সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

আসল অগ্নিপুরাণের সুলুক সন্ধান

আসল অগ্নিপুরাণের সুলুক সন্ধান

জয়ন্ত ভট্টাচার্য

সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬ ৭৫ 4

প্রাককথন

দীর্ঘকাল যাবৎ প্রচলিত ঐতিহ্য অনুসারে সংস্কৃত ভাষায় রচিত বর্ণাশ্রমধর্মের অনুসারী পুরাণ নামে অভিহিত গ্রন্থসমূহ একই সময়ে এবং একই ব্যক্তির দ্বারা সৃষ্ট। এই ঐতিহ্যের অনুসরণ করে মত্স্যপুরাণে বলা হয়েছে, সব শাস্ত্রের মধ্যে পুরাণই প্রথম ব্রহ্মা কর্তৃক স্মৃত হয়েছিল। তারপর তাঁর মুখ থেকে বেদ বিনির্গত হয়। কল্পের শুরুতে কেবল একটি মাত্র পুরাণ গ্রন্থ বিদ্যমান ছিল, সেই গ্রন্থ শত কোটি শ্লোকবিশিষ্ট ছিল।১ একই ঐতিহ্যেরই সম্প্রসারণ করে পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে, ব্রহ্মা ব্যাসের রূপ ধারণ করে প্রত্যেক দ্বাপর যুগে চার লক্ষ শ্লোকের পুরাণকে ১৮টি ভাগে ভাগ করেন।২ অবশ্য, এই ঐতিহ্য কখনওই সর্বজনীন ছিল না। বিষ্ণুপুরাণে (৩.৬.১৫-১৯) বলা হয়েছে, ব্যাস আখ্যান, উপাখ্যান, গাথা ও কল্পশুদ্ধি নিয়ে পুরাণসংহিতা রচনা করে তাঁর শিষ্য সূতবংশীয় রোমহর্ষণকে শিক্ষা দিয়েছিলেন। রোমহর্ষণের ছয় শিষ্য সুমতি, অগ্নিবর্চা, মিত্রায়ু, অকৃতব্রণ, সাবর্ণি ও শাংশপায়ন। এর মধ্যে তিন শিষ্য, অকৃতব্রণ, সাবর্ণি ও শাংশপায়নের রচিত তিনটি পুরাণসংহিতা ও রোমহর্ষণ রচিত মূল পুরাণসংহিতা চারটি আদি পুরাণসংহিতা। অগ্নিপুরাণ (২৭০.১০-১২), বায়ুপুরাণ (৬১.৫৫-৬১) ও ব্রহ্মাণ্ডপুরাণেও (অনুষঙ্গপাদ।৩৫.৬৩-৬৬) প্রায় একই ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।৩ বর্তমানে বিদ্যমান পুরাণ গ্রন্থগুলিতে উল্লিখিত ঐতিহাসিক ও সামাজিক তথ্যসমূহের সঙ্গে এই ঐতিহ্যগুলির খুব সাযুজ্য নেই।

ঐতিহাসিক তথ্য ও পুরাণ গ্রন্থসমূহের অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্যের বিশ্লেষণ করে আধুনিক বিদ্বানদের অনুমান, সংস্কৃত ভাষায় রচিত পুরাণ বলে অভিহিত গ্রন্থসমূহের যে বিশাল সম্ভার বর্তমানে মুদ্রিত ও পাণ্ডুলিপিরূপে বিদ্যমান, তার রচনার সূত্রপাত উত্তর ভারতের গুপ্ত সাম্রাজ্যের কালপর্বে, তার পূর্ববর্তী কালপর্বের পুরাকথার দীর্ঘ মৌখিক ঐতিহ্যের লিখিত সংকলনের রূপে।৪ আনুমানিক দ্বিতীয় শতাব্দী সাধারণপূর্বাব্দ থেকে তৃতীয় শতাব্দী সাধারণাব্দ পর্যন্ত ভারতের প্রাচীন শৈব ও বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের পুরাকথাগুলি মহাভারত, রামায়ণ ও পুরাণের আদিরূপে অন্তর্ভুক্ত হয়।৫ সাধারণাব্দের তৃতীয় থেকে অষ্টম শতক সাধারণাব্দের মধ্যবর্তী কালপর্বে তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের মুখ্য ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলির সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয়সমূহ প্রাচীন পৌরাণিক গ্রন্থগুলিতে সঙ্কলিত হয়। শিবের উপাসক পাশুপত সম্প্রদায়, নারায়ণ-বিষ্ণুর উপাসক পাঞ্চরাত্র ও ভাগবত সম্প্রদায় এবং বৈদিক যজ্ঞ অনুষ্ঠানকারী স্মার্ত ব্রাহ্মণ লেখকগণ তাঁদের নিজস্ব চিন্তন অনুযায়ী উপাসনা পদ্ধতি, আচার-অনুষ্ঠান, তীর্থ মাহাত্ম্য, দান মাহাত্ম্য, ইতিবৃত্ত, পুরাকথা, লোকশ্রুতি এবং দার্শনিক মত এই গ্রন্থগুলিতে সমাবিষ্ট করতে শুরু করেন। আদি-মধ্যযুগের শুরু থেকে ভারতে সব ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে তান্ত্রিক আচার-অনুষ্ঠানের অনুগামীদের সংখ্যার ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটে, এবং তান্ত্রিক ভাবনার অন্যতম অঙ্গ, দেবী বা শক্তি উপাসনা এই সময় জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। নবম থেকে দ্বাদশ শতক সাধারণাব্দের মধ্যবর্তী কালপর্বে তান্ত্রিক উপাসনার অনুসারী ব্রাহ্মণরা, বিশেষত শক্তি উপাসকরা পুরাণগ্রন্থগুলির সেই সময়ের প্রচলিত রূপের যথেষ্ট পরিবর্তন ও সংযোজন করেন এবং কয়েকটি পুরোনো পুরাণের নাম ব্যবহার করে সম্পূর্ণ নতুন পুরাণগ্রন্থ এই সময় রচিত হয়।৬ এই কালপর্বে সূর্য উপাসক সৌর সম্প্রদায় ও গণপতির উপাসক গাণপত্য সম্প্রদায়দের ধর্মীয় ভাবনারও প্রভাব পুরাণ গ্রন্থসমূহে অন্তর্ভুক্ত হয়। অন্ত-মধ্যযুগে, অর্থাৎ, সাধারণাব্দের দ্বাদশ থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ধর্মাচরণের নিজস্ব ধারাগুলির সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয়সমূহ ও স্মৃতি নির্দেশিত সামাজিক বিধিনিষেধগুলি পুরাণ গ্রন্থসমূহে যুক্ত হয়েছে। অন্ত-মধ্যযুগে উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে নীলমতপুরাণ বা একাম্রপুরাণের মতো কয়েকটি স্থানীয় বিষয় নিয়েও পুরাণও রচিত হয়েছে। ঊনবিংশ শতকের শুরু থেকে পুরাণ গ্রন্থগুলির মুদ্রিত সংস্করণ প্রকাশ শুরু হওয়ার পর সংযোজন ও পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সমাপ্ত হয়ে যায়।

