সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

আম্বেদকার ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদ

আম্বেদকার ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদ

কুণাল চট্টোপাধ্যায়

সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২০ ৭৬৭

আমার প্রবন্ধের এই আপাত নিরীহ শিরোনামটি কিন্তু বস্তুত রীতিমতো বিপত্তিপূর্ণ। তার কারণ এক্ষেত্রে প্রথম প্রশ্ন হল, একটি মাত্র ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অস্তিত্বই কি ইতিহাসে দেখা যায়, আর যদি তা-ই হয় সেক্ষেত্রে সেই জাতীয়তাবাদ কি গোটা ভারতবর্ষ জুড়েই বিরাজমান ছিল। বর্তমান সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনাটিতে আমি এ বিষয়ে কয়েকটি মূল বিষয়কেই শুধু ছুঁয়ে যেতে পারি। সুতরাং একেবারে গোড়াতেই বলা যাক যে আম্বেদকরের সঙ্গে যখন গান্ধী-নেহরুর তুলনা করার কথা বলা হয় তখন তার মধ্যে কী ধরনের সমস্যা জড়িত থাকে। একটি স্তরে এর মাধ্যমে বলতে চাওয়া হয় যে আম্বেদকরকে একক একজন ব্যক্তিত্ব হিসেবে জানা ও বোঝা সম্ভব নয়। আর আরেকটি স্তরে এর মাধ্যমে অনবহিত পাঠককে (যার অর্থ বর্ণহিন্দু ও অন্যান্য অ-দলিত পাঠক, যা আমি এই প্রবন্ধের পরবর্তী অংশে দেখাতে পারব বলে আশা করি) বলতে চাওয়া হয় যে মূলধারার জাতীয়তাবাদ নামক বৃহত্তর সত্তাটির ইতিহাসে আম্বেদকর একটি পাদটীকা মাত্র, কিংবা বড়জোর তার আংশিক সমালোচক। সাম্প্রতিক কালে এই প্রবণতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ সম্ভবত একদিকে আম্বেদকরের বিরুদ্ধে শৌরির আক্রমণ এবং অন্যদিকে অ্যানাইহিলেশন অফ কাস্ট বইটিকে কেন্দ্র করে নবায়ন-অরুন্ধতী রায় পর্ব। 

কিন্তু এই আধিপত্যকারী সন্দর্ভটি সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার জন্য আমাদের ফিরে যেতে হবে আম্বেদকরের সময়ে এবং তারও আগে। ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অন্দরে বিভিন্ন ধরনের বৈচিত্র্য থাকতেই পারে। কিন্তু উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদ থেকে শুরু করে গান্ধীবাদী ও নেহরুবাদী ধাঁচা পর্যন্ত সব ধরনের জাতীয়তাবাদই উচ্চবর্গীয়দের হাতে নির্মিত। এই নির্মাণ প্রক্রিয়ায় ভারতবর্ষ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির আবশ্যিক উপাদান হল অতীতের পুনর্নির্মাণ এবং সে বিষয়ে জাতীয়তাবাদের বিভিন্ন বয়ানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। স্থানাভাবের কারণে আমি এখানে নেহরুর ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া থেকে সংক্ষেপে কিছু মন্তব্য তুলে ধরব। বর্ণ-ব্যবস্থার উৎপত্তি সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য এই: 

“বিভিন্ন জাতির মধ্যে এই দ্বন্দ্ব ও আদানপ্রদানের মধ্যে থেকেই ক্রমশ বর্ণ-ব্যবস্থার জন্ম হয়, পরবর্তী বহু শতাব্দী ধরে তা ভারতীয় জীবনে গভীর প্রভাব ফেলবে। … পরবর্তী কালে তার ধারার মধ্যে অবক্ষয় দেখা দেয়, এবং আজও এটি একটি ভার ও একটি অভিশাপ রূপে বর্তমান, তবে উত্তরকালের মাপকাঠিতে কিংবা পরবর্তীকালে তার ক্রমবিকাশের যে ধারা তার ভিত্তিতে এই ব্যবস্থাকে আমরা বিচার করতে পারি না।” [পৃ. ৮৪-৮৫] এরপর নেহরু বিষয়টি নিয়ে বিশদে ও নির্দিষ্টভাবে আলোচনা করেছেন, কিন্তু সেই আলোচনা থেকে মোটের উপর তিনটি বক্তব্য উঠে আসে:

১. অন্যান্য দেশেও এ জাতীয় বিভেদের অস্তিত্ব ছিল (যার ফলে সম্ভবত ভারতবর্ষ ও অন্যান্য দেশ উভয় ক্ষেত্রেই অত্যাচারী উচ্চবর্গীয়রা বেকসুর খালাস পেয়ে যায়)।

২. ভারতীয় মনন অসাধারণ বিশ্লেষণী শক্তির অধিকারী, আর সেই কারণেই ব্রাহ্মণদের প্রতি এহেন সম্ভ্রম প্রদর্শন।

৩. কিছু সংখ্যক ব্রাহ্মণ দুর্নীতিপরায়ণ ও অসৎ হতে পারেন, কিন্তু ব্রাহ্মণদের জনসেবার নজির এবং জনহিতের জন্য তাঁদের ব্যক্তিগত আত্মত্যাগ তাঁদের জনগণের চোখে শ্রদ্ধার অধিকারী করে তুলেছিল।

এই বইয়ের পরবর্তী অংশে নেহরু মত প্রকাশ করেছেন যে অস্পৃশ্যদের একটি ক্ষুদ্র অংশকে বাদ দিলে বাকিদের জন্য বর্ণ-ব্যবস্থা বিষয়টি নেহাত খারাপ ছিল না। এমনকী তা সমাজে গণতন্ত্রের অস্তিত্বকেও অনুমোদন করত। কিন্তু একথাও আমাদের জানানো হয়েছে যে আজকের দিনে বর্ণ-ব্যবস্থা বা জাতপাত নিঃসন্দেহে খারাপ। কাজেই অপেক্ষাকৃত রক্ষণশীল অংশগুলির সঙ্গে নেহরুর পার্থক্য এখানেই যে বর্তমান সম্পর্কে তিনি সমালোচকের অবস্থান নিয়েছেন, কিন্তু জাতির অতীতে বর্ণ-ব্যবস্থার ইতিবাচক মূল্যায়ন তাঁর এই অবস্থানকে অনেক দূর ক্ষুণ্ণ করে।

জাতি ও জাতীয়তাবাদের স্বরূপ প্রসঙ্গে নেহরুর বক্তব্য হল: “হিন্দু জাতীয়তাবাদ ভারতের মাটিতে স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে উঠেছে, কিন্তু ধর্মীয় বা ধর্মমত প্রসূত পার্থক্যের ঊর্ধ্বে যে বৃহত্তর জাতীয়তাবাদ, এই হিন্দু জাতীয়তাবাদ অবধারিতভাবে তার পথে বাধার সৃষ্টি করে।” [পৃ. ২৭২]  

তিনি এই হিন্দু জাতীয়তাবাদের সন্ধান পেয়েছেন মারাঠা সাম্রাজ্যে এবং সামগ্রিকভাবে গোটা জাতির প্রতিও গভীর অনুরক্তি সেখানে তাঁর চোখে পড়েছে। এ বিষয়ে তিনি ওয়ারেন হেস্টিংসের সাক্ষ্য উদ্ধৃত করেছেন। এক্ষেত্রে নজর কাড়ার মতো বিষয়টি হল এর সামান্য পরেই তিনি উল্লেখ করেছেন যে হায়দার ও টিপুর নেতৃত্বাধীন মহীশূর ব্রিটিশ শক্তির সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল এবং মহীশূর একটি সর্বভারতীয় ব্রিটিশ-বিরোধী জোট গড়ে তোলার চেষ্টা করলে মারাঠাদের তরফ থেকে সে বিষয়ে কোনও সাড়া মেলেনি। কিন্তু মারাঠাদের এহেন ভূমিকা এবং তাঁর তাদেরকে জাতীয় লক্ষ্যসম্পন্ন একমাত্র জনসম্প্রদায় হিসেবে চিহ্নিত করার মধ্যে তিনি স্পষ্টতই কোনও স্ববিরোধ দেখেননি। এরপর তিনি উল্লেখ করেছেন যে ১৮১৮ সালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে মারাঠাদের পরাজয়ের ফলে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার অবসান ঘটে। [পৃ. ২৭৫]

