সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

হারিয়ে যাওয়া এক রাজধানী আর সমুদ্র গুপ্তের মোহর

হারিয়ে যাওয়া এক রাজধানী আর সমুদ্র গুপ্তের মোহর

বিশ্বজিৎ রায়

সেপ্টেম্বর ৫, ২০২০ ৩৪৩ ১৪

অতিমারীর খবরের ঘনঘটা চলছেই। ঘনঘটার বিরাম নেই আকাশের কালো মেঘমাখা বর্ষারও। আর বর্ষাকাল মানেই নতুন নতুন প্রত্নবস্তুর আবিষ্কারের সম্ভাবনা। কোথাও চূর্ণী নদীর বেহিসেবি কোমরের বাঁকের গভীরে ‘অ্যাম্ফোরা’ সহ বৌদ্ধ-তন্ত্রসাধনার নানা সামগ্রী আবিষ্কার; আবার কোথাও গভীর জঙ্গলের মধ্যে পাওয়া চওড়া প্রাচীর সহ এক দুর্গের প্রাচীন অবশেষ এর সাক্ষী হবার হাতছানি!

সত্যি, ভাবতেও অবাক লাগে এই ২০২০ সালের দুনিয়াতেও জলা জঙ্গলে লুকিয়ে আছে এমন এক রহস্যময় পুরাতাত্ত্বিক কেন্দ্র যা শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে আজও দিন গুনছে আবিষ্কারের আলোয় উদ্ভাসিত হবার। হ্যাঁ, এই সেই দেবলগড়। গাংনাপুর থানার দেবগ্রাম পঞ্চায়েত এর দেবলগড় প্রত্নক্ষেত্র দশকের পর দশক ধরে সাক্ষী থেকেছে এক রহস্যময় উদাসীনতার। বড় রহস্যময় আলো-ছায়া হিজল, জারুল, আকাশমণিতে ঢাকা এখানকার জঙ্গল আর মাটির ঢিবিগুলোর আনাচেকানাচে। মাটির আবডাল সরালেই এখানে বেরিয়ে পরে বহু শতাব্দী আগের নানা প্রত্নসামগ্রী। পুকুর কাটার সময়, বাড়িঘর তৈরির সময়, চাষের মাঠে কৃষকের লাঙলের ফলায় উঠে আসে বিরাট বিরাট মূর্তি, প্রাসাদের নক্সাদার পাথরের চাঁই, ধাতুর বুদ্ধমূর্তি, সোনা-রুপোর মুদ্রা, নানা আকার আয়তনের নক্সাদার ইট আরও কত কি!

ধাতব মুচলিন্দ বুদ্ধমূর্তি

বহু বছর আগে এই অজানার হাতছানিতে হারিয়ে যাওয়া দিয়ে শুরু হয়েছে যে অভিযানের, তার ফয়সালা হয়নি আজও। ঘর থেকে দু’পা ফেললেই মাড়িয়ে চলে যাই যে ইতিহাস কে, তার প্রকাশের জন্য শুরু করা লড়াই টাও তাই চলছেই। দেবলগড়কে মাঝে রেখে চারপাশের ১০-১২ কিলোমিটারের মধ্যে চষে বেড়িয়েছি বছরের পর বছর ধরে। দেখেছি কি নির্মম অবহেলায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে আমার দেশের ভূগোল-ইতিহাস। লড়াই এর প্রয়োজন টা সেদিন থেকেই বুঝতে পারা।

প্রথমদিকে অপরিচিত এক পাগল কে দেখে গ্রামের মানুষেরা মজা পেয়েছেন বিস্তর। ভাঙ্গা হাড়ি কলসি আর পুরোনো ইতিহাসের খোঁজ পরে তাদের করেছে কৌতূহলী। ২০১৪-১৫ নাগাদ ধীরে ধীরে পরিচয় হতে থাকে আশপাশের কিছু গ্রামবাসীর সাথে। স্থানীয় ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সচেতনতার প্রচার পুরোদমে আরম্ভ করতে পারি তখন থেকেই। কিন্তু কি করে বাঁচাবো অমূল্য এই প্রত্ননির্দশন গুলিকে? কি করে হবে এগুলোর সংরক্ষণ? নদিয়াতে তো নেই কোন জেলা সংগ্রহশালা, তবে? অথচ প্রতিদিন ধ্বংস হয়ে চলা এই প্রমাণ গুলিকে রাখতে না পারলে তো হারিয়ে যাবে সব তথ্য প্রমাণ, হারিয়ে যাবে ভবিষ্যৎ গবেষণার যাবতীয় সম্ভাবনা! তখন থেকেই পরিকল্পনা দেবলগড় মিউজিয়াম গড়ে তোলার। পরিকল্পনা একে আপনাদের সামনে তুলে ধরার।