প্রচলিত ঐতিহ্য অনুসারে ১৮টি পুরাণ গ্রন্থকে মহাপুরাণ ও ১৮টি পুরাণ গ্রন্থকে উপপুরাণ বলে অভিহিত করা হয়। মহাপুরাণ কথাটি সম্ভবত প্রথম ভাগবতপুরাণে (দ্বাদশ স্কন্ধ।৭.২২) উল্লিখিত হয়েছে। বিভিন্ন পুরাণ ও স্মৃতিনিবন্ধ গ্রন্থে উল্লিখিত মহাপুরাণ ও উপপুরাণের বেশ কয়েকটি তালিকায় সন্নিবিষ্ট ১৮টি মহাপুরাণের নাম প্রায় এক হলেও ১৮টি উপপুরাণের নামের ক্ষেত্রে পার্থক্য যথেষ্ট বেশি।৭ প্রায় সব তালিকাতেই অগ্নিপুরাণ বা আগ্নেয়পুরাণকে মহাপুরাণ বলে উল্লিখিত হয়েছে।          

মুদ্রিত সংস্করণের অগ্নিপুরাণ

অধিকাংশ ঐতিহ্য অনুসারে মহাপুরাণ বলে স্বীকৃত অগ্নিপুরাণের বর্তমানে যে মুদ্রিত সংস্করণগুলি পাওয়া যায়, সেই সংস্করণগুলিতে ৩৮২ বা ৩৮৩টি অধ্যায় দেখা যায়। ১৮৭৩-১৮৭৯ সালে রাজেন্দ্রলাল মিত্রের সম্পাদনায় কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে তিন খণ্ডে প্রকাশিত প্রথম মুদ্রিত সংস্করণে ৩৮২টি অধ্যায় রয়েছে। এরপর ১৯০০ সালে পুণের আনন্দাশ্রম প্রেস, ১৯০৭ সালে কলকাতার বঙ্গবাসী প্রেস এবং ১৯২১ সালে মুম্বাইয়ের ভেঙ্কটেশ্বর প্রেস থেকে প্রকাশিত সংস্করণ সমেত অগ্নিপুরাণের আরও কয়েকটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্বকোষপ্রতিম এই পুরাণগ্রন্থে প্রাচীন ও আদি-মধ্যযুগের ভারতে চর্চিত বহু বিষয় সঙ্কলিত হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রাচীন গ্রন্থ, যেমন, অমরকোষ বা যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতির অংশবিশেষের প্রায় অবিকল পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। আভ্যন্তরীণ সাক্ষ্যের নিরিখে অধিকাংশ আধুনিক বিদ্বান বর্তমান মুদ্রিত অগ্নিপুরাণের রচনার সূচনাকাল সাধারণাব্দের নবম শতক বলে মনে করেন।৮ আধুনিক বিদ্বানরা মধ্যযুগের স্মৃতিনিবন্ধকারদের উদ্ধৃত অগ্নিপুরাণের অনেক শ্লোক বর্তমান মুদ্রিত সংস্করণের অগ্নিপুরাণে খুঁজে না পাওয়ায় এই গ্রন্থটি আদৌ প্রাচীন অগ্নিপুরাণের পরিবর্তিত রূপ নাকি নবম শতক সাধারণাব্দ থেকে প্রাচীন অগ্নিপুরাণ গ্রন্থকে প্রতিস্থাপন করে উদ্ভূত এক পৃথক গ্রন্থ, এই নিয়ে প্রথম সন্দেহের উদ্রেক হয়।

