সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

আলাস্কার সাতরঙা ইতিহাস – পর্ব ৭

আলাস্কার সাতরঙা ইতিহাস – পর্ব ৭

ভাস্কর দাস

ডিসেম্বর ১৭, ২০২৩ ১৯৪ 1

বেলা গেল, সাঁঝবেলাতে

ব্যারানভ চলে গেলেন। আলাস্কার সৈকতে সাগরের ঢেউ আগের মতোই ভাঙতে লাগল। স্প্রুসের ডাল থেকে খসে পড়া পাতা মাটিতে মিশে পরের প্রজন্মের চারাদের লালনে ব্যাস্ত থাকল। বাতাস আগের মতোই জলীয় বাস্প বয়ে নিয়ে গিয়ে জন্ম দিতে লাগল অন্ধ কুয়াশার। আর আলাস্কার আদিবাসী মানুষেরা বিশ্বাস করল যে আগের ছন্দেই চলতে থাকবে জীবন। ততদিনে রুশদের সঙ্গে অ্যালিউট আর লিঙ্গিতদের একটা তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ বিনিময়ের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। বানিজ্যিক বিনিময়ের বাইরে স্থাপিত হয়েছে সামাজিক সম্পর্ক। রুশদের সঙ্গে আদিবাসীদের মিশ্রণের ফলে  জন্ম নিয়েছে এক মিশ্র প্রজাতির যার নাম ‘ক্রেওল’, সামাজিক অবস্থানে যারা যথেষ্ট সম্মানজনক স্থান পেয়েছে। শুধু প্রবল নাড়াচাড়া পড়ে গিয়েছে প্রশাসনের অন্দরমহলে।

আলাস্কা হস্তান্তর চুক্তির প্রথম পাতা

ব্যারানভের উত্তরসূরি হেজিমিস্টার এসেই কোম্পানির আর্থিক পরিস্থিতির তদন্ত শুরু করলেন। আগের আমলের বিশিষ্ট আমলাদের সরিয়ে দিলেন। কোম্পানির বিভিন্ন চৌকির আর্থিক আর প্রশাসনিক কাজকর্ম কেন্দ্রীভূত করলেন সিটকার সদর দফতরে যাতে নজরদারি চালানো যায় সঠিকভাবে। এতদিন অ্যালিউটদের পারিশ্রমিকের একটা অংশ ‘ফার’ দিয়ে মেটাবার প্রথা চালু ছিল। তাকে পালটে সবটাই নগদে দেবার ব্যবস্থা করলেন তিনি। ব্যবস্থাটা অ্যালিউটদের খুশী করল না। উপরন্তু আরও নানা সংস্কারের আশঙ্কায় সবার মধ্যেই একটা অনিশ্চয়তার জন্ম হল। যদিও তা স্থায়ী হল না। হেজিমিস্টার অন্য নানা প্রশাসনিক পদক্ষেপের মধ্যে দিয়ে আশ্বস্ত করতে পারলেন সব শ্রেণীর মানুষদের। তাঁর আর তাঁর পরবর্তী পরিচালকদের সুযোগ্য পরিচালনায় একটা নিয়ন্ত্রিত শাসনব্যবস্থা বজায় থাকল। ততদিনে ‘ফার ট্রেড’এ একটা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু হয়েছে, একটা নির্দিষ্ট বয়সের পুরুষ ভোঁদড়ই শিকার করা হবে যাতে নতুন প্রজন্ম আসার ক্ষেত্রে সমস্যা না হয়। এতে ভোঁদড়দের সংখ্যা কখনই বিপজ্জনক সীমারেখার নিচে নামবে না। হেজিমিস্টারের তত্ত্বাবধানে বানিজ্যসাম্রাজ্যের সীমারেখা বিস্তৃত হল। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, ক্রেওলদের সহায়তায় ‘ইন্টিরিয়র’ আলাস্কায় আথাবাসকানদের সঙ্গেও ব্যবসা শুরু করতে পারল রাশিয়া। তার বাইরে আলাস্কার খনিজ দ্রব্য, গাছের কাঠ, মাছ, কয়লা ইত্যাদি ব্যবসায়ে হাত দিয়েছে কোম্পানি। লাভের অঙ্ক তাতেও বড় কম না। ১৮৬১র এক হিসেব বলছে, কোম্পানি তার অংশীদারদের ‘ডিভিডেন্ট’ হিসেবে দিয়েছে ১,৪৫,২২৯ রুবল আর কোম্পানির ঘরে লভ্যাংশ গচ্ছিত আছে ৩১,৬৫৬ রুবল।        