অনেক বছর কেটেছে, বাংলার অন্যতম প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্র এই দেবলগড়কে জানতে চাওয়া হয়েছে প্রধান আকর্ষণ। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে শুধু গাংনাপুর থানার দেবগ্রাম পঞ্চায়েতের জঙ্গলেই নয়, সমসাময়িক সভ্যতা সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে। অনুসন্ধান ছড়িয়ে পড়েছে পাশের রানাঘাট থানার আনুলিয়া-গুড়পাড়া-বৃদ্ধকোল অঞ্চলেও।

পাওয়া গিয়েছে হরেক রকমের অজস্র মৃৎপাত্র। এগুলির কোনটি টকটকে লাল রঙের, কোনটির একদিক কালো তো অপর দিক লাল, কোনটি গাঢ় কালো রঙের প্রলেপযুক্ত তো আবার কোনটি মসৃণ এক আস্তরণযুক্ত। আকার আয়তন গড়নে নকশায় প্রত্যেকেই অপূর্ব সুন্দর। শুধু কি মাটির পাত্র, পাওয়া গিয়েছে পাথরের পাত্র, লকেট- দুল সহ প্রচুর terracotta beads, নকশা করা নানা আয়তনের অজস্র Sling Balls, অপূর্ব মীনপুচ্ছ জলপ্রদীপ। পাওয়া গিয়েছে ধাতব মুদ্রা, ধাতব মুচলিন্দ বুদ্ধমূর্তি। পাওয়া গিয়েছে দুর্লভ তারামূর্তি। পাওয়া গিয়েছে আরও হাফ ডজন প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি।

পুকুরের তলায়, বহু গভীর থেকে পাওয়া গিয়েছে অসাধারণ কারুকার্য খচিত স্ট্যাকোর বিশাল বিশাল খণ্ড, বৈভবযুক্ত স্থাপত্য অবশেষ। গ্রামগুলি থেকে পাওয়া গিয়েছে অসাধারণ নকশাযুক্ত মাকড়া পাথরের ব্লক। পাওয়া গিয়েছে আড়াই ফুট লম্বা থেকে শুরু করে ছয় ইঞ্চি মাপের বিভিন্ন মাপের ও কালপর্বের প্রচুর পরিমাণে ইটের নমুনা। ঠিক বাণগড়ের মতোই দেবলগড় প্রত্নক্ষেত্র এর ইটে বৃক্ষ, লতাপাতা সহ নানা অলঙ্করণ পাওয়া গিয়েছে।

আনুলিয়া- নন্দীঘাট- বৃদ্ধকোল-গুড়পাড়া অঞ্চল জুড়েই করা হয়েছে ক্ষেত্র অনুসন্ধান। এই অনুসন্ধান কে প্রথম থেকেই চালনা করা হয়েছে দুটি বিভাগে বিভক্ত করে। প্রথম বিভাগে অনুসন্ধান করা হয়েছে প্রাচীন নদীখাত গুলির। বিশ্লেষণ করা হয়েছে প্রাচীন জলনির্গমন প্রণালীর। এ কাজে আধুনিক উপগ্রহ চিত্রের সাহায্যে প্রাচীন নদীখাত গুলির অবস্থান, পরিত্যক্ত খাতগুলির অবস্থান, নদীখাত গুলির অতীত বিস্তার ও ঢাল পরিমাপ, সেগুলোর ভৌগলিক বিন্যাস চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণ হিসেবে প্রাপ্ত অজস্র নিদর্শন সমূহের অনুসন্ধান, প্রাপ্তি, সংরক্ষণের বিষয় টিকে পৃথক বিভাগের অন্তর্ভুক্ত করে ক্ষেত্র সমীক্ষা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

