা হয়তো অনেকেই জানি না। গ্রামে গ্রামে যে সব সমাজকর্মী ও রাজনৈতিক কর্মী এই সময় মেয়েদের মধ্যে কাজ করেছেন তাঁদের লেখা পড়লে আমরা জানতে পারি যে রিলিফ কিচেনের লাইনে দাঁড়িয়ে এক মগ জলো খিচুড়ি নিতে হলেও যে ছেঁড়া কানি গায়ে রাখা দরকার হতো, সেটুকুও তাদের ছিল না অনেক ক্ষেত্রে। কনক মুখোপাধ্যায় যেমন লিখেছেন কাপড়ের অভাবে কীভাবে মেয়েরা কলাপাতা/কচুপাতা দিয়ে গা ঢাকতে বাধ্য হয়েছেন। রেণু চক্রবর্তীর লেখায় পাই একখানি কাপড় না থাকার জন্য ১৯৪৫-এ আত্মরক্ষা সমিতির বরিশাল জেলা সম্মেলনে ৫৫টি প্রাইমারি কমিটির মধ্যে মাত্র ১১টি কমিটির মেয়েরা সম্মেলনে যোগ দিতে আসতে পেরেছিলেন।

আমরা ইতিহাসে বারবার দেখেছি যে, যে কোনও যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ অথবা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর মেয়েদের ও বাচ্চাদের বিক্রি ও পাচার অনেকটাই বেড়ে যায়। চাষিরা তাঁদের গরু, জেলেরা তাঁদের জাল বেচে দিচ্ছিলেন যখন অভাবের তাড়নায়, সে সময়ে ‘জনযুদ্ধ’ কাগজের রিপোর্ট আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, জোতদার ও মহাজনদের কাছে বিক্রি হয়ে যাচ্ছিল তাঁদের বাড়ির মেয়েরা। জোতদার ও তাদের আড়কাঠিরাও অনেক মেয়েকে শরীর বেচার কাজে লাগাত, বিশেষত যাদের বাড়ির পুরুষরা ধান কাটতে বা অন্য কোথাও কাজের খোঁজে গেছেন, তাদের। ‘অশনি সঙ্কেত’-এর যদুকে এই প্রসঙ্গে আপনাদের মনে পড়বে নিশ্চয়। মেয়েরা নিজেরাই দু-মুঠো ভাতের জন্য গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র গিয়ে দেহ বেচতে বাধ্য হয়েছিলেন। দেহ বেচে অথবা অন্যভাবে কিছু রোজগার করে তাঁরা যখন গ্রামে ফিরে আসেন, তখন তাঁদের পরিবার দ্বারা পরিত্যক্ত হতে হয়। আবার পথে নেমে কখনো তাঁরা নিজের সন্তানকে বিক্রি করে দেন, অথবা মৃত সন্তানকে কোলে নিয়ে কাপড়ের আড়ালে লুকিয়ে রেখে বাচ্চার জন্য মিল্ক ক্যানটিন থেকে দুধ নিতে আসেন।  

এছাড়া দুটো ভাত আর একটা কাপড়ের জন্য এ সময়ে জন্ম হয় এক নতুন ধরনের মেয়েদের—ট্রেনের ডেলি প্যাসেঞ্জারির ভাষায় যাদের নাম হয় ‘কন্ট্রোলের মাগী’। যে সব চাষির ঘরের মেয়ে-বৌ নিরুপায় হয়ে পেটের কাপড়ের মধ্যে বেঁধে চাল চুরি করে নিয়ে আসত শহরে বেচতে এবং দিনের পর দিন পুলিশ, জনতা ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর হাতে শত লাঞ্ছনা ভোগ করত, তাদেরই বলা হতো ‘কন্ট্রোলের মাগী’। এদের কাপড় ধরে টানতো টিকিট চেকার, কুকুরের মতো তাড়া করে লাঠিপেটা করতো পুলিশ কনস্টেবল, আর ট্রেন/স্টেশন-সুদ্ধু ভদ্রলোকেরা এদের প্রতি অশ্লীল গালিগালাজ ও কুৎসিত ইঙ্গিত করলেও কেউ কোনো প্রতিবাদ করতো না। এই ‘কন্ট্রোলের মাগী’-দের দেখা পেতে চাইলে আপনারা পড়ে দেখতে পারেন সলিল চৌধুরীর ‘চালচোর’ গল্পটি। পরে কখনো এই মেয়েদের নিয়ে আলাদা করে আলোচনা করা যাবে।