আলাস্কা অধিগ্রহণের আগের শেষ দশকে সিটকা আর তার সংলগ্ন অঞ্চল কেমন ছিল তার বর্ণনায় জনৈক আমেরিকান পর্যটক, যিনি ঘটনাচক্রে গিয়ে পড়েছিলেন সেখানে, তিনি কী বলছেন তা দেখা যেতে পারে। আমেরিকান, অতএব রাশিয়ার প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট, এ অভিযোগ ধোপে টিঁকবে না। তিনি লিখছেন, সিটকায় তিনটি চার্চ। তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ সেন্ট মাইকেল’স চার্চ স্থাপত্যের উৎকর্ষতায় অনেককেই হারিয়ে দিতে পারে। ‘As a structure it would do credit to any New England Town.’ বাকি দুটো চার্চ সম্পর্কেও প্রশংসাই লিপিবদ্ধ রয়েছে তাঁর নথিতে। চার্চের নথিভুক্ত ভক্তদের নামের তালিকায় প্রচুর লিঙ্গিত ও অ্যালিউটিক মানুষ পেয়েছিলেন তিনি।

তাঁর লেখায় উল্লেখ রয়েছে অনেকগুলো ইস্কুল, হাসপাতাল আর ডাক্তারখানার। রয়েছে সাধারনের স্নানের জন্য উষ্ণ জলের কুন্ড, বেড়াবার জন্য ফুলের বাগান থাকার বিবরণ। রয়েছে অসাধারণ এক পাঠাগারের খবর যার সংগ্রহে আছে ইউরোপের বিভিন্ন ভাষার কয়েক হাজার বই। সেন্ট মাইকেল চার্চের তত্ত্বাবধানে রয়েছে এক সংগ্রহশালা যার সংগ্রহের তুলনা একমাত্র পিটার্সবার্গের অ্যাকাডেমির সংগ্রহের সঙ্গেই করা সম্ভব। রয়েছে লাইটহাউস, মানমন্দির আর আবহাওয়া আপিস। সেই হাওয়া আপিসের কাজের উৎকর্ষতা বুঝতে একটা তথ্যই যথেষ্ট। ১৮৬৭তে আলাস্কা প্রত্যার্পণের পর আমেরিকান বিজ্ঞানী জর্জ ডেভিডসন তথ্যপঞ্জী তৈরির প্রয়োজনে আবহাওয়ার নথি চাইলে এককথায় আগের ১৪ বছরের প্রতিদিনের তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বাতাসের চাপমান ইত্যাদির মুদ্রিত বিবরণ পেয়ে যান এখান থেকে।     

আর একটি বই আমাদের জানাচ্ছে যে সেই সময়ের সিটকার নগরনির্মাণ ছিল পরিকল্পনামাফিক। রাস্তা চওড়া আর সোজা করে করা। সমস্ত বাড়ী শক্তপোক্ত কাঠের তৈরি যার পাশের রাস্তাও কাঠের পাটাতনে ঢাকা। কোম্পানির আপিসও কাঠের তৈরি, হলুদ রং করা। ছাদ লোহার, যার রং লাল। ‘Every edifice, large and small, is built of hewn logs, hewn, in the better class of houses, so as to leave no crevices, with the internal and external walls so well dressed as to be suitable for painting or papering.’  উল্লেখযোগ্য এখানে কোনো জেল নেই।