টেরাকোটা সিল

আনুলিয়া অঞ্চলে প্রাপ্ত পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন সমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল আদি ঐতিহাসিক কালের সুন্দর নকশাযুক্ত একাধিক মৃৎপাত্র, স্থাপত্য অবশেষ রূপে ছোট্ট ইটের (৬”/৬”১”) তৈরি দেওয়াল, ধূসর ও কালচে ধূসর রঙের অজস্র মৃৎপাত্র, বাটুল (designed Sling balls), মাছের লেজের নকশার লাল রঙের মৃৎপাত্র, চিরায়ত মূর্তি প্রভৃতি। আনুলিয়া অঞ্চলে বহু বছর আগে থেকেই পাওয়া গিয়েছে পাল-সেন যুগের কালো প্রস্তর বিষ্ণু মূর্তি, লক্ষণ সেনের তাম্রশাসন, মহাযানী সম্প্রদায়ের উপাস্য কালো পাথরের পদ্ম পাপড়ি চিত্রিত ধর্মচক্র। আজকে একথা প্রমাণিত যে, একাদশ-দ্বাদশ শতকে গঙ্গানদী প্রবহমান ছিল গুড়পাড়া-বৃদ্ধকোল অঞ্চলেরই মধ্যে দিয়ে। তারও বহু শতাব্দী আগে থেকেই এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে গড়ে উঠেছিল এক উন্নত সভ্যতার রূপরেখা, যা পাল-সেন যুগে উন্নতির শিখরে পৌছায়।

দেবলগড়-আনুলিয়া সমকালীন সভ্যতার ধাত্রী ভূমি। এক বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছিল এক উন্নত সভ্যতা সংস্কৃতির পর্যায়ক্রম যেখানে মরালী নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছিল দেবলগড়, অন্যদিকে গঙ্গানদীর ধারে বিবর্তিত হয়েছিল অতীতের অনলগ্রাম। আজও এই দুটি কেন্দ্রের মধ্যে দূরত্ব কমপক্ষে ২০ কি. মি। এ থেকেই বোঝা যায় কত বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বিকশিত হয়ে উঠেছিল বহু শতাব্দী ধরে চলা সভ্যতা সংস্কৃতি এবং এক্ষেত্রে সভ্যতার বিকাশ কেন্দ্র (cultural hearth) রূপে অবশ্যই তৎকালীন সমাজ-ধর্ম-অর্থনীতিতে উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছিল।

বিষ্ণু মূর্তি

সাম্প্রতিক গবেষণা ও ক্ষেত্রসমীক্ষা এগিয়ে চলার সাথে সাথে আবিষ্কৃত বহু পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন এই দুই কেন্দ্রের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগকে প্রমাণ করে। এই দুই কেন্দ্রেই পাওয়া গিয়েছে এমন বহু পুরাবস্তু যা আকার আকৃতি ও গঠন বৈশিষ্ট্যে হুবহু মিলে যায় (উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় লাল রঙের একপ্রকার বিশেষ মৃৎপাত্র দুটি স্থানেই বহু পাওয়া গিয়েছে। এই প্রকার মৃৎপাত্র গঠন বৈশিষ্ট্যে স্বকীয়। ছোট বড় নানা আয়তনের, উত্তম পলি নির্মিত মৃৎপাত্র গুলির ব্যবহার অজানা হলেও, ছড়ানো তলযুক্ত পাত্রগুলিতে হাতল তৈরি করা হয়েছিল মাছের লেজের অনুকরণে। এছাড়া দুটি স্থানেই বহু সংখ্যায় পাওয়া গিয়েছে ক্ষুদ্র চিরন্তনী (age less) মূর্তি। শুধু তাই নয় বিভিন্ন যুগ বা কালপর্বের পর্যায়ক্রমের দিক থেকেও এই দুই কেন্দ্রে সমরূপতা পরিলক্ষিত হয়।

এসেছেন ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক সর্বক্ষণের বিশেষজ্ঞরা, নিদর্শন সমূহ পরীক্ষা করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এর পুরাতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা কাল নির্ণয় করেছেন যা আমাদের নিয়ে যায় আজ থেকে প্রায় দেড়-দুই হাজার বছর আগে।