মন্বন্তরের সময় মেয়েদের অবস্থার কথা বলতে গেলে আর একটা দিকের বিশেষ ভাবে উল্লেখ হওয়া দরকার। সেটা হলো মার্কিন ও ব্রিটিশ সেনাদের হাতে মেয়েদের নিগ্রহ। এই সময় যৌন ব্যাধির শিকার হন বহু মেয়ে, উত্তর-পূর্ব বঙ্গে যার নাম ছিল আরাকানের ঘা। সৈন্যদের ছাউনি কাছে থাকলেই সেখানকার মেয়েদের মধ্যে এটা বেশি দেখা যেত। চট্টগ্রামের রিলিফ হাসপাতালে বেশিরভাগ মেয়েদের যৌন ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার উল্লেখ সেই সাক্ষ্যই বহন করছে।

‘চাইরে অর্থ, চাইরে বস্ত্র, চাইরে অন্নজল’

মন্বন্তরের সময় মেয়েদের জীবন কীভাবে তছনছ হয়ে গেছিল তার সামান্য কিছু নিদর্শন আমরা পেলাম। এবার আমরা দুর্ভিক্ষের সময় মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির কাজের মূল ধারাগুলো লক্ষ করতে পারি।

১৯৪২ সালে কম্যুনিস্ট মেয়েদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি প্রথম কয়েক বছর একটি ফ্যাসিবিরোধী ও যুদ্ধ-দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধী মঞ্চ হিসেবে নানা মতের বহু মহিলাকে একত্র করেছিল, যাঁরা কেউ কেউ কংগ্রেসি ছিলেন, কেউ বিপ্লবী স্বাধীনতা সংগ্রামী আবার কেউ শিল্পী/সাহিত্যিক যাঁরা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না কখনোই। যুদ্ধের সময় মেয়েদের মধ্যে এ আর পি শিক্ষা গ্রহণ করার ব্যবস্থা, বস্তি অঞ্চলে জাপানী বোমার বিরুদ্ধে সাবধানতামূলক কাজের প্রচার, জাতীয় নেতাদের মুক্তির দাবি, যুদ্ধ-দুর্ভিক্ষের হাত থেকে জনগণকে রক্ষা করা, বিশেষ করে মেয়েদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য মোহিনী দেবী, জ্যোতির্ময়ী গাংগুলি, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, প্রভাবতী দেবী সরস্বতী, সাকিনা বেগম, ফুলরেণু গুহ প্রমুখ আরো অনেকের অংশ গ্রহণ ছিল মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির কাজে। সামনের সারিতে থেকে কাজগুলো করতেন জেলায় জেলায় অসংখ্য আত্মরক্ষা কর্মী আর নেতৃত্বে ছিলেন মণিকুন্তলা সেন, কনক মুখোপাধ্যায়, নাজিমুন্নেসা আহমেদ, যুঁইফুল রায়, কমলা চ্যাটার্জি ও আরো কয়েকজন। ১৯৪৩ সালে বেশ কয়েকটি মহিলা সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে ‘বেংগল উইমেন্স ফুড কমিটি’ নামক সংযুক্ত সমিতি গঠনে উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিল আত্মরক্ষা সমিতি। এই কমিটিতে নানা মতাদর্শের মেয়েরা ছিলেন যেমন ইয়ং উইমেন্স খ্রিশ্চিয়ান অ্যাসোসিয়েশানের প্রতিনিধিরা। ‘বেংগল উইমেন্স ফুড কমিটি’ রিলিফের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, ওষুধ ও টাকা তোলায় খুব জরুরি কাজ করে। 