দ্বাদশ শতাব্দী সাধারণাব্দের দ্বিতীয়ার্ধের বাংলার সেনবংশীয় শাসক বল্লালসেন (রাজত্বকাল ১১৫৮-১১৭৯ সাধারণাব্দ) ৫টি স্মৃতিনিবন্ধ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। এর মধ্যে আচারসাগর ও প্রতিষ্ঠাসাগর নামের দুটি স্মৃতিনিবন্ধ গ্রন্থের কোনও পাণ্ডুলিপি আজও পাওয়া যায়নি, শুধু পরবর্তীকালের স্মৃতিনিবন্ধ গ্রন্থের উল্লেখ ও উদ্ধৃতি থেকে এই গ্রন্থ দুটির কথা জানা গেছে৯ আর তাঁর লেখা ব্রতসাগর নামের স্মৃতিনিবন্ধ গ্রন্থটির সম্পর্কে উল্লেখ কেবল তাঁর দানসাগর গ্রন্থে পাওয়া গেছে।১০ বল্লালসেন ১০৯১ শকাব্দে (১১৬৯-১১৭০ সাধারণাব্দে) তাঁর স্মৃতিনিবন্ধ গ্রন্থ, দানসাগর রচনা সমাপ্ত করেন। তাঁর ১০৮৯ শকাব্দে (১১৬৭-১১৬৮ সাধারণাব্দে) শুরু করা অসমাপ্ত স্মৃতিনিবন্ধ গ্রন্থ অদ্ভূতসাগর তাঁর পুত্র ও বাংলার পরবর্তী সেনবংশীয় শাসক লক্ষ্মণসেন সমাপ্ত করেন।১১ এই দুটি গ্রন্থে অগ্নিপুরাণ বা আগ্নেয়পুরাণ থেকে উদ্ধৃত বলে যে শ্লোকগুলি উল্লেখ করা হয়েছে, তার অধিকাংশই বর্তমান অগ্নিপুরাণে পাওয়া না গেলেও বহ্নিপুরাণ নামের বর্তমানে উপপুরাণ বলে স্বীকৃত একটি গ্রন্থে পাওয়া যায়। হলায়ুধ লক্ষ্মণসেনের ধর্মাধিকারী পদে আসীন ছিলেন। তাঁর রচিত ব্রাহ্মণসর্বস্ব গ্রন্থে অগ্নিপুরাণ থেকে উদ্ধৃত বলে উল্লিখিত শ্লোকগুলিও বর্তমান অগ্নিপুরাণে পাওয়া যায় না, কিন্তু বর্তমান বহ্নিপুরাণ গ্রন্থে পাওয়া যায়। চতুর্দশ শতকের শুরুতে মিথিলার কর্ণাট রাজবংশের শাসক হরিসিংহদেবের সান্ধিবিগ্রহিক (যুদ্ধমন্ত্রী) ছিলেন চণ্ডেশ্বর ঠক্কুর। তাঁর কৃত্যরত্নাকর গ্রন্থে অগ্নিপুরাণ ও আগ্নেয়পুরাণ থেকে উদ্ধৃত বলে যে শ্লোকগুলি উল্লিখিত হয়েছে, তাও কেবলমাত্র বর্তমান বহ্নিপুরাণ গ্রন্থে পাওয়া যায়। বল্লালসেন, হলায়ুধ ও চণ্ডেশ্বর ঠাকুর উল্লিখিত অগ্নিপুরাণ বা আগ্নেয়পুরাণ গ্রন্থটি যে আসলে একটি প্রাচীনতর অগ্নিপুরাণ এবং সেই প্রাচীন পুরাণ গ্রন্থই বর্তমানে বহ্নিপুরাণ নামে তা অনুমান করতে অসুবিধা হয় না। কিন্তু, দীর্ঘদিন পর্যন্ত বহ্নিপুরাণের বিদ্যমান পাণ্ডুলিপির সঙ্গে এই শ্লোকগুলিকে মিলিয়ে দেখা হয় নি। তবে, দুটি অগ্নিপুরাণের অস্তিত্বের কথা এই উদ্ধৃতিগুলি থেকেই প্রথম বুঝতে পারা যায়।

বহ্নিপুরাণই আসল অগ্নিপুরাণ?

দ্বাদশ শতক সাধারণাব্দ থেকে দক্ষিণ ভারতের স্মৃতিনিবন্ধকাররা, যেমন দেবণভট্ট, হেমাদ্রি বা মাধবাচার্য, বর্তমান বহ্নিপুরাণ নামে পরিচিত গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত শ্লোকগুলিকে বহ্নিপুরাণ নামেই উল্লেখ করতে শুরু করেছেন। সম্ভবত, প্রাচীন আগ্নেয়পুরাণ দক্ষিণ ভারতের বিদ্বানদের কাছে ১১০০ সাধারণাব্দের যথেষ্ট আগে থেকেই বহ্নিপুরাণ নামেই পরিচিত ছিল। সম্ভবত নবম শতাব্দী সাধারণাব্দ থেকে উত্তর ও পূর্ব ভারতে বর্তমান অগ্নিপুরাণ স্বীকৃতি অর্জন করার পর তাঁরা তাঁদের উদ্ধৃত গ্রন্থের পার্থক্য বোঝানোর জন্য এই নাম ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু, তাঁদের রচিত গ্রন্থগুলিতে বর্তমান অগ্নিপুরাণ থেকে প্রায় কোনও উদ্ধৃতিই দেখতে পাওয়া যায় না। সম্ভবত, তাঁদের কাছে বর্তমান অগ্নিপুরাণ গ্রন্থটি তখনও শাস্ত্রগ্রন্থের মর্যাদা লাভ করেনি। বর্তমান অগ্নিপুরাণ সম্ভবত প্রথম শাস্ত্রগ্রন্থের মর্যাদা পেয়েছে চতুর্দশ শতক সাধারণাব্দে, বর্তমান ওড়িশার অধিবাসী বিশ্বনাথ কবিরাজ (১৩০০-১৩৮৪ সাধারণাব্দ) রচিত সাহিত্যদর্পণ গ্রন্থে। এরপর, পঞ্চদশ শতক সাধারণাব্দের মাঝামাঝি বর্তমান ওড়িশারই স্মৃতিনিবন্ধকার নরসিংহ বাজপেয়ীও তাঁর লেখা নিত্যাচারপ্রদীপ গ্রন্থে আগ্নেয়পুরাণ বলে বর্তমান অগ্নিপুরাণ গ্রন্থের শ্লোক উদ্ধৃত করেছেন। ষোড়শ শতকের বাংলার স্মৃতিনিবন্ধকার গোবিন্দানন্দ কবিকঙ্কণাচার্যও (১৫২০-১৫৬০ সাধারণাব্দ) তাঁর রচনায় অগ্নিপুরাণ বা আগ্নেয়পুরাণ বলে বর্তমান অগ্নিপুরাণ গ্রন্থের শ্লোক উদ্ধৃত করেছেন।১২ অনুমান করা যায়, দ্বাদশ শতক সাধারণাব্দ থেকে দক্ষিণ ভারতে প্রাচীন অগ্নিপুরাণ গ্রন্থ বহ্নিপুরাণ নামে নতুন পরিচিতি লাভ করেছে এবং চতুর্দশ শতক সাধারণাব্দ থেকে বর্তমান অগ্নিপুরাণ গ্রন্থ আসল অগ্নিপুরাণ গ্রন্থটিকে ক্রমশ প্রতিস্হাপন করতে সক্ষম হয়েছে। 