সামাজিক মেলামেশার জন্য রয়েছে ‘ক্লাব’ যেখানে সমাজের অভিজাত মানুষেরা আসতেন। আশ্চর্যের ব্যাপার ছিল এটাই যে রুশ, ক্রেওল আর লিঙ্গিত সমাজের ওপরতলার মানুষেরা সেখানে এক সঙ্গে অংশ নিতেন। সামাজিক অবস্থানটাই ছিল বিচার্য বিষয়, গায়ের রং বা জাতিগত উৎস নয়। উৎসবে মদ নিষিদ্ধ ছিল, একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল কোনো রাজপুরুষের আগমন।  

সাধারণের সমাজে ততদিনে এক মিশ্র সংস্কৃতির প্রভাব দেখা দিয়েছে। লিঙ্গিত মানুষেরা অভ্যস্ত হয়ে গেছে রুশ ভাষায় আসা সংবাদপত্র আর পত্রিকা পড়তে (যদিও রাশিয়া থাকে তাদের আসাটা অনিয়মিত এবং ২/৩ মাসে একবার)। রাশিয়ার গ্রামে গঞ্জে খেলা তাস আর দাবা খেলা আদিবাসীদের রোজকার অবসর কাটানোয় জায়গা করে নিয়েছে। লিঙ্গিতসমাজে গল্প বলার যে প্রথা বংশপরম্পরায় রয়েছে, তার মধ্যে ঢুকে গেছে রুশ লৌকিক গল্প, রূপকথারা। কোডিয়াকের গ্রামে যে ছেলেরা ‘লাপতা’ খেলছে, তারা আসলে খেলছে রুশ ‘বেসবল’-এর একটা পরিবর্তিত সংস্করণ। আর লম্বা স্কার্ট পড়া যুবতীরা অ্যাকর্ডিয়ান বাজানো ব্রিচেস পড়া যুবকদের সাথে যে নাচের ছন্দে আজ পা মেলাচ্ছে, তাতেও রয়েছে রুশ লোকনৃত্যের ছায়া। অর্থাৎ সাধারণভাবে একটা ‘ফিল গুড’ আবহাওয়া বিরাজ করছে আলাস্কা জুড়ে।

কিন্তু সাফল্য অবিসংবাদিতভাবে জন্ম দেয় শত্রুতা এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। আর এই শত্রুতার শুরু হয়েছে ব্যারানভের আমলের শেষ দিক থেকেই। ব্যারানভের প্রতি ব্যক্তিগত বিদ্বেষের কারণে জারের কাছের কিছু মানুষ রাজশক্তির কাছে কোম্পানির সাফল্যকে ছোট করে দেখিয়েছে। পরিকল্পিতভাবে আর্থিক ফলাফলের নথিতে কারচুপি করে কোম্পানির লাভকে লোকসান পরিবর্তিত করেছে। জারসম্রাজ্ঞী ক্যাথারিনকে বুঝিয়েছে যে রাজশক্তির ঘাড়ে চাপছে ভর্তুকির বোঝা। রাজশক্তির কানে দিনের পর দিন এই মন্ত্রণা দেওয়া হয়েছে যে পিটার্সবার্গ থেকে ওই বিশাল দূরত্ব অতিক্রম করে আলাস্কায় উপনিবেশ বজায় রাখতে আর্থিক সামরিক সব দিক থেকেই ক্ষতি বাড়ছে রাশিয়ার। তার ওপর অ্যালিউট ও অন্যান্য অধিবাসীদের ওপর অত্যাচারের সংবাদ, তাদের বাস্তুচ্যুত করার অভিযোগ, যা অনেকক্ষেত্রেই সঠিক বলে প্রমানিত হয়েছে, তা বিচলিত করেছে রাজশক্তিকে। কারণ নীতিগতভাবে রাশিয়া এর বিরোধী। এই অভিযোগে ইন্ধন জুগিয়েছে পাদ্রীদের লিখিত চিঠি ও সশরীরে পিটার্সবার্গে এসে করা সাক্ষাত। ফলস্বরূপ উনবিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশক থেকেই আলাস্কাকে শরীর থেকে ছেঁটে ফেলার চিন্তা শুরু করেছে রাশিয়ার রাজশক্তি।

পঞ্চাশের দশকে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে জটিল করল। ১৮৫৩ থেকে ১৮৫৬ অব্দি চলা এই যুদ্ধ রাশিয়াকে একা লড়তে হল গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স, অটোমান সাম্রাজ্য আর সার্ডিনিয়ার সম্মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে। সরাসরি দেড় লক্ষ সৈন্যের মৃত্যু আর ৮০ হাজার আহত সৈন্যের দায়ভার চাপল যুদ্ধে পরাজিত রাশিয়ার ওপর। আর তার থেকেও বেশী চাপ অনুভব করল রাশিয়ার রাজকোষ। যুদ্ধের ব্যয়ভার বইতে গিয়ে তলানিতে ঠেকল রুবলের ভান্ডার।   

এদিকে যুদ্ধে জিতে সামরিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কানাডার আলাস্কা সংলগ্ন অঞ্চলে ইংরেজরা তাদের নৌশক্তি বাড়াতে লাগল; ভ্যাঙ্কুবার দ্বীপে স্থাপন করল প্রথম স্থায়ী নৌঘাঁটি। রাশিয়া আশঙ্কা করল ইংরেজরা আলাস্কায় রাশিয়ার অধিকৃত অঞ্চলে হাত বাড়াবে, আর বাড়ালে সেই আগ্রাসনকে ঠেকানো তার একার পক্ষে অসম্ভব। এই অঞ্চলে আর যার তৎপরতা আছে সে আমেরিকা। রাশিয়া তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিল। আর সেই বন্ধুত্বের নিশান হিসেবে আলাস্কাকে আমেরিকার কাছে বিক্রির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরুর সিদ্ধান্ত নিল। জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার আর তাঁর ভাই কন্সটানটিন এই সিদ্ধান্তের মূল নায়ক। তাঁদের হয়ত মনে হয়েছিল দেশের থেকে বিরাট দূরে সাগরপারের উপনিবেশে প্রশাসন পরিচালনার দায়ভার থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে এই পদক্ষেপে, শত্রু দেশ গ্রেট ব্রিটেনের কাছে আবার পর্যদুস্ত হবার গ্লানি তাদের স্পর্শ করবে না আর এই সুবাদে রাজকোষের রক্তাল্পতা কিছুটা হলেও কমবে। আসলে আলাস্কার নিজস্ব সম্পদের কোনো হদিশ ছিল না রাজপরিবারের বর্তমান প্রজন্মের কাছে। তাঁরা পিটার দ্য গ্রেটের রক্তের সম্পর্কের উত্তরসূরি ছিলেন বটে, কিন্তু তাঁর মেধা, তাঁর অনুসন্ধিৎসা, তাঁর রোমান্টিকতার ফল্গুধারাকে বয়ে নিয়ে যাবার উত্তরাধিকার থেকে বিধাতা তাঁদের বঞ্চিত করেছিলেন। তাই আংটির মাথায় থাকা দুর্মূল্য হীরকখন্ড হেলায় হারিয়ে যাচ্ছে, তা অনুধাবন করার সাধ্যই তাঁদের হয়নি।

১৮৫৮এ মালিকানা বদলের যে কথাবার্তা শুরু হয়েছিল তা সাময়িক ধাক্কা খেল ১৮৬১তে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের কারণে। যুদ্ধ কবে শেষ হবে তার পূর্বানুমান সম্ভব নয়। তাই নতুন করে রাশিয়া ১৯৬৪তে আলাস্কার গভর্নর নিয়োগ করল মাকসুতভকে। এই মানুষটির সঙ্গে আলাস্কার সম্পর্ক ১৮৫৯ থেকে। বিভিন্ন প্রসাশনিক পদে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। তিন সন্তানের পিতা হয়েছেন আলাস্কায় থাকতে থাকতে, প্রিয়তমা স্ত্রী প্রয়াত হতে তাঁকে সমাধিস্ত করেছেন আলাস্কার মাটিতে। এ দেশের সম্পদ তাঁর থেকে কেউ বেশী চেনে না। স্ত্রী বিয়োগ হতে ১৮৬৩তে রাশিয়ায় গিয়ে জারসম্রাটকে সে কথাই বলে এসেছেন তিনি। দৃঢ়ভাবে বিরোধিতা করেছেন আলাস্কা হস্তান্তরের। কারণ সরকারিভাবে না হলেও দেওয়ালের কান ছুঁয়ে যাওয়া বাতাসে তখন এ কথা ভাসছে। হাবেভাবে মনে হয়েছে জারও তাঁর কথায় আস্থাশীল। আশ্বস্ত মাকসুতভ পরের বছর আলাস্কায় গিয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে শুরু করে দিয়েছিলেন প্রশাসন পরিচালনার কাজ। আসলে সম্রাটের অভিনয়ক্ষমতা পরাস্ত করেছিল মাকসুতভের বিচারবোধকে। আলাস্কার বিক্রি ততদিনে রাশিয়ার কাছে ইংরাজিতে যাকে বলে ‘ফোরগন কনক্লুসন’। আর ভাগ্যের তীব্রতম পরিহাস বোধহয় এটাই যে কয়েক বছর পর সেই বিনিময়ের আনুষ্ঠানিক সভায় রাশিয়ার পক্ষ থেকে যাঁকে প্রতিনিধিত্ব করতে হয়েছিল তাঁর নাম দিমিত্রি পেত্রভিচ মাকসুতভ।     

আলাস্কার মূল্য নির্ধারণে তুলনায় অনেক বিচক্ষণতার পরিচয় রাখল আমেরিকা। আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে সেক্রেটারি অফ স্টেট উইলিয়াম সিওয়ার্ড। গৃহযুদ্ধের দিনগুলোর আগে থেকেই আব্রাহাম লিঙ্কনের প্রতিনিধি হিসেবে রাশিয়ার সঙ্গে কথা চালিয়েছেন তিনি। পরবর্তী প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জনসনও তাঁকেই দায়িত্ব দিলেন এ প্রসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেবার। আমেরিকার কংগ্রেসের সদস্যদের একটা অংশ এই সিদ্ধান্তের পক্ষে ছিল না। বিরোধিতা ছিল সংবাদমাধ্যমের একটা অংশ থেকেও। কিন্তু সিওয়ার্ড অচঞ্চল। রাশিয়ার তরফে ব্যারন ভন স্টোয়েকেলের সঙ্গে চলল দীর্ঘ আলোচনা। শেষে আলাস্কার মূল্য স্থির হল একর প্রতি ২.৫ সেন্ট হিসেবে ৭২ লক্ষ আমেরিকান ডলার। ৩০ মার্চ, ১৮৬৭ ওয়াশিংটনে সারা রাত্রিব্যাপী আলোচনা শেষে ভোর ৪টেয় দুপক্ষ সই করল আলাস্কা প্রত্যার্পণ চুক্তি। আলাস্কার মানুষ তখন নিশ্চিন্ত নিদ্রায়, আলাস্কার গভর্নর মাকসুতভ সম্পূর্ণ অন্ধকারে তাঁর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে। পরদিন আমেরিকার আকাশে যে সূর্য উঠল, তার কাঁধের ওপর  দায়িত্ব পড়েছে আরও ৫ লক্ষ ৮৬ হাজার বর্গমাইল আমেরিকান এলাকায় আলো দেবার।

চুক্তিকে রূপায়িত করতে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার কাজ শুরু হল। মে মাসে এক টেলিগ্রাম মারফৎ স্টোয়েকেল মাকসুতভকে নির্দেশ দিলেন সিটকার বন্দরকে আমেরিকান জাহাজের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে। জুলাই মাসে আমেরিকান স্টিমার ‘লিঙ্কন’কে পাঠানো হল সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে প্রত্যার্পণ অনুষ্ঠানে অংশ নেবার উদ্দেশ্যে। আমেরিকার তরফে জেনারেল লভেল রুশো আর রাশিয়ার তরফে ক্যাপ্টেন পেসচুরভকে নিযুক্ত করা হল অনুষ্ঠানের দায়িত্বে। আমেরিকার নৌবাহিনীর মেজর জেনারেল হ্যালেক তৎপর হলেন বড়সড় সৈন্য সমাবেশের, কারণ অন্য অনেক সামরিক কর্তার মতো তাঁরও ধারণা ছিল যে রাশিয়ার বিরাট সৈন্যবাহিনীর হাত থেকে নিতে হবে আলাস্কার ভার। সিটকার বাইরে রাশিয়ার সেনাবাহিনী যে কোথাওই ছিল না আর সিটকাতেও তাদের উপস্থিতি ছিল প্রতিনিধিত্বমূলক এই সহজ সত্যে বিশ্বাস রাখতে পারেনি আমেরিকা। তাই ৯ই থেকে ১৮ই অক্টোবরের মধ্যে সিটকার বন্দরে একে একে এসে উপস্থিত হল ৪ রণতরী – জন এল স্টিফেন্স, ওসিপি, রেসাকা আর জেমসটাউন। সেনাকর্তা জেফারসন সি ডেভিস ১৮ তারিখের বিকেলে প্রত্যার্পণ অনুষ্ঠান শেষ করতে চাইলেন। ক্যাসেল হিল পাহাড়ের ওপরে গভর্নরের প্রাসাদ  নির্দিষ্ট হল অনুষ্ঠানস্থল হিসেবে। পাহাড়ের সামনের সমুদ্রে আমেরিকান রণতরীতে দাঁড়িয়ে সাক্ষী থাকল ১০০র ওপর আমেরিকান মানুষ। রাশিয়ার তরফে উপস্থিতির হার নগণ্য। আসলে সিটকাবাসী রুশ আর লিঙ্গিতদের কাছে বাসভূমির মালিকানা পালটে যাওয়া এক অবিশ্বাস্য অবাঞ্ছিত ঘটনা যার বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া বেদনাদায়ক। আর সেই বেদনার ভার সবচেয়ে বেশী বোধহয় মাকসুতভের হৃদয়ে। তবে কর্তব্যের দায় আরও বেশী। সেই দায়ে ঠিক সাড়ে ৩টের সময় মঞ্চে এসে উপস্থিত হলেন তিনি, যেখানে আগে থেকেই উপস্থিত বাকী কর্তাব্যক্তিরা। এর পরের ঘটনাবলীর বর্ণনায় আমরা এক প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনার সাহায্য নিতে পারি। ঘটনার ৬ বছর পর সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত এক ফিনল্যান্ডবাসী কামার তার দেশে এই বিবরণী প্রকাশ করে। তাতে বলা হচ্ছে ; 

“The wooden two-story mansion of the Russian governor stood on a high hill, and in front of it in the yard at the end of a tall spar flew the Russian flag with the double-headed eagle in the middle of it. Of course, this flag now had to give way to the flag of the United States, which is full of stripes and stars. On a predetermined day in the afternoon a group of soldiers came from the American ships, led by one who carried the flag. Marching solemnly, but without accompaniment, they came to the governor’s mansion, where the Russian troops were already lined up and waiting for the Americans. Now they started to pull the [Russian double-headed] eagle down, but—whatever had gone into its head—it only came down a little bit, and then entangled its claws around the spar so that it could not be pulled down any further. A Russian soldier was therefore ordered to climb up the spar and disentangle it, but it seems that the eagle cast a spell on his hands, too—for he was not able to arrive at where the flag was, but instead slipped down without it.”

বদলে গেল পতাকা

অক্টোবরের সেই শীতার্ত অপরাহ্নে আলাস্কার বুকে শেষ হয়ে গেল এক রুশ আমেরিকার রূপকথা। জেনারেল ডেভিস আলাস্কাকে রেয়াত করেননি। একদল ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো ছেড়ে দিয়েছেন তার সৈন্যদের। সেন্ট মাইকেল’স চার্চের সংগ্রহশালা, পাঠাগারের অমূল্য বই আর পান্ডুলিপির সংগ্রহকে তারা তছনছ করেছে। রুশ সেনাদের সেনাব্যারাক থেকে রাস্তায় বের করে দিয়েছে অক্টোবরের চূড়ান্ত শীতে। চোখের ভাষায় আর অঙ্গভঙ্গিমায় সিটকার রুশ অধিবাসীদের বুঝিয়ে দিয়েছে আমেরিকান আলাস্কায় তারা মোটেই স্বাগত নয়। ফলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মাত্র কয়েক ঘর রুশ আর পাদ্রীরা ছাড়া সকলেই পাড়ি দিতে বাধ্য হল রাশিয়ার পথে। রুশ আমলে জমির কোনো লিখিতি দলিলের অস্তিত্ব ছিল না। ফলে আদিবাসী মানুষদের কাছে ছিল না জমির অধিকারের কোনো লিখিত প্রমাণ। সেই সুযোগে আমেরিকান জমি হাঙ্গরেরা নিজেদের নামে নথিবদ্ধ করে নিল সিটকা ও সংলগ্ন অঞ্চলের জমি। লিঙ্গিত, হাইডা, অ্যালিউটরা হয়ে গেল নিজভূমে পরবাসী। আমল দেয়নি সরকারি আমেরিকাও। আলাস্কার প্রতি উপেক্ষায় তাকে প্রথমে ডিপার্টমেন্ট অফ আলাস্কা (১৮৬৭-১৮৮৪), তারপর ডিস্ট্রিক্ট অফ আলাস্কা (১৮৮৪-১৯১২) শেষে টেরিটোরি অফ আলাস্কা (১৯১২ -১৯৫৯) নামে অভিহিত করে নিম্নতর পদমর্যাদার প্রশাসক দিয়ে শাসনকাজ চালিয়েছে। শেষে নাগরিকত্বের দাবীতে আলাস্কার মানুষদের দীর্ঘ সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে ১৯৫৯-এ এসেছে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা। ৩রা জানুয়ারি আমেরিকার পতাকায় ৪৯তম তারাটি ফুটেছে। আর আলাস্কার ভূমিপুত্রদের তাদের মাটির অধিকার ফিরে পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৯৭১ অব্দি, যতদিন না পাশ হয়েছে আলাস্কা নেটিভ ক্লেমস সেটেলমেন্ট অ্যাক্ট।

মৃত্যু কি সত্যিই ঘটেছে রুশ আমেরিকার?  

অ্যাংকরেজ থেকে ২২০ কিলোমিটার দূরে হোমার শহর। আজও সে পথের যাত্রীদের একটা বড় অংশ দুই তৃতীয়াংশ পথ অতিক্রম করে পায়ে হেঁটে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে যান এক ছোট্ট গ্রামে যার নাম নিনিলচিক। ৮৮০ জন মানুষের এই গ্রামে মাউন্ট রিডাউট আর মাউন্ট ইলিয়াম্নার পাদদেশে ৫টি সোনালী গোম্বুজওলা এক রুশ অর্থোডক্স চার্চ তাদের লক্ষ্য। রুশ আমেরিকা রয়ে গেছে এই পবিত্র পরিক্রমায়।

পামার শহর থেকে গ্লেন হাইওয়ে দিয়ে চলতে চলতে হঠাৎই দেখতে পাবেন আকাশছোঁয়া হিমবাহ পথের পাশেই এসে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে আপনাকে দেখবে বলে। রুশ আমেরিকা বেঁচে আছে তার ‘মাতানুস্কা’ নামে।    

উপকূল আলাস্কার অনেক গ্রামে কারোর বাড়ী বেড়াতে গেলে বাড়ীর বয়স্ক মহিলারা সযত্নে থালায় করে সাজিয়ে আনবেন ‘গোলুবসি’ নামে এক খাবার। সামান্য অনুসন্ধানেই আপনি জানতে পারবেন এর রেসিপির উৎস রয়েছে ইউক্রেনের গ্রামের হেঁসেল। রুশ আমেরিকার গন্ধ মিশে আছে ওই খাবারের গায়ে। রুশ আমেরিকা রয়ে গেছে কোডিয়াকের গ্রামে ‘লাপতা’ খেলা কিশোরের পায়ে, রয়ে গেছে ইয়ুকুন নদীর ধারে নর্তকী যুবতীদের নাচের ছন্দে। আর সেই আদিম আলাস্কা? সে কি কোথাও নেই?  

প্রিবিলফ দ্বীপপুঞ্জের পাশে বেরিং প্রণালীর জল তোলপাড় করে হাজারে হাজারে তিমির দল চলেছে তাদের বাৎসরিক সফরে। সমুদ্রের ঢেউয়ের ওপরে তাদের ছুঁড়ে দেওয়া জলের ফোয়ারা ধুইয়ে দিচ্ছে বাতাসের গা। শীতসন্ধ্যায় আকাশছোঁয়া পাহাড়শ্রেণীর ওপার থেকে শিস দিয়ে ছুটে আসা হাওয়া বরফকুচি উড়িয়ে তুলছে প্রবল তুষারঝড়। স্বল্পস্থায়ী গ্রীষ্মের শুরুতে ইয়ুকুন নদীর বরফ গলে তিরতির বইতে শুরু করছে জল, তাতে স্যামন ধরতে গুটি গুটি এগিয়ে আসছে বাদামি ভালুকের মা আর ছানা। আলাস্কার আত্মার অনন্ত উপস্থিতি এই সব ছবিতে, শব্দে, গন্ধে। সেই কোন আদিম সময়ে সাইবেরিয়া থেকে আসা প্রথম মানুষটিকে সে তুলে নিয়েছিল নিজের কোলে। তারপর থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের চলার সাক্ষী থেকেছে সে। সে চলা যতদিন থাকবে, ততদিন আদিম আলাস্কা বেঁচে থাকবে আমার তোমার জীবনে, যাপনে।

কায়াকে এক অ্যালিউট

টীকা ও চিত্র পরিচিতি

১. Del Norte, Special Correspondent of The Alta 17.10.1867 Russian America, 69

২. Clarence L. Andrews. The Story of Sitka, the Historic outpost of the Northwest coast, the Chief Factory of the Russian American Company. Seattle. Lowman & Hanford. 1922

৩. T. Ahllund নামে ফিনল্যান্ডবাসি এক কামার যে ওই সময়ে আলাস্কায় কাজ করা ও সেই সুত্রে ৬ বছর পরে প্রকাশ করা এক প্রতিবেদনে এই কথাগুলি লেখে। সূত্র – Wikipedia. Alaska Purchase

৪. গোলুবসি – ইউক্রেনের এক বিশেষ খাবার গোলুবসি। বাঁধাকপির পাতায় মুড়ে গরুর মাংসের সুস্বাদু পুর দিয়ে সিদ্ধ ও হাল্কা ভাজা করে খাওয়া হয়। রাশিয়ার এই অঞ্চলে কোনো উৎসব সম্পূর্ণ হয় না গোলুবসি ছাড়া। পাকা রাঁধুনিও ৪ থেকে ৬ ঘন্টা সময় নেন এক প্লেট গোলুবসি বানাতে।

চিত্র-১, ২, ৩, ৪ Wikimedia Commons

চিত্র-৫ Black, Lydia T. Russians in America 1732 -1867 University of Alaska Press, 2004. Plate – 4

জন্ম ১৯৫৯। কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষা। পেশায় অস্থিশল্য চিকিৎসক। লেখার জগতে বিলম্বিত প্রবেশ। লেখা প্রকাশিত 'দেশ', হরপ্পা, ভ্রমি ভ্রমণআড্ডা সহ নানা পত্রিকায় ও সংকলনে। প্রকাশিত বই 'টাইমলাইন আলাস্কা', 'এক চামচ বিদেশ', 'কোভিড-১৯, এক বিভ্রান্তির সন্ত্রাস'। ভ্রমণআড্ডা প্রদত্ত 'কলম' সম্মান লাভ ২০২২এ। ভ্রমণ, ইতিহাস অনুসন্ধান নিয়ে বিশেষভাবে অনুরাগী। ছবি তোলার নেশায় দেশে বিদেশে পাড়ি, তাতে কিছু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মানপ্রাপ্তি। দেশে ও বিদেশে একক ও দলগত প্রদর্শনী।

মন্তব্য তালিকা - “আলাস্কার সাতরঙা ইতিহাস – পর্ব ৭”

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।