মন্বন্তরের সময় আত্মরক্ষা সমিতি মূলত তিনভাবে কাজ করতো। কাজের এই তিনটি ধারা ছিল:

  • আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে দুর্ভিক্ষ-কালোবাজারি-মহামারী সম্বন্ধে মানুষকে সচেতন করা এবং দর কমানো, রেশন ব্যবস্থা ও কন্ট্রোলের দোকান চালু করবার জন্য সরকারকে চাপ দেওয়া
  • কলকাতা ও জেলায় জেলায় লংগরখানা নিজেরা খোলা ও সরকারকে দিয়ে খোলানো
  • নিরাশ্রয় নিরবলম্ব মেয়েদের আশ্রয় ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা

প্রথম ধারায় উল্লেখ করতে চাই ১৯৪৩-এর ১৭ই মার্চ আত্মরক্ষা সমিতি ও মুসলিম মহিলা আত্মরক্ষা লিগের আহবানে চালের দাম কমানো ও রেশন দোকান খোলার দাবিতে শহর ও গ্রামের ৫০০০ মেয়ের ভুখ মিছিল ও রাজ্য বিধানসভার গেটে সমাবেশ। কলকাতার রাজপথেই শুধু নয়, ওই মার্চ মাসেই বাঁকুড়া, পাবনা, ফরিদপুর, বরিশাল, জলপাইগুড়ি এবং অন্যান্য জেলা সদরে প্রায় একই সময় মেয়েদের ভুখ মিছিল বেরোয় জেলা শাসকের দপ্তরের উদ্দেশ্যে। রংপুর, খুলনা, ঢাকা ও অন্যত্র মেয়েরা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে ডেপুটেশন দেয় বস্ত্র ঘাটতি ও বণ্টনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে। ১৯৪৩-৪৫-এ খাদ্য-বস্ত্র মজুতদারি রুখতে এবং রেশন-কন্ট্রোল ব্যবস্থা চালু করবার জন্য লাগাতার আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল এইভাবে।

দ্বিতীয় ধারায় আমরা দেখি দুর্ভিক্ষপীড়িতদের জন্য সমিতির উদ্যোগে সর্বত্র খিচুড়ির ক্যান্টিন, বাচ্চাদের জন্য মিল্ক ক্যানটিন এবং অসুস্থদের জন্য মেডিকাল রিলিফ সেন্টার গড়ে তোলা। কলকাতাতেই ছিল ১৭টি খিচুড়ির ক্যান্টিন ও ৮টি মিল্ক ক্যান্টিন। মেদিনীপুর, বর্ধমান, হাওড়া, হুগলি, ২৪ পরগণা, নদীয়া, কুমিল্লা, নোয়াখালী, বগুড়া, পাবনা, রাজশাহী, জলপাইগুড়ি, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, ঢাকা, ফরিদপুর ও ময়মনসিংহে চলতো আরো অনেকগুলো সেন্টার। দুর্ভিক্ষের হাত ধরে আসা ম্যালেরিয়া-কলেরা-বসন্তের প্রকোপে মানুষের তখন দুর্দশার শেষ ছিল না। জেলায় জেলায় পিপলস্‌ রিলিফ কমিটির চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো চালানোয় সক্রিয় সহযোগ ছিল আত্মরক্ষা সমিতির মেয়েদের।