ইতিহাসের এই বিশেষ পুনর্নির্মাণটির খামতিগুলিকে তুলে ধরা এখানে আমার একমাত্র বা প্রাথমিক উদ্দেশ্য নয়। বরং আমি এই পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়ার মধ্যে নিহিত একটি বিশেষ ধারণার প্রতি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। ধারণাটি এই যে ভারতবর্ষে সে সময়েই একটি জাতির অস্তিত্ব ছিল এবং মারাঠাদের সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সংঘর্ষের মধ্যে সোজাসাপটাভাবে জাতির সঙ্গে ঔপনিবেশিক শক্তির সংঘর্ষেরই প্রতিফলন ঘটেছে। কাজেই এই প্রক্রিয়াটি নিয়ে আলোচনা করার সময় ইতিহাসকে সরলীকৃত করে তাকে জাতির পক্ষাবলম্বীদের সঙ্গে ঔপনিবেশিক শক্তির পক্ষাবলম্বীদের সংঘর্ষে পরিণত করা হয়। বর্তমান আলোচনার এই পর্যায়ে একটি বিশেষ ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। ঘটনাটি হল কোরেগাঁওয়ের যুদ্ধ, তারিখ ১ জানুয়ারি ১৮১৮। এই যুদ্ধে কোম্পানির ৮৩৪ জন মতো সৈন্য পেশোয়ার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাওয়ের বাহিনীতে ঘোড়া ছিল ২০,০০০, আর পদাতিক সৈন্যের সংখ্যা ছিল ৮,০০০, তবে গোটা বাহিনীকেই হয়তো এই যুদ্ধে নিয়োজিত করা হয়নি। কিন্তু বারো ঘণ্টা ধরে যুদ্ধ চলার পর পেশোয়ার বাহিনী পিছু হটে এবং তৃতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধে মারাঠারা যে শেষ পর্যন্ত হেরে যায় তার মূল কারণ এই পশ্চাদ্‌পসারণ। কোম্পানির সৈন্যদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন মাহার সম্প্রদায়ের মানুষ। অতীতে শিবাজী তাঁর বাহিনীতে এই মাহারদের ব্যাপকভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন। কিন্তু উগ্র ব্রাহ্মণ্যবাদী পেশোয়াদের আমলে মাহার ও অন্যান্য জাতের মানুষরা প্রবল নিপীড়নের শিকার হন। এ প্রসঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে যে পেশোয়াদের শাসনকালে পুনাতে ঢোকার সময় অস্পৃশ্য জাতির মানুষদের বা অচ্ছুতদের পিঠে একটি ঝাঁটা বেঁধে রাখতে হত, যাতে পথের উপর নিজেদের পায়ের ছাপ সাফ করতে করতে তাঁরা এগোতে পারেন, আর থুতু ফেলার জন্য তাঁদের গলায় ঝুলত একটি পাত্র।  

পেশোয়াদের শাসন যে সেভাবে জাতীয় চরিত্র অর্জন করে উঠতে পারেনি তার জন্য সমানভাবে দায়ী এই ব্রাহ্মণ্যবাদী আধিপত্য এবং মারাঠা সাম্রাজ্যের বাইরের অঞ্চলগুলিতে মারাঠাদের দস্যুবৃত্তি ও লুঠতরাজ। বর্গি হাঙ্গামা বাংলাকে কীভাবে বিধ্বস্ত করেছিল তা বাঙালি সমাজের লোকস্মৃতিতে এখনও ধরা আছে। আর এই বর্ণভেদ প্রথার ফলেই ব্রিটিশদের সেনাবাহিনীতে চাকরি মাহারদের কাছে জাতীয়তাবাদের তুলনায় অনেক বেশি মূল্যবান হয়ে উঠেছিল। তার কারণ সেই জাতীয়তাবাদের বক্তব্য হল, ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটলে তবেই অনগ্রসর শ্রেণিগুলির তথাকথিত সামাজিক উন্নয়নের প্রক্রিয়া শুরু হওয়া সম্ভব এবং সেই উন্নয়ন প্রক্রিয়াকেও যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে তা আম্বেদকারের মতো মাহার সম্প্রদায়ের নেতাদের আদপেই গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়নি।

মাহারদের ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা হয় একশো বছরের কিছু বেশি সময় ধরে (১৭৫০ সাল থেকে ১৮৯৩ সাল পর্যন্ত) এবং এই সময়কালটি তাঁদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই কর্মজীবন তাঁদের অনেকের সামনেই উন্নততর আয় এবং শিক্ষার সুযোগ খুলে দিয়েছিল। তার ফলে পরবর্তী কালে সেনাবাহিনীতে পুনর্বহাল হওয়ার জন্য তাঁরা দীর্ঘদিন লড়াই চালিয়েছিলেন। আমরা জানি যে আম্বেদকার স্বয়ং এক মাহার সৈনিকের পুত্র। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর আইনকানুনে জাতপাতভিত্তিক বৈষম্যকে একেবারে নির্মূল করা না-হলেও তাকে অনুমোদনও করা হত না।

অস্পৃশ্যতার পূর্ণ অভিঘাতটি জীবনে প্রথমবার যে ঘটনার মধ্যে দিয়ে আম্বেদকার হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন তার কথা তিনি তাঁর পাঠকদের জানিয়েছেন:

প্রথম যে ঘটনাটার কথা আমার মনে আছে এবং যেটার কথা আমি লিখছি সেটা ঘটেছিল ১৯০১ সাল নাগাদ, আমরা তখন থাকতাম সাতারায়। গরমকালে একদিন আমি, আমার দাদা ও আমার ভাইপো আমাদের বাবার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলাম, তিনি গোরেগাঁওতে ক্যাশিয়ারের চাকরি করতেন। ট্রেনে করে আমরা পাদালি স্টেশনে এসে নেমেছিলাম। আমাদের আসার কথা জানিয়ে যে চিঠি দেওয়া হয়েছিল সেটা কোনও কারণে বাবা সময় মতো পাননি, কাজেই স্টেশনে তিনি আমাদের নিতে আসতে পারেননি। বেশ কয়েক ঘণ্টার দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর অপেক্ষার পর বিস্তর মেহনত করে আমরা সেখানকার বর্ণহিন্দু স্টেশন মাস্টারকে আমাদের জন্য একটা গোরুর গাড়ির বন্দোবস্ত করে দেওয়ার ব্যাপারে রাজি করাতে সমর্থ হয়েছিলাম এবং তারপর গোরেগাঁওয়ের পথে রওনা দিয়েছিলাম। গোরুর গাড়িটা তখন বোধহয় কয়েক গজও এগোয়নি, ইতিমধ্যে আমাদের গাড়ির ধর্মভীরু ও বর্ণহিন্দু গাড়োয়ানটি টের পেয়ে গেলেন যে তাঁর গাড়িতে যে ধোপদুরস্ত জামাকাপড় পরা ছেলেগুলো উঠেছে তারা আসলে ঘৃণ্য অচ্ছুত এবং যারপরনাই ক্রুদ্ধ হলেন! রাগের চোটে তিনি আমাদের স্রেফ ময়লার ঝুড়ি ওলটানোর মতো করে রাস্তায় ঠেলে ফেলে দিলেন, কারণ তাঁর মনে হয়েছিল যে আমরা তাঁর কাঠের গাড়িটাকে অপবিত্র করে দিয়েছি এবং তাঁর পবিত্র প্রাণীটিরও বিশুদ্ধতা নষ্ট করেছি।