দ্বাদশ শতাব্দী সাধারণাব্দে বল্লালসেনই সম্ভবত প্রথম দুটি পৃথক অগ্নিপুরাণের অস্তিত্ব লক্ষ করেছিলেন। তিনি তাঁর দানসাগর গ্রন্থে (উপক্রমণিকা।শ্লোক ৬৩-৬৬) ৫টি পুরাণের তৎকালীন রূপকে জাল বলে উল্লেখ করেছেন – তার্ক্ষ্যপুরাণ (গরুড়পুরাণ), ব্রাহ্মপুরাণ (ব্রহ্মপুরাণ), বৈষ্ণবপুরাণ (বিষ্ণুপুরাণ), লিঙ্গপুরাণ ও আগ্নেয়পুরাণ (অগ্নিপুরাণ)। তিনি জানিয়েছেন, মীনকেতনের অনুগামী (অর্থাৎ নাথ সম্প্রদায়ভুক্ত) ভণ্ড বিধর্মী সন্ন্যাসীরা মানুষকে বিভ্রান্ত করতে জাল আগ্নেয়পুরাণ রচনা করেছে।১৩ বল্লালসেন উল্লিখিত জাল আগ্নেয়পুরাণই যে মুদ্রিত সংস্করণের অগ্নিপুরাণ এবং বর্তমানে বহ্নিপুরাণ নামে উল্লিখিত পাণ্ডুলিপিগুলিই যে প্রাচীন বা প্রকৃত অগ্নিপুরাণ বা আগ্নেয়পুরাণ, তাও আজ অত্যন্ত স্পষ্ট। কিন্তু, বিংশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত আধুনিক বিদ্বানরাও এই ব্যাপারটা সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারেন নি। রাজেন্দ্রলাল মিত্র বহ্নিপুরাণের বিদ্যমান পাণ্ডুলিপিকে অগ্নিপুরাণ থেকে পৃথক কোনও একটি উপপুরাণের পাণ্ডুলিপি বলে অনুমান করেছিলেন।১৪

বহ্নিপুরাণের পাণ্ডুলিপি ও মুদ্রিত সংস্করণ

১৯৫১ সালে আধুনিক পুরাণবিদ রাজেন্দ্র চন্দ্র হাজরা কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির সংগৃহীত বহ্নিপুরাণ গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি পাঠ করে প্রথম উপলব্ধি করেন এই পাণ্ডুলিপির বহ্নিপুরাণই বল্লালসেন, হলায়ুধ, হেমাদ্রি, চণ্ডেশ্বর, মাধবাচার্য, শূলপাণি, বিদ্যাপতি, বাচস্পতিমিশ্র, গণপতি, গোবিন্দানন্দ, রঘুনন্দন প্রমুখ মধ্যযুগের স্মৃতিনিবন্ধকারদের রচনায় উদ্ধৃত আগ্নেয়পুরাণ বা প্রকৃত অগ্নিপুরাণ।১৫

বহ্নিপুরাণ বা আসল আগ্নেয়পুরাণের বর্তমানে লভ্য ৬টি পাণ্ডুলিপিগুলির মধ্যে প্রথমটি কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির সংগৃহীত অষ্টাদশ শতকের দেবনাগরী লিপিতে লিপিবদ্ধ এই খণ্ডিত পাণ্ডুলিপি (পাণ্ডুলিপি সংখ্যা ৮০৯০)। পুষ্পিকায় গ্রন্থটির নাম বহ্নিপুরাণ বলে উল্লিখিত। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এই পাণ্ডুলিপিটি এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশিত অগ্নিপুরাণের সঙ্গে এক বলে মনে করেছিলেন।১৬ পুষ্পিকা অনুযায়ী, এই পাণ্ডুলিপি ১৮৬৫ সাধারণাব্দে রামচন্দ্র নামের বারাণসী শহরের জনৈক ব্যাবসায়ী নারায়ণ নামের এক ব্রাহ্মণকে দান করেছিলেন। বর্তমানে এই পাণ্ডুলিপিতে কেবল রোহিণ্যাষ্টমীকল্প (৭০তম অধ্যায়) অধ্যায়ের কিছুটা অংশ (২৭তম শ্লোক) পর্যন্ত রয়েছে। এই পাণ্ডুলিপির অর্ধেকের বেশি অংশ পাওয়া যায়নি।

লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে (বর্তমানে ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে) আগ্নেয়পুরাণের দেবনাগরী লিপিতে লিখিত দুটি পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত রয়েছে। এর  মধ্যে একটি পাণ্ডুলিপি (পাণ্ডুলিপি সংখ্যা ১৪২৫) ১৬৪৫ বিক্রম সংবতে (১৫৮৯ সাধারণাব্দে) আগ্রায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। এই পাণ্ডুলিপিটি মোটামুটিভাবে সম্পূর্ণ, যদিও মধ্যের বেশ কিছু অধ্যায় সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে হারিয়ে গেছে।১৭ এই পাণ্ডুলিপির ‘আখ্যানশতকীর্তন’ (১৮২ অধ্যায়) নামের শেষ অধ্যায়ের সমাপ্তির পর পুষ্পিকায় বহ্নিপুরাণ ও আগ্নেয়পুরাণ দুটি নামেরই উল্লেখ রয়েছে। ১৮২টি অধ্যায় সমন্বিত এই পাণ্ডুলিপির ৭৫ অধ্যায় থেকে ১৮১ অধ্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত রামকথার সঙ্গে বাল্মীকির রামায়ণের মিল যথেষ্ট, কিন্তু, রামের রাজ্যশাসন পর্যন্ত কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। বাল্মীকি রামায়ণের বালকাণ্ড ও উত্তরকাণ্ডে বর্ণিত কাহিনি এখানে অনুপস্থিত। আখ্যানশতকীর্তন নামের শেষ অধ্যায়ে প্রদত্ত অনুক্রমণিকায় ৭৫-১৮১ অধ্যায়ে বর্ণিত এই রামকথার শীর্ষক দশগ্রীবরাক্ষস চরিত। দ্বিতীয় পাণ্ডুলিপিটি (পাণ্ডুলিপি সংখ্যা ১০০১) বেনারসে ১৮৬১ বিক্রম সংবতে (১৮০৪ সাধারণাব্দে) লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল।১৮ এই পাণ্ডুলিপিটিও মোটামুটিভাবে সম্পূর্ণ, এবং ‘আখ্যানশতকীর্তন’ অধ্যায়ে সমাপ্ত। তবে এই পাণ্ডুলিপি থেকে ৫টি অধ্যায় সম্পূর্ণভাবে ও দুটি অধ্যায় আংশিকভাবে হারিয়ে গেছে।১৯