তৃতীয় ধারাটি মেয়েদের আশ্রয় ও পুনর্বাসনকে কেন্দ্র করে জেলায় জেলায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে গেছিল। ‘ত্রাণ’-এর সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে মেয়েদের নানা ধরনের কাজ শেখানো শুরু হয় এই কেন্দ্রগুলোতে। মেয়েরা নিজেদের কাপড় নিজেরা বুনে নিতে চাওয়ায় বহু জেলায় খোলা হয় চরকা কেন্দ্র। এছাড়া একেকটি জেলা সমিতি একেক ধরনের হাতের কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে মেয়েদের তৈরি জিনিস বিক্রির ব্যবস্থা করে। যেমন গামছা বোনা, জাল বোনার জন্য নারায়ণগঞ্জ; ডাল ছাঁটাইয়ের জন্য দিনাজপুর; তাঁতের কাপড়ের জন্য পাবনা; মাদুর বোনা ও বেতের অন্যান্য জিনিস তৈরির মেদিনীপুরের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কাজ সুপরিচিত ছিল।১০  শহর কলকাতাতেই একশোটা কুটির শিল্পকেন্দ্র চালাতেন আত্মরক্ষা সমিতি। এছাড়া বেশ কয়েকটা আশ্রয় কেন্দ্র গড়ে তোলেন সমিতির মেয়েরা যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ্য বরিশালে মনোরমা বসুর পরিচালনায় ‘নারী কল্যাণ ভবন’। নারী পাচার রুখতে ও উদ্ধার হওয়া মেয়েদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে ‘বেংগল উইমেন্স ফুড কমিটি’-এর মতোই ১৮টি সংস্থাকে নিয়ে আর একটি সংযুক্ত সমিতি গড়ে তোলায় বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিল মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি। এই দ্বিতীয় কমিটি থেকেই ১৯৪৪-এ উদ্ভব হয় ‘নারী সেবা সংঘ’ নামক প্রতিষ্ঠান। চল্লিশের দশকে ‘নারী সেবা সংঘ’-এর প্রায় ৫০টি হোম বা সেন্টার ছিল সারা বাংলা জুড়ে।১১

‘শোন ওরে ও শহরবাসী শোন ক্ষুধিতের হাহাকার’

প্রবন্ধের শেষ অংশে আমি আত্মরক্ষা সমিতির কাজের প্রথম ধারাটি নিয়েই আলোচনা করব। এই সমিতির মেয়েদের কাজের অন্য দুটি ধারার অপরিসীম গুরুত্ব স্বীকার করে নিয়েও বলতে হয় যে আরো কয়েকটি সমাজসেবী সংগঠন সে সময়ে লংগরখানা, দাতব্য চিকিৎসালয় ও মেয়েদের আশ্রয় কেন্দ্র স্থাপন করার চেষ্টা করেছিল। আত্মরক্ষা সমিতির রিলিফের কাজের প্রথম ধারাতেই মূলত লুকিয়ে আছে সমাজ-নির্দিষ্ট কিছু ছক ভেঙে মেয়েদের শামিল হওয়ার ইতিহাস এবং সেই প্রথা-বহির্ভূত দিকটি নিয়ে খুবই কম কথা হয়েছে বলা যায়।

পঞ্চাশের মন্বন্তরে বেশ কিছু সমাজসেবামূলক ও ধর্মীয় সংস্থা বাংলার নিরন্ন মানুষকে অন্ন ও বস্ত্র যুগিয়েছে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেই ত্রাণের প্রয়াস ছিল সম্পূর্ণ নারী-বর্জিত। দু-চারটি নারী সংস্থা, যেমন নিখিল ভারত মহিলা সম্মেলন (AIWC) ও ইয়ং উইমেন্স খ্রিশ্চিয়ান অ্যাসোসিয়েশান (YWCA), অনাথ শিশুদের জন্য আশ্রম ও মিল্ক ক্যানটিন অথবা মা ও শিশুদের জন্য চিকিৎসাকেন্দ্র, মেয়েদের জন্য খাদি কেন্দ্র শুরু করে দুর্ভিক্ষের সময় মানুষের পাশে থেকেছেন নিবিড়ভাবে। কিন্তু তাঁদের কাজের ধরন ‘নারীসুলভ’ ছিল বলে, তাতে সামাজিক স্বীকৃতি ও সম্মান ছিল। সে কাজের ফলে শ্রেণি-লিঙ্গের স্টিরিওটাইপ ভাঙার আশঙ্কা ছিল না।