মাস খানেক আগে, অক্টোবরের শেষ দিকে আনুলিয়া গ্রামে, চূর্ণী নদীর ভাঙনের পাড়ে পাওয়া গিয়েছে এক অসাধারণ প্রত্নসম্পদ। এই আবিষ্কারের ফলে সমগ্র আনুলিয়া-দেবলগড় পুরাক্ষেত্রের গুরুত্ব ও বিবর্তনের ইতিহাস এক নতুন বাঁকে উপস্থিত হয়েছে।

কালো পাথরের ধর্মচক্র

গত মাসের শেষাশেষি, বর্ষার জল সরে যাবার পর নদীর দুপাশ ধরে ভূমিরূপের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ ও পুরাবস্তুর অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যেই সমীক্ষা চালানোর সময়েই নজরে আসে নদীর পূর্ব তীরের ক্ষয়জাত পাড়ের একটি স্থানে বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে ভাঙনের ফলে তৈরি হয়েছে খাড়া পাড়। পৃষ্ঠতল থেকে প্রায় ১০-১২ ফুট নিচে, ঝোপঝাড় জঙ্গলে ভরা সেই জায়গায় পৌছোনোই রীতিমতো ভয়াবহ। গাছের শিকড় ধরে জলের ঠিক পাশে পৌছে, খুঁটিয়ে দেখতেই নজরে আসে নানা গুপ্তধন। পাওয়া গিয়েছে বিভিন্ন আকারের ধূসর বর্ণের অনেকগুলি মৃৎপাত্র। সন্ধান মিলেছে অদ্ভুত আকার আয়তনের ইটের তৈরি এক লম্বা প্রাচীরের। ভাঙন জুড়ে যতদূর পরিমাপ করা সম্ভব হয়েছে, তাতে দেখা গেছে প্রাচীরটি ৩০ ফুটের বেশী দীর্ঘ, উচ্চতা প্রায় ৮-১০ ফুট। ইটের মাপ বর্গাকার ৬”/৬”, বেধ অত্যন্ত কম, হাফ ইঞ্চি প্রায়।

এর আগে আনুলিয়া-গুড়পাড়া-বৃদ্ধকোল অঞ্চলে নদীর পাড় ধরে পাওয়া গিয়েছে Rampart wall-এর মত দীর্ঘ ও উচ্চ ভূমিভাগ। দীর্ঘ নদীমঞ্চের মতো গঠনযুক্ত এই কাঠামো এই অঞ্চলের ব-দ্বীপ ভূমিরূপের সাথে সম্পূর্ণই বেমানান। যদিও Rampart wall-এর কোন স্থাপত্য কাঠামো বা নির্মাণ উপাদান এর আগে আবিষ্কৃত হয়নি। তবে কি সদ্য আবিষ্কৃত এই প্রাচীর কাঠামো নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা প্রাচীন নগরকেন্দ্রের অবশেষ? দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী পেরিয়ে সূর্যের আলো দেখা এই নগর কাঠামোর বিস্তার কতটা, কোন সময়ে এর গড়ে ওঠা, কতদূর বিস্তারিত হয়েছিল এর কালসীমা ?

দ্বিতীয় ও অপর চমকপ্রদ আবিষ্কারের মাধ্যমে উপরোক্ত প্রশ্নগুলির ওপর আলোকপাতের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ভাঙনের ঐ একই জায়গা থেকে পাওয়া গিয়েছে অসাধারণ গঠনশৈলীর এক ‘অ্যাম্ফোরা’। টকটকে লাল রঙের, প্রায় আড়াই ফুট উচ্চতার এই মৃৎপাত্র প্রত্নতত্ত্বের ভাষায় পাশ্চাত্যের অলঙ্করণ ও হাতলযুক্ত অ্যাম্ফোরা-এর অনুকরণে নির্মিত স্থানীয় নির্মাণ শৈলীর। এই Imitation of Amphora-এর আবিষ্কার আমাদের যেমন হতবাক করেছে, তেমনি দেবলগড় আনুলিয়া প্রত্নক্ষেত্রের এক অজানা দিকের উন্মোচন করেছে।