আগ্নেয়পুরাণের চতুর্থ পাণ্ডুলিপিটি কলকাতার সংস্কৃত সাহিত্য পরিষদ গ্রন্থাগারে (পাণ্ডুলিপি সংখ্যা ৬২১৫) সংরক্ষিত আছে। এই পাণ্ডুলিপিটি দেবনাগরী লিপিতে লিখিত এবং মোটামুটি সম্পূর্ণ। আগ্নেয়পুরাণের পঞ্চম পাণ্ডুলিপিটি বিকানের শহরের অনুপ সংস্কৃত লাইব্রেরিতে (পাণ্ডুলিপি সংখ্যা ৪৬৫) সংরক্ষিত রয়েছে। দেবনাগরী লিপিতে লিখিত এই পাণ্ডুলিপিতেও গ্রন্থটির নাম বহ্নিপুরাণ বলে উল্লিখিত হয়েছে।২০    

বহ্নিপুরাণম নামে আসল আগ্নেয়পুরাণের প্রথম মুদ্রিত সংস্করণ কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়েছে। অনসূয়া ভৌমিক সম্পাদিত এই সংস্করণে আগ্নেয়পুরাণের কেবল প্রথম ৭৭টি অধ্যায় মুদ্রিত হয়েছে। আগ্নেয়পুরাণের বাকি অংশ যেখানে রামকথা বর্ণিত হয়েছে, এই সংস্করণে অনুপস্থিত। সাম্প্রতিককালে বড়োদরার ওরিয়েন্টাল ইনস্টিটিউটও বহ্নিপুরাণের একটি সমীক্ষাত্মক সংস্করণ প্রকাশের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।২১

শেষকথন

রাজেন্দ্র চন্দ্র হাজরা আসল আগ্নেয়পুরাণ অর্থাৎ বর্তমান বহ্নিপুরাণ গ্রন্থ বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন গ্রন্থটির আদিরূপ যজুর্বেদী ব্রাহ্মণদের রচনা। অগ্নিহোত্রী ব্রাহ্মণদের বেশ কিছু সংখ্যক যজ্ঞ অনুষ্ঠানের পদ্ধতি এই গ্রন্থে অতি প্রাচীন কালে সমাবিষ্ট হয়েছিল। এই গ্রন্থের প্রথম তিনটি অধ্যায়ে সেই আদিরূপের পরিচয় আজও বিদ্যমান। প্রাচীনতম অধ্যায়গুলিতে অগ্নি রুদ্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছেন।  পরবর্তীকালে বৈষ্ণব লেখকরা বিষ্ণুপুরাণ, হরিবংশ, বাল্মীকি রামায়ণ এবং বিষ্ণুধর্মপুরাণ থেকে বহুসংখ্যক শ্লোক এই গ্রন্থে সংযোজন করেন এবং প্রাচীন গ্রন্থের বেশ কয়েকটি অধ্যায় প্রতিস্থাপন করেন। গ্রন্থটির একাদশ অধ্যায় থেকে শেষ পর্যন্ত এই বৈষ্ণব লেখকদের রচনা।২২ তবে, চতুর্থ থেকে দশম অধ্যায়ের অধিকাংশ শ্লোক এবং একাদশ থেকে বিংশ অধ্যায়ের কিছু বিক্ষিপ্ত শ্লোক প্রাচীনতম রূপের অংশ ছিল।২৩ হাজরার মতে, বৈষ্ণব লেখকদের দ্বারা আগ্নেয়পুরাণের পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া ৩০০-৫০০ সাধারণাব্দের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছিল।২৪ পঞ্চম শতক সাধারণাব্দের কোনও সময় আগ্নেয়পুরাণ গ্রন্থে রামকথা সংযোজিত করা হয়েছে,২৫ এবং বাল্মীকি রামায়ণের সঙ্গে এই রামকথার ভাষাগত ও বিষয়গত মিল যে নিছক সমাপতন নয়, এই গ্রন্থেই তার ইঙ্গিত রয়েছে। সম্ভবত ষষ্ঠ শতক সাধারণাব্দে প্রাচীন আগ্নেয়পুরাণ বর্তমান বহ্নিপুরাণের রূপ গ্রহণ করে।

নবম-দশক শতক সাধারণাব্দ থেকে বর্তমান অগ্নিপুরাণের স্বীকৃতি অর্জনের পরিণামে সম্ভবত দ্বাদশ শতক সাধারণাব্দের পূর্বেই দক্ষিণ ভারতের স্মৃতিনিবন্ধ লেখকদের কাছে প্রাচীন আগ্নেয়পুরাণ গ্রন্থ বহ্নিপুরাণ নামে পরিচিতি লাভ করে। ক্রমশ বহ্নিপুরাণ বা প্রাচীন অগ্নিপুরাণের স্বীকৃতি আরও হ্রাস পায়। কিন্তু, তা সত্ত্বেও ত্রয়োদশ শতক সাধারণাব্দের দ্বিতীয়ার্ধে রচিত হেমাদ্রির চতুর্বর্গচিন্তামণি গ্রন্থের দানখণ্ডের সপ্তম অধ্যায়ে উদ্ধৃত কালিকাপুরাণের একটি শ্লোকে বহ্নিজপুরাণকে অষ্টাদশ পুরাণের (অর্থাৎ মহাপুরাণের) অন্যতম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।২৬ উল্লেখ্য, অন্ত-মধ্যযুগের স্মৃতিনিবন্ধকারদের আগ্নেয়পুরাণ থেকে উদ্ধৃত বেশ কয়েকটি শ্লোক বহ্নিপুরাণের বর্তমানে প্রাপ্ত পাণ্ডুলিপিগুলিতে পাওয়া যায় না। অনুমান করা যায়, এই শ্লোকসমন্বিত অংশগুলি অন্ত-মধ্যযুগের কোনও সময় বহ্নিপুরাণের পাণ্ডুলিপিগুলি থেকে বিয়োজিত হয়েছে অথবা হারিয়ে গেছে।