আত্মরক্ষা সমিতির ক্ষেত্রে প্রথমেই বলতে হয় শুধু মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত ভদ্রমহিলাদের নিয়ে নয়, শ্রমিক-কৃষক-বস্তিবাসী মেয়েদের সঙ্গে ভদ্রমহিলাদের একসঙ্গে মিছিলে হাঁটার মধ্যে দিয়েই তৈরি হতো কিছু অবিশ্বাস্য দৃশ্য। মজুতদারির বিরুদ্ধে এবং খাদ্য সুরক্ষার দাবিতে যেভাবে নানা শ্রেণীর মেয়েদের সমাবেশ এই মিটিং-মিছিলগুলোয় হতে লাগলো, তা পরাধীন ভারতে এর আগে আর কোনো আন্দোলনে হয়েছে বলে জানা নেই। লবণ সত্যাগ্রহের মতো গান্ধীবাদী আন্দোলনে শহরে ও গ্রামে নানা স্তরের মেয়েরা যোগ দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু প্রকাশ্যে এভাবে একত্র হয়ে আন্দোলন এই প্রথম। 

শ্রেণি-লিঙ্গের স্টিরিওটাইপ আর কীভাবে ভেঙে যেত, তার দু-একটা উদাহরণ দিই। যেমন, রাত তিনটের ট্রেনে গ্রাম থেকে দলে দলে যে নারী-পুরুষ বালিগঞ্জ স্টেশনে এসে নামতেন চালের লাইনে দাঁড়াবেন বলে, সমিতির মধ্যবিত্ত মেয়েদের কাজ ছিল ভোরবেলা থেকে তাঁদের পাশে থাকা, সকালে তাঁরা যাতে ন্যায্য মূল্যে চাল পান সেটা দেখা, কমবয়সী মেয়েদের আশেপাশে দালাল ঘুরছে কিনা খেয়াল রাখা, কেউ মরা শিশু কোলে নিয়ে বসে থাকলে যথাযথ ব্যবস্থা করা—এইসব আর কী!১২ গ্রামে গ্রামে ছিল পথের ধারে পড়ে থাকা শবদেহগুলোকে শেয়াল-শকুনের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যে সাফাই কর্মীদের পাড়া ও ডোম পাড়ায় গিয়ে ব্যবস্থা করা।১৩ ভদ্রো(মহিলা)চিত কাজ বলে এগুলো একেবারেই গণ্য হতো না!

কথাটা এই জন্য বলছি যে ভদ্রমহিলাদের বিশেষ করে মেনে চলতে হতো শ্রেণি-নির্দিষ্ট কিছু আচার-আচরণ। রাস্তায় সবার সঙ্গে প্রকাশ্যে মেলামেশা, বুভুক্ষু মানুষের জন্য পথসভায় গান গেয়ে টাকা তোলা, অন্য শ্রেণির মেয়েদের ভিড়ে দাঁড়িয়ে চালের দোকানীদের প্রয়োজনমতো হুঁশিয়ার করা—ভদ্রসমাজে মানানসই নয় ও ‘নারীত্ব’-এর মর্যাদা ধুলোয় লুটনো এমনসব কাজ করার ফলে আত্মরক্ষা সমিতির মেয়েদের নামে হামেশা রটতো কুৎসা; গঞ্জের এদিক ওদিক পোস্টার পড়তেও দেরী হতো না। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক আপত্তিই এত প্রবল ছিল যে মেয়েদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে হতো এক কাপড়ে। 

ইদানীং লকডাউন ও আম্পফানের সময়ে কম্যুনিটি কিচেন/ ক্যান্টিন, গণ-উদ্যোগে রেশন বিলি কথাগুলো আমরা ঘন ঘন শুনেছি। নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশ বহু কাজ-খোয়ানো মানুষের পাশে অতিমারীর সময় যখন রিলিফ সংগঠিত করেছে, তখন কম্যুনিটি কিচেন চালানোয়, পরিযায়ী শ্রমিকদের ফেরানোর গণ উদ্যোগে ও আরো নানা ভূমিকায় মেয়েদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। মেয়েরা ত্রাণের কাজে দূরে দূরে যাচ্ছে, পরিকল্পনা করছে, এই নিয়ে লিখছে-বলছে, মতামত গঠন করছে। তাই বদলটা কীভাবে এসেছিল মনে রাখা জরুরি।

মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির কাজের আরো একটা খুব বড় বৈশিষ্ট্য ছিল প্রেশার গ্রুপ হিসেবে রেশন ব্যবস্থা ও কন্ট্রোলের দোকান খোলার জন্য প্রশাসনকে চাপ দেওয়া। খাদ্য সঙ্কট-কালোবাজারির দিনে রাষ্ট্র-প্রশাসনকে খাদ্য সরবরাহ করতে বাধ্য করার কাজটাও এই মেয়েরাই প্রথম করেছিলেন। চালের দাম কমানো ও রেশন দোকান খোলার দাবিতে ১৭ মার্চ ১৯৪৩-এ পাঁচ হাজার মেয়ের একটি মিছিল পৌঁছেছিল বাংলার আইনসভায়। মেয়েরা আঁচলে বাঁধা পয়সা দেখিয়ে ন্যায্য মূল্যে চাল কিনতে চেয়েছিলেন—যে দামে তাঁরা চাল কিনতেন মজুতদারি শুরু হওয়ার আগে। এই অভূতপূর্ব জমায়েতের ফলে সেদিন ফজলুল হক-মন্ত্রীসভার সদস্যরা কয়েক লড়ি বোঝাই চাল আনিয়ে উপস্থিত প্রত্যেককে দু-সের চাল দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। সেদিন মেয়েরা সরকারের থেকে আদায় করে নিয়েছিলেন ন্যায্য দরের চালের দোকান খোলার প্রতিশ্রুতি। সেইমতো এই ঘটনার কিছুদিন পর সরকার থেকে কলকাতায় খোলা হয় ১৬টি চালের দোকান এবং কতগুলো বড় ক্যান্টিন।১৪

আজ আমরা খাদ্য নিরাপত্তা আইন পেয়েছি এবং তার দুর্নীতিমুক্ত রূপায়নের দিকে সঙ্গত কারণেই নজরদারি জারি রাখছি। লকডাউনের ফলে ডিলার-নির্দিষ্ট রেশন কার্ডের দরুন দেশের নানা প্রান্তে পরিযায়ী শ্রমিকদের খাদ্যাভাবে কীভাবে হয়রান হতে হয়েছে আমরা দেখেছি। হয়তো অচিরে পেতে চলেছি ‘এক রাষ্ট্র -এক রেশন কার্ড’, যার বিপদের দিকটা নিয়ে সজাগ থাকাটাও আমাদের কাজ। এসবের মধ্যে ভুলে যেন না যাই যে বাংলার মন্বন্তরের সময়েই আমাদের দেশে খাদ্যশস্যের গণবণ্টন ব্যবস্থা প্রথম চালু হয় ১৯৪৫ সালে এবং তারও আগে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির ‘ভুখ মিছিল’ প্রশাসনকে বাধ্য করে কলকাতার বুকে প্রথম রেশন দোকানগুলো চালু করতে।

পাদটীকা-

১) রেবা রায় চৌধুরী। জীবনের টানে, শিল্পের টানে। থীমা: কলকাতা, ১৯৯৯। পৃষ্ঠা ৫-১০

২) বিপ্লব মাজী। তেভাগা: মেদিনীপুরের সংগ্রাম। মনফকিরা: কলকাতা, ২০০৯। পৃষ্ঠা ৪৭-৫০

৩) রেবা রায় চৌধুরী। জীবনের টানে, শিল্পের টানে। পৃষ্ঠা ৯-১০

৪) জনযুদ্ধ, ২রা ফেব্রুয়ারি ১৯৪৪।

৫) কনক মুখোপাধ্যায়। নারী মুক্তি আন্দোলন ও আমরা। ন্যাশানাল বুক এজেন্সি: কলকাতা, ১৯৯৩। পৃষ্ঠা ৭৭

৬) রেণু চক্রবর্তী। ভারতীয় নারী আন্দোলনে কমিউনিস্ট মেয়েরা। মনীষা: কলকাতা, ১৯৮০। পৃষ্ঠা ৬৪