আমাদের মতো যাঁরা দুশো বছর ধরে সুবিধাভোগী বাঙালি ভদ্রলোক, এই যেমন যাঁরা চট্টোপাধ্যায় পদবীধারী, তাঁদের পক্ষে জাতীয়তাদের এমন একটি আখ্যান নির্মাণ করা খুব সহজ যার মধ্যে সুনির্দিষ্ট পারম্পর্য আছে, সেই আখ্যানের যুক্তিতে নিম্নবর্ণের মানুষদের পশ্চাৎপদ অবস্থার সমস্যাটি অতিক্রম করা ‘স্বাভাবিকভাবেই’ সময়সাপেক্ষ কাজ। এ জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি একজন মাহারের কাছে কেন প্রকৃতপক্ষে তার সম্প্রদায়কে স্থায়ীভাবে নিপীড়িত অবস্থানে রেখে দেওয়ারই নামান্তর, তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

আম্বেদকার যেভাবে ব্রিটিশ শাসনকে দেখেছেন তার সঙ্গে উচ্চবর্গীয় জাতীয়তাবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্যের কারণটি এখানেই নিহিত। তাঁর জাতীয়তাবাদের চেহারার সঙ্গে গান্ধী, প্যাটেল বা নেহরুর জাতীয়তাবাদের আকৃতিগত পার্থক্যের কারণও এখানেই লুকিয়ে আছে। আম্বেদকার তাঁর অ্যানাইহিলেশন অফ কাস্ট-এ জোরের সঙ্গে জানিয়েছেন যে স্মৃতি ও শাস্ত্র ধর্মের মূর্ত রূপ নয়, বরং এমন একটি নিয়মতন্ত্র যা অচ্ছুতদেরকে তাঁদের ন্যূনতম চাহিদাগুলি থেকে পর্যন্ত বঞ্চিত করে এবং সমাজে তাঁদের সমমর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার দেয় না। সুতরাং তাঁর মতে, এহেন যে ধর্ম অচ্ছুত হিসেবে চিহ্নিত তাঁর নিজের জনসম্প্রদায়ের প্রতিই বৈষম্যমূলক আচরণ করে তাকে নির্মূল করার কথা বলতে কোনও দ্বিধা থাকার কথা নয় এবং এহেন ধর্মকে নির্মূল করার লক্ষ্যে কাজ করা কোনও অধার্মিক কর্ম নয়।

এই দৃষ্টিভঙ্গিটি স্পষ্টতই সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের একটি দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে ব্রিটিশদের সঙ্গে তাঁর নিজস্ব শর্তে দর কষাকষি করার প্রণোদনা জুগিয়েছিল। সেই শর্তগুলি উচ্চবর্গীয় জাতীয়তাবাদীদের শর্তাবলির থেকে একেবারেই আলাদা।

এই প্রবন্ধে আমার পরবর্তী উদ্দেশ্য আম্বেদকারের নিজস্ব কাজকর্ম ও তার কারণগুলির দিকে দৃষ্টিপাত করা নয়। আমি বরং তাকাতে চাই আম্বেদকার বিষয়ক জাতীয়তাবাদী সন্দর্ভগুলির দিকে।

আম্বেদকারের প্রতি গান্ধীর অবস্থান মূলগতভাবেই প্রতিকূল ছিল। আম্বেদকারের অবস্থানটি ছিল এই যে অনগ্রসর শ্রেণিগুলির মুক্তির পথ উচ্চবর্গীয়দের উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া নির্দেশিকা মেনে এগোতে পারে না এবং সে মুক্তি বাধ্যতামূলকভাবে হিন্দুধর্মের মধ্যেই ঘটতে হবে এমন কোনও কথা নেই। কাজেই যে গান্ধী বছরের পর বছর ধরে মালব্য ও অন্যান্য হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের সহ্য করেছেন, তিনি এহেন একটি অবস্থান মেনে নিতে আদপেই ইচ্ছুক ছিলেন না। অ্যানাইহিলেশন অফ কাস্ট-এর প্রতি তাঁর প্রতিক্রিয়া এবং অন্যান্য ঘটনায় আম্বেদকারের প্রতি তাঁর প্রতিক্রিয়ার ব্যাখ্যা এখানেই নিহিত আছে। প্রথমটি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে এই অন্যান্য ঘটনায় প্রতিক্রিয়াগুলির মধ্যে দুটির কথা মনে করা যেতেই পারে। একটি অবশ্যই অনগ্রসর শ্রেণিগুলির (Depressed Classes) জন্য পৃথক নির্বাচনী কেন্দ্রের প্রস্তাবে তাঁর বিরোধিতা। পরবর্তী কালের জাতীয়তাবাদী ভাষ্যকাররা এই ঘটনাটিকে কোন দৃষ্টিতে দেখেছেন তা আমি পরে আলোচনা করব। এখানে আমার কাছে যা তাৎপর্যপূর্ণ তা হল গান্ধী এই প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে অনশনে বসেছিলেন, কিন্তু মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনী কেন্দ্রের ব্যবস্থার বিরোধিতা করেননি। অন্যভাবে বলতে গেলে কোনও ‘লিবারাল-গণতান্ত্রিক’ অবস্থান থেকে তিনি অনগ্রসর শ্রেণিগুলির জন্য পৃথক নির্বাচনী কেন্দ্রের ব্যবস্থার বিরোধিতা করেননি। অর্থাৎ প্রতিটি ব্যক্তিই সমান এবং সকলকেই শুধুমাত্র নাগরিক হিসেবে দেখা প্রয়োজন, এহেন কোনও অবস্থান তাঁর এই বিরোধিতার মধ্যে নিহিত ছিল না। এ বিষয়ে আমি অজানা কোনও কথা বলছি না, কিন্তু এর তাৎপর্যগুলি অবশ্যই চিহ্নিত করা দরকার। হিন্দুদের মধ্যে সর্বাধিক নিপীড়িত অংশটিকে তাদের নিপীড়কদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে তাঁর আপত্তি ছিল। আর তাদের সমস্যাগুলির যে সমাধান গান্ধীর কাছে ছিল তা রাজনৈতিক ও সামাজিক উভয় স্তরেই রীতিমতো দুর্বল। রাজনৈতিক স্তরে সাধারণ বর্গের ভোটারদের নিয়ে সংরক্ষিত আসন গঠন করার অর্থ ছিল দলিতদের স্বার্থকে ব্যাহত করা। এরপরেও দীর্ঘদিন পর্যন্ত শুধুমাত্র বর্ণহিন্দু নেতৃত্বের দ্বারা অনুমোদিত দলিতরাই ভোটাধিকার পেতেন এবং তা সত্ত্বেও তাঁদের নিকৃষ্টতর জীব হিসেবেই গণ্য করা হত। গান্ধীর সামাজিক সংস্কারের মধ্যে অবশ্যই অস্পৃশ্যতা দূরীকরণের ডাকও ছিল, কিন্তু অস্পৃশ্যদের জন্য সেই তথাকথিত সংস্কারের অন্যতম অংশ ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদী বিধি আরোপ। আমি এখানে দেখাতে চাই যে দক্ষিণপন্থী বা বামপন্থী ইতিহাসবিদরা প্রায় কেউই বিষয়টির এই মাত্রাটিকে তার যথার্থ আলোকে দেখেননি।

আম্বেদকারের প্রতি গান্ধীর অবিশ্বাসের মনোভাব পরবর্তী কালেও অক্ষুণ্ণ ছিল। আম্বেদকারের মনে হয়েছিল যে তাঁকে পুনা চুক্তি মেনে নিতে বাধ্য করা হয়েছে। এই চুক্তির প্রতি তাঁর সমালোচকের অবস্থানের ফলে তাঁকে প্রবল কুৎসার শিকার হতে হয়েছিল। তাঁর জনৈক জীবনীকারের বক্তব্য অনুযায়ী:

আম্বেদকার তখন ভারতবর্ষে ঘৃণ্যতম ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। তাঁকে অশিষ্ট, দুর্বিনীত, অতিরিক্ত উদ্ধত এবং মানবিক বিবেচনাশূন্য জাতীয় অপবাদে চিহ্নিত করা হয়। তাঁকে মূর্তিমান শয়তান হিসেবে তুলে ধরা হয়, জনগণের পক্ষে প্রধান বিপদ হিসেবে তাঁকে শাপশাপান্ত করা হয় এবং প্রতিক্রিয়াশীল, ব্রিটিশ সরকারের দালাল, দেশের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতাকারী হিসেবে তাঁর নিন্দা করা হয়। [কির]

১৯৪৬ সালে গান্ধী প্যাটেলকে একটি চিঠিতে লেখেন; মূল সমস্যাটি আম্বেদকারকে নিয়ে। আমি বুঝতে পারছি যে তার সঙ্গে যে কোনও রকম বোঝাপড়ায় যাওয়া বেশ ঝুঁকির কাজ, কারণ সে আমাকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে তার কাছে সত্য আর অসত্যের মধ্যে কিংবা হিংসা আর অহিংসার মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। সে একটি মাত্র নীতির অনুসারী, তা হল তার উদ্দেশ্য সাধনের উপযোগী যে কোনও পথ গ্রহণ করা। যে লোক খ্রিস্টান, মুসলমান বা শিখ হয়ে যেতে পারে এবং তারপর আবার নিজের সুবিধা অনুযায়ী ধর্মান্তরিত হতে পারে তার সঙ্গে বাক্যবিনিময় করার সময় বস্তুতই খুবই সাবধান থাকা প্রয়োজন। এই একই বিষয়ে আরও অনেক কথাই আমি বলতে পারি।[1]

প্যাটেল নিজেও আম্বেদকারকে পছন্দ করতেন না এবং নিম্নবর্ণের রাজনীতিবিদদের প্রতি তিনি বরাবরই অবজ্ঞাসূচক মনোভাব পোষণ করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারের যুদ্ধ-উদ্যোগের সময় ভারতবর্ষের ভাইসরয় লর্ড লিনলিথগো তাঁর সরকারের ভাবমূর্তিকে আরও জনপ্রিয় করে তোলার জন্য বাহান্ন জন বিশিষ্ট ভারতীয়কে আলোচনায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এই বাহান্ন জনের মধ্যে তফশিলি জাতির মানুষরাও ছিলেন। সেই বৈঠকে ভারতীয়দের সহানুভূতি ও সহযোগিতা সরকারের পক্ষে আনার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়। আমেদাবাদের এক জনসভায় প্যাটেল এই ঘটনার প্রতি কটাক্ষ করে বলেন: “বড়লাট হিন্দু মহাসভার নেতাদের ডেকে পাঠিয়েছিলেন, মুসলিম লিগের নেতাদের ডেকে পাঠিয়েছিলেন, এবং ঘনশি (তেলি), মুচি আর বাকিদের সবাইকেও ডেকে পাঠিয়েছিলেন।”[2] অর্থাৎ একটু অন্যভাবে বললে, লিগ ও মহাসভার রাজনৈতিক অস্তিত্বকে এখানে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু অনগ্রসর শ্রেণির মানুষদের দেখা হচ্ছে নেহাতই নিচু জাতের আবর্জনা হিসেবে, রাজনৈতিক সক্রিয়তার অধিকারী হিসেবে নয়।

১৯৪৮ সালে আম্বেদকার ও তাঁর সঙ্গীরা দলিতদের অধিকতর রাজনৈতিক অধিকারের জন্য সংবিধান-সভায় একটি সংশোধনী আনতে চেয়েছিলেন। সেই সময় প্যাটেল তাঁদের বলেন:

আপনারা আপনাদের পথে চলে আরও একবার দেশভাগের হাত থেকে একটুর জন্য রক্ষা পেয়েছেন। আলাদা নির্বাচনী কেন্দ্র করার ফল আপনারা বম্বেতে দেখতে পেয়েছেন, আপনাদের সম্প্রদায়ের সবথেকে উপকারী বন্ধুটি যখন বম্বের ভাঙ্গি পাড়ায় থাকতে এলেন তখন আপনাদের লোকেরাই তাঁর বাসস্থানে পাথর ছোঁড়ার চেষ্টা করেছিল। এটা কেন ঘটেছিল? এও সেই একই বিষের ফল, আর তাই আমি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করছি। তার কারণ আমি মনে করি যে হিন্দু সমাজের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ আপনাদের ভালো চায়। তারা না থাকলে আপনারা কোথায় থাকবেন? সুতরাং, তাদের বিশ্বাস অর্জন করুন এবং ভুলে যান যে আপনারা তফশিলি জাতি। মিস্টার খান্দেকর যে কীভাবে তফশিলি জাতির মানুষ হন তা আমার মাথায় ঢোকে না। তিনি আর আমি যদি একসঙ্গে ভারতের বাইরে কোথাও যাই তাহলে তিনি তফশিলি জাতির মানুষ না আমি তফশিলি জাতির মানুষ সেকথা কেউ টেরও পাবে না। আমাদের মধ্যে কোনও তফশিলি জাতি নেই। কাজেই তফশিলি জাতির সেই সমস্ত প্রতিনিধিদের অবশ্যই জেনে রাখা উচিত যে তফশিলি জাতিকে আমাদের সমাজ থেকে পুরোপুরি মুছে দিতে হবে, আর যদি একে মুছে দিতে হয় তাহলে যাঁরা এখন আর অচ্ছুত নন এবং আমাদের মধ্যেই বসে আছেন তাঁদের ভুল যেতে হবে যে তাঁরা অচ্ছুত, আর নয়তো যদি তাঁরা এই হীনমন্যতায় ভুগতেই থাকেন তাহলে তাঁরা তাঁদের নিজের সম্প্রদায়ের সেবা করতে পারবে না। এখন যেহেতু তাঁরা আমাদের সঙ্গে আছেন তাই তাঁরা আর মন থেকে নিজেদের সম্প্রদায়ের সেবা করতে পারবেন না।[3]

ইতিহাস লিখনের প্রথম দফা:

কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করতে না-পেরে আম্বেদকার শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেন। এরপর তফশিলি জাতিগুলিকে হিন্দুধর্মের আওতার বাইরে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগের পাশাপাশি তাদের জন্য আলাদা রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টাও তিনি করেছিলেন।

রাষ্ট্র বা তার সমর্থক হিসেবে কিংবা দক্ষিণপন্থী অথবা বামপন্থী উচ্চবর্গীয় জাতীয়তাবাদী হিসেবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ভারতীয় জাতীয়তাবাদ আম্বেদকারের দিকে কোন চোখে তাকিয়েছে সেটিই এখন আমার দেখার বিষয়। আমি বড় হয়ে উঠেছি ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত আমি পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের ছাত্র ছিলাম, সেই প্রতিষ্ঠান এখন ভারতবর্ষেরও অন্যতম সেরা রাজ্য স্তরের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে থাকে। কাজেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে এখানে আমি কাজে লাগাতেই পারি। এ প্রসঙ্গে একটা স্পষ্ট বিভাজন-রেখা টানাই যায়। ১৯৮০-র দশকের শেষদিক পর্যন্ত আম্বেদকারকে স্রেফ উপেক্ষা করা হয়েছে এবং/অথবা তাঁর জন্য বরাদ্দ হয়েছে প্রান্তিক অবস্থান। এখানে আমি আধুনিক ভারতীয় ইতিহাসের তিনটি উল্লেখযোগ্য কাজের দিকে দৃষ্টিপাত করব। ড. তারাচাঁদের বইটি কার্যত স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষে প্রকাশিত প্রথম সরকারি জাতীয়তাবাদী ইতিহাস। এই বিপুলায়তন গ্রন্থে আম্বেদকারের উপস্থিতি কতকটা এরকম: চতুর্থ খণ্ডের নির্ঘণ্ট (বইটি প্রায় ৬০০ পাতার) থেকে জানা যায় যে গোটা বইতে আম্বেদকারের তিনটি উল্লেখ আছে। ৮৫ নম্বর পাতায় বলা হয়েছে যে জাতীয়তাবাদীরা সংসদীয় কমিশনকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, কিন্তু কিছু গোষ্ঠী সেই কমিশনকে মেনে নিয়েছিল। সেই কিছু গোষ্ঠী ও ব্যক্তিদের একজন হিসেবে আম্বেদকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ১৫০ পাতায় এই ধরনের আরও একটি নিরীহ উল্লেখ পাওয়া যায়। আর শেষে, ১৮৬ নম্বর পাতায় আমাদের জানানো হয়েছে যে “আশ্চর্যজনকভাবে আম্বেদকারও পুনা চুক্তির বিরুদ্ধে প্রচার করা শুরু করলেন” । 