বাংলার চন্দ্রকেতুগড়ে ও পূর্ব মেদিনীপুরের দু-একটি প্রত্নক্ষেত্রে এর আগে এই বিশেষ মৃৎপাত্র আবিষ্কৃত হলেও নদিয়া জেলা তথা বঙ্গের এই অঞ্চলে এর আবিষ্কার সম্পূর্ণ প্রথম। বিশেষত রপ্তানির উদ্দেশ্যে নির্মিত এই সুরাপাত্রর আবিষ্কার নিঃসন্দেহেই এই সম্ভাবনা তুলে ধরে যে তৎকালীন বঙ্গের এই অংশেও বহির্বাণিজ্য বিস্তার লাভ করেছিল। সময়কাল গুপ্ত-পূর্ববর্তী, আনুমানিক তৃতীয়- চতুর্থ শতক।

উজ্জ্বল কালো আস্তরণ যুক্ত মৃৎপাত্র

মৃৎপাত্র সহ অ্যাম্ফোরাটি এখন সংরক্ষণ পর্বের পরে দেবগ্রামের সংগ্রহশালায় আপনাদের জন্য প্রদর্শিত। আজও চূর্ণী নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে উঁচু উঁচু ঢিবি যার কিছু অংশের উচ্চতা প্রায় ৮’-১০’। স্থানীয় কায়েৎ পাড়া-কাপালি পাড়া-বুদ্ধকোল অঞ্চলে নদীর তীরে রয়েছে প্রায় ৩০’ উঁচু রৈখিক বিন্যাসের মঞ্চ বিশেষ, যা প্রায় ৫০ মিটার চওড়া। ভূমিরূপ বিদ্যার আলোকে বলা যায়, গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের এই অংশে প্রাকৃতিক নদীমঞ্চ নিতান্তই অসম্ভব- তবে কি এই গঠনের সাথে কোন উন্নত নগর কেন্দ্রের সীমান্ত প্রাচীর (Rampart wall)-এর যোগ ছিল?

দেবলগড় প্রত্নক্ষেত্র থেকে বহুদিন আগে থেকেই মিলেছে সমুদ্র গুপ্তের একাধিক স্বর্ণমুদ্রা। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সংগ্রহে রয়েছে দেবলগড় থেকে পাওয়া গুপ্তযুগের বিরল ব্রাহ্মণী মূর্তি। দেবলগড় প্রত্নক্ষেত্র এর চারপাশের চওড়া পরিখা, Rampart-এর সাথে আবিষ্কৃত হয়েছে আর এক চমকপ্রদ নিদর্শন। পাশের মরালি নদী হয়ে ইছামতীর সাথে যোগ ছিল একেবারে রাজপ্রাসাদের পিছনের অংশের । গত ২৬/০১/২০১৯-এ আবিষ্কৃত হয়েছে নোঙর করবার কাজে ব্যবহৃত বিশেষ বৈশিষ্ট্যযুক্ত মাকড়া পাথরের ব্লক (Anchoring Stone)।

সন্দেহ ঘনীভূত হয়েছে। এই সুদৃঢ় দুর্গগঠন, ওয়াচটাওয়ার, পরিখা, উন্নত নৌ বাণিজ্য, সদা প্রস্তুত এক জলপথ পরিবহন এ সব তো সার্বভৌম কোন রাজশক্তি ছাড়া স্থানীয় সামন্তের কাজ হতে পারে না। খোঁজ শুরু হয় দেবল গড়ের ঠিকুজি কুলুজীর, পাওয়াও যায়। উঠে আসে রাজা বিক্রমজিতের নাম। সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতে থেকে জানা যায় পাল রাজা রামপালের কৈবর্ত বিদ্রোহ দমনে সাহায্যকারী এগারোজন রাজার অন্যতম ছিলেন দেবগ্রামের রাজা ছিলেন বিক্রমজিৎ।