৭) রেণু চক্রবর্তী। ঐ। পৃষ্ঠা ৩৭

8) কনক মুখোপাধ্যায়। নারী মুক্তি আন্দোলন ও আমরা। পৃষ্ঠা ৬১-৬২

৯) রেণু চক্রবর্তী। ভারতীয় নারী আন্দোলনে কমিউনিস্ট মেয়েরা। পৃষ্ঠা ৪২

১০) রেণু চক্রবর্তী। ঐ। পৃষ্ঠা ৫০-৫২

১১) কনক মুখোপাধ্যায়। নারী মুক্তি আন্দোলন ও আমরা। পৃষ্ঠা ৭৪

১২) মণিকুন্তলা সেন। সেদিনের কথা। নবপত্র প্রকাশন: কলকাতা, ১৯৮২। পৃষ্ঠা ৬৯-৭০

১৩) রেবা রায় চৌধুরী। জীবনের টানে, শিল্পের টানে। পৃষ্ঠা ৯-১০

১৪) মণিকুন্তলা সেন। সেদিনের কথা। পৃষ্ঠা ৭০-৭২

মন্তব্য তালিকা - “অথ মন্বন্তর কথা”

  1. এই প্রসঙ্গে আরও একটু সংযোজন। বোধহয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না। সেইসময় ‘জনযুদ্ধ’ এবং ‘ ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়’ এই লাইন ঘোষণার জন্য তৎকালীন কম্যুনিস্ট পার্টিকে যখন ব্যাকফুটে যেতে হয়েছিল, এইসব জনসংযোগ মূলক কর্মসূচি তাদের জনসমর্থন ফিরে পেতে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল। পরবর্তী দুটো বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল তার প্রমাণ বহন করে।

    1. চিত্তপ্রসাদের ক্ষুধার্ত বাংলা বইটিও এ ক্ষেত্রে অনব্দ্য সংযোজন হতে পারতো।

  2. আমার মা-এর মুখে শুনেছি, “এট্টু ফ্যাণ দে”-র প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা।
    মেজমামা আর তাঁর কয়েকজন বন্ধু বেরোতে বিছানার চাদর নিয়ে বড়লোকেদের পাড়ায়। বলতেন, “দান চাই না। এই চাদরে কিছু একটা ফেলে দিন। কিছু নেই বাড়ীতে? একটু নুন ফেলে দিন।”

  3. চমৎকার লিখেছেন।বিমলা মাজিকে নিয়ে প্রকাশিত ব‌ই আমি স‍‌ংগ্ৰহ করে অনেককে দিয়েছি।আরো কিছু জানার অপেক্ষায় রইলাম।

  4. আমার মা’র কাছে শুনেছি, ঐ দুর্ভিক্ষ্যর সময় ঘরের দরজা-জানলা বন্ধ করে খেতে হতো, তবুও ঘরের বাইরে চারিদিকে ঘুরে ঘুরে,’মাগো এট্টু ফ্যান দ্যাও মা’ এরকম কাতর অনুনয় শোনা যেত।আর প্রায়ই দিন আমার মায়ের খাওয়া হ’ত না।

  5. চমৎকার।অনেক কিছু জানতে পারলাম।বিশেষ করে মেয়েদের আব্রু ঢাকতে বস্ত্রের সঙ্কট।
    ধন্যবাদ আপনাকে।

  6. এক বছর ধরে আমরা এক অভূতপূর্ব সময়ের মধ্যে দিয়ে যাপিত জীবন পার করছি, সেই চরম সংকটকালে তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের কথাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। দুর্ভিক্ষ আমি দেখিনি কিন্তু ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে এবং জানান দিয়েছে।
    লকডাউনের কারণে আমাদের চারপাশে বেশিরভাগ মানুষের কাজ নাই, খাওয়া জুটছে না। শাকসবজি, আলু, পেয়াজ, টমেটো, মরিচসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম হুহু করে বেড়েই চলছে। বারো তেরো শিশুরা স্কুল ছুট হয়ে ফল সবজি বিক্রি করার কাজে নেমে পড়েছে। কিশোরী মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং পাচারকারীরা হয়ে উঠছে সক্রিয়। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি বেশি দিন চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে ভাবতে গা শিউরে উঠে।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।