সম্পাদকীয়
‘আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই’
বাংলায় নিদাঘের এই মাসগুলিতেই আসে পঁচিশে বৈশাখ আর এগারই জ্যৈষ্ঠ আর প্রত্যেক বার নতুন করে ভাবায় বাংলার গানের দীর্ঘ ঐতিহ্যের কথা। অন্ত-মধ্যযুগ থেকে যে ভূখণ্ড বাঙ্গালা বা পরে বাংলা নামে পরিচিত, সেই নদীবিধৌত ভূখণ্ডের অধিবাসীরা প্রাগিতিহাস ও ইতিহাসের প্রাচীন কালপর্বে কোন ভাষায়, কোন ভাবনাকে গানের সুরে প্রকাশ করতেন তা আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না, কিন্তু অনুমান করা যায়, আজও বাংলার জনমানস থেকে সেই সুর আর ভাবনার আবেশ লুপ্ত হয়নি। শুধু বাংলা ভাষা নয়, বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ ও ত্রিপুরার বিভিন্ন প্রান্তের জনজাতীয় অধিবাসীদের সব মাতৃভাষার সঙ্গীত ঐতিহ্যও বাংলার সেই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অঙ্গীভূত। বাংলার সঙ্গীতের ইতিহাস নিয়ে এক শতকের বেশি সময় ধরে যথেষ্ট গবেষণা হলেও, বাংলার সঙ্গীতের এই সামগ্রিক রূপটি আজও অধিকাংশ মানুষের কাছে অধরা।
আদি-মধ্যযুগ থেকে বাংলায় সঙ্গীত সাধনার মূলত দুটি রূপের সন্ধান পাই। জয়দেব গোস্বামীর গীতগোবিন্দের সুললিত সংস্কৃতে রচিত, বৈষ্ণব ভক্তিরসে জারিত যে সঙ্গীতের পরিচয় পাই, তা অনেকাংশেই রাজসভা আশ্রিত। অন্যদিকে বাংলার জনজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের সঙ্গীত ছিল তাঁদের সাধনার অংশ; লৌকিক জীবনের বর্ণময়তার অন্তরালে তন্ত্র সাধনার গূঢ় রহস্য বাখান চর্যাপদের সঙ্গীতকে এক অনন্য মাত্রায় উপনীত করেছিল। আদি-মধ্যযুগের বাংলার সঙ্গীতের ক্ষেত্রে রাজসভার কবি থেকে সহজিয়া সাধক সবাই কিন্তু রাগ-তালের প্রয়োগের ক্ষেত্রে উপমহাদেশে প্রাচীন যুগের সঙ্গীত চর্চার বৃহত্তর ঐতিহ্য অনুসরণ করেছেন।
অন্ত-মধ্যযুগের বাংলায় একদিকে যেমন সুফি সাধনার প্রসারের ফলে পশ্চিম থেকে নতুন গানের ধারা বাংলায় এসে পৌঁছায়, অন্যদিকে মিথিলার রাজসভার কবি বিদ্যাপতির মৈথিলী পদাবলির ধারাও বাংলায় প্রসারিত হয়। এই দুই ধারার প্রভাবে একদিকে যেমন, মুর্শিদি, মারফতি ও গাজির গান বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতির অঙ্গীভূত হয়েছে অন্যদিকে ব্রজবুলি আর বাংলায় লেখা পদাবলি কীর্তনের সুরে মথিত হয়েছে বাংলার পথ। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে বাংলার নিজস্ব কৃষ্ণ লীলাকাহিনি নিয়ে রচিত যে লোকায়ত সঙ্গীতের ধারার কথা প্রথম জেনেছি, পরে সেই ধারায় পেয়েছি মঙ্গলচণ্ডীর গীত, মনসার ভাসান আর ধর্মের গাজন, পেয়েছি পটের গান। বাংলায় এক সময় কৃত্তিবাসী রামায়ণ আর কাশীদাসী মহাভারতও সঙ্গীতের রূপে গীত হয়েছে। অন্ত-মধ্যযুগের বাংলায় শক্তি উপাসনায় ভক্তির সংযোগে শাক্ত পদাবলির উদ্ভব হয়। রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত ও অন্য শক্তিসাধকদের বাংলা সাধনসঙ্গীতের গানের ধারা, বিশেষত মালসি গান জনপ্রিয়তা অর্জন করে। অন্ত-মধ্যযুগের ময়মনসিংহ গীতিকায় আর গোপীচাঁদের গানে অন্তর্নিহিত বাংলার নদী, মাটি আর প্রকৃতির সৌরভ আজও অম্লান। সেই সুবাসের ছোঁয়া আজও লেগে আছে ভাদু, টুসু, ঝুমুর, গম্ভীরা, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, ধামাইল, জারি আর সারিগানে। আদি-মধ্যযুগের বৌদ্ধ সহজিয়া তত্ত্ব, অন্ত-মধ্যযুগের ইসলামের সুফি ভাবনা আর বৈষ্ণব ভক্তি সাধনা বাংলার মানসের যে রূপান্তর সাধন করেছে, তারই মূর্ত রূপ বাউল গানের ছত্রে ছত্রে বিধৃত। বাউল তত্ত্বের হদিস না জেনেও লালন শাহ, দুদ্দু শাহ, নবনী দাস, পূর্ণ দাস বা শাহ আবদুল করিমের গানে বাংলার মানুষ তাঁদের প্রাণের কথা শুনতে পান। প্রায় একই আঙ্গিকে সৃষ্ট কর্তাভজা, সাহেবধনী, বলাহাড়ি বা মতুয়া সঙ্গীতে প্রাগাধুনিক যুগ থেকে প্রচলিত বাংলার লৌকিক সাধনার রূপকল্পের সন্ধান পাওয়া যায়।