আদি-মধ্যযুগে নতুন পুরাণ গ্রন্থের প্রাচীন পুরাণ গ্রন্থকে প্রতিস্থাপনের ইতিহাস বিরল হলেও অপ্রতিম নয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই ইতিহাস অনুসন্ধান যথেষ্ট দুরূহ। অগ্নিপুরাণের ক্ষেত্রে রাজেন্দ্র চন্দ্র হাজরার দীর্ঘ গবেষণার ফলে সেই ইতিহাস নির্মাণ সহজ হয়েছে।

টীকা

১. “পুরাণং সর্বশাস্ত্রাণাং প্রথমং ব্রহ্মণাং স্মৃতং।/ অনন্তরঞ্চ বক্ত্রেভ্য বেদাস্তস্য বিনির্গতাঃ॥/ পুরাণমেকমেবাসীৎ তদা কল্পান্তরেঽনঘ।/ ত্রিবর্গসাধনং পুণ্যং শতকোটিপ্রবিস্তরম্॥” – মত্স্যপুরাণ ৫৩.৩-৪। 

২. “কালেনাগ্রহণং দৃষ্ট্বা পুরাণস্য তদা বিভুঃ।/ব্যাসরূপস্তদা ব্রহ্মা সংগ্রহার্থং যুগে যুগে॥/চতুর্লক্ষপ্রমাণেন দ্বাপরে দ্বাপরে জগৌ।/তদাষ্টাদশধা কৃত্বা ভূলোকেঽস্মিন্ প্রকাশিতম্॥” – পদ্মপুরাণ, সৃষ্টিখণ্ড, ১.৫১-৫২।

৩. Ludo Rocher, ‘The Purāṇas’; Weisbaden: Otto Harrassowitz, 1986, pp. 45-46.

৪. Romila Thapar, ‘The Penguin History of Early India: From the Origins to AD 1300’; London: Penguin Books, 2002, pp. 319, 320.

৫. Sukumari Bhattacharji, ‘The Indian Theogony: A Comparative Study of Indian Mythology from the Vedas to the Purāṇas’; Calcutta: Firma KLM, 1978, p. 6.

৬. R.C Hazra, “The Purāṇas” in ‘The Cultural Heritage of India, Volume II’; Calcutta: The Ramakrishna Mission Institute of Culture, 1962, p. 251.

৭. R.C. Hazra, ‘Studies in the Upapurānas, Vol. I’; Calcutta: Sanskrit College, 1958, pp. 1-3.

৮. Ludo Rocher, ‘The Purāṇas’; Weisbaden: Otto Harrassowitz, 1986, pp. 136-137.

৯. R.C. Hazra, “Purāṇa Literature as known to Ballālasena” in Ram Shankar Bhattacharya edited, ‘Dr. R.C. Hazra Commemoration Volume (Selected Articles of Late Dr. R.C. Hazra), Part I (Puranic and Vedic Studies)’; Varanasi: All-India Kashiraj Trust, 1985, p. 41.

১০. Bhabatosh Bhattacharya critically edited, ‘Dānasāgara of Ballāla Sena’; Calcutta: The Asiatic Society, 1956, p. xxi.

১১. Ibid, pp. xxv-xxvi, xxi.

১২. Rajendra Chandra Hazra, “Studies in the Genuine Āgneya-Purāṇa alias Bahni-Purāṇa, Part I” in Sadananda Bhaduri edited, “Our Heritage, Bulletin of the Department of the Postgraduate Training and Research, Sanskrit College, Calcutta, Vol. I, Part II, July-December 1953”; pp. 231-233.

১৩. Bhabatosh Bhattacharya critically edited, ‘Dānasāgara of Ballāla Sena’; Calcutta: The Asiatic Society, 1956, p. 7.

১৪. Rájendralála Mitra, ‘A Catalogue of Sanskrit Manuscripts in the Library of His Highness Mahárájá of Bikáner’; Calcutta: Baptist Mission Press, 1880, pp. 183, 216.

১৫. R.C. Hazra, “Discovery of the Genuine Āgneya-Purāṇa” in Ram Shankar Bhattacharya edited, ‘Dr. R.C. Hazra Commemoration Volume (Selected Articles of Late Dr. R.C. Hazra), Part I (Puranic and Vedic Studies)’; Varanasi: All-India Kashiraj Trust, 1985, pp. 60, 61.

১৬. Haraprasāda Shāstrī, ‘A Descriptive Catalogue of Sanskrit Manuscripts in the Government Collection under the Care of the Asiatic Society of Bengal, Vol. V, Purāṇa Manuscripts’; Calcutta: The Asiatic Society of Bengal, 1928, p. 422.

১৭. Rajendra Chandra Hazra, “Studies in the Genuine Āgneya-Purāṇa (alias Bahni-Purāṇa), Part II” in ‘Our Heritage, Bulletin of the Department of the Postgraduate Training and Research, Sanskrit College, Calcutta, Vol. II, Part I, January-June 1954; p. 87n40.

১৮. Julius Eggeling edited, ‘Catalogue of the Sanskrit Manuscripts in the Library of the India Office, Part VI’; London: The Secretary of State for India in Council, 1899, pp. 1294-1298.

১৯. Rajendra Chandra Hazra, “Studies in the Genuine Āgneya-Purāṇa (alias Bahni-Purāṇa), Part II” in ‘Our Heritage, Bulletin of the Department of the Postgraduate Training and Research, Sanskrit College, Calcutta, Vol. II, Part I, January-June 1954; p. 87n40.

২০. Rájendralála Mitra, ‘A Catalogue of Sanskrit Manuscripts in the Library of His Highness Mahárájá of Bikáner’; Calcutta: Baptist Mission Press, 1880, p. 216.

২১. “Critical Edition’s Wing”, ‘Oriental Institute, The Maharaja Sayarijrao University of Baroda website’ [url: https://msubaroda.ac.in/academics/OI/department/CEW/aboutdepartment].

২২. Rajendra Chandra Hazra, “Studies in the Genuine Āgneya-Purāṇa alias Bahni-Purāṇa, Part I” in Sadananda Bhaduri edited, “Our Heritage, Bulletin of the Department of the Postgraduate Training and Research, Sanskrit College, Calcutta, Vol. I, Part II, July-December 1953”; pp. 224-231.

২৩. Rajendra Chandra Hazra, “Studies in the Genuine Āgneya-Purāṇa (alias Bahni-Purāṇa), Part II” in ‘Our Heritage, Bulletin of the Department of the Postgraduate Training and Research, Sanskrit College, Calcutta, Vol. II, Part I, January-June 1954; p. 77.