তারপর কি হল? দেবগ্রামের পরিণতি কী হল? কেন এখানে দেবগ্রাম আনুলিয়া জুড়ে পাওয়া যায় অসংখ্য বিষ্ণু মূর্তি ? কেন মেলে সেন যুগের তাম্রশাসন? কেন এখানে বিষ্ণুমূর্তি আর ভাঙ্গা রাজপ্রাসাদে ছড়িয়ে আছে নির্মম ধ্বংসের চিহ্ন? কেন এখানকার লোককথায় জড়িয়ে আছে মুসলিম এক রাজার আক্রমণ ও বিজয়ের কাহিনীচিত্র? কেন আনুলিয়া-গুড়পাড়ায় মেলে একাধিক যোদ্ধার ইসলামি রীতির গোরস্থান? তবে কি এই গড় সাক্ষী এক বৃহৎ সংঘর্ষের? তাই এখানে প্রতিরক্ষার এই বিপুল আয়োজন? তবে কি এই দেবলগড় হারিয়ে যাওয়া কোন স্কন্ধাবার, কোন বিলুপ্ত রাজধানী? আবারও খোঁজ।

পথ দেখায় সেনরাজ সভাকবি ধোয়ীর পবনদূত। জানায় ত্রিবেণী সঙ্গম পেরিয়ে সমৃদ্ধশালী বিষ্ণু ও শিবের নগরী পেরিয়ে পৌছোনো সম্ভব সেনরাজার একই সাথে স্কন্ধাবার ও রাজধানী বিজয়পুরে।

দেবলগড়ই কি তবে সেই হারিয়ে যাওয়া রাজধানী বিজয়পুর? আজকেও তো ত্রিবেণী সঙ্গম পেরিয়ে, মদনপুর- শিমুরালির মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা বিলুপ্তপ্রায় যমুনা নদীর পাড় ধরে পৌছোনো যায় চাকদহের বিষ্ণুপুরে। যেখানে মিলেছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত বিষ্ণুমূর্তি, মিলেছিল প্রাচীন মন্দির স্থাপত্যের প্রত্ন অবশেষ। পৌছোনো সম্ভব শংকরপুর জনপদের পাশে আজকের জঙ্গলে ঘেরা দেবলগড়ে।

চ্যালেঞ্জ করে বহু যুগ লালিত এক ধারণা। নীহাররঞ্জন রায়, যজ্ঞেশ্বর চৌধুরীর মত বরেণ্য ঐতিহাসিকদের লেখনী যে বলে নবদ্বীপই প্রাচীন সেন রাজধানী। রাজা লক্ষণ সেনের সাথে এখানেই সংঘর্ষ হয়েছিল বখতিয়ার খিলজির! আবার খোঁজা।

দেখা হয় মিনহাজের তবকাৎ-ই-নাসিরি (রেভার্টি সাহেব ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অনুবাদ সমস্ত), আব্দুল মালিক ইসামীর ফুতুহ উস সালাতিন, আচার্য যদুনাথ সরকার, আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন, রমেশ চন্দ্র মজুমদারের, নলিনীকান্ত ভট্টশালীর বক্তব্য । মিনহাজের বিবরণের রাজধানীর গঠন নকশার সাথে মিলিয়ে দেখা হয় দেবলগড়ের নকসা (উল্লেখ করা হয় বাণগড় Excavation Report )।

দেখা যায় কেউই মতামত দেননি যে নবদ্বীপ ছিল সেন রাজধানী। পাওয়া যায়নি কোন পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন। অনেকের মতেই এটি তীর্থস্থান (বল্লাল ঢিবি ও সুর্বণবিহারে, আমডাঙার হরিহর ক্ষেত্রে মিলেছে তার প্রত্ন স্থাপত্য প্রমাণ)।

বিকল্প স্থানে বিজয়পুর সন্ধানের অনাবিষ্কার যেমন এই প্রচলিত ধারণাকে টিকিয়ে রেখেছে, তেমনি শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর পরবর্তী সময়ে চৈতন্য জীবনীকারদের স্থান মাহাত্ম্য বর্ণনে আমরা ‘নূদিয়াহ’ তথা নদিয়া কে নবদ্বীপের সাথে সমার্থক করেছি। দেখিনি ব্যরোজের মানচিত্র, দেখিনি তভারনিয়ের বর্ণনা। তবে জানতে পারতাম প্রাচীন সুরসাগর চক্রদহ ও তখন ‘নূদিয়াহ’।