এই যদি হয় সরকারি (বলতে ইচ্ছে হয় “দরবারি”) ইতিহাসবিদের অবস্থান তাহলে দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদীদের প্রিয় এক ইতিহাসবিদের অবস্থানটি কীরকম? এখানে যাঁর কথা বলা হচ্ছে তিনি রমেশচন্দ্র মজুমদার। তাঁর বিপুলায়তন হিস্ট্রি অফ দ্য ফ্রিডম মুভমেন্ট ইন ইন্ডিয়া-র তৃতীয় খণ্ডের দ্বিতীয় পরিমার্জিত সংস্করণে মজুমদার নিজেকে সরকারি বা দরবারি ইতিহাসের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছেন। ভূমিকাতেই তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে ভারতবর্ষে স্বাধীনতা আনার কৃতিত্ব একমাত্র বা মূলত গান্ধী ও কংগ্রেসের, এই মতটির তিনি বিরোধিতা করছেন। কিন্তু এর বাইরে তাঁর কাছে জাতীয়তাবাদের অর্থ ছিল কিঞ্চিৎ হিন্দু জাতীয়তাবাদ, আর কিঞ্চিৎ বাঙালি পরিচিতিবাদী রাজনীতি (বিপ্লবীদের – বিশেষ করে বাঙালি বিপ্লবীদের এবং সুভাষচন্দ্র বসুর সশস্ত্র সংগ্রামের ভূমিকা)। তাঁর এই আখ্যানে আম্বেদকারের উপস্থিতি সামান্য বেশি, কিন্তু সে উপস্থিতি একইরকম প্রান্তিক। তৃতীয় খণ্ডের নির্ঘণ্টে আম্বেদকারের পাঁচটি উল্লেখ পাওয়া যায়। ৫৫ পাতায় মজুমদার খিলাফত আন্দোলন প্রসঙ্গে গান্ধীর বিরুদ্ধে আম্বেদকারের সমালোচনার উল্লেখ করেছেন। তার কারণ নিঃসন্দেহে এই যে তা মজুমদারের নিজের কংগ্রেস-খিলাফত জোটকে নাকচ করার অবস্থানের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ, আম্বেদকার কেন উদ্ধৃত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তিত্ব তা কিন্তু এখানে আমরা বুঝে উঠতে পারি না। ৩০৩ নম্বর পাতায় আমাদের জানানো হয়েছে: “নির্বাচনের জন্য অনগ্রসর শ্রেণিগুলিকে পৃথক সম্প্রদায় হিসেবে গণ্য করতে হবে – বি.আর আম্বেদকারের এহেন দাবির ফলে একটি নতুন জটিলতার সংযোজন ঘটে। তারা এবং অন্যান্য সব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ই জোরের সঙ্গে পৃথক নির্বাচনী কেন্দ্রের দাবি জানায়।”

এই বইয়ের ৩৮৮ পাতায় এবং তারপরে পুনা চুক্তির যে বর্ণনা হাজির করা হয়েছে তার সঙ্গে আম্বেদকারের নিজের ধারণার বিস্তর ফারাক। তার কারণ আমাদের জানানো হয়েছে যে সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদের (Communal Award) সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশটি অনগ্রসর শ্রেণিগুলির সঙ্গে যুক্ত, কারণ তাদের জন্যই পৃথক নির্বাচনী কেন্দ্র বরাদ্দ হয়েছিল এবং তার প্রতিক্রিয়ায় গান্ধী আমরণ অনশনের ডাক দেন। এর ফলে আলোচনা ডাকা হয়। “অনগ্রসর শ্রেণিগুলির সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতা ড. আম্বেদকারকে সেই আলোচনায় যোগ দেওয়ার জন্য রাজি করানো হয় এবং তিনি এই পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণভাবে তাঁর নিজের স্বার্থে কাজে লাগান।”

সংরক্ষিত আসনগুলির বিষয়টিকে রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন “পৃথক নির্বাচনী কেন্দ্রের সুবিধা”। এবং আম্বেদকার নাকি তাঁর নিজের সুবিধার জন্য পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়েছিলেন। সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ অনুযায়ী অনগ্রসর শ্রেণিগুলির পৃথক নির্বাচনী কেন্দ্রের জন্য যতগুলি আসন বরাদ্দ হয়েছিল তার থেকে সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা বেশি ছিল। আম্বেদকারের কিন্তু মনে হয়েছিল যে পৃথক নির্বাচনী কেন্দ্রের বন্দোবস্ত না-থাকলে বর্ণহিন্দু রাজনৈতিক নেতারা অস্পৃশ্যদের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ কায়েম রাখবে। স্পষ্টতই বোঝা যায় যে মজুমদারের মতো হিন্দু সাম্প্রদায়িক ঝোঁকসম্পন্ন জাতীয়তাবাদীর কাছে দলিতদের সীমিত পরিমাণ সুবিধা প্রাপ্তিও বড্ড বাড়াবাড়ি বলে মনে হয়েছিল। জাতির বৈধ স্বার্থের হিসেব থেকে সামাজিক ন্যায়বিচার ও তা অর্জনের জন্য যে কোনও ইতিবাচক পদক্ষেপ একেবারে বাদ। 

৫৭৪ পাতায় ক্ষমতা হস্তান্তরের সংক্রান্ত দর কষাকষির একটি বিশেষ পর্যায় সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে মজুমদার মশাই লিখেছেন, “জিন্না ও আম্বেদকার দুজনেই সপ্রুর সঙ্গে সহযোগিতা করতে রাজি হননি”। এখানে মনে প্রশ্ন জাগে যে আম্বেদকারের এই অরাজি হওয়ার প্রসঙ্গ হঠাৎ তুলে আনা হল কেন? কয়েকশো পাতার আখ্যানটিতে তো অনগ্রসর শ্রেণিগুলির সংগ্রাম সম্পর্কে কোনও উচ্চবাচ্যই করা হয়নি, তাহলে এইখানে হঠাৎ বাবাসাহেবকে টেনে আনা হচ্ছে কেন? তিনি কি রাজনীতিতে আদৌ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, নাকি নন? উচ্চবর্গীয় জাতীয়তাবাদীদের সমস্যাটি স্পষ্টতই এই প্রশ্নে। ডুডু ও তামাক দুই-ই তাঁরা খেতে চান – এমনিতে আম্বেদকারকে পাত্তা দিও না, কিন্তু যখন “জাতীয়তাবাদ-বিরোধী” কিংবা ব্রিটিশদের দালাল হিসেবে তাঁর নিন্দেমন্দ করার মতো সন্দর্ভ খাড়া করার সুযোগ আছে, তখন তাঁর কথা উল্লেখ করো।

আর শেষত, ৬২৬ পাতায় পাঠকদের নিছক দায়সারাভাবে জানানো হয়েছে যে তফশিলি জাতিগুলির নেতাদের মধ্যে আম্বেদকার ছিলেন চরমপন্থী।

রমেশচন্দ্র মজুমদার ঘরানার দক্ষিণপন্থী জাতীয়বাদ থেকে আমরা জাতীয়তাবাদের বামপন্থী ও মার্কসবাদী ঝোঁকসম্পন্ন সমর্থকদের আলোচনায় যেতে পারি, চলে আসতে পারি বিপানচন্দ্র ও তাঁর জাতীয়তাবাদ বিষয়ক খ্যাতনামা বইটির সহলেখকদের কথায়।