২৪. Ibid, p. 82.

২৫. Rajendra Chandra Hazra, “Studies in the Genuine Āgneya-Purāṇa (alias Bahni-Purāṇa), Part II” in ‘Our Heritage, Bulletin of the Department of the Postgraduate Training and Research, Sanskrit College, Calcutta, Vol. II, Part I, January-June 1954; p. 89.

২৬. Bharatacandra Śiromaṇi edited, ‘Chaturvarga Chinamani by Hemádri, Vol. I, Dáṇakhaṇḍa’; Calcutta: The Asiatic Society of Bengal, 1873, p. 531.

সহায়ক গ্রন্থ:

১. Anasuya Bhowmik edited, ‘Vahni-Purāṇam also referred as Āgenya-Purāṇam’; Kolkata: The Asiatic Society, 2012.

২. R.C Hazra, ‘Studies in the Purāṇic Records on Hindu Rites and Customs’; Dacca: University of Dacca, 1940.

লেখক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তিবিদ্যার স্নাতক এবং বিগত তিন দশক ধরে বিমান প্রযুক্তিবিদ্যার সঙ্গে যুক্ত। ইতিহাসের আগ্রহী পাঠক। ইতিহাস নিয়ে লেখালেখির সূত্রপাত সাম্প্রতিক।

মন্তব্য তালিকা - “আসল অগ্নিপুরাণের সুলুক সন্ধান”