অন্ত-মধ্যযুগের শেষ দিকে বিষ্ণুপুরের রাজসভায় শুরু হয়েছিল হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চা, গড়ে ওঠে বাংলার নিজস্ব বিষ্ণুপুর ঘরানা। ইংরেজ আমলে কলকাতায় এসে পৌঁছায় সেই শাস্ত্রীয় সঙ্গীত চর্চার ধারা – বিষ্ণুপুর থেকে ধ্রুপদ আর খেয়ালের সাথে উত্তর ভারত থেকে এল টপ্পা। কালিদাস চট্টোপাধ্যায় টপ্পার দৌলতে পরিচিত হলেন কালী মির্জা নামে আর রামনিধি গুপ্তের সৃষ্ট টপ্পা জনপ্রিয়তা লাভ করল নিধুবাবুর টপ্পা নামে । উনিশ শতকের মাঝামাঝি লখনউ থেকে নির্বাসিত হয়ে কলকাতা এলেন নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ। তাঁরই সঙ্গে লখনউ থেকে এসে পৌঁছাল ঠুংরি। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের গোড়ায় কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে কবিগান, পাঁচালি, হাফ-আখড়াইয়ের মতো নাগরিক লোক-সঙ্গীত চর্চা, বাংলা থিয়েটারের গান, রামমোহন প্রবর্তিত ব্রাহ্মসমাজে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আঙ্গিকে ব্রহ্মসঙ্গীত চর্চা আর অভিজাত গৃহে ইউরোপীয় সঙ্গীত চর্চার আবহের মধ্যে জন্ম নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর সৃজনশীলতা বাংলার সঙ্গীতকে বিশ্বের সঙ্গীত জগতে চিরায়ত স্থান করে দিল। সংখ্যায় মাত্র দ্বিসহস্রাধিক হলেও রবীন্দ্রসঙ্গীত বাংলার মানুষের চিরায়ত সত্তার মূর্ত রূপ – দুটি রাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীতে তারই প্রতিভাস। এর পরেও যদি বা কিছু অপূর্ণতা রয়ে গিয়েছিল, তা পূর্ণ করলেন নজরুল। তিন হাজারেরও কিছু বেশি নজরুলগীতি বাংলার সঙ্গীতকে আন্তর্জাতিক রূপে উপস্থাপিত করল – তাঁরই সুরে শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিক সঙ্গীতও বাংলার মাঠে ময়দানে প্রথম ধ্বনিত হল।
স্বাধীনতা আন্দোলন বিংশ শতকের বাংলার সঙ্গীত চর্চাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। এই শতকের প্রথমার্ধে দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত ও অতুলপ্রসাদের গান যেমন আপামর বাংলাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল, তেমনি বঙ্গভঙ্গের ক্রান্তিকালে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়েছিলেন মুকুন্দ দাস। বাংলায় পরাধীনতার শেষ পর্বে সাম্যবাদী আন্দোলনের প্রভাবে সৃষ্টি হল সঙ্গীতের নতুন ধারা – জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, হেমাঙ্গ বিশ্বাস এবং সলিল চৌধুরীর নবজীবনের গানে আজও উজ্জীবিত হন বাংলার মানুষ। বিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে সৃষ্ট বাংলার চলচ্চিত্র সঙ্গীতের স্বর্ণযুগের গানগুলি আজও সবার হৃদয়ে অনুরণিত হয়। এই ঐতিহ্যে এক নতুন ব্যঞ্জনা যুক্ত করেছে সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র সঙ্গীত। পঞ্চাশের দশক থেকে বাংলা গ্রুপ থিয়েটারের গানগুলিও মানুষের মনে অভিঘাত সৃষ্টি করে চলেছে।
বাংলা ভাগের পর পূর্ব বাংলায় (সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে) বাংলা গান সংগ্রামের প্রেরণায় রূপান্তরিত হয়। বাংলার সাঙ্গীতিক ঐতিহ্য রক্ষায় ছায়ানট আর উদীচীর মতো সংগঠনের ভূমিকা অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ১৯৩০-এর দশকে কলকাতার বেতার কেন্দ্র ও গ্রামোফোন রেকর্ড থেকে যার সূচনা, স্বাধীনতার পর থেকে পশ্চিম বাংলায় সেই আধুনিক গানের ধারায় আজও চলছে পৃথিবীর বহু সঙ্গীতের ধারার প্রয়োগ, চলছে বিভিন্ন ধারাকে মেশানোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা। পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের যাত্রার শুরু ১৯৭০-এর দশকে মহীনের ঘোড়াগুলি থেকে; তারপর সেই ধারা ভূমি, ক্যাকটাস, চন্দ্রবিন্দু, দোহার হয়ে আজ হুলিগানইজম পর্যন্ত দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে। একই সময়ের পূর্ব বাংলা বা বাংলাদেশে আজম খান ও তাঁর উচ্চারণ, নগর বাউল বা জলের গানকে কি ভোলা যায়?
বাংলার হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো সঙ্গীত চর্চা আজও অবিরত ধারায় বহমান। নতুন বাংলা সনের শুরুতে ইতিহাস তথ্য ও তর্ক গোষ্ঠী বাংলার গানের সেই উজ্জ্বল ইতিহাসকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজে সচেষ্ট থাকার সংকল্প নিচ্ছে।