মানচিত্রে তাকালেই আজও বোঝা যাবে নবদ্বীপ থেকে বিক্রমপুরে পৌছোনো লক্ষণ সেনের পক্ষে যতটা দ্রুত ও নিরাপদে হওয়া সম্ভব, দেবলগড়ের মরালি ও ইছামতী তাকে তুলনামূলকভাবে একবেলায় পূর্ববঙ্গে পৌছাতে সক্ষম। এটাই দেবলগড় প্রত্নক্ষেত্রের Geo political advancement, এজন্যই এত সুদৃঢ় নৌ-যোগাযোগ।

অপেক্ষা এখন উৎখননের। অপেক্ষা নতুন সত্য উদঘাটনের মধ্যে দিয়ে ইতিহাসের নব অধ্যায়কে বরণের। বড় রহস্যময়তা এখানকার পলাশ – জারুল – হিজলের অরণ্য আর মাটির উঁচু উঁচু ঢিবিগুলিতে। জঙ্গলে ঢাকা সুউচ্চ ‘ওয়াচ টাওয়ার’ আর গভীর পরিখা দিয়ে ঘেরা গড়ের ভিতরের পুকুর, বিরাট প্রাসাদের অবশেষ মিলেমিশে এক রহস্যময় আলোছায়া। এ রহস্যের অবগুণ্ঠন উন্মোচনে, এ রোমাঞ্চের সাথী হতে পাশে চাইছি আপনাদেরও।

ফুলদানি জাতীয় ভগ্ন মৃৎপাত্রের গায়ে নারীমূর্তি

সহায়ক গ্রন্থসূচী:

‌‍¤ ‘Ancient Monuments of Bengal by Public Works Dept., Bengal Secretariat Pres, Govt. of India, Calcutta, 1896.

¤ ‘ নদীয়া কাহিনী ‘, কুমুদনাথ মল্লিক, কলিকাতা, 1912।

¤ ‘Handbook to the Sculptures in the museum of the Bangiya Sahitya Parishad, Manomohan Ganguly, Bangiya Sahitya Parishad, Calcutta,  1922, pp- 85.

¤ ‘পবনদূতম’, চিন্তাহরণ চক্রবর্তী,  সাহিত্য পরিষৎ সিরিজ: সংস্কৃত সাহিত্য পরিষদ, কলিকাতা,  1926।

¤ ‘Inscriptions of Bengal, Vol. III,  (ed.), N.G.Majumder,  Varendra Research Society, Rajsahi, Bangladesh, 1929.

¤ ‘Some Historical Aspects of the Inscriptions of Bengal ‘, Benoychandra Sen, University of Calcutta, 1942, pp- 222.

¤ ‘History of Bengal ‘, Vol.II, (ed.),  Jadunath Sarkar, B.R. Publishing Corporation, Delhi, 1943, pp- 5.

¤ ‘Studies in the Geography of Ancient and Medieval India’, Dinesh Chandra Sircar,  Motilal Banarsidass Pvt., Delhi, 1960.

¤ ‘History of Ancient Bengal ‘, Ramesh ch. Majumder, G. Bharadwaj & Co., Calcutta,  1971.

¤  ‘নদীয়া জেলার পুরাকীর্তি ‘, (সম্পাদিত), মোহিত রায়, পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট,  বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েট প্রেস, পশ্চিমবঙ্গ সরকার,  কলিকাতা,  1975।

¤ ‘বাঙালির ইতিহাস ‘, আদি পর্ব, প্রথম খণ্ড, নীহাররঞ্জন রায়, পশ্চিমবঙ্গ নিরক্ষরতা দূরীকরণ সমিতি,  কলকাতা, 1980, পৃষ্ঠা-490।

¤ ‘ বাঙলার ইতিহাস ‘, ( সম্পাদিত), রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়, দে’জ পাবলিশিং, কলিকাতা, 1981, পৃষ্ঠা- 338।

¤ ‘গঙ্গারিডি: আলোচনা ও পর্যালোচনা ‘, নরোত্তম হালদার,  দে বুক স্টোর্স, কলিকাতা, 1988।

¤ ‘ বিলুপ্ত রাজধানী ‘, উৎপল চক্রবর্তী,  অমর ভারতী, কলকাতা, 1990, পৃষ্ঠা- 88।

¤ ‘কাঁদে মরালি কাঁদে যমুনা ‘, সুনীল কুমার দে, লঘুছন্দা প্রকাশনী, চাকদহ, নদীয়া, 1995।

¤ ‘মধ্যযুগের ভারতীয় শহর ‘, অনিরুদ্ধ রায়,  আনন্দ প্রকাশনী,  কলকাতা,  1999, পৃষ্ঠা- 131, 132।

¤ ‘Archaeological Geography of the Ganga Plain, The Lower and the Middle Ganga’, Dilip kumar Chakraborty,  Permanent Black, Delhi, 2001.