এই দ্ব্যর্থহীনভাবে বামপন্থী ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিপানচন্দ্র ও পানিক্করের মতো ব্যক্তিরাও আছেন, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাঁরা দীর্ঘ ও সম্মানজনক নজির সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তাঁরাও ধরে নিয়েছিলেন যে “জাতীয়তাবাদী” বলতে উচ্চবর্গীয় জাতীয়তাবাদী নেতাদেরই বোঝায় এবং পৃথক নির্বাচনী কেন্দ্রের প্রস্তাব হিন্দুদের মধ্যে বিভাজন ঘটানোর জন্য ব্রিটিশদের একটি চাল মাত্র। অর্থাৎ অন্যভাবে বললে ব্রিটিশদের কলকাঠি নাড়ার ব্যাপারটি বাদ দিলে হিন্দুরা ঐক্যবদ্ধই ছিল। এ প্রসঙ্গে তাঁরা লিখেছেন:

কিন্তু অনগ্রসর শ্রেণিগুলিকে পৃথক রাজনৈতিক অস্তিত্ব হিসেবে গণ্য করে তাদেরকে হিন্দুদের অন্যান্য অংশের থেকে বিচ্ছিন্ন করার এই উদ্যোগ সমস্ত জাতীয়তাবাদীদের প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছিল। গান্ধীজি সে সময় ইয়েরওয়াড়া জেলে ছিলেন, তিনি বিশেষভাবে এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। তিনি এই রোয়েদাদকে ভারতের ঐক্য ও জাতীয়তাবাদের উপর আঘাত হিসেবে দেখেছিলেন, যা হিন্দুধর্ম ও অনগ্রসর শ্রেণি উভয় পক্ষের জন্যই ক্ষতিকারক, তার কারণ তা দ্বিতীয় পক্ষটির হীন সামাজিক অবস্থানের কোনও সমাধান জোগায় না। একবার যদি অনগ্রসর শ্রেণিগুলিকে পৃথক রাজনৈতিক অস্তিত্ব হিসেবে গণ্য করা হয় তাহলে অস্পৃশ্যতা দূরীকরণের প্রশ্নটি আর উঠবেই না এবং এক্ষেত্রে হিন্দু সমাজের সংস্কারের উদ্যোগ স্তব্ধ হয়ে যাবে।[4]

অর্থাৎ “উদ্যোগ”-টি নেওয়া হয়েছিল শুধুমাত্র ব্রিটিশদের তরফ থেকে। অনগ্রসর শ্রেণিগুলির অন্দরের বিভিন্ন অংশের স্বাধীন চিন্তার এখানে কোনও গুরুত্ব নেই। আর তথাকথিত অস্পৃশ্যরা যে হিন্দু পরিচয়কে বর্জন করে একইসঙ্গে স্বাধীন রাজনৈতিক প্রভাবের অধিকারী হয়ে উঠতে পারেন সেই বিষয়টিকে আশ্চর্যজনকভাবে স্রেফ উপেক্ষা করা হয়েছে। আর তার বদলে যে রাজনৈতিক রণকৌশলটির পক্ষে কথা বলা হয়েছে তার মাধ্যমে কিছু সংখ্যক উচ্চবর্ণীয় হিন্দুরা তাঁদের ধর্মের সংস্কার করে ধন্য হবেন এবং সেই সূত্রে অনগ্রসর শ্রেণিগুলির অবস্থারও উন্নতি ঘটাবেন। “আইনসভায় আসন কিংবা চাকরির নিরিখে অনগ্রসর শ্রেণিগুলির তথাকথিত স্বার্থ”-কে সুরক্ষিত করা আর “অস্পৃশ্যতা নির্মূল” করার মধ্যে পার্থক্য সম্পর্কে গান্ধীর মতামত তাঁরা উদ্ধৃত করেছেন কোনও রকম সমালোচনা ছাড়াই।

পরের পাতায় আমাদের কাঠখোট্টাভাবে জানানো হয়েছে যে কীভাবে এই সময় আম্বেদকার সহ বিভিন্ন গোত্রের রাজনৈতিক নেতারা সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং কীভাবে তাঁরা বিস্তর বাকবিতণ্ডার পর একটি ঐকমত্যে পৌঁছতে সমর্থ হয়েছেন। পৃথক নির্বাচনী কেন্দ্র সম্পর্কে গান্ধীর প্রকৃত আপত্তির জায়গাটি ছিল এই যে তা হিন্দুধর্মকে পঙ্গু করে দেবে – এই কথাটি এই বামপন্থী ইতিহাসবিদরা পর্যন্ত স্বীকার করতে চাননি। গান্ধীর যুক্তি ছিল যে এই পদক্ষেপ হিন্দুদের মধ্যে বিভাজনের সৃষ্টি করবে – যেন বাস্তবে এই ধরনের বিভাজনের কোনও অস্তিত্বই নেই। এই যুক্তিটির পুনরাবৃত্তি আজও করা হয়ে থাকে। আম্বেদকার কিন্তু গোল টেবিল বৈঠকেও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন যে অনগ্রসর শ্রেণিগুলির মুক্তি অর্জিত হতে পারে একমাত্র স্বরাজি সরকারের শাসনেই। তা সত্ত্বেও যে তিনি পৃথক নির্বাচনী কেন্দ্রের দাবির উপর জোর দিয়েছিলেন তার কারণ তিনি চেয়েছিলেন দলিতরা উচ্চবর্ণের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হোন। গান্ধীর সঙ্গে এখানেই তাঁর পার্থক্য। এক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হল মদনমোহন মালব্য থেকে শুরু করে জিডি বিড়লা পর্যন্ত নানা গোত্রের উচ্চবর্গীয় শক্তিগুলি পৃথক নির্বাচনী কেন্দ্রের প্রশ্নে গান্ধীর এবং তাঁর আম্বেদকারের উপর (সাম্রাজ্যবাদের উপর নয় কিন্তু) চাপসৃষ্টির প্রচেষ্টার সমর্থনে দাঁড়িয়েছিল। আলোচ্য বইটিতে বর্ণিত আখ্যান থেকে এই বাস্তবতাটি স্রেফ মুছে ফেলা হয়েছে। এর কয়েক পাতা পরে কোনও রকম সমালোচনামূলক মন্তব্য ছাড়াই ‘হরিজন’-দের মধ্যে গান্ধীর প্রচার-অভিযানের স্বরূপ আলোচনা করা হয়েছে। এর অন্যতম অংশ ছিল “হরিজনদের অভ্যন্তরীণ সংস্কার”, যেন শুদ্ধিকরণের প্রয়োজন তাঁদেরই, তাঁদের নিপীড়কদের নয়। আর গান্ধীর এই সংস্কারের মূল উপাদান ছিল গোমাংস ও মদ্যপান বর্জন।[5] এহেন বিধি আরোপ করতে ইচ্ছুক গান্ধীকে যদি সমালোচনা না-ই করা হয় তাহলে আর আরএসএস গোমাংস খাওয়ার বিরুদ্ধে প্রচার চালালে আপত্তি কীসের? 

পরিবর্তিত পরিস্থিতি

আম্বেদকার চেয়েছিলেন দলিতদের একটি যুযুধান শক্তি হিসেবে খাড়া করে তুলতে। তাঁর মৃত্যুতে এবং রিপাবলিকান পার্টির মধ্যে ভাঙন ধরার ফলে সে উদ্যোগ দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু ১৯৭০-এর দশকের শেষাশেষি নাগাদ সে উদ্যোগ আবার শুরু হয়। তার সূত্রপাত ঘটে ১৯৭৮ সালে অল ইন্ডিয়া ব্যাকওয়ার্ড অ্যান্ড মাইনরিটি কমিউনিটিজ এমপ্লয়িজ ফেডারেশন (বিএএমসিইএফ নামে পরিচিত) প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে। এটি মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের দলিত কর্মচারীদের সংগঠন। পরে এখান থেকেই বহুজন সমাজ পার্টি গড়ে ওঠে। এই শেষোক্ত ঘটনাটির ফলে একটি স্বাধীন দলিত নেতৃত্বের জন্ম হয় এবং তার জেরে ভারতীয় রাজনীতি চিরতরে বদলে যায়। কিন্তু এই সময় থেকেই আম্বেদকারকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া শুরু হয়, তা সে তাঁর প্রতি ঘৃণাবশতই হোক, আর তাঁকে আত্মসাৎ করার প্রচেষ্টা থেকেই হোক।  

আম্বেদকার সম্পর্কে অরুণ শৌরির বইটি কমিউনিস্টদের সম্পর্কে তাঁর বইয়ের পরিপূরক। শৌরির ওয়ারশিপিং ফল্‌স গড্‌স বইটিতে আম্বেদকার একজন আত্মকেন্দ্রিক, দেশপ্রেমহীন, ক্ষমতালোভী ও জাতীয়তা-বিরোধী ব্যক্তিত্ব এবং ব্রিটিশদের দালাল।[6] যত্রতত্র থেকে আলগোছে বিভিন্ন উদ্ধৃতি তুলে ধরার কাজটিতে অরুণ শৌরি এই বইয়ে প্রায় বিশেষজ্ঞের পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। তার পরিবর্তে আম্বেদকারের লেখালিখি ও বক্তৃতাগুলিকে আগাগোড়া খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। শৌরির বই থেকে দুটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে:  

(১) তিনি জানিয়েছেন, “এমন কোনও উদাহরণ নেই, এমন একটিও উদাহরণ নেই যেখানে আম্বেদকার দেশকে স্বাধীন করার সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত কোনও কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করেছেন।” অথচ গোল টেবিল বৈঠকে আমরা আম্বেদকারকে বলতে শুনি:

প্রাক-ব্রিটিশ যুগের ভারতীয় সমাজে আমাদের সম্প্রদায়কে যা ভোগ করতে হত তার সঙ্গে যদি আমরা আমাদের বর্তমান অবস্থার তুলনা করি তাহলে দেখব যে সামনের দিকে এগিয়ে চলার বদলে আমরা সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। ব্রিটিশরা আসার আগে আমাদের অস্পৃশ্যতার জন্য আমাদেরকে ঘৃণা করা হত। ব্রিটিশ সরকার কি তা দূর করার জন্য কোনও ব্যবস্থা নিয়েছে? ব্রিটিশরা আসার আগে আমরা কুয়ো থেকে জল তুলতে পারতাম না। ব্রিটিশরা আসার আগে আমরা মন্দিরে ঢুকতে পারতাম না। এখন ঢুকতে পারি কি?… এসব প্রশ্নের কোনওটিরই ইতিবাচক উত্তর দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমাদের প্রতি যে অবিচারগুলি হয়েছে সেগুলি আজও দগদগে ঘায়ের মতো টাটকা এবং ব্রিটিশ শাসনের ১৫০ বছর পার হয়ে যাওয়ার পরেও সেগুলির কোনও সুবিচার হয়নি।। এহেন সরকার কার কোন উপকারে লাগবে?

(২) আম্বেদকার ১৯৪২ সালে ভাইসরয়ের শাসন-পরিষদের সদস্য ছিলেন, তাই শৌরির চোখে তিনি বিশ্বাসঘাতক। লক্ষণীয় বিষয় হল এ জাতীয় উঁচু পদে থাকাকালীনও কিন্তু আম্বেদকার অচ্যুত পট্টবর্ধনের মতো জঙ্গি নেতাদের আত্মগোপন করতে সাহায্য করেছেন। অন্যদিকে আরএসএস ব্রিটিশ সরকারের বশংবদের ভূমিকা পালন করেছে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও এই সময় প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রী ছিলেন, তাঁকে কিন্তু শৌরি আক্রমণের নিশানা করেননি।

১৯৯০-এর দশক থেকে আম্বেদকারকে আত্মসাৎ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। দলিত রাজনীতির জোরালো পুনরুত্থান ঘটার ফলে মূলধারার উচ্চবর্ণীয় রাজনৈতিক দলগুলিকে আম্বেদকারকে আত্মসাৎ করার প্রচেষ্টায় নামতেই হত এবং তারা সে কাজে নেমেও পড়ে। কিন্তু আম্বেদকারকে আত্মসাৎ করার প্রচেষ্টার মধ্যেও আরএসএস তার নিজস্ব অবস্থানের প্রতি অনুগত। তাই তাদের যৌথ সাধারণ সম্পাদক কৃষ্ণ গোপাল ২০১৫ সালে দ্য অর্গানাইজার পত্রিকায় লেখেন যে আম্বেদকারের মতে ভারতবর্ষে অস্পৃশ্যতার উদ্ভব ঘটেছিল আনুমানিক ১,২০০-১,৩০০ বছর আগে এবং তিনি এর সঙ্গে ইসলামি আক্রমণের যোগসূত্র টেনেছিলেন। এই বক্তব্যের সঙ্গে আরএসএস-এর তত্ত্বের যোগাযোগ আছে, আম্বেদকারে মতামতের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই। তিনি অস্পৃশ্যতার উদ্ভবের সঙ্গে গুপ্ত যুগে ব্রাহ্মণ্যবাদের পুনরুত্থানের যোগসূত্র টেনেছিলেন। অতি সম্প্রতি জিন বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই বক্তব্যটির সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে।

গণতান্ত্রিক সরকারের পূর্বশর্ত হল গণতান্ত্রিক ধাঁচার সমাজ। সামাজিক স্তরে গণতন্ত্র না-থাকলে গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক ধাঁচার কোনও মূল্য থাকবে না এবং তা সমাজের সঙ্গে বেমানান হয়ে পড়বে। গণতান্ত্রিক সমাজে যে একতা, সাধারণ উদ্দেশ্য, জনস্বার্থের প্রতি আনুগত্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার মতো বৈশিষ্ট্যগুলির অস্তিত্ব থাকতেই হবে তার কোনও মানে নেই। কিন্তু তার সঙ্গে সন্দেহাতীতভাবে জড়িত দুটি বিষয়। প্রথমটি হল একটি বিশেষ মানসিকতা, সহ-নাগরিকদের প্রতি সম্মান ও সম মনোভাব প্রদর্শনের মানসিকতা। আর দ্বিতীয়টি হল এমন একটি সামাজিক সংগঠন যেখানে সামাজিক প্রতিবন্ধকতার অচলায়তনের কোনও অস্তিত্ব থাকবে না। সুবিধাভোগী ও সুবিধাহীনের মধ্যে পার্থক্য থেকে জাত যে বিচ্ছিন্নতা ও একচেটিয়া আধিপত্য তা গণতন্ত্রের সঙ্গে বেমানান এবং সাযুজ্যহীন।

আম্বেদকারকে আত্মসাৎ করার জন্য আরএসএস-এর যে উদ্যোগ তার সঙ্গে তুলনীয় এ বিষয়ে কংগ্রেসি উদ্যোগ। আজকাল কংগ্রেসি নেতারা আম্বেদকারকে তাঁদেরই একজন হিসেবে তুলে ধরতে চান, বা তাঁর সঙ্গে গান্ধীর অবস্থানগত পার্থক্যের বিষয়টিকে উপেক্ষা করতে চান, কিংবা মাঝেমধ্যে দেখা যায় যে সরকারিভাবে তাঁকে আনুষ্ঠানিক সাম্যের নয়া-উদারনীতিবাদী প্রচারক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন করাই যথেষ্ট: কংগ্রেসি নেতাদের তরফে এবং স্বাধীনতার পর কংগ্রেস সমর্থিত জাতিরাষ্ট্রের ভাষ্যে আম্বেদকারকে প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেওয়া হল কেন? এই প্রবন্ধের মাধ্যমে যদি পাঠকদের এই সম্পর্কগুলির দিকে ফিরে তাকাতে উৎসাহিত করা যায় তাহলেই আমি মনে করব যে কিছু কাজের কাজ করা সম্ভব হয়েছে। শ্রেণি ও বর্ণব্যবস্থার যে সম্পর্কটি আমাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে সেটি আমরা বিনা প্রশ্নে মেনে নেব, নাকি তার সমালোচনা করব, সেই সিদ্ধান্তটুকুই এক্ষেত্রে আমাদের অর্জন।  


তথ্যসূত্রঃ

১. MK Gandhi, My Lettters…, ed. Prof. Prasoon, Pustak Mahal, 2010

https://books.google.co.in/books?id=d5UzfS8TtDsC&pg=PT87&lpg=PT87&dq

২. Dr. B. R. Ambedkar, What Congress and Gandhi Have Done to the Untouchables?, in Writings and Speeches,Vol. 9, Government of Maharashtra, 1990, p. 209

৩. http://parliamentofindia.nic.in/ls/debates/vol5p9a.htm

৪. Bipan Chandra, Mridula Mukherjee, Aditya Mukherjee, K.M. Panikkar, Sucheta Mahajan, India’s Struggle for Independence,  Penguin Books, Delhi, 1989, p. 290.

৫. ওই, pp. 294-5.

৬. Arun Shourie, Worshipping False Gods, ASA Publishers, 1997

মন্তব্য তালিকা - “আম্বেদকার ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদ”

  1. বিশ্লেষণ ভাল লাগল।

    গান্ধির অবস্থান নিয়ে একটা কথা না বললে বোধ করি দলিতদের আত্মসাৎ করার জিনিসটা পুরো বোঝা যাবে না। হরিজন নামকরণের মধ্যে তিনি ‘জাতে তোলা’র যে ধারণাটা দিয়েছিলেন, নানা কম্যুনিটিতে সেটা চালু ব্যাপার ছিল। যেমন বাংলার নমঃশূদ্রদের হরিচাঁদ ঠাকুরের মতুয়া আন্দোলনের গোড়ার দিক থেকেই নিজেদের পৌরাণিক সূত্রে ব্রাহ্মণ আইডেন্টিটি তুলে ধরার ব্যাপারটা ছিল। বাংলার দলিত আইডেন্টিটি হয়তো মাহারদের ঐতিহাসিক পেশোয়া যুগে নির্মিত আইডেন্টিটির সঙ্গে মেলা মুশকিলও ছিল। সারা ভারতে আম্বেদকরের এখন যে ভাবমূর্তি বা আইকনিক অ্যাপিল, সেটা সে সময় ছিল না বলেই মনে হয়।
    অন্যদিকে, গান্ধির সেই আইকনিক অ্যাপিল গড়ে তোলা হয়েছিল, আর গান্ধি সেটা সম্পর্কে খুবই সচেতন ছিলেন। নিজের পোশাককে তিনি মাসের সঙ্গে আইডেন্টিফাই করা কাজে লাগিয়েছিলেন–সেরকম ব্যাপারে আম্বেদকরের কোনও উৎসাহ ছিল বলে মনে হয় না। নিজের হাতে নিজের মলমূত্র পরিষ্কার করার আপাত-অরাজনৈতিক কর্মসূচি খুব ভাল রাজনৈতিক মাইলেজ দিত। জন্মসূত্রে দলিত হিসেবে দলিতদের স্বার্থ তিনি বেশি দেখবেন, এমন ভাবমূর্তি তৈরি করার ব্যাপারে আম্বেদকর বেশ পিছিয়ে ছিলেন।
    পরে তাঁর ভাবমূর্তি নির্মাণে মেইনস্ট্রিম জাতীয়বাদী রাজনীতি নেমে পড়ে। জগজীবন রামের কথাটা হয়তো কাঁসিরামের সঙ্গে আসতে পারত এখানে। ভেতর থেকে দলিত রাজনীতি দখলের কাজ বাবুজি অনেকটা করে রেখেছিলেন।

    ধন্যবাদ এমন লেখার জন্য।

  2. হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান ও অগ্রগতির একটি স্পষ্ট শ্রেণীগত ভিত্তি ছিল ও আছে। কিন্তু তার সঙ্গে দলিত আইডেনটিটি নির্মাণ প্রক্রিয়ার দ্বন্দমূলক সম্পর্কটি খুব একটা স্পষ্ট হয়নি। বর্তমানের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলিত কোন হোমোজেনাস অস্তিত্ব নয়। আম্বেদকরের সময়েও ছিল না। পরবর্তীতে জগজীবন রাম, কাঁসিরাম, মায়াবতী থেকে রামবিলাস পাশোয়ান কিভাবে দলিত রাজনীতির উত্থানের আইকন হতে পারেন? হিন্দু আধিপত‍্যবাদী রাজনীতির বিপ্রতীপে আইডেনটিটি রাজনীতির সঙ্গে শ্রেণীকে যুক্ত করতে না পারলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

  3. হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান ও অগ্রগতির একটি স্পষ্ট শ্রেণীগত ভিত্তি ছিল ও আছে। কিন্তু তার সঙ্গে দলিত আইডেনটিটি নির্মাণ প্রক্রিয়ার দ্বন্দমূলক সম্পর্কটি খুব একটা স্পষ্ট হয়নি। বর্তমানের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলিত কোন হোমোজেনাস অস্তিত্ব নয়। আম্বেদকরের সময়েও ছিল না। পরবর্তীতে জগজীবন রাম, কাঁসিরাম, মায়াবতী থেকে রামবিলাস পাশোয়ান কিভাবে দলিত রাজনীতির উত্থানের আইকন হতে পারেন? হিন্দু আধিপত‍্যবাদী রাজনীতির বিপ্রতীপে আইডেনটিটি রাজনীতির সঙ্গে শ্রেণীকে যুক্ত করতে না পারলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

  4. আমার বিশ্লেষণের কেন্দ্রে হিন্দুত্ববাদ ছিল না। ছিল সবরকম জাতীয়তাবাদী ধারণা, এবং হালকা করে বাম চিন্তা। আগে জাতীয় স্বাধীনতা পরে দলিতদের সমতা, আগে শ্রেণী পরে দলিতদের সমতা, এগুলো শেষ অবধি ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রাধান্যকে ধরে রাখে। এই লেখাটি আম্বেদকরকে কীভাবে বিকৃত করে দেখানো হয়েছে সেইটা নিয়ে। বাকি প্রশ্ন তাই এই প্রবন্ধের মধ্যে জবাব পাবেন না। আমার মত আছে। এক দু বাক্যে প্রকাশ করা সম্ভব না। ইন্টারসেকশনালিটি আর সোশ্যাল রিপ্রোডাকশন থিয়োরি দিয়ে এগোতে হবে।

    1. আপনার মন্তব্যের উপর আপনার ব্যাখ্যা কি এখানে দ্বিতীয় এইটি ভাগ হিসেবে লেখা আকারে পেতে পারি? তবে একটি বিষয়ে সাধুবাদ জানাই, ভারি বই আর গবেষণাপত্র না লিখে এইভাবে যে আপনি আমাদের মত সাধারণ পাঠকদের জন্য লেখা শুরু করেছেন এটা খুব সৎ উদ্যোগ। যাদবপুর বরাবর নতুন পথের সন্ধান দেয়। আপনিও দিলেন। নমস্কার জানাই।

  5. কিন্তু একটা ব্যাপার তো আপনাকে মানতে হবে, যে আম্বেদকরকে নেহেরুই ডেকে এনেছিলেন সংবিধান লেখার জন্যে, অনেকের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও.

  6. আপনার মন্তব্যের উপর আপনার ব্যাখ্যা কি এখানে দ্বিতীয় এইটি ভাগ হিসেবে লেখা আকারে পেতে পারি? তবে একটি বিষয়ে সাধুবাদ জানাই, ভারি বই আর গবেষণাপত্র না লিখে এইভাবে যে আপনি আমাদের মত সাধারণ পাঠকদের জন্য লেখা শুরু করেছেন এটা খুব সৎ উদ্যোগ। যাদবপুর বরাবর নতুন পথের সন্ধান দেয়। আপনিও দিলেন। নমস্কার জানাই।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।