  1. হিন্দু পৌরাণিক ঐতিহ্যে অষ্টাদশ মহাপুরাণের মধ্যে অগ্নিপুরাণ এক অনন্য স্থান অধিকার করে রয়েছে। ধর্মতাত্ত্বিক বয়ানের তুলনায় এটি মূলত প্রাচীন ভারতের ব্যবহারিক বিজ্ঞান ও বিদ্যার একটি সুবিশাল সংকলন। ‘ইতিহাস আড্ডা’-র আলোচনায় আধুনিক পাঠ-সমালোচনা (Textual Criticism) ও পাণ্ডুলিপিতত্ত্বের সাহায্যে অনুসন্ধান করা হয়েছে—আজ যে মুদ্রিত অগ্নিপুরাণ আমরা পড়ি, সেটিই কি প্রাচীন ভারতের সেই আদি অগ্নিপুরাণ, নাকি পরবর্তীকালের এক অভিনব বিশ্বকোষ?
    ১. পঞ্চলক্ষণ তত্ত্ব ও অগ্নিপুরাণের স্বাতন্ত্র্য
    ঐতিহ্যগতভাবে পুরাণের সংজ্ঞায় অমরসিংহ রচিত অমরকোষ-এ পাঁচটি লক্ষণ আবশ্যিক বলা হয়েছে:
    > सर्गश्च प्रतिसर्गश्च वंशो मन्वन्तराणि च।
    > वंशानुचरितं चैव पुराणं पञ्चलक्षणम्॥
    > (সৃষ্টি, প্রলয়/পুনঃসৃষ্টি, দেব ও ঋষিদের বংশতালিকা, মন্বন্তর এবং রাজবংশের ইতিবৃত্ত—এই পাঁচটিই পুরাণের লক্ষণ।)
    >
    মুদ্রিত অগ্নিপুরাণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি এই ঐতিহ্যবাহী পঞ্চলক্ষণের গণ্ডি পেরিয়ে এক মহাজ্ঞানকোষীয় চরিত্র ধারণ করেছে। নিবন্ধটিতে ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরা হয়েছে যে, প্রচলিত পুরাণের কাঠামো ছাপিয়ে কীভাবে সমাজ, বিজ্ঞান ও রাষ্ট্রনীতির প্রায় প্রতিটি শাখাকে এখানে ধারণ করা হয়েছে।
    ২. কাব্যতত্ত্ব ও অলংকারশাস্ত্রের বিকাশ
    অগ্নিপুরাণের ৩৩৭তম থেকে ৩৪৭তম অধ্যায়জুড়ে রয়েছে সংস্কৃত সাহিত্যতত্ত্বের বিস্তারিত বিবরণ। ভামহ, দণ্ডী এবং আনন্দবর্ধনের অলংকার ও ধ্বনিতত্ত্বের ছাপ এখানে সুস্পষ্ট। কাব্যের স্বরূপ ও রসের শ্রেষ্ঠত্ব বোঝাতে অগ্নিপুরাণে এক অবিস্মরণীয় শ্লোক রয়েছে:
    > अपारे काव्यसंसारे कविरेकः प्रजापतिः।
    > यथास्मै रोचते विश्वं तथेदं परिवर्तते॥
    > (এই অপার কাব্যসংসারে কবিই একমাত্র স্রষ্টা বা প্রজাপতি; তিনি বিশ্বকে যেভাবে সাজাতে পছন্দ করেন, কাব্যজগৎ সেভাবেই রূপ লাভ করে।)
    >
    নিবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে, কীভাবে শাস্ত্রীয় অলংকারতত্ত্বকে সাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পৌরাণিক কাঠামোর ভিতর কাব্যশাস্ত্রকে প্রবিষ্ট করানো হয়েছিল।
    ৩. প্রাচীন চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বৃক্ষায়ুর্বেদ
    অগ্নিপুরাণ কেবল মানুষের ব্যাধি নিরাময়ে সীমাবদ্ধ নয়; এতে অশ্বচিকিৎসা, গজচিকিৎসা এবং উদ্ভিদ সংরক্ষণের বিদ্যা বা ‘বৃক্ষায়ুর্বেদ’ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। পরিবেশ রক্ষা ও বৃক্ষরোপণের পুণ্য সম্পর্কে অগ্নিপুরাণ (অধ্যায় ২৮২)-এ বলা হয়েছে:
    > अश्वत्थमेकं पिचुमन्दमेकं न्यग्रोधमेकं दश चिञ्चिणीकान्।
    > कपित्थबिल्वामलकत्रयं च पञ्चाम्रमुप्त्वा नरकं न याति॥
    > (যে ব্যক্তি একটি অশ্বত্থ, একটি নিম, একটি বট, দশটি তেঁতুল, তিনটি করে কয়েতবেল, বেল ও আমলকী এবং পাঁচটি আমগাছ রোপণ করে যত্ন নেয়—সে কখনোই নরকগামী হয় না।)
    >
    এতে স্পষ্ট হয় যে, পৌরাণিক ধর্মীয় অনুশাসনের আড়ালে জনকল্যাণমুখী বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশ সংরক্ষণের বৈজ্ঞানিক বার্তা তৎকালীন সমাজে প্রতিষ্ঠা করাই ছিল সংকলকদের অন্যতম উদ্দেশ্য।
    ৪. বাস্তুশাস্ত্র ও মূর্তিশিল্প (Iconography)
    দেবালয় নির্মাণ, নগর পরিকল্পনা এবং মূর্তির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অনুপাত নির্ধারণের ক্ষেত্রে অগ্নিপুরাণ এক আকরগ্রন্থ। এতে বাস্তুপুরুষ মণ্ডলের পূজা ও গৃহনির্মাণের বিজ্ঞান নিয়ে বলা হয়েছে:
    > प्रासादं वास्तुपुरुषं सम्पूज्य विनिवेशयेत्।
    > सर्वकामप्रदं नृणां भुक्तिमुक्तिफलप्रदम्॥
    > (বাস্তুপুরুষের যথাবিধি অর্চনা করে গৃহ বা প্রাসাদ নির্মাণ করলে তা মানুষের সকল অভীষ্ট পূর্ণ করে এবং ইহলৌকিক ভোগ ও পারলৌকিক মুক্তি প্রদান করে।)
    >
    শিল্পীদের জন্য দিকনির্দেশনা ও ভাস্কর্যরীতির এই পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্যকলার ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ বোঝার জন্য অপরিহার্য।
    ৫. রাজনীতি, নীতিশাস্ত্র ও যুদ্ধবিদ্যা (ধনুর্বেদ)
    কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র ও কামন্দকের নীতিসার-এর নির্যাস অগ্নিপুরাণের এক বিস্তীর্ণ অংশে গৃহীত হয়েছে। সেখানে রাজার কর্তব্য এবং নীতিভ্রষ্টতার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে:
    > दुष्टस्य दण्डः सुजनस्य पूजा न्यायेन कोषस्य च संप्रवृद्धिः।
    > अपक्षपातोऽर्थिषु राष्ट्ररक्षा पञ्चैव यज्ञाः कथिता नृपाणाम्॥
    > (দুষ্টের দমন, সজ্জনের সম্মান, ন্যায়সঙ্গতভাবে কোষাগার বৃদ্ধি, বিচারপ্রার্থীদের প্রতি নিরপেক্ষতা এবং প্রজাপালন ও রাষ্ট্ররক্ষা—এই পাঁচটিই রাজার শ্রেষ্ঠ পঞ্চযজ্ঞ।)
    >
    ৬. টেক্সটুয়াল ক্রিটিসিজম: “আসল” অগ্নিপুরাণ কোথায়?
    আলোচনার সবচেয়ে তাত্পর্যপূর্ণ অংশ হলো আদি পাণ্ডুলিপির অনুসন্ধান।
    * হাজরার অভিমত: ভারততত্ত্ববিদ ড. আর. সি. হাজরা দেখিয়েছেন, আদি অগ্নিপুরাণটি সম্ভবত নবম শতকের পূর্বে কোনো এক সময় বিদ্যমান ছিল। কিন্তু বর্তমান মুদ্রিত পাঠটি মূলত খ্রিস্টীয় নবম থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যে পূর্বাঞ্চলে (বাংলা-বিহার-মিথিলা অঞ্চলে) ব্যাপকভাবে পুনর্লিখিত ও পরিবর্ধিত হয়।
    * অন্যান্য পুরাণের সঙ্গে বৈপরীত্য: মৎস্যপুরাণ (অধ্যায় ৫৩) বা স্কন্দপুরাণ-এ অগ্নিপুরাণের যে লক্ষণ দেওয়া আছে (যেমন—ঈশান কল্পের কথা বা নির্দিষ্ট সংখ্যক শ্লোক), বর্তমান গ্রন্থে তার অনেক কিছুই অনুপস্থিত। ফলে বর্তমান সংস্করণটি মূলত প্রাচীন পাঠের ওপর এক সুবিশাল মধ্যযুগীয় সংকলন বা ‘এনসাইক্লোপিডিয়া’।
    সামগ্রিক মূল্যায়ন
    | মানদণ্ড | পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ |
    |—|—|
    | পদ্ধতিগত স্বচ্ছতা | ভাবাবেগের বদলে পাণ্ডুলিপিবিদ্যা, অভ্যন্তরীণ ভাষাতত্ত্ব ও কালানুক্রমিক স্তরবিন্যাসের প্রয়োগ। |
    | বহুমাত্রিক বিষয়বস্তু | ধর্মতত্ত্বকে ছাপিয়ে অলংকারশাস্ত্র, আয়ুর্বেদ, বাস্তু ও রাজনীতির মতো ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞানের দলিল হিসেবে মূল্যায়ন। |
    | ঐতিহাসিক মূল্য | মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষের জ্ঞানচর্চার সার্বিক চিত্র অনুধাবনে অত্যন্ত সহায়ক ও সময়োপযোগী একটি পাঠ। |
    উপসংহার:
    ‘ইতিহাস আড্ডা’-র এই পর্যালোচনা ধর্মীয় সাহিত্যের মোড়ক খুলে অগ্নিপুরাণকে এক ঐতিহাসিক সমাজ-দলিল হিসেবে পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করে। নিবন্ধটি প্রমাণ করে যে, পুরাণ কেবল পূজাপাঠের গ্রন্থ নয়—বরং মধ্যযুগীয় ভারতের জ্ঞান-বিজ্ঞান, কলা ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত মহাসংগ্রহশালা।

    1. এখন‌ও পর্যন্ত বহ্নিপুরাণের সম্পূর্ণ সংস্কৃত মূলও প্রকাশিত হয়নি, অর্ধেক অংশ এখনও কেবল পাণ্ডুলিপিতেই রয়েছে। বাংলায় অনুবাদের কোনও প্রয়াসের খবর পাইনি।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।