¤ ‘ একটি বিস্মৃত রাজধানী বিজয়পুর: নওদিয়াহ: নবদ্বীপ ‘, যজ্ঞেশ্বর চৌধুরী, নবদ্বীপ পুরাতত্ত্ব পরিষদ, নবদ্বীপ, 2004।

¤ ‘ The Changing Face of Bengal: A Study  in Riverine Economy ‘ , Radhakamal Mukherjee,  University of Calcutta, Calcutta,  2009.

¤ ‘ Chandraketugarh- Rediscovering a missing link in Indian History ‘, (ed.), A Synoptic Collection of Three Research by the SandHi Group, IIT Kharagpur, 2013.

¤ ‘বাড়ির পাশে দেবলগড় : এক বিলুপ্ত সভ্যতার পদচিহ্ন ‘, বিশ্বজিৎ রায়,  ‘ইতিহাস ও সাহিত্য প্রবন্ধমালা’, ( সম্পাদিত), বাংলার পুরাতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্র,  কলকাতা, 2018। 

¤ ‘Debagram: A new destination in the archaeo- tourist map of West Bengal, Dr. Keka Adhikary Banerjee,  Monthly Bulletin, July, Vol. XLVII No. 07, The Asiatic Society , Kolkata, pp- 09.

 Web References:

● Nandi Sandhyakar, retrived from

https://archive.org/details/in.ernet.dli.2015.511308/mode/2up

● ‘ Tabakat I Nasiri, Translated by H.G. Raverty, 1873, retrieved from:

https://archive.org/details/in.ernet.dli.2015/page/n25/mode/2up

● অন্নদামঙ্গল, রায় গুণাকর ভারতচন্দ্র, 1853, retrieved from:

http://dli.serc.iisc.ernet.in/bitstream/handle/2015/290841/annadamangal1853.

মন্তব্য তালিকা - “হারিয়ে যাওয়া এক রাজধানী আর সমুদ্র গুপ্তের মোহর”

    1. এ এক রহস্য । উদাসীনতা, অবহেলা এই বোধহয় আমাদের ঐতিহ্য ।
      দেখা যাক, ক্ষুদ্র এই প্রচেষ্টা কতদিনে সফল হয়। আপনাদের সকলের সহযোগিতা কাম্য । ভালো থাকুন ।

    1. অবশ্যই । এখনো পর্যন্ত যা প্রত্নপ্রমাণ পাওয়া গিয়েছে, তার ভিত্তিতে বলা যায় গুপ্ত পূর্ববর্তী সময় থেকে পাল- সেন যুগ হয়ে সুলতানি আমল পর্যন্ত সময়ে এক ধারাবাহিক সভ্যতার বিকাশ এই অঞ্চলে ঘটেছিল ।

    1. সেন রাজধানী বিজয়পুর ছিল এই দেবলগড়, যেখানে আক্রমণ করেন বখতিয়ার খিলজি। নবদ্বীপ কে ঘিরে দীর্ঘ দিন ধরে চলা ধারণার ও পরির্বতন প্রয়োজন । উৎখননের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এর সময় হয়েছে ।

  1. আরো বিশদে জানার ইচ্ছা এ বিষয়টি।সরকারের প্রত্নতত্ত্ববিভাগের,এসবের যথাযথ সংরক্ষন করার কথা জানি।করলে তা কিভাবে করেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা,জানার কৌতূহল হয়।

    1. সড়কপথে চাকদহ বা রানাঘাট থেকে গাংনাপুর থানার দেবগ্রাম পঞ্চায়েত এর দেবলগড় ।
      রেলপথে রানাঘাট- বনগাঁ লাইনে গাংনাপুর স্টেশন এ নেমে দেবগ্রাম নতুন পোস্ট অফিস ।
      ধন্যবাদ